কেন অস্থিরতা? অন্তর্ঘাত নয়তো

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ
42

খাগড়াছড়িতে ইপিবিএন স্থাপনার জন্য দু ‘বান্ডিল ঢেউটিন কেনা হয়েছে ১৪ লাখ টাকায়! প্রতিটির দাম লাখ টাকা। মেডিক্যাল কলেজ লাইব্রেরির সার্জারির জন্য ৫৫০০ টাকার প্রতিটি বই কেনা হয়েছে ৮৫,৫০০ টাকায়! ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজের পর্দার দাম ৪৫ লাখ টাকা। এর আগে রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের কর্মকর্তা আবাসন কমপ্লেক্সের বালিশ, তোষক, খাট কাণ্ডতো বহুল আলোচিত ঘটনা। এরপর রেলের পিওন, আর্দালির মাসিক বেতন ৪ লাখ টাকার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে মূলধারায়ও ঘুরপাক খেয়েছে। স্যূয়ারেজবিহিন চট্টগ্রাম ওয়াসার বিভিন্ন মন্ত্রনালয়সহ ৪১ কর্মকর্তার দফায় দফায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা হাতেকলমে শিখতে কোটি কোটি টাকার উগান্ডা শিক্ষা সফরও মিডিয়ার চুম্বক আইটেম হয়েছে। উগান্ডা দুর্নীতি তালিকায় বাংলাদেশের সাথে ১৩ নম্বরে থাকলেও দেশটি এখনো ৬০% মানুষকে বিশুদ্ধ পানি দিতে পারেনা। সর্বশেষ খবর, বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাবে দেশটির বহু জনপদে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে কলেরা। মারা গেছে কয়েক ডজন মানুষ, আক্রান্ত শত শত। আফ্রিকার অন্যতম অনুন্নত দেশটি প্রায় সব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অনেক পিছনে। মাথাপিছু বার্ষিক গড় আয় ৭০০ ডলারের নিচে, বাংলাদেশের গড় আয় দু’ হাজার ডলার। স্বাস্থ্য দফতরের কেনাকাটায় চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজের হাজার হাজার কোটি টাকার ঘাপলা বেশ ক’বছর ধরে আলোচিত ঘটনা। কিন্তু অবিশ্বাস্য এসব ঘাপলা ও কেলেংকারিতে কার কী শাস্তি হয়েছে, দেশের মানুষ জানেনা। বিচার কোন পর্যায়ে তাও না! এর বাইরে সাইবার হ্যাকারেরা বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের প্রায় ৮ মিলিয়ন ডলার মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ থেকে হাতিয়ে নেয়ার পর ফিলিপাইনের রিজল ব্যাঙ্ক থেকে ওগুলো উদ্ধারের অগ্রগতিও চাপা পড়ে আছে। ব্যাঙ্কিং খাতের রাঘব বোয়াল ঋণখেলাপীদের হাজার হাজার কোটি টাকা আটকে থাকা ঋণ উদ্ধারে এখনো গঠিত হয়নি কোন স্পেশাল ট্রাইবুনাল। সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়ার পরও দুর্নীতির ভয়াল ঘুণোপোকা সব সেক্টরকে খুঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, সব দায় চাপছে সরকার প্রধান হিসাবে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার ঘাঁড়ে। আমরা যতটুকু জানি, তিনি দুর্নীতির উর্ধে। বিশ্বের অন্যতম সেরা ডায়নামিক নেতা হিসাবে জাতিসঙ্গসহ বহু আন্তর্জাতিক সংস্থার বিরল স্বীকৃতি তাঁর মুকুটে শোভা পাচ্ছে। ‘৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাকান্ডে দেশে না থাকায় ভাগ্যের জোরে বঙ্গবন্ধু পরিবারের নিশানা তাঁরা দু’ বোন বেঁচে যান। এতোবড় এবং নির্মম ত্যাগের পর তাঁরতো কোন লোভ, মোহ থাকার কথাও না। তাঁর দু’ছেলে-মেয়ে সর্বোচ্চ শিক্ষায় সুশিক্ষিত হয়ে বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। তাঁরা ভাইবোন তথ্য প্রযুক্তি খাত ও অটিস্টিক সেবায় নিজেদের মেধা দেশে-বিদেশে ব্যবহার করছেন। দেশের সর্বোচ্চ সমৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে শোষিত বঞ্চিত মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়া ছাড়া জননেত্রী শেখ হাসিনার অন্যকোন ব্যক্তিগত আকাঙ্খাও নেই। তাহলে কেন এমন হচ্ছে ! কারা এর জন্য দায়ী? এদের দ্রুত খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া না হলে উন্নয়নের চলমান অভিযাত্রা মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ‘৭৫ পূর্ববর্তী প্রেক্ষাপট বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার নিষ্ঠ শুভাকাঙ্‌ক্ষীদের অবশ্যই এখন রিওয়াইন্ড করে দেখা উচিত। শুধু একটা দৃষ্টান্ত দিয়ে বিষয়টার ইতি টানছি। ‘৭৪এর ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্ম দিবসে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ধ্বজাধারী সশস্ত্র জাসদ পল্টনে সমাবেশ করে। সেখানে নেতারা বঙ্গবন্ধু উৎখাতে অগ্নিলাভা ঝেড়ে প্রচণ্ড উত্তেজিত করে কর্মীদের। আসম রব, প্রয়াত এম এ জলিল বঙ্গবন্ধুর গোষ্ঠী উদ্ধার করে এমনভাবে কর্মীদের উত্তেজিত করে যে, তারা মিছিল নিয়ে মিন্টু রোডে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলির বাসভবনে হামলা চালায়। পরিকল্পিত হামলায় নেতৃত্ব দেন রবসহ আরো ক’জন নেতা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ির গেটে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে গুলি বর্ষণও শুরু করে তারা। সময়মত পুলিশ ও রক্ষীবাহিনী না আসলে কী ঘটতো অনুমান করা অসম্ভব ভীতিকর! পুলিশ ও রক্ষীবাহিনী পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে হামলাকারীদর হটিয়ে দেয়। এদিন গুলিতে ৩ জাসদ নেতাকর্মী নিহত হন। দু’পক্ষে আহতের সংখ্যা প্রচুর। বিনা উস্কানিতে ঠাণ্ডা মাথার এই হামলার মাধ্যমে তারা বঙ্গবন্ধুকে সম্ভবত কড়া বিশেষ ম্যাসেজ দিতে চেয়েছে। বঙ্গবন্ধু এতো সহজ-সরল ও সাধারণ ছিলেন যে, জাসদ এর ম্যাসেজ হয়তো ঠিকমত পড়তে পারেন নি। এর পরবর্তী ইতিহাস ও পরিণতি সবার জানা। এখনো কেন জানি, মনে কু ডাকছে! এত অনিয়ম, পুকুর চুরি, লুট, কোলের শিশুর উপরও মোল্লা, শিক্ষক, দাঁতালের ভয়াল নখর কেন গাঁথছে? কেন এতো অশুভ! এসবও কী জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি মহল বিশেষের বিশেষ বার্তা? এখনতো চারপাশে প্রায় সবাই “বঙ্গবন্ধু ও নেত্রীর ভক্ত”! ভক্ত ব্যূহের ভেতরে মূল কালপ্রিটরা গা’ ঢাকা দিয়ে নেইতো! আশা করি সংশ্লিষ্ট এজেন্সি এবং নেত্রী অতীত থেকে শিক্ষা নেবেন। সতর্ক হবেন।
নিষ্ঠুরতম বর্বরতা
মেক্সিকোর অভিবাসী স্রোত আটকাতে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাঁত কামড়ে তাঁর পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছেন। কংগ্রেস অর্থ বরাদ্দ আটকে দিলে পেন্টাগনের সামরিক বাজেটে থাবা বসিয়ে বড় একটা তহবিল তুলে নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরপর সীমানা দেয়াল নির্মাণের আটকে থাকা কাজও চলছে।
আসলে মেক্সিকো এখন বিশ্বের সবচে’ ভয়ঙ্কর ও অনিরাপদ দেশ। ড্রাগ ও ওয়ারলর্ডরা মিলে দেশটিকে প্রায় ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছে। ২০০৬ সাল থেকে দেশটির সরকার শক্তিশালী মাদক সম্রাটদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে। কিন্তু সাফল্য খুব একটা আসেনি। উল্টো দেশটিতে সরকারি হিসাবে ‘০৬ থেকে ২০১৬ মাত্র দশ বছরে ৪০ হাজার মানুষ গুম হয়ে গেছে। আবিষ্কার হয়েছে ১৯৭৮ টি গণকবর। এমন কোন পরিবার নেই, যারা আপনজন হারাননি।
সবচে’ খারাপ অবস্থা দেশটির হালিস্কো রাজ্যের। রাজ্যের রাজধানী ওয়ালজারার বর্ধিষ্ণু শহরতলি এন্তাসনিয়ার মানুষ বাড়ি ছেড়ে দলে দলে পালাচ্ছে, বাড়ি বিক্রির বিজ্ঞাপন ঝুলিয়ে। এখানে পাঁচ বাড়ির একটিতে পাওয়া যাচ্ছে মৃত ও গলিত লাশ। কয়েক মাসে কয়েক ডজন লাশ পাওয়ার পর পুরো শহরতলি এখন মৃতপুরি। অথচ সবুজে ছাওয়া এই শহরটি মেক্সিকোর অন্যতম পর্যটন তীর্থ! সরকারি হিসাবের বাইরেও বহু মানুষ নিখোঁজ। জীবনের ভয়ে থানায় মামলা রেকর্ড করে না অনেকে। গুম হওয়া আত্মীয়দের লাশ খুঁজতে প্রিয়জনেরা গণকবরগুলো খোঁড়াখুঁড়ি করছে। গুমের আপনজনেরা সমিতি করে লাশের সন্ধান করছে। ড্রাগলর্ড গ্রুপ “হালিস্কো নিউজেন কার্টেল” ও “নুয়েতা প্লাজা” এসব ভয়াল কাণ্ড ঘটাচ্ছে। এরা শুধু ড্রাগলর্ড না, ভয়ঙ্কর এবং নিষ্ঠুর ওয়ারলর্ডও। প্রচুর অত্যাধুনিক অস্ত্রের মজুদ আছে তাদের। তারা পরিত্যক্ত বাড়িঘর দখল নিয়ে সেখানেই লাশ গুম করছে। পাওয়া যাচ্ছে ছিন্নভিন্ন অঙ্গ পত্যঙ্গ ও হড়গোড়! সার্চ ওয়ারেন্ট ছাড়া অন্যের সম্পত্তিতে পুলিশের প্রবেশাধিকার না থাকায় অবস্থা দিন দিন আরো বিভীষিকাময় হয়ে উঠছে। এভাবে চলতে থাকলে পুরো মেক্সিকো ড্রাগ ও ওয়ারলর্ডের কব্জায় চলে যাবে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।

x