কেউ আপনাকে জোর করতে পারে না, এমনকী কোনো অবতার এলেও না – মাদার তেরেসা

শনিবার , ২০ জুলাই, ২০১৯ at ৭:৫৬ পূর্বাহ্ণ
95

মাদার তেরেসা প্রায়ই কথা বলার আমন্ত্রণ গ্রহণ করতেন, যেন তাঁকে গরীব ও অভাবী মানুষের প্রতি বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণের সুযোগ দেয়া হয়েছে। এই সাক্ষাৎকারটি এমনই একটি সাক্ষাৎকার যেখানে তিনি কথা বলেছেন আন্টো আকারার সাথে, যিনি ভারতীয় অধিকারবিষয়ক উকিল ও আন্তর্জাতিক মাধ্যমের একজন সাংবাদিক। মাদার তেরেসা আন্টো আকারাকে এই সাক্ষাৎকারটি দিয়েছিলেন ১৯৯৫ এর ১৭ নভেম্বর নয়াদিল্লীতে অবস্থিত ‘নির্মলা শিশু ভবন’ সেন্টারে, যা মিশনারীজ অফ চ্যারিটির অন্তর্ভুক্ত।
সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন নীলাঞ্জনা অদিতি

মাদার, আপনার মাতৃভাষা কি?

আলবেনিয়ান। কিন্তু আমি সমানভাবে বাংলা (কোলকাতা) এবং ইংরেজিতেও সচ্ছন্দ।

এই মুহূর্তে কী অনুভব করছেন? আপনি ভারতীয় না আলবেনিয়ান?

আমি সবকিছুই। প্রত্যেক দেশকেই আমি ভালবাসি এবং আমি ঈশ্বরের সন্তান তাই মানুষকে ভালবাসি।

তার মানে আপনার কোন জাতীয়তা নেই?

আমার ভারতীয় পাসপোর্ট ডিপ্লোমেটিক, আলবেনিয়ান পাসপোর্ট ডিপ্লোমেটিক। আমার ভ্যাটিকান পাসপোর্ট আছে, আর আমেরিকায় আমি যেকোন সময় যেতে পারি। আমি যখনই ভিসা চাই তারা আমাকে পাঁচ বছরের জন্য ভিসা দেয়। আমার কোনো জায়গায় যেতে ভিসা পেতে সমস্যা হয়না।

আপনি যখন সমাবেশ করতে শুরু করেন, কখনো কি ভেবেছিলেন যে এটা এখনকার মত এত ক্রমবর্ধমান হবে?

তা তো সবাই জানে। আমরা এখন ১২৬ টা দেশে ছড়িয়ে আছি। আমাদের ৫৬১ টি হোম আছে। আমরা সেগুলোকে মন্দির বলে থাকি- আর ৪৬০০ এর উপরে সন্ন্যাসিনী রয়েছেন। শুধুমাত্র যারা দুস্থ থেকেও দুস্থ তাদের জন্যই এতকিছু। যাদের কিছুই নেই আমরা তাদের পাশে থাকি, তাদের সমর্থন করি যারা ঈশ্বরের বঞ্চিত সন্তান।

আপনার এইসব কাজকর্মের উদ্দেশ্য কী? সমালোচকদের মতানুযায়ী এর উদ্দেশ্য কি ধর্মের প্রতি অন্ধবিশ্বাস গড়ে তোলা?

যীশু তাঁর প্রচারিত বাণীতে পরিষ্কারভাবে বলেছেন- ‘তুমি যাই কর, অন্তত আমার অনুসারী হয়ে কর।’ বুঝেছেন? এটাই ছিল যীশুর কাজ। যীশু আরো বলেছেন ‘এসো, সৌভাগ্যপ্রাপ্ত হয়ে তোমার জন্য রাজত্বে যে স্থান নির্ধারিত হয়েছে তা গ্রহণ কর, কারণ যখন আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম আমাকে খেতে দিয়েছিলে, পিপাসার্ত অবস্থায় জল দিয়েছিলে, নগ্নাবস্থায় বস্ত্র দিয়েছিলে, আশ্রয়হীন অবস্থায় আশ্রয় দিয়েছিলে আর অসুস্থ অবস্থায় দেখতে এসেছিলে।’ আমরাও ঠিক তাই করছি। মিশনারীজ অফ চ্যারিটির সকল ভায়েরা- পিতারা- বোনেরা আমরা সকলেই তাই করছি। ঈশ্বর আমাদের সকলকে ভালবাসতে এবং ভালবাসা পেতে সৃষ্টি করেছেন। আমরা সকলেই এই কাজে একাত্ম হয়ে আছি। আপনি যখন একাত্ম থাকেন সেখানে আনন্দ একতা ও ভালবাসা থাকে।

