কেমন আছে লাল-সবুজের দেশ?

রুমান হাফিজ

মঙ্গলবার , ২০ আগস্ট, ২০১৯ at ১১:৪৬ পূর্বাহ্ণ
21

কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। চতুর্দিকে বাড়ছে ভয়ের সংস্কৃতি। কতিপয় গোষ্ঠী এবং ব্যক্তির স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে সর্বত্র ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে চলেছে। প্রকাশ্যে দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন নিপীড়ন মাত্রাতিরিক্তভাবেই বাড়ছে। দিনদিন চরম নৈতিক অবক্ষয়ের দিকেই পতিত হচ্ছে দেশ। ফলশ্রুতিতে যা সমাজের প্রতিটি নাগরিককে ভাবিয়ে তুলছে। প্রশাসনিক কাঠামোর অব্যবস্থাপনা আর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা বিচারহীনতার সংস্কৃতি কতিপয় দুর্বৃত্তদের বেপরোয়া করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করছেন সমাজের বিশিষ্টজনেরা। পৃথিবী ও সমাজ নিত্য পরিবর্তনশীল। মানুষের সমাজ কোথাও থেমে নেই। চলমান পৈশাচিক কর্মকাণ্ডে চমকে উঠি, ভাবি কোথায় গেল আমাদের সেই সময়, আমাদের সেই সোনালি দিনগুলো?
সর্বশেষ বরগুনায় স্ত্রীর সামনে স্বামীকে দিনদুপুরে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা সারাদেশে আলোড়ন তৈরি করেছে। এমন ঘটনা সারাদেশের নিত্যনৈমিত্তিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের বর্তমান অবস্থা কোনো সভ্য সমাজের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না বলে মনে করেন ইডেন মহিলা কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী রামিসা রাফিকা। তার মতে, ‘সামপ্রতিককালে যেই পৈশাচিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণ এতটাই বেড়েছে যে বর্তমানে এটি একটি সামাজিক অবক্ষয়। এর একটি ভয়ংকর চিত্র তুলে ধরেছে। আমাদের দেশে আইনের শাসন থাকলেও এর যথার্থ প্রয়োগ শুধু নিম্নবিত্ত কিংবা খেটে খাওয়া মানুষের উপরই প্রয়োগ করা হচ্ছে ফলে সমাজের প্রভাবশালী ব্যাক্তিবর্গ অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন। অপরদিকে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার ফলে অপরাধীরা খুব সহজেই আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে আসতে পারছে। আবার দেখা যায়, অপরাধী চক্রের সাথে পুলিশ প্রশাসনের একটি অলিখিত আঁতাত থাকে। তাছাড়াও নতুন ইস্যু তৈরি হওয়ার সাথে সাথে পুরনো ইস্যু ভুলে যাচ্ছি। একজন মানুষ যখন আরেকজন মানুষকে হত্যা করে কিংবা হত্যা করার জন্য প্রশ্রয় দেয়, তখন সমাজ আর সমাজ থাকে না। কোন সভ্য সমাজে এ-অবস্থা চলতে পারেনা।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শামিমা ছিদ্দিকা দেশের সার্বিক বিষয়গুলোর আশানুরূপ পরিবর্তনের শূন্যতা অনুভব করেন। তার মতে, ‘যত মানুষ দাঁড়িয়ে দিনে দুপুরে জনসম্মুখে হওয়া অপরাধগুলো নির্বিকারভাবে দেখে তাদের কিছুটা অংশও যদি প্রতিবাদের আওয়াজ তুলতো হয়তো বর্তমান বাংলাদেশ-এর চিত্রটা অন্যরকম হতো। স্বাধীনতার অর্ধশত বছরেও আশানুরূপ পরিবর্তন কেন জানি হয় নি। পরিপূর্ণ মানবতাবোধ সম্পন্ন জাতি হয়ে উঠতে অন্তর্গত পরিবর্তনের যথেষ্ট ঘাটতি রয়ে গেছে। বিশ্বায়নের ধারাবাহিকতায় এবং প্রযুক্তির সংস্পর্শে এসে আমাদের যতটা উপকৃত হওয়ার কথা ছিলো কিন্তু এর সঠিক ব্যবহার না শিখিয়ে প্রযুক্তি হাতে তুলে দেয়ার দরুণ ক্ষতির দিকের পাল্লাটাই বরং ভারী হয়েছে দিনে দিনে। অপরাধীদের সুষ্ঠু বিচারের আওতায় না আনার সংস্কৃতি অপরাধ প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
অপরাধ বেড়ে চলার এই অমানবিক অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে তরুণ প্রজন্মকে যান্ত্রিক পৃথিবীর বাইরের দুনিয়াটাতে বিচরণ বাড়াত হবে। পরিবার,সমাজ ও রাষ্ট্রকে দেশের প্রতিটি নাগরিকের মানবতা বোধ, বিবেক বোধ জাগ্রত করতে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে। এর পাশাপাশি সরকার, রাষ্ট্রকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট আন্তরিক হতে হবে।’
