কেমন হবে সড়ক পরিবহনের প্রস্তাবিত আইন

ঢাকা ব্যুরো

মঙ্গলবার , ৭ আগস্ট, ২০১৮ at ৫:৩৩ পূর্বাহ্ণ
582

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রেখে বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহন আইনের খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে সরকার। গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভা বৈঠকে ‘সম্পূরক এজেন্ডা’ হিসেবে এ অইনের খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের বলেন, দুর্ঘটনা সংক্রান্ত অপরাধের বিষয়ে খসড়া আইনে বলা হয়েছে, এই আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন মোটরযান চালনাজনিত কোনো দুর্ঘটনায় গুরুতরভাবে কোনো ব্যক্তি আহত বা প্রাণহানি ঘটলে এ সংক্রান্ত অপরাধ পেনাল কোডের (দণ্ডবিধি) ৩০২, ৩০৪ ধারা অনুযায়ী অপরাধ বলে গণ্য হবে। তবে দণ্ডবিধির কোন ধারায় মামলা হবে তা তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে বলে জানান তিনি। এটা অবস্থার গুরুত্ব অনুযায়ী এভিডেন্স বেইজসড হবে। বোঝা যায়, যদি সে স্বেচ্ছায় কাজটা করেছে, ভলান্টারিলি কাউকে সে পিষে দিল এরকম ঘটনা, এটা পেনাল কোড বা সংশ্লিষ্ট ধারায় এর শাস্তি হবে। তদন্তে ডিসাইড (নির্ধারণ) হবে এটা কোন লাইনে যাবে, (দণ্ডবিধির) ৩০২ ধারায় হবে নাকি ৩০৪ ধারায়। শফিউল বলেন, তবে শর্ত থাকে যে পেনাল কোডে সংশ্লিষ্ট সেকশন ৩০৪ (বি) এ যা কিছু থাকুক না কেন ব্যক্তির বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত কারণে মোটরযান চালানোর কারণে সংগঠিত দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত হলে বা তার প্রাণহানি ঘটলে চালক সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অর্থ দণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

নতুন আইনে সাজার মেয়াদ নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও অর্থদণ্ড নির্ধারণ নেই জানিয়ে শফিউল বলেন, সিচুয়েশেনের উপর নির্ভর করে অর্থদণ্ডের পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

আইমন্ত্রী আনিসুল হক জানান, দণ্ডবিধির ৩০৪ (বি) ধারায় সাজা সাত বছর থাকলেও ১৯৮৫ সালে তা সংশোধন করে সাজা তিন বছর করা হয়। নতুন করে দণ্ডবিধির ৩০৪ (বি) ধারা সংশোধন না করে নতুন সড়ক পরিবহন আইনে দুর্ঘটনায় প্রাণহাণির সাজা পাঁচ বছর করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলছেন, পরিবহন মালিক, শ্রমিক ও যাত্রীদের সঙ্গে আলোচনার পর সব শ্রেণির সর্বসম্মত মতামতের ভিত্তিতেই নতুন আইনে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সর্বোচ্চ সাজা পাঁচ বছর করা হয়েছে।

সড়ক সচিব বলেন, বেপরোয়া গাড়ি চালনার কারণে প্রাণহানির ক্ষেত্রে তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় ইন্টেনশন (ইচ্ছাকৃত) ছিল তবে এর শাস্তি ৩০২ ধারা অনুযায়ী হবে, এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে সড়ক পরিবহন আইনে সড়ক নিরাপত্তার জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান নেই জানিয়ে সচিব নজরুল বলেন, এটা কিলিং পর্যায়ে গেলেই কেবল ৩০২ এ যাবে।

সড়ক সচিব বলেন, বর্তমানে ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানোর শাস্তি সর্বোচ্চ চার মাসের জেল বা ৫০০ টাকা অর্থদণ্ড। নতুন আইনে এজন্য ছয় মাসের জেল ও ২৫ হজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, নতুন আইনে রেজিস্ট্রেশন ছাড়া গাড়ি চালানোর শাস্তি ছয় মাসের জেল বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড রাখা হয়েছে। আগে এই অপরাধের সাজা ছিল তিন মাসের জেল বা দুই হাজার টাকা জরিমানা। ফিটনেসবিহীন গাড়ির জরিমানা বর্তমানে সর্বোচ্চ তিন মাসের জেল বা দুই হাজার টাকা জরিমানা থাকলেও নতুন আইনে তা ছয় মাসের জেল বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সড়ক সচিব জানান, গাড়ির চেসিস পরিবর্তন, জোড়া দেওয়া, বডি পরিবর্তন করার শাস্তি দুই বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড ছিল, সেটাকে বাড়িয়ে এক থেকে তিন বছরের কারাদণ্ড বা তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সড়কের ত্রুটির জন্য দুর্ঘটনা হলে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী দায়ী হবেন কি নাসেই প্রশ্নে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, তাদেরকে দায়ী করা হবে। কোনো সরকারি কর্মচারী তার উপর অর্পিত দায়িত্ব অবহেলা বা ত্রুটিপূর্ণভাবে পালনের জন্য দুর্ঘটনা ঘটলে ওই কর্মচারীকে দায়ী করে প্রচলিত আইনে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

