কেন আমাদের সবার নারীবাদী হওয়া উচিত

শাফিনূর শাফিন

শনিবার , ৬ জুলাই, ২০১৯ at ১১:১০ পূর্বাহ্ণ
39

২০১২ সালে নাইজেরিয়ান ঔপন্যাসিক চিমামান্দা এনগোজি আদিচে টেডটকে “আমাদের সবার নারীবাদী হওয়া উচিত’’ এই শিরোনামে একটি বক্তৃতা দেন। এই শিরোনামে পরে তাঁর একটি বইও বের হয়। এই বক্তৃতায় আদিচে নারীবাদী হওয়া অপমানজনক এবং ছোটবেলা থেকেই ছেলে এবং মেয়েদের উপর লিঙ্গভেদে যে প্রত্যাশার চাপ থাকে- এই দুটি ধারণাকেই প্রত্যাখ্যান করেন। টেড টকে আদিচে বলেন, ছোটবেলার এক বন্ধু কীভাবে তাঁর মেয়েশিশুকে নারীবাদী হিসেবে বড় করে তুলবে পরামর্শ চেয়ে চিঠি দিয়েছিল। আদিচে তাঁর বইতে সেই বন্ধুকে “প্রিয় ইজিওয়ালে” সম্বোধন করে চিঠির জবাব দেন। এই চিঠিতে আদিচে পনেরটি পরামর্শ দেন কীভাবে বন্ধু তাঁর মেয়েকে শক্তিশালী এবং স্বাধীনভাবে গড়ে তুলতে পারে।
নিজের কন্যাসন্তানকে খেলনা হিসেবে পুতুল বাদ দিয়ে বেশি করে হেলিকপ্টার বেছে নিতে উৎসাহিত করা দিয়ে আদিচের পরামর্শের শুরু হয়েছে। এভাবে আমরা চিনে নিতে পারি ভাষার প্রয়োগের মাধ্যমে কীভাবে সমাজ নানা খারাপ আরোপিত নিয়মকানুনের বেড়াজালে আটকে ফেলে আমাদের। নইলে কেন একটি মেয়েশিশুকে সে কতোটা সুন্দরী বা ছেলেশিশুকে সে কতোটা শক্তিশালী বলতে দেরী করি না? এভাবেই সমাজ ঠিক করে দেয় ছেলে এবং মেয়ের ভূমিকা বা তাদের কীভাবে আমরা দেখতে চাই।
আদিচে বাবা-মাকে তাদের কন্যাসন্তানদের সাথে বাহ্যিক আচরণ, চেহারা, নিজস্ব পরিচয় এবং যৌনতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে বলেন। এছাড়া তিনি আরও পরামর্শ দেন বাবামা যেন মেয়েদের বিয়েকে ঘিরে যেসব সামজিক রীতিপ্রথা প্রচলিত আছে তার সমালোচনা করতে শেখায় এবং সেসব ধারণাকে পদদলিত করতে যেগুলো কেবল বলে মেয়েদের শরীর এমনভাবে বানানো যাতে তারা শুধুমাত্র রান্নাঘরে কাজ করতে পারে। মেয়েদের নিয়ে প্রচলিত ধ্যানধারণাকে ব্যঙ্গ করে আদিচে লিখেন তাঁর বইতে, “ সংস্কৃতি আমাদের তৈরি করে না। আমরা সংস্কৃতি তৈরি করি। যা প্রচলিত হয় সমাজে। যদি এটাই সত্য হয় তবে নারীদের যেভাবে দেখানো হয় তা আমাদের সংস্কৃতি নয়, তারচেয়ে আমরা নারীরাই পারি প্রচলিত সংস্কৃতি ভেঙে নতুন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে। বারবার কিছু ঘটতে থাকলে তা স্বাভাবিক হয়ে যায় একসময়… আমরা মেয়েদের শেখাই সংকুচিত, ছোট হয়ে থাকতে নিজের ভিতর। মেয়েদের আমরা বলি, তুমি স্বপ্ন দেখো কিন্তু খুব বেশি স্বপ্ন দেখো না। তোমার সফল হবার লক্ষ্য থাকবে তবে খুব বেশি সফল না। আর নইলে তোমাকে পুরুষ হুমকি হিসেবে দেখবে। কারণ আমি তো নারী। বিয়ে থা করে সংসার করার আশা করি। সারাজীবন মাথায় রাখতে হবে বিয়েই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ চাওয়া আমার জীবনে। এসব কেন আমরা শুধু মেয়েদের বলি কেন ছেলেদের নয় যখন আনন্দ, ভালোবাসা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বিয়ের মূল মন্ত্র। পুরুষের মনোযোগ পাবার মতো উপযুক্ত করে গড়ে তুলি মেয়েদের অথচ তাদের চাকরির কিংবা উপযুক্ত হবার প্রতিযোগিতার জন্য গড়ে তুলি না যা কিনা বেশি দরকারি মনে করি আমি।