অভিযোগ আছে যে, আপনি এমন ব্যক্তিদের কাছ থেকে ঋণ ও পুরস্কার নিয়ে থাকেন যারা চরিত্রের দিক থেকে সন্দেহজনক। আপনি কি দাতাদের থেকে প্রশংসাপত্র গ্রহণ করবার আগে তা যাচাই করে নেন?

তার কোন প্রশ্নই আসেনা। আমরা সর্বান্তকরণে শপথ নিয়েছি যে সবকিছুই গরীব দুস্থদের কে দিয়ে দেব। আমরা সরকার বা অন্য লোকদের থেকে যাই পাই না কেন যদি এক টাকাও পাই দুস্থ মানুষকে দিয়ে দেই। পুরোপুরি বিনামূল্যে সেবাদান। আমাদের কোন বেতন নেই। যখন কেউ বলে যে সে ভাল ক্যাথলিক পরিবার থেকে এসেছে এবং আমাদের সাহায্য করতে চায়, আমরা কেন তার প্রস্তাব প্রত্যাখান করব?

সমপ্রতি শঙ্করাচার্য অভিযোগ করেছেন যে আপনাদের মানব সেবার আসল উদ্দেশ্য হল ধর্মান্তরিত করা। এর উত্তরে আপনি কী বলবেন?

আমার উত্তর হল, যেহেতু তারা জানে না তারা কী বলছে ঈশ্বর যেন তাদের ক্ষমা করেন। আমি সবাইকে বলেছি যে, আমরা যা করছি ঈশ্বরের ভালবাসার জন্য করছি এবং ভালবেসে করছি এবং সবাইকে গ্রহণ ও সম্মান করতে বলেছি। ভালবাসার কাজগুলো সব সময় শান্তি বয়ে আনে। কোলকাতায় আমাদের বাড়িতে দারুণ শান্তি, একতা ও ভালবাসা আছে। অনেক হিন্দু পরিবার অবিশ্রান্তভাবে মরণাপন্ন রোগীদের জন্য খাবার ও বস্ত্র নিয়ে আসে। এই কাজটা ভালবাসার চিহ্ন। আমি তাদের আসতে বলিনি। তারা শুধু জেনেছে কী নিয়ে কাজ করি নিজেরাই এসেছে। সুন্দর কাজটা সুসম্পন্ন হচ্ছে কিনা তা দেখতে আসে। অনেক মানুষ (যারা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে তার সাথে কাজ করতে যায়) তারা দুস্থদের সাহায্য করার মাধ্যমে নিজেদের পরিবারে শান্তি, আনন্দ ও একতার দেখা পেয়েছে। যারাই কোন দুস্থ মানুষকে সাহায্য করে আনন্দ পায় কাজেই স্বাভাবিকভাবে তারা (সমালোচকরা) আমাদের প্রতি খুশি না।

ধর্মান্তকরণ এর ব্যপারে আপনার বক্তব্য?

