কেবল বিসিএস কেন?

নাদিম মাহমুদ

শনিবার , ৮ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৫:৪৯ পূর্বাহ্ণ
770

বছর চারেক আগে আমার সহপাঠিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়েছে। এদের মধ্যে মাত্র ১৫ শতাংশ চাকরি বা কর্মসংস্থান খুঁজে পেয়েছে আর অন্যরা সব সরকারি কর্ম কমিশনের বিসিএসে পরীক্ষার পিছনে ছুটছে। কারণ কী? বিসিএস আমাদের কেন টানছে? কারণ, প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তারা মূলত বেতনের সাথে সাথে চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা, ভ্রমণ, বাড়ি ভাড়া, কাপড় পরিষ্কার করার ভাতা, প্রেষণভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, যাতায়াত ভাতা, টিফিন ভাতা,ঝুঁকিভাতাসহ নানাবিধ সুবিধায় হাবুডুবু খায়।
অথচ, বেসরকারি চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এইসব ভাতা তেমন একটা নেই। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান দেয়ার চেষ্টা করলেও সিংহভাগ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে এই ধরনের সহায়ক ভাতা চাকরিরতরা পান না বলে নজির রয়েছে। ফলে, নিরাপদ জীবিকা নির্বাহের মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে সরকারি চাকরি ব্যবস্থাকে সবার উপর রাখে আমাদের তরুণ প্রজন্ম।
তাই বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের প্রধান লক্ষ্য হলো, যে করেই হোক বিসিএস ক্যাডার হতে হবে, যা হতে না পারলে তাদের জীবনটাই বৃথা। এমন দৃঢ় মনোবল নিয়ে শুরু করা কর্মজীবনের প্রবেশের পরীক্ষার তালিকায় শুধু আমার সহপাঠিই নয়, বাংলাদেশের লাখ লাখ স্নাতক/স্নাতকোত্তর পাসকৃতরা চোখ বন্ধ করে, আমেরিকার প্রেসিডেন্টের নাম কিংবা হনুলুলুর নাম মুখস্ত করে দিনের পর দিন বিসিএস পিছনে ছুটছে। বিসিএস ক্যাডার হওয়ার মানে জীবনের সব সফলতা হাতের মুঠোয় ধরা দেয়া। সরকারি চাকরিতে শুধু বেতন নয়, ক্ষমতার দাপট মেলে ধরার অন্যতম কৌশলও বটে।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক, প্রায় চার লাখ আবেদন পড়ে সর্বশেষ ৩৮তম বিসিএস পরীক্ষায় যার পদ সংখ্যা ছিল মাত্র ২ হাজার ২৪টি। বিপুল সংখ্যক এই পরীক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে বিসিএসে নিয়োগের পর বাকিরা ফের পরবর্তী বছরের বিসিএসের পেছনে দৌঁড়ান। শিক্ষা জীবন সমাপ্ত করে অন্তত ৪ থেকে ৫ বার বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়েও যখন টিকতে পারছেন না তখন এই বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী চাকরির বয়স বৃদ্ধির আন্দোলনে শরীক হচ্ছেন। দাবি উঠছে ৩৫ বছর পর্যন্ত সরকারি চাকুরির বয়সসীমা করার। কিন্তু এই দাবিগুলো কেন? কেন আমরা বিসিএস ক্যাডার হওয়ার ব্যাপারে মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ছি?
বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার রেখা অনুসরণ করলে দেখা যাবে, একজন শিক্ষার্থী এসএসসি ১৫-১৭ বছরে, এইচএসসি ১৮-২০ বছরে আর বিশ্ববিদ্যালয় পাস করে তার বয়সের কোঠা গিয়ে ঠেকে ২৪-২৫ বছরে। সেশন জটের কবলে পড়লে সেটা দুই এক বছর দীর্ঘায়িত হয় বটে। এই যুবক বয়সে চাকরি পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা আর পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে আরো ৪/৫ বছর। আর সেটা যদি হয় বিসিএস, তাহলে তো আর কথাই নেই। সরকারি চাকরির আশা বাদ দিয়ে হতাশায় হাবুডুবু খেতে খেতে অনেকের মনে হচ্ছে, যেকোনও খড়কুটা ধরতে পারলে বুঝি বেঁচে থাকার স্বাদ পাওয়া যাবে। ঠিক এমনই ঘটনা ঘটছে বাংলাদেশের ২৫ থেকে ৩১ বছর বয়সী যুবক-যুবতীদের। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানে সেরা ছাত্রটি, প্রকৌশল কিংবা মেডিকেলের ছাত্রটিও বিসিএস স্বপ্নে বিভোর। যাদের আবার পছন্দের তালিকায় রয়েছে প্রশাসনিক ক্যাডার।
