কেন ভাববো দেশের কথা

জাকির হোসেন কামাল

শনিবার , ১৪ এপ্রিল, ২০১৮ at ৮:৩২ পূর্বাহ্ণ
73

কেন ভাববো দেশের কথা? দেশ আমার কে? আমাকেই বা কেন ভাবতে হবে দেশের কথা, আর কি কেউ নেই? আমি একজন না ভাবলেই কি আসে যায় দেশের? এরকম অনেক প্রশ্ন খেলে যায় কারো কারো মাথায়। আবার কারো কারো যায়ও না।

দেশ মানে কী? দেশ মানে কি একটি ভুখন্ড, গাছপালা, নদীনালা, খালবিল, মানুষ, গরশু, হাট বাজার, না আলোবাতাস, না কি সব? প্রশ্ন তো আর হয়না শেষ। নাহোক। আমি বলবো তবুও ভালো, মাথায় প্রশ্ন আসছে, মাথার জট খুলছে। আজ মনে হতে পারে, দেশ নিয়ে না ভাবলে এমন কি আসে যায়। কাল তার বিপরীতটাও মনে হতে পারে। প্রথম কথা হলো ভাবতে হবে। শুধু রুটিরুজিভাতকাপড় নিজের কিংবা নিজের সংসারকে নিয়ে ভাবলেই যথেষ্ট হবেনা। এর বাইরেও যে আরো বিশাল জগৎ আছে। তা নিয়েও ভাবতে হবে। শুধু মুর্ত জিনিস নিয়ে, শুধু জাগতিক জিনিস নিয়ে, শুধু নিছক ভোগ্য পন্য নিয়ে ভাবলেই যথেষ্ট হবেনা। ভাবতে হবে বিমূর্ত বিষয় নিয়ে, নীতিনৈতিকতা নিয়ে, নান্দনিকতা সৌন্দর্যবোধ নিয়ে, ত্যাগ ও ভালোবাসা নিয়ে। ভাবতে ভাবতেই আবিষ্কার, উদ্ভাবন, নতুন কিছু। ভাবতে ভাবতেই নিউটন, আইনষ্টাইন, গ্যালিলিও, নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, বঙ্গবন্ধুহাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি।

আজ দেখি ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তার ক্রমবর্ধমান বিস্তার। কী ঘর থেকে কী বাইরে থেকে। অথচ ঘর হচ্ছে শিক্ষার, ত্যাগের, দেশ প্রেমের, সামাজিকিকরণের প্রথম পাঠশালা। বিজ্ঞাপন হয়, একা একা খেতে চাও, দরজা বন্ধ করে খাও। এ বিজ্ঞাপনের জন্য কাউকে দায়ী করা হয়না। একসময় সাবানের আরেকটি বিজ্ঞাপন ছিল, বাপ্পি, তোর সাবান হ্মো না কিরে? শৈশবেই টিজ করার শিক্ষা দেয়া হচ্ছে বিজ্ঞাপনে।

আগে গ্রামে গ্রামে বা পাড়ায় পাড়ায় ক্লাব ছিল, সংগঠন ছিল। এখন আর চোখে পড়েনা। এর সবগুলো সবসময় ভালো কাজ করতো, তা হয়তো না। তবে কিছু কিছু হলেও ভালো কাজ করতো। একটি সংগঠনের একটি ভালো কাজ দেখে অন্য সংগঠন আরেকটি ভালো কাজে হাত দিতো। আজ আর তা নেই। লূপ্ত হচ্ছে সংঘবোধ। চোখের সামনে কোন অনাচার দেখলে আমাদের অনেকেরই কোন কিছু যায় আসেনা। অপরের ছেলেটা গাঁজা খাচ্ছে, খাক। আমার ছেলেটা তো ভালো আছে। প্রতিবেশীর ছেলেটা গোল্লায় যাচ্ছে। যাক। সে অধম না হলে আমার ছেলে যে উত্তম, লোকেতো তা বুঝবেনা। এরকম ভাবনাও কারো কারো মাথায় আসতে পারে। কিন্তু মাথায় আসেনা, প্রতিবেশীর ছেলেটা ডাকাত হলে সে তো তার নিজের ঘরে ডাকাতি করবেনা, ডাকাতি করবে আমার ঘরেই। আগে কোন ছেলেছোকরাকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মুরুব্বীদের সামনে সিগারেট খেতে দেখলে, তাস খেলতে দেখলে দশগ্রাম দূরের বর্ষিয়ান ব্যক্তিটিও তাকে বাধা দিতেন। ছেলেটিকে তার বাবার নাম জিঞ্জেস করতেই ছেলেটি কাঁচুমাচু হয়ে বলতো, মা করে দেন, চাচা আর কোনদিন করবোনা। দয়া করে আমার বাবাকে বলবেন না। আজকাল তো ফ্রি ষ্টাইল। ডেম কেয়ার। আর বাপধনটিও নদরকান্তি ছেলের অধরে সিগারেট দেখলেও মা করে দেন সীমাহীন উদারতায়। অনেকের ক্ষেত্রেই উল্টো তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠা এবং বলা, আমার ছেলে গোল্লায় গেলে, তোমার কি? এই যদি হয় পারিবারিক প্রশ্রয়, মূল্যবোধ, তাহলে সমাজ এগুবে কি করে?

