কোথায় হবে খালেদার চিকিৎসা?

ঢাকা ব্যুরো

সোমবার , ১১ জুন, ২০১৮ at ৫:৩৮ পূর্বাহ্ণ
33

কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) নেওয়ার কথা বলা হলেও গতকাল তাকে কোনো হাসপাতালে নেয়া হয়নি। দুপুরে এক অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছিলেন, চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল হাসপাতালে নেয়া হবে। তাঁর বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশের পরপরেই গণমাধ্যমকর্মীরা বিএসএমএমইউতে ভিড় করেন। তবে বিএনপি কিংবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কেউই এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য জানাতে পারেনি।

দুপুরে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সর্ম্পকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছিলেন, ‘খালেদার জিয়ার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে সরকার অবগত রয়েছে। যেসব পরীক্ষানিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে মাইল্ড স্ট্রোক হয়েছে কিনা, সে ব্যাপারে খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউতে নিয়ে যাওয়া হবে।’ আইনমন্ত্রী আরও বলেছিলেন, ‘তিনি (খালেদা) রোজা রেখেছিলেন। বেলা তিনটাসাড়ে তিনটার দিকে একটু হেলে পড়ে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁর অ্যাটেনডেন্ট ফাতেমা তাকে ধরে ফেলেন এবং তাৎক্ষণিক জেলে ডাক্তাররা তাকে দেখেন।’ তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া যেহেতু রোজা রেখেছিলেন, তাই তাঁর সুগার লেভেল কমে গিয়েছিল বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।’ একই দাবি সেতুমন্ত্রী ওবাইদুল কাদেরেরও। গতকাল গাজিপুরে ঢাকাটাঙ্গাইল মহাসড়ক পরিদর্শনে এসে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, খালেদা জিয়ার সুগার লেভেল কমে গেছে।

এদিকে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার ব্যাপারে সরকার শতভাগ আন্তরিক বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। গতকাল রোববার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘খালেদা জিয়ার ব্যাপারে তাঁর চিকিৎসকরা আমাদের জানিয়েছেন উনি মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন। আমরা আজ (রোববার) দুপুরেই তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছি। তাকে কখন পরীক্ষার জন্য নেওয়া হবে, তা ঠিক করবেন আইজি প্রিজন।’

খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসকেরা তাঁকে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন, কিন্তু তাঁকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) কেন নেওয়া হচ্ছে নাসাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এখানেও বড় বড় চিকিৎসকরা রয়েছেন, গবেষকরা রয়েছেন। আবার তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসকরাও রয়েছেন। সুতরাং এখানেই চিকিৎসা হবে। খালেদা জিয়ার চিকিৎসার ব্যাপারে সরকার শতভাগ আন্তরিক। খালেদা জিয়ার যদি এর বেশি কিছু প্রয়োজন হয়, আমরা তা দেখব।’

কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখারুজ্জামান বলেন, খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা তাঁরা পাননি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পেলে খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে নেওয়া হবে।

গত শনিবার বিকেলে কারাবন্দী খালেদা জিয়াকে দেখতে তাঁর ব্যক্তিগত চার চিকিৎসক পুরোনো ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে যান। সেখানে থেকে ফিরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী তাঁদের পর্যবেক্ষণ সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গত মঙ্গলবার খালেদা জিয়া হঠাৎ করে পড়ে গিয়েছিলেন। তিনি ওই সময়টার কথা বলতে পারছেন না। তাঁর একটি ‘মাইল্ড স্ট্রোক’ হয়েছে বলে তাঁরা ধারণা করছেন। বিষয়টি নিশ্চিত হতে আরও পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য খালেদা জিয়াকে কারাগারের বাইরে বিশেষায়িত একটি হাসপাতালে ভর্তি করতে সুপারিশ করেছেন তাঁরা।