আমার ভাবতে অবাক লাগছে, যে ছেলেটি বা মেয়েটি ডাক্তারি কিংবা প্রকৌশল পাস দিলো, সে কিনা প্রশাসনের কোনও বড়কর্তা হওয়ার বাসনায় তার অর্জিত বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানকে বাংলা, ইংরেজি আর সাধারণ জ্ঞান চর্চার মধ্যে হাওয়া করে দিলো! যে ছেলেটি বায়োক্যামিস্ট্রি কিংবা মাইক্রোবায়োলজিতে সর্বোচ্চ ফল করলো, সে কিনা কাস্টমস কর্মকর্তা হওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগছে! কিন্তু কেন? তাদের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা করা লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তারা সেদিকে না ঝুঁকে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার ভূত তাদের মাথায় কেন চেপে বসছে?
ঠিক এইভাবেই আমাদের সৃজনশীলতা হারিয়ে লক্ষ্যহীন হয়ে পড়ি তা কেউ জানে না। ছোটকালে আমাদের যে স্বপ্নগুলো চোখের আশেপাশে ঘুরঘুর করতো তা বড় হওয়ার সাথে সাথে লাপাত্তা হয়ে যায়। আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়ছে, তাদের অধিকাংশই মনের বিরুদ্ধে পড়াশোনা করেন। এখানে কেউই আগে থেকে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত সাবজেক্টে পড়ার সুযোগ পান না। ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা মেডিকেল কলেজে যারা পড়াশোনা করে তাদের সিংহ ভাগই বাবা-মার স্বপ্ন পূরণ করতে পড়তে যায়। খুব কম সংখ্যক আছেন, যারা নিজেদের মধ্যে সেখানে পড়াশোনা করার ইচ্ছা পোষণ করে। অনেকটা অ্যাকসিডেন্টালি পড়াশোনা করছে।
ঠিক তেমনি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কম সংখ্যক শিক্ষার্থীই আছেন, যারা নিজেদের আত্মিক ভালো লাগার বিষয়গুলোতে পড়াশোনা করছেন। আমরা মূলত একটি চাকরি পাওয়ার আশায় তীব্র প্রতিযোগিতার মাঠে নিজেদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার নেশায় মত্ত থাকি। আমরা কেউই ছোটবেলা থেকে রাজনৈতিক হওয়ার স্বপ্ন দেখি না, গবেষক হওয়ার চিন্তা রাখি না, ভালো ব্যবসায়ী হওয়ার চিন্তা করি না, সাংবাদিক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করি না, শিক্ষক কিংবা কৃষক হওয়ার ভাবনা আসে না। মনের ভালোবাসা থেকে প্রাপ্ত পেশার সংখ্যা হাতে গুণতে পাওয়া যায়।
২০১৫ সালে জাপানের আডিকো গ্রুপ এশিয়ার সাতটি দেশে জরিপ চালিয়েছিল। সেখানে ৬ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তারা বড় হয়ে কী হতে চায়? জাপানি শিশুরা উত্তর দিয়েছিল, তারা কোম্পানির চাকরি, ফুটবল খেলোয়াড়, সিভিল সার্ভিস ও বেইসবল খেলোয়াড় হতে চায়। মজার বিষয় হলো এরা কেউ ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়নি। বছর খানেক আগে আমার কয়েকজন সহপাঠিকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, সে সরকারি চাকরি করতে আগ্রহী কি না? ওদের উত্তরে যা পেলাম তা সত্যিই আমি আশা করিনি। সরাসরি বলে দিলো- না। আমি এরপর জিজ্ঞাসা করলাম, কেন নয়?
তারা বললো, সরকারি চাকরি আর বেসরকারি চাকরির তফাৎ কোথায়? সরকারি চাকরিতে ঢুকলে যে বেতন পাওয়া যাবে, বেসরকারি চাকরিতে তা প্রায় সমান। তবে বেসরকারি চাকরিতে সুযোগ-সুবিধাই বেশি। অযথা সময় নষ্ট করে সরকারি চাকুরির পেছনে দৌড়ানো জাপানি শিক্ষার্থীদের অভ্যাস নয়। তাছাড়া, প্রশাসনিক চাকরি মূলত পাবলিক আডমিনিস্ট্রেশন কিংবা এই সম্পর্কিত বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পাসকৃতদেরই জন্য। আমাদের চাকরিতে বৈচিত্রতাই বেশি।
শুধু জাপান নয়, একটু স্বচ্ছল দেশগুলোর সরকারি কিংবা বেসরকারি চাকরির তারতম্য খুঁজে বের করা কঠিন। বেতনে সাম্যাবস্থা থেকে শুরু করে যাবতীয় মহার্ঘ্য ভাতায় সম-অধিকার থাকে বেসরকারি চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। ফলে এইসব দেশগুলোতে সরকারি কিংবা বেসরকারি পদের বিশেষ পার্থক্য থাকে না।