সংঘবোধ না থাকায় শুভবোধ নেই। শুভবোধ না থাকায় ন্যায়অন্যায় চেতনা বিলীন। ন্যায়অন্যায় চেতনা বিলীন হওয়ার অনাচারে বাধা দেয়ার সাহস তিরোহিত। ফলে প্রতিবাদ প্রতিরোধের অভাবে সন্ত্রাসী, অন্যায়কারীরা দূঃসাহসী। এতো এক চেইন বা চক্র। বিপরীতে সংগঠিত হচ্ছে অপশক্তি। সংঘবোধ বৃদ্ধি পাচ্ছে তাদের। কারণ এরা জানে, তাদের সংগঠিত শক্তির জোয়ারে ভেসে যাবে সকল শাসন ও বিচার ব্যাবস্থা।

ভেবে দেখুন, কেউ কেউ উৎসাহিত হয়ে নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে দিনান্ত পরিশ্রমের পর একটি ফুটবল খেলার আয়োজন যদি করে বসে, তবে চোখ বন্ধ করে আমি বলতে পারি, খেলা শেষ হওয়ার আগেই মারামারি হবে। এতোদিন খেলা হয়নি, যে কারণে পাড়া বা গ্রামের প্রতি মমত্ববোধ, দেশপ্রেম ছাঁইচাপা আগুনের মতো লুকিয়ে থাকলেও আজ সে আগুন আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের মতো জ্বলে উঠবেই। নিজের দলটির শোচনীয় পরাজয় নিশ্চিত বুঝেই রেফারী আর বিপ দলের প্রতি আক্ষেপটি ক্রমেই বাড়তে থাকবে। কারণ না খেলতে খেলতে সহনশীলতা, খেলোয়ারসূলভ মনোভাবটির আজ বড়ই অভাব।

এখন দেশে মেধাবীদের ঘাটতি নেই। এখনো ব্রেন ড্রেন হয় বটে, তারপরও প্রচুর মেধাবী রয়েছে দেশে। তাদের যথাযথ মূল্যায়ন চাই। প্রচন্ড দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিদেশের লোভনীয় চাকুরী ছেড়ে দেশে এসে জানাল নজরুল ইসলাম স্যার যথাযথ মূল্যায়ন পায়নি। সেদিকটাতে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন খুব। মেধাবীদের উৎসাহিত করা প্রয়োজন। তার চেয়ে বেশী প্রয়োজন, ত্যাগী দেশপ্রেমিক মেধাবীদের। নতুবা রাষ্ট্রের লক্ষ লক্ষ বা কোটি কোটি টাকার পৃষ্টপোষকতায় গড়ে উঠা মেধাবীরা তার নিজের বা বড়জোর পরিবারের কথাই ভাববে, দেশের কথা নয়। হয়তো একসময় ফ্লাই করবে, বাড়ি করবে আমেরিকা বা কানাডায়। আমরা যে তিমিরে আছি সে তিমিরেই থেকে যাবো।

