কোথায় শরণ

সাইয়েদা জয়নাব শিউলী

শুক্রবার , ২ নভেম্বর, ২০১৮ at ৯:০৮ পূর্বাহ্ণ
35

যার অনুষঙ্গ সাহিত্যে তিনি যে পেশারই হোন না কেন সাহিত্য তাঁকে জড়িয়ে রাখবেই। তেমনই একজন মননশীল লেখক ফারুক মঈনউদ্দীন। যিনি একজন সফল ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ। কিন্তুু সাহিত্য তাঁর মনোজগত দখল করে আছে। তাই তিনি স্বাচ্ছন্দ্যে হেঁটেছেন সাহিত্যের বিভিন্ন অঙ্গনে। অনুবাদ করেছেন ভ্রমণ কাহিনী লিখেছেন আর লিখেছেন ছোট গল্প। এ যাবত তাঁর তিনটি ‘গল্পগ্রন্থ’ প্রকাশিত হয়েছে। এবারের ২১শের বই মেলায় শ্রাবণ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘সেই সব শেয়ালেরা’ গল্প গ্রন্থটি। মোট গল্পের সংখ্যা ১০টি। প্রতিটি গল্প পড়লে মনে হয় লেখক সমাজের বাস্তবচিত্রকে পাঠকের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। তাঁর লেখনীতে উঠে এসেছে কঠিন এক সমাজ ব্যবস্থা।
কোথায় শ্রাবণ গল্পটি পড়লাম। অনেকটা এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম। গল্পের গতিটা এমনই ছিলো, নিঃশ্বাস ফেলার জো ছিলো না। সাধারণ কাহিনী। হার হামেশায়ই ঘটে থাকে। কিন্তুু লেখকের লেখার গুণে কাহিনীটা অসাধারণ হয়ে উঠেছে। কোথাও কোনো পদস্খলন নেই, যা স্বাভাবিক তাই একে একে ঘটে চলছে। বর্ণনা গুলো যেন ছবির মতো চোখের সামনে ফুটে উঠেছে। নুরীরা রোকন দাদাদের আশ্রয় থেকে নির্যাতিত হয়ে আসছে, যুগে যুগে, কালে কালে। রোকন দা তার জৈবিক চাহিদা মিটিয়েছে নূরীর কাছে, আবার তাকে শংকামুক্ত ও করেছে! নাকি রোকন দা শংকামুক্ত হয়েছে? উপমা দেওয়াতেও লেখক অনবদ্য, ‘‘আমাদের দেখে উঠে দাঁড়ানোর সময় চিতায় পোড়ানোর সময় হাড় কাটার মতো লোকটার হাঁটুর হাড়ের কোথাও মটমট শব্দ করে ওঠে’’ কিংবা নার্সকে দেখে রোকন দার মন্তব্য এরকম দেখাল পর আমার ডাঁসা পোয়ারর মতোন মনে হয়’’ আবার নুরীর দেহ বিশ্লেষণ করে রোকন দা বলে ‘‘পুষ্ট ধানের গোছার মতো ও রহম হাত ভর্তি এইরে ধরার মতন’’। চোখের সামনে আলোর মতো ফুটে উঠেছে। আর তারা আলোতে বেরিয়ে আসার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে, করতেই থাকে। নুরীর বাবা নুরীকে নিরাপদে রাখার জন্য, বদ লোকের দৃষ্টি থেকে বাঁচানোর জন্য, দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করার জন্য, শান্তিতে থাকার জন্য রোকনদের বাড়ীতে দিয়েছিলো কাজ করার জন্য। কিন্তুু নুরীর বাবা তাও বাঁচাতে পারলো না নুরীকে। সমাজের উপর তলার মানুষের সাময়িক আনন্দের জন্য ইজ্জত বলী দিতে হলো নুরীকে। বাবা আর মেয়ে চোখের জলে ভাসিয়ে দিলো তাদের ক্ষুধাকে, ইজ্জতকে। সত্যিই লেখকের ভাষ্য মতে এই পাপ থেকে বেরিয়ে আসতে তাদের যুগ যুগ লেগে যায়। কারণ খেটে খাওয়া নিম্ন শ্রেণির এই সব লোকদের কোথাও শরণ নেই। নেই কোনো তাদের আশ্রয়দাতা। গল্পে লেখকের এই মন্তব্যটি ফুটে উঠেছে সাবলীল ভাবে। এখানেই ফারুক মঈনুউদ্দীন সার্থক হয়েছে।
মান সম্মান গল্পটি মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের উপর লেখা। যে মন্ত্রণালয়ে সচিবের পিয়ন মনিরুল মুক্তিযোদ্ধাদের চাকরির সুযোগ করে দিতে চায়, সচিবকে ধরে। অনেক চেষ্টা করে যখন মনিরুল গ্রামের রেহান উদ্দিনের চাকরীর ব্যবস্থা করতে পারে না, তখনই জানতে পারে যে তার সচিব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট দিয়ে চাকরি করছে। এতে রেহানউদ্দিন কষ্ট পায় না, রাগ কিন্তু বা হতাশা কিছুই জন্মায় না বরং তার মধ্যে অন্য রকম এক অনুভূতি কাজ করে। বলে, আল্লা যা করে ভালর জন্যি করে, ঠিক না? আমরা দুই আসল মুক্তিযোদ্ধা আইছিলাম। এক ভূয়া মুক্তিযোদ্ধার কাছে’’। রেহান উদ্দিন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার তদবিরে তার ছেলের চাকরী হয়নি এতে বরং খুশীই হয়েছে। লেখক আসল মুক্তিযোদ্ধার সম্মান এমন করেই বাঁচিয়ে দিয়েছেন, সমাজের কাছে তথা দেশের কাছে।