অদক্ষ চালক নিয়োগ করলে মালিকদের সাজা হবে কি নাজানতে চাইলে শফিউল বলেন, চুক্তি করতে হলে চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স লাগবে, আর শ্রম আইন অনুযায়ী মালিক ও চালককে চুক্তিপত্র করতে হবে। শফিউল জানান, নতুন আইন পাস হলে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার জন্য বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে। আর পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে চাইলে বয়স হতে হবে ২১ বছর। অষ্টম শ্রেণি পাসের সনদ না থাকলে কেউ ড্রাইভিং লাইসেন্স পাবেন না। প্রত্যেক চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিপরীতে ১২ পয়েন্ট করে বরাদ্দ থাকবে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, অপরাধ করলে পয়েন্ট কাটা যাবে, পয়েন্ট শূন্য হয়ে গেলে ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে। ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী ব্যক্তি অপ্রকৃতস্থ, অসুস্থ্য, শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম, মদ্যপ বা অপরাধী হলে সরকার তার ড্রাইভিং লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করতে পারবে।

ভাড়ায় খাটে এমন যানবাহন যেমনসরকারি, লাশ বহনকারী ও সৎকারে নিয়োজিত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স এবং রেকারগুলোকে রুট পারমিট থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। নতুন আইন অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থে সমগ্র বাংলাদেশ বা যেকোনো এলাকার জন্য যেকোনো ধরনের মোটরযানের সংখ্যা নির্ধারণ করে দিতে পারবে বলেও জানান শফিউল আলম।

তিনি বলেন, যেকোনো ধরনের গাড়ির জীবনকাল প্রজ্ঞাপন দিয়ে সরকার নির্ধারণ করে দিতে পারবে। চালক ও তার সহকারীদের যথাযথভাবে রেস্ট হয় না, তাদের সুবিধার জন্য সরকারি প্রজ্ঞাপন দ্বারা শ্রম আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর্মঘণ্টা ও বিরতিকাল নির্ধারণ করে দেওয়া যাবে। নিয়োগকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আবশ্যিকভাবে সেই কর্মঘণ্টা বা বিরতিকাল মেনে চলতে হবে। মোটরযানের গতিসীমা, শব্দমাত্রা এবং পার্কিংয়ের বিষয়ে আইনে বিস্তারিতভাবে বলা আছে বলেও জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

মোটরযান চলাচলে সাধারণ নির্দেশাবলী দেওয়া আছে জানিয়ে সচিব বলেন, মদ বা নেশা জাতীয় দ্রব্য সেবন করে কেউ গাড়ি চালাতে পারবে না। নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করে চালকের সহকারী গাড়িতে অবস্থান করতে পারবে না। চালকের সহকারীদের যানবাহন চালানোর দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। সড়ক বা মহাসড়কে উল্টে পথে গাড়ি চালাতে পারবে না। মোটরযান চালানোর সময় চালক মোবাইল ফোন বা অনুরূপ কোনো কিছু ব্যবহার করতে পারবে না।

এছাড়া সিট বেল্ট বাঁধা, যান চলাচলে যাত্রীরা যাতে চালককে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করা এবং মহিলা, শিশু, প্রতিবন্ধী ও বয়োজ্যেষ্ঠ যাত্রীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে যাতে অন্য কেউ না বসে সে ব্যাপারে নির্দেশনা রয়েছে বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

প্রস্তাবিত আইনে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে জানিয়ে শফিউল বলেন, কোনো মোটরযান দুর্ঘটনায় কেউ আঘাতপ্রাপ্ত বা মারা গেলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি তার উত্তরাধিকারী আর্থিক সহায়তা তহবিল থেকে ট্রাস্টি বোর্ড কর্তৃক ক্ষতিপূরণ বা চিকিৎসার খরচ পাবেন। এই সহায়তা তহবিল কীভাবে গঠন হবে আইনে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা রয়েছে। ওই তহবিল পরিচালনায় ট্রাস্টি বোর্ড করা হবে। সরকারি অনুদানের পাশাপাশি মোটরযানের মালিকের কাছ থেকে আদায়কৃত চাঁদা, এই আইনের অধীন জরিমানার অর্থ, মালিক সমিতির অনুদান, মোটরশ্রমিক ফেডারেশন বা সংগঠনের অনুদান বা অন্য যেকোনো বৈধ উৎস থেকে পাওয়া অর্থ নিয়ে এই তহবিল গঠন করা হবে।

শফিউল বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট চালক ও তার সহকারীরা তাৎক্ষণিকভাবে নিকটস্থ থানা এবং ক্ষেত্রমতে ফায়ার সার্ভিস, চিকিৎসা সেবা ও হাসপাতাল।

x