কেন এই আত্মহনন?

জাহেদুল কবির

শুক্রবার , ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৬:২৯ পূর্বাহ্ণ
177

মানসিক চাপ, হতাশা, অবসাদ ও নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়ে সমাজে আত্মহত্যার প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলছে। আর্থ-সামাজিক সমস্যা, পারিবারিক সংকট এবং পরকীয়া প্রেমের জেরেও আত্মহত্যা করছেন অনেকে। নগরীতে গতকালও ঠিক তেমন একটি ‘পরকীয়ার’ ঘটনায় আত্মহত্যা করেছেন ডা. মোস্তফা মোরশেদ আকাশ নামের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন চিকিৎসক।
স্বজনদের দাবি, চিকিৎসক স্ত্রীর পরকীয়ার জেরে মধ্যরাতে চান্দগাঁও আবাসিকের বি-ব্লকের ২ নম্বর সড়কের ২০ নম্বর বাসায় তাদের মধ্যে তুমুল বাকবিতণ্ডা হয়। অতঃপর ভোরের দিকে তিনি আত্মহত্যা করেন। এদিকে আত্মহত্যার আগে স্ত্রীর একটি ভিডিও ক্লিপ নিজের ফেসবুকে ওয়ালে আপলোড দেন আকাশ। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, স্ত্রী তানজিলা হক চৌধুরী মিতু বিয়ের আগে ও পরে তার সাথে বিভিন্ন স্বীকারোক্তি দেন। তবে এই সময় মিতুকে খুব আতঙ্কিত দেখা গেছে।
সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মূল্যবোধের পরিবর্তন হচ্ছে। আগে শিশুদের যেভাবে শিক্ষা দেয়া হতো এখন সেভাবে দেয়া হচ্ছে না। এখন ব্যক্তি স্বাধীনতা প্রাধান্য পাচ্ছে। নারী-পুরুষ সবাই কমবেশি শিক্ষিত হচ্ছে। তথ্য-প্রযুক্তির সুবিধা ভোগ করছেন তারা। কিন্তু অনেকে এর সাথে নিজেকে ঠিকভাবে মানিয়ে নিতে পারছেন না। জড়িয়ে পড়ছেন পরকীয়ায়। যা সংসারে ডেকে আনছে অশান্তি। এ থেকে কেউ আত্মহননের পথও বেছে নিচ্ছেন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিষন্নতায় যারা ভোগেন তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা থাকে। কারণ জীবন নিয়ে তাদের মধ্যে প্রচণ্ড নেতিবাচক ধারণা কাজ করে। ছেলেবেলা থেকে যাদের নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না তাদের মধ্যেও আত্মহত্যার প্রবণতা কাজ করে। এছাড়া এখন আর আগের মতো সামাজিক বন্ধন নেই। আত্মহত্যা প্রতিরোধে ওই বন্ধন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা জরুরি। যার কারণে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক গাজী সালাউদ্দিন দৈনিক আজাদীকে বলেন, আত্মহত্যার কয়েকটি কারণ থাকতে পারে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে- যখন একজন মানুষ ভাবে আমার বেঁচে থেকে কোনো লাভ নেই, তখন চরম হতাশা থেকে আত্মহত্যার চিন্তা মাথায় আসে। পারিবারিক অশান্তির কারণে আত্মহত্যার ঘটনা অহরহ। তবে যে চিকিৎসক আত্মহত্যা করেছেন, বলা হচ্ছে স্ত্রীর পরকীয়ার জেরেই এ ঘটনা ঘটেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে স্ত্রী পরকীয়ায় কেন জড়াবেন? এর বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। দাম্পত্য জীবনে নানা অতৃপ্তি অন্যতম প্রধান কারণ বলে আমি মনে করি। আমাদের দেশের পুরুষরা সাধারণত এই বিষয়ে খুবই উদাসীন। অথচ সুখী দাম্পত্য জীবন উপভোগ করা একটি প্রকৃতিগত ব্যাপার।
জানতে চাইলে নারী নেত্রী অ্যাডভোকেট কামরুন নাহার দৈনিক আজাদীকে বলেন, বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্কে জড়ানোর ক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রে স্বামীরও ভূমিকা থাকে। দাম্পত্য জীবনে স্ত্রীকে পর্যাপ্ত সময় না দিলে দেখা যায়, অনেক মেয়ে পরপুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হন। সবার তো নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো ক্ষমতা থাকে না। এক্ষেত্রে স্বামীর উচিত স্ত্রীর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। পারিবারিক কলহ থাকলে স্ত্রী নিজের শান্তি খুঁজার জন্য অন্যের প্রতি আসক্ত হতে পারেন। এছাড়া বর্তমান স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলও পরকীয়ার প্রতি প্রভাবিত করতে পারে। অনেক মা বাবা মেয়েকে খুব প্রশ্রয় দেন। তারা মেয়ের বয়ফ্রেন্ড থাকাটা স্বাভাবিক বলে ধরে নেন। এ ধারণা থেকেও তাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘প্রিভেনটিং সুইসাইড: অ্যা সোর্স ফর মিডিয়া প্রফেশনালস ২০১৭’-এ বলা হয়, প্রতি বছর বিশ্বে ১০ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। প্রতি ৪০ সেকেন্ডে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে একটি। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০২০ সালে এই সংখ্যা প্রতি ২০ সেকেন্ডে একজনে পৌঁছবে। একই প্রকাশনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংখ্যা আরও বলছে, গত ৪৫ বছরে আত্মহত্যার ঘটনা ৬০ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্বে বর্তমানে ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী মানুষের মৃত্যুর প্রধান তিনটি কারণের একটি হলো আত্মহত্যা। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক ওয়েবসাইট সাইকোলজি টুডেতে প্রকাশিত ‘সুইসাইড: ওয়ান অব অ্যাডিকশনস হিডেন রিস্ক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, যারা আত্মহত্যা করেন তাদের তিনজনের মধ্যে একজন মাদকাসক্তের কারণে এই পথ বেছে নেন। আর ৭৫ শতাংশ মাদকাসক্তই আত্মহত্যার চিন্তা করেন।

x