‘অনিকেত অভিবাসী’ গল্পে ভাগ্যান্বেষণে আমেরিকা পাড়ি দেওয়া এক পরিবারের কথা বলা হয়েছে। সেখানেই এই সমাজের যে বাস্তব চিত্রটা ফুটে উঠেছে তা হলো দেশে সুখে থাকা মানুষগুলো অধিক সুখের আশায় পাড়ি জমায় স্বপ্নের দেশ আমেরিকায়। কিন্তুু সে কাঙ্ক্ষিত সুখ আর আসে না ইদ্রিস সিকদারের জীবনে এবং তার পরিবারে। তার বড় ছেলে রুবেল আমেরিকায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে নিজেকে অনেকটা বয়স্ক বানিয়ে ফেললো। দীর্ঘ অপেক্ষার পরও বিভিন্ন জটিলতার কারণে সে যেতে পারছে না আমেরিকায়। সিকদার সাহেব দেশে ভালই ছিলেন। কিন্তুু আমেরিকায় গিয়ে তেমন সুবিধা করতে পারেনি। তারপরও কেমন এক সুখের নেশায় যারা, ঘুম থেইকে জাইগে উঠে আমেরিকায় চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে। তারাও সুযোগ পালি পর ওহানে যাওয়ার জন্য লাইন লাগায়’’। চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করলেও সবাই এক পা বাড়িয়ে রাখে ঐদেশের দিকে, সুযোগের অপেক্ষায়। দেশে আরাম আয়েশে থাকা শিকদার সাহেবের তখকার অবস্থা হলো ‘‘হাজার হাজার মাইল দূরের হতদরিদ্র এক পাড়ার নিতান্ত অসহায়ের মতো পড়ে থাকে, সরকারি অবসর হিসেবে অবসর নেওয়া লোকটি যে এ বয়সে শ্রমিকের মতো শারীরিক পরিশ্রম করেন-এবং এক সময় তাদের চাকরী ও চলে যায়। এসব শুনে রুবেলের মধ্যে রাগের সঞ্চার হয়। স্বপ্ন ভেঙ্গে যাওয়ার কারণে বাবার জন্য ওর মমতা , মায়ের জন্য ভালোবাসা, দুশ্চিতা হঠাৎ করে শূন্যে মিশিয়ে যায় যেনো, তার জায়গায় হতাশা মেশানো রাগ আর অসহায় ক্ষোভ গ্রাস করে নেয় ওর সবকিছু। বাবার মলিন ভেঙ্গে পড়া চেহেরা অস্পষ্ট হয়ে যায় ওর সামনে। হঠাৎ করে কেটে পড়ে ও’’ সোনার হরিণের পিছে ছোটা লোভী মানুষগুলোর ছবি ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন লেখক।
চাওয়া পাওয়া : গল্পে নিশাদকে ভালোবেসেছে লেখক নিশাদের প্রতি ভালোবাসায় যে উত্তাল হাওয়া ছিলো কিন্তুু সেই হাওয়ায় যতো জোর থাকা দরকার তা ছিলো না। তাই সে নিশাদকে কিছুটা ভুলে গিয়ে প্রফেসরের সুন্দরী কন্যাকে বিয়ে করেছে। প্রথম যৌবনের ভালোবাসা কিছুটা ভুলে গেলে ও মনের দিক থেকে ভুলা অতো সহজ ছিলো না লেখকের। তাই নিউইয়র্ক সিটির সাবওয়েতে সেই স্মৃতি গুলো মনের ভেতর ঢুকে পড়তে বেশী সময় লাগে না। গোচরে অগোচরে সেই ভালোবাসার কথা প্রকাশ করেছে নিশাদের কাছে। যদিও এই ভালোবাসায় সন্দেহ প্রকাশ করেছে নিশাদ বলে-‘‘মাখো মাখো কথা বলেছেন এখন, ঢাকায় গেলে এ সব মনে থাকে’’? তারপর তারা নানা অজুহাতেই কিছুটা ঘনিষ্ট হতেই মাঝপথে বিয়ে করে ফেললো পারুলকে। নিশাদ যে স্বপ্ন দেখেছিলো তা ভেঙ্গে গেলো। এরপর তাদের মধ্যে একটা দূরত্ব বাড়তেই থাকলো কিন্তুু মনের দূরত্ব বাড়তে পারেনি। তাই বিদেশ থেকে আসার পরই ছুটে গিয়েছিলো নিশাদের কাছে। মুখের শান্তশ্রী কমনীয়তা উবে যাওয়া নিশাদের দিকে তাকিয়ে ছিলো পলকহীন চোখে। সেখানে বয়সের ভারের চাইতে তারুণ্য ছিলো অনেক বেশী। কিন্তুু নিশাদ শক্ত ধাছের মেয়ে। সে বুঝেছিলো সব মেয়েরা স্বপ্ন দেখতে পারে না, সবাইকে তা মানায় ও না। তাই সে পুকুরের ঘাটে দেখা করতে এসে প্রেম ভালো বাসার কাসুন্দি না ঘেটে সরাসরি চমকে দিয়ে বলে উঠে ‘‘ যাওয়ার আগে আমাকে কিছু টাকা দিয়ে সাহায্যে করে যেতে পারবেন’’ এখানেই গল্পের বাস্তবতা ছোঁয়া পাওয়া যায়। নিশাদ বুঝিয়ে দিলো অভাবের তাড়নায় ভালোবাসার লোকের কাছে টাকা চাওয়াটা এমন কোনো ব্যাপার নয়। বইয়ের অন্যান্য গল্পগুলো ও অনবদ্য। লেখক প্রতিটি গল্পে চমকের পর চমক দেখিয়ে গেছেন। এই চমকের কারণে গল্পগুলো আরো গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।

x