একথা নি:সন্দেহে মেনে নেওয়া জরুরি, যেকোনও দেশে প্রশাসনিক চাকরির একটা বিশেষ মর্যাদা যেমন আছে, তেমনি নন-গর্ভমেন্ট পদ হোল্ডারদের বৈষম্যের চোখে দেখা হয় না। তবে উল্টো ঘটনা কেবল আমাদের দেশে। এখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরির নিরাপত্তাহীনতা যেমন ওত পেতে থাকে তেমনি, সরকারি চাকরি থেকে বৈষম্যতা বেশ পরিলক্ষিত হয়। ফলে, সরকারি চাকরি সবার কাছে সোনার হরিণই বটে।
বায়োলজিক্যাল সায়েন্সে ‘সিঙ্গুলারিটি’ নামে একটি বিশেষ টার্ম আছে, যার অর্থ হল, ক্ষুদ্র কোনও জিনিসের পেছনে ছুটে সেই কেন্দ্রিক হয়ে পড়া। ঠিক তেমনি, দেশের শিক্ষার্থীদের কাছে বিসিএস ‘সিঙ্গুলারিটি’ হয়ে উঠেছে। যে শিক্ষার্থী বিসিএসের জন্য ৪/৫ বছর দৌড়ে যখন কোন ফল পেলেন না, তখন তাকে অমেধাবী বলে আখ্যা দান মোটেই সমীচীন বলে আমি মনে করি না। কেবল মাত্র, কিছু মুখ্যস্তবিদ্যায় অকৃতকার্য হয়ে মেধা নেই নেই বলে তাদেরকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।
চার লাখ পরীক্ষার্থী থেকে যদি প্রতি বছর আড়াই হাজার বিসিএস ক্যাডার নেয়া হয়, তাহলে স্নাতক শেষ করার পর ৪ বার বিসিএসে অংশগ্রহণে সর্বোচ্চ দশ হাজার ক্যাডার নেয়া হয়। তাহলে বাকিরা কী হতাশায় ডুবে নিজেদের লক্ষ্যকে তলানিতে গিয়ে তুলবে? নাকি নিজেদেরকে নতুন করে গড়বে? যে বিসিএসের জন্য এতো তোরজোর সেটা না করে, যদি কেউ কম বেতনের কোন চাকরিতে ঢুকতো তাহলে এই ৪ বছরের তার দক্ষতার সাথে সাথে বেতন ও অন্যন্য সুবিধাও কয়েকগুণ বেড়ে যেত। অথচ আমরা এক অন্যরকম মোহজালে আটকা পড়ে যাচ্ছি। আমাদের তরুণদের বিসিএস কেন্দিক ছুটতে দিয়ে আমরা মূলত আমাদের তারুণ্যের শক্তিকে হারাতে বসছি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চাকরি বেতন নির্ধারণ করা হয় বয়সভেদে। যার বয়স যত কম, তার বেতন ততো বেশি। কারণ একটাই, তারুণ্যের ভরপুর শক্তিকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতির চাকাকে সচল করা। কিন্তু আমরা পারছি না। সিঙ্গুলারিটির আবেশে নিজেদের বয়স বাড়িয়ে ‘চাকরি বয়সসীমা’ বৃদ্ধির দাবি তুলছি। আমার মনে হয়, সময় এসেছে বিসিএস বিকেন্দ্রকরণ সরকারের পদক্ষেপ নেয়ার। এইভাবে একটি দেশ চলতে পারে না। কেবল এই ক্যাডার ভিত্তিক কমসংস্থানের লোভে অনেক মেধাবীদের আমরা হারিয়ে ফেলছি। যাদের কাজ ছিল, শিক্ষা-গবেষণায় নিজেদের উজাড় করে দেওয়া- তারা পাপেটের মতো মুখস্ত ডায়লগ আওড়াতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। উগলে দেয়া স্মৃতি শক্তির পরীক্ষায় কখনো সৃজনশীলতা প্রকাশ পায় না। সৃজনশীলতার জন্য প্রয়োজন বিশদ পরিবেশ।
আমলাতান্ত্রিক চাকরি ব্যবস্থা রুখতে সরকারের উচিত, নতুন কোনও কমিশন করে দেওয়া, যারা সরকারি চাকরির আদলে বেসরকারি চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও বেতন কাঠামো থেকে শুরু করে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার কাজটি করবে। চাকরির নিরাপত্তা বা সুরক্ষার বিষয়ে অন্যদের এগিয়ে আসা জরুরি বলে মনে করি। যদি তা করা সম্ভব না হয়, আমরা আমাদের তারুণ্যকে হারিয়ে ফেলবো। আজ যদি সরকারি চাকরির সাথে অন্যন্য চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বৈষম্য কমিয়ে আনা যেত, তাহলে আমরা এভাবে দিনের পর দিন আমলাকেন্দ্রিক চাকরির নেশায় ছুটতো না। দীর্ঘমেয়াদী বিসিএস পরীক্ষায় সফলতার লোভে বেকারত্বের ডেমোগ্রাফ উর্ধ্বমূখী হতো না। তাই আমরা চাইবো, বিসিএস বিকেন্দ্রীকরণে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে যৌথভাবে এগিয়ে আসা। তরুণদের হতাশায় না ফেলে আশার বীজ বপনে সহযোগিতা করা। তবে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ, এগিয়ে যাবে আমাদের তারুণ্য।
সৌজন্য : বিডিনিউজ টুয়েন্টি ফোরডটকম

Advertisement