কথা হয় ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম এর ইকোনমিকস অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষেও শিক্ষার্থী ইফরাত আরা নাজনীনের সাথে। যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় আর সঠিক শিক্ষার অভাবে দিনেদিনে দেশের সার্বিক অবস্থা অধঃপতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে বলে মনে করছেন তিন। বর্তমানে দেশের যুবসমাজ নিজস্ব ব্যাক্তি স্বার্থে,রাজনীতি স্বার্থে,বিভিম্ন অপরাধ মূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। তারা এখন দিন দুপুরে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি, মারামারি, খুনাখুনি এবং ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধ মূলক কাজ করে যাচ্ছে। এইসব মানুষ রাজনীতির ছত্রছায়া থেকে এই সব অপকর্মের সাহস পাচ্ছে। এই সব কর্মকাণ্ডের কারণ হচ্ছে আমাদের দেশের দুর্বল আইন ব্যবস্থা। সর্বত্র বৃদ্ধি পাচ্ছে অস্থিরতা, ভয়,ভীতি, শঙ্কা ও অনাস্থা। বৃদ্ধি পাচ্ছে শোষণ, নির্যাতন, অন্যায় ও অরাজকতা। মাথা ছাড়া দিয়ে উঠছে বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাস। বৃদ্ধি পাচ্ছে মাদকের ব্যবসা। অশান্ত হয়ে যাচ্ছে পৃথিবী। মানুষ শান্তির অন্বেষায় ব্যাকুল হয়ে পড়েছে। আজ মানুষকে শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারছে না কোন সমাজ, কোন সংগঠন, কোন রাষ্ট্র, এমন কি কোন ধর্ম। সর্বত্রই অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা বিরাজমান। এই থেকে মুক্তি পাওয়া জন্য সঠিক উপযোগী আইন প্রণয়ন করতে হবে, আইনে সঠিক ব্যবহার যেন প্রয়োগ করা। সর্বোপরি জনগণের মধ্যে প্রতিবাদমূলক মনমানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
তাহ্‌িসনা এনাম তৃষা। পড়ছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইন্সটিটিউটের দ্বিতীয় বর্ষে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কি ভাবছেন? প্রশ্নের উত্তরে যেমনটা জানালেন, ‘দেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে প্রথমেই যে কথাটা মাথায় আসে তা হলো, আমাদের নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটেছে। শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে দেশ অসামান্য সাফল্য অর্জন করলেও আমাদের মূল্যবোধ একদম তলানিতে এসে ঠেকেছে। প্রযুক্তির অবাধ অপব্যবহার এবং বিজাতীয় অপসংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ আজ আমাদেরকে বিবেকহীন প্রাণীতে পরিণত করেছে। এই কোপাকুপির সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার একমাত্র উপায় হচ্ছে নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটানো। পারিবারিক এবং সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করা। পড়ালেখার পাশাপাশি দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা বৃদ্ধি করতে হবে এবং সুস্থ বিনোদনের ব্যাবস্থা করতে হবে। এছাড়া অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে কঠিন শাস্তি দিতে হবে এবং মাদকের সহজলভ্যতা কঠোর হাতে দমন করতে হবে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস সামাজিক মূল্যবোধের অভাবকে দায়ী করে সেখানে থেকে উত্তরণে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গুরুত্ব দেওয়ার কথা মনে করে বলেন, ‘দেশে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে কিন্তু নৈতিকতার উন্নয়ন হচ্ছেনা। আমরা সমাজে থেকেও সমাজ নিয়ে ভাবছি না। এখন কেউ অন্যায়ের প্রতিবাদ করে না, কারো বিপদে এগিয়ে আসে না। কেউ যেন কারো নয়! সামাজিক মূল্যবোধের অভাবই দেশে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির মূল কারণ। কারো একার পক্ষে রাতারাতি এ সমস্যাগুলো দূর করা সম্ভব না। এর জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি সকল অন্যায়, অপরাধের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।’
কিন্তু বর্তমান সময়ে সুস্থ সংস্কৃতিকে রক্ষার বা সমাজকে সুস্থ রাখার জন্য কোনও মহল থেকেই তেমন কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে খবর নেই। এখন সমাজে আর্থিক দুর্নীতি, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, সামাজিক অবক্ষয়, কালো টাকা ইত্যাদি নিয়ে আন্দোলনের কথা বলা হচ্ছে। দেশের তথাকথিত ভাইটাল সমস্যাগুলো নিয়ে নানাজন নানাভাবে কথা বলছেন কিন্তু মারাত্মক সমস্যাদি সমাধানে কেউ দৃঢ়ভাবে এগিয়ে আসছেন না। এভাবে চলতে থাকলে সমস্যায় জর্জরিত সমাজটাই বিপন্ন হয়ে পড়বে একদিন। আর সে কারণেই সমাজের বিদ্যমান ত্রুটিপূর্ণ জায়গাগোলতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে এক্ষুনি। যতো দ্রুত সম্ভব।

x