আকাজ করার চেয়ে কাজ না করা ভালো। ভুল সিদ্ধান্ত প্রদানের চেয়ে কোন সিদ্ধান্ত না দেয়া ভালো। সে বিবেচনায় সিদ্ধান্ত প্রদানকারীকে সিদ্ধান্ত প্রদানের জন্য যোগ্য হতে হয়। রাষ্ট্রের উচ্চ পদে আসীন কর্মকর্তাদের সঠিক সিদ্ধান্ত যেমন দেশকে এগিয়ে নিতে পারে, তেমনি ভুল সিদ্ধান্ত দেশকে পিছিয়েও দিতে পারে। কাজেই সিদ্ধান্ত প্রদানকারী ব্যক্তিদের হতে হবে সবচেয়ে মেধাবী ও যোগ্য। এখানে কোটার চক্রে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীরা মেধাবীদের জায়গা দখল করা গ্রহণীয় হতে পারেনা। কোটার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করছি না। শুধু তার প্রয়োগিক বিষয়টি ভাবার কথা বলছি। পাশাপাশি বলছি সিদ্ধান্ত প্রদানের যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিটির রুচি, মানসিকতার বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার। যিনি দেশের রাষ্ট্রের বা বৃহত্তর জনগোষ্টির চেয়ে নিজ বা ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর স্বার্থকে বড় করে দেখেন তার সিদ্ধান্ত যথাযথ বা যৌক্তিতক হবেনা। কারণ তিনি নিরপে নন। যিনি রাগ অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত নেন, তার যথাযথ সিদ্ধান্ত দেয়ার মতা থাকেনা। সে মতা বিলীন হয়ে যায় তার ক্ষুদ্র মানষিকতার কাছে। রাষ্ট্রের শুধু মেধাবীদের পুরষ্কৃত করা বা উৎসাহিত করাই যথেষ্ট হবেনা, যদিনা সে মেধাবীটি হয় পরোপকারী, হৃদয়বান, দেশপ্রেমিক। অতএব মেধাবীদের সনাক্ত করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ নিঃস্বার্থ পরোপকারী মানসিকতার মেধাবীদের খুঁজে বের করা। অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীদেরকে উৎসাহিত করতে দেখলেই অধিক মেধাবীরাও এরকম উদারতার দৃষ্টান্ত স্থাপনে উৎসাহিত হবেনা। এগিয়ে আসবেনা। তাদের সনাক্ত করার দু’টি টিপস দিচ্ছি। আজকাল অনেক স্কুলে সততা স্টোর চালু হয়েছে। তেমনি স্কুল ভিত্তিক ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। ১. একটি ক্লাসে ৩০ জন স্টুডেন্ট থাকলে ২৯টি প্যাকেট খাবার বিতরণ করে দেখুন, যে প্যাকেট পায়নি, তাকে নিজের প্যাকেট দিয়ে দেয়ার জন্য ক’জন এগিয়ে আসে। ২. একজনকে অসুস্থতার অভিনয় করিয়ে দেখুন, তার চিকিৎসা বা সেবায় ক’জন এগিয়ে আসে।

এখন আসি মূল কথায়। কেন ভাববো দেশের কথা? ভাবতে হবে, দেশের কথা এ কারনেই যে, দেশ আমাদের ছায়া দেয়, মায়া দেয়, ফুল দেয়, ফল দেয়, জল দেয়, দেয় আশা ভালবাসা, অনুপ্রেরণা, বেঁচে থাকার। সেটি কিভাবে? প্রশ্ন করে নয়, ভেবে ভেবে বের করতে হবে তার উত্তর। যে রাস্তা দিয়ে বাজারে যাচ্ছি, স্কুলে কলেজে যাচ্ছি বা গিয়েছিলাম সে রাস্তাটি কে করেছে? যে পাঠশালায় পড়ালেখা করেছি বা করেছিলাম, ক’টাকার বিনিময়ে পড়ালেখা করেছি? ঐ বিদ্যা নিকেতনের চেয়ার টেবিল, ফ্যান কে দিয়েছিল? এই যে হাসপাতাল, ব্যাংক বীমা, ষ্ট্রিট লাইট, পয়ঃনিষ্কাষণ, কে করছে, কিভাবে করছে? এসব কি ভেবে দেখেছি কখনো? আমি আজ যেখানে, এতটুকু বড় হতে কতজনের অবদান রয়েছে পেছনে, ভেবে দেখেছি কি কখনো? মা বাবার আদর, প্রতিবেশীর উৎসাহ, শি কদের অনুপ্রেরণা কি প্রতিষ্ঠার পেছনে নেই? যদি তাদের কথাই মাথায় না আসলো, রাষ্ট্রের অদৃশ্য সহায়তার কথা আসবে কি করে?। কাজেই সুখী সুন্দর সমৃদ্ধ দেশ গড়তে প্রয়োজন নিখাদ ভালোবাসা আর দেশপ্রেমের।

ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো নিয়ে যতই সমালোচনার ঝড় বা নিন্দাবাদ হোক, মূলত সমাজ এগিয়ে যায় তাদের প্রচেষ্টাতেই। বঙ্গবন্ধুর সারাজীবনের ত্যাগেই হাজার বছরের শৃংখলিত দেশ মুক্তি পেয়েছে। দেশের কোটি কোটি মানুষ জীবন দিতে এগিয়ে এসেছে। এটি এমনি এমনি হয়নি। কাজেই বনের মোষ তাড়ানোর মতো লোক চাই আজ প্রচুর। এরকম লোক তৈরীর কারখানা চাই। তাদের উৎসাহিত করার মতো ব্যক্তিত্ব চাই। তবেই কথায় কথায় ‘কী লাভ’ ‘কী লাভ’এধরনের নেতিবাচক কথার সংখ্যা কমে যাবে। এগিয়ে যাবে দেশ। শেষ কথা, দেশের জন্য, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সুন্দর আগামীর জন্যই ভাবতে হবে দশের কথা, দেশের কথা।

লেখক : প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক

x