…আমরা মেয়েদের এটা শেখাতে অনেক সময় ব্যয় করি যে তাকে নিয়ে পুরুষ কি ভাবলো না ভাবলো তা নিয়ে চিন্তিত হতে, পক্ষান্তরে ছেলেদের একইভাবে চিন্তিত হতে বলি না।…একটা বয়স পর্যন্ত নারীরা অবিবাহিত থাকলে এটা তাদের অযোগ্যতা ধরা হয় সমাজে। আর পুরুষ যথেষ্ট বয়স হবার পরেও অবিবাহিত থাকলে বলি সে এখনো যোগ্য কাউকে পায়নি।”
“প্রিয় ইজিওয়ালে”কে লেখা চিঠি একবিংশ শতাব্দীর যৌনতা বা লিঙ্গ সম্পর্কিত রাজনীতিতেও দাগ কেটেছে। আদিচে স্বীকার করেন এখনো অনেক কাজ বাকি রয়ে গেছে। রাষ্ট্রপতির ক্যাম্পেইন চলাকালীন “লকার রুম টক” উন্মোচিত হয় এবং নারীবিদ্বেষী ভাবনাচিন্তা বেরিয়ে আসে যখন আইনপ্রণেতারা নারী অধিকার ইস্যুগুলো নিয়ে কথা বলতে চায় না তখন আজকের দিনে এটা নিয়েই কথা বলা খুব গুরুত্বপূর্ণ নারী হওয়ার মানেটা কী আসলে বোঝাতে।
আদিচের বইটি থেকে কন্যাসন্তানের বাবা-মায়ের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ সংক্ষেপে নিচে তুলে ধরা হলো:
– তাকে স্বনির্ভর হতে শেখাও
– তাকে বলো যে নিজের জন্য কাজ করা এবং নিজেকে বাঁচানোটা জরুরি
– তাকে প্রশ্ন করতে শেখাও
– বই ভালবাসতে শেখাও
– “যেহেতু তুমি মেয়ে” এটা কখনোই কোন অজুহাত হতে পারে না
– নারীত্ব এবং নারীবাদ সমান্তরালে চমকপ্রদ নয়
– কখনোই বিয়ে একটি অর্জন এমন কথা বলবে না
– তার সাথে পার্থক্য নিয়ে কথা বলো। সে যেন পার্থক্যকে স্বাভাবিক বানিয়ে ফেলে
– বাবার ভুমিকাও মায়ের মতো একইরকম ক্রিয়াশীল/সরব
– সে যেন নিজেকে নিজের সেরাটা দিয়ে মাপতে শিখে
– খেলাধুলায় উৎসাহিত করো
– যেকোনো কথা কেন উঠে বা বলা হয় তাকে প্রশ্ন করতে শেখাও
– আমি গুরুত্ব রাখি। আমার সমান দাম আছে।
টেডটকে আদিচে বলেন নারী পুরুষ সবার একসাথেই পরিবর্তনের জন্য, সমতা আনার জন্য এগিয়ে যেতে হবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, “যদি সমস্যাটা আমাদের লিঙ্গ-ভূমিকা নিয়েই হয়, তবে নারী পুরুষ একসাথে হয়েই এই সমস্যার সমাধান করতে হবে।… পুরুষালী হওয়া ব্যাপারটা আসলে ছোট কিন্তু জটিল একটা খাঁচা আর আমরা ছেলেদের সেই খাঁচায় ভরে রাখি।… আমার খুব রাগ হয়। আমাদের সবারই রাগ হওয়া উচিত। ইতিহাস বলে রাগ থেকে ভালো কোন পরিবর্তনই ঘটে থাকে।“
আদিচের এই বক্তব্যের ভিডিও টেডটকের অন্যতম সর্বোচ্চ দেখা ভিডিও এবং বইটি বেস্ট সেলার হয় পরবর্তীতে। বইয়ের শিরোনাম বহু স্লোগানে ব্যবহার হয়েছে। এছাড়া বইয়ের বিভিন্ন বক্তব্য পরবর্তীতে নারীদের বিভিন্ন অধিকার আদায় সংক্রান্ত মিছিল মিটিং-এ ব্যবহৃত হয়েছে, সেলিব্রেটি থেকে শুরু করে সর্বস্তরের সাধারণ নারীবাদীদের লড়াইয়ে নতুন করে প্রণোদনা যুগিয়েছে।

সূত্র: We All Should Be Feminist by Chimamanda Ngozi Adichie

x