এ বিষয়ে অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী বলেন, ‘মাইল্ড স্ট্রোকের ক্ষেত্রে যা সবচেয়ে বিপজ্জনক তা হলো কারও যদি টিআইএ হয় তাহলে আগামীতে বড় ধরনের স্ট্রোক হওয়ার আশঙ্কার আভাস থাকে খুব বেশি। আমরা যারা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দেখতে এসেছিলাম, আমাদের সমস্ত মতামত ও পর্যবেক্ষণ লিখে দিয়ে এসেছি কারা কর্তৃপক্ষকে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা মনে করি কয়েকটি বিশেষ ধরনের পরীক্ষা দরকার খালেদা জিয়ার। এর মধ্যে অন্যতম প্রসথেসিস কমফোর্টেবল এমআরআই মেশিন দিয়ে এমআরআই করানো। খালেদা জিয়ার মস্তিস্কে রক্ত সঞ্চালন পর্যবেক্ষণ করা দরকার। তাঁর নার্ভ কন্ডিশন স্টাডিও করতে হবে। যেহেতু ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) মাঝে মধ্যে শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারছেন না, এ কারণে হাঁটলে মনে হয় তিনি পড়ে যাবেন। সেজন্য আমরা বলেছি, এসব সুযোগসুবিধা আছে ইউনাইটেড হাসপাতালে। চিকিৎসক হিসেবে তাঁকে দ্রুত সেখানে ভর্তি করানোর পরামর্শ দিয়েছি। শিগগিরই এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আমরা আশা করছি।

খালেদার আরেকজন ব্যক্তিগত চিকিৎসক নিউরো সার্জন অধ্যাপক সৈয়দ ওয়াহিদুর রহমানও শনিবার চিকিৎসক দলের সঙ্গে খালেদা জিয়াকে দেখতে কারাগারে যান। তিনি বলেন, ‘উনি (খালেদা জিয়া) আগে থেকেই কিছু ক্রনিক্যাল ডিজিজে ভুগছেন। তবে এখন যেটা হয়েছে তাকে আমরা বলি ব্রেইনে ট্রানজিয়েন্ট স্কিমিক অ্যাটাক। এর ফলে মস্তিস্কে রক্ত চলাচল স্বাভাবিকের চেয়ে কম হয়। এখন উনি স্বাভাবিক আছেন। কিন্তু ভয়ের ব্যাপার হল আগে যে তাঁর রোগ এবং বর্তমান যে অবস্থা এবং যা বয়স তাতে তিন মাসের মধ্যে স্ট্রোকে টার্ন করতে পারে। এখনো হয়নি। তবে আশঙ্কা আছে।’

বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গত শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, খালেদা জিয়া কারাগারে গত মঙ্গলবার দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন। তিন সপ্তাহ ধরে তিনি ভীষণ জ্বরে ভুগছেন; যা কোনোভাবেই থামছে না। খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার দাবিতে গতকাল রোববার সারা দেশে জেলামহানগর এবং ঢাকার থানায় থানায় প্রতিবাদ কর্মসূচী পালিত হয়েছে।

এদিকে বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী (বি.চৌধুরী) গতকাল রোববার এক অনুষ্ঠানে সর্বোত্তম চিকিৎসার জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে লন্ডন পাঠাতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। বি চৌধুরী বলেন, আজ (রোববার) পত্রিকায় দেখলাম, খালেদা জিয়ার চিকিৎসকেরা বলেছেন, তিনি (খালেদা) সাত মিনিট অজ্ঞান ছিলেন। এ কথা সঠিক হয়ে থাকলে তাঁর নিশ্চয়ই টিআইএ হয়েছিল। অর্থাৎ তাঁর সাময়িকভাবে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল কমে গিয়েছিল। এ ধরনের রোগীর ভবিষ্যতে ব্রেন স্ট্রোক বা প্যারালাইসিস হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। সেহেতু এই পর্যায়ে সর্বোত্তম নিউরোলজিক্যাল সেন্টারে তাঁর চিকিৎসা হওয়া উচিত।

সাবেক এই রাষ্ট্রপতি বলেন, যেহেতু খালেদা জিয়া তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধী দলের নেতা ছিলেন, সুতরাং অন্য বিবেচনা বাদ দিয়ে শুধু রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবেচনায় তাঁর সঠিক চিকিৎসা হওয়া উচিত।

x