ঈশ্বর ছাড়া কেউ আপনাকে ধর্মান্তরিত করতে পারে না। এমনকি আমিও যদি চাই, জোর করে আপনাকে ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চাওয়াতে পারব না। অল্প কথায় বলতে গেলে আমি একজন ক্যাথলিক বা প্রটেস্টান্ট বানাতে পারি। আপনি যতক্ষণ নিজে না চাইবেন আর ঈশ্বরের করুণা না থাকলে কেউ আপনার ধর্ম পরিবর্তন করতে পারবে না। এটা শুধুমাত্র আপনার ও ঈশ্বরের ব্যপার। কেউ আপনাকে জোর করতে পারেনা। আমরা রাস্তা থেকে পোকামাকড়ের আক্রমণে মরণাপন্ন মানুষজন তুলে আনি। আমরা তাদের মত প্রায় ৪০০০০ এর বেশি মানুষজন তুলে এনেছি। আমি যদি একজন কে রাস্তা থেকে তুলে আনি, তাকে আমি পরিস্কার করি, ভালবাসি ও সেবা করি, এটা কি ধর্মান্তকরন? সে ওখানে পশুপাখির মত পড়ে আছে কিন্তু আমি তাকে ভালবাসছি আর সে শান্তিতে মরতে পারছে। এই শান্তিটা তার হৃদয় থেকে আসে। এটা তার ও ঈশ্বরের ব্যাপার। কেউ তার মাঝে হস্তক্ষেপ করতে পারেনা। আমি যদি কিছু করতে চাইও, আমি কিছু করতে পারব না। তারা মরে গেলে তাদের আমরা সব সময় স-ধর্মের মানুষের কাছে পাঠিয়ে দিই। মুসলিমেরা মুসলিম মানুষের মৃতদেহ কবর দিতে নিয়ে যায়, হিন্দুরা দাহ করতে নিয়ে যায় এবং খ্রিস্টানেরা কবর দিতে নিয়ে যায়। যদি ধর্মান্তকরণের মানে পরিচ্ছন্ন হৃদয় ও ঈশ্বরকে ভালবাসার উদ্দেশ্যে মানুষজনকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে ফেরানো হয় তাহলে আমি ধর্মান্তর করি। এটাই আসল ধর্মান্তকরণ।

সমালোচকেরা অভিযোগ করেন যে, আপনাদের হোম- এ গোপনে খ্রিস্টিয় দীক্ষাদান হয়। এটা কি সত্যি?

না, মোটেই না। তাদের জন্য যারা এ ধরনের মিথ্যে গল্পও বানায় , আমি শুধু বলব ঈশ্বর যেন তাদের ক্ষমা করে দেন। আমার তাদের কথা ভেবে খারাপ লাগে কারণ তারা নিজেদের অনেক ক্ষতি করছে। যদি একজন হিন্দু ঈশ্বরের কাছে যাবার রাস্তা খোঁজে তার যে কোন সাধু সন্নাসিনী বা অন্য যে কারো কাছে যাবার অধিকার আছে। আপনি যদি ক্যাথলিক হন আর অন্য কেউ আপনার কাছে পথনির্দেশের জন্য আসে, স্বভাবতই আপনি তাকে সোজা এমন কারো কাছে নিয়ে যাবেন যারা তাকে ঐশ্বরিক ভালবাসার সন্ধান দিতে পারে। ধর্মান্তকরণ মানেই শুধু বিশ্বাসের পরিবর্তন নয়। ধর্মান্তর মানে হৃদয়ের পরিবর্তন এবং ইশ্বরের করুণা লাভে কাজ করে যাওয়া। ঠিক তখনই বিশ্বাস বদলের প্রশ্ন আসে। কেউ আপনাকে জোর করতে পারে না , এমনকি কোন অবতার এলেও না।

সমাবেশ করার জন্য নতুন জায়গা পেয়েছেন?

আমার মনে হয় না যে এখন আমরা যা করছি এর বেশি কিছু করতে পারব। আমরা পোকামাকড়ে ভর্তি লোকজনকে রাস্তা থেকে তুলে এনেছি, সেবা করেছি আর শান্তি ও ভালবাসায় মৃত্যুর সুযোগ করে দিয়েছি। তাদের যখন আমাদের হোমে আনা হয় তারা অনুভব করে যেন তারা নিজেদের বাড়িতে পরিবারের সাথে আছে। এখন আমি এখানে (নয়াদিল্লী) এইডস আক্রান্তদের জন্য একটা হোম খোলার চেষ্টা করছি। মানুষজন এ-কারণে মারা যাচ্ছে।

আমি আপনাকে কারাগার মন্ত্রণালয়ে সেপ্টেম্বর মাসে ক্যাথলিক যাজকদের বলতে শুনেছি যে ‘বন্দীশালায় পুরুষ নারীদের খেয়াল রাখা ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে করা একটি সুন্দর কাজ।’ আপনি কি কারাগার মন্ত্রণালয়ে প্রবেশের পরিকল্পনা করছেন?

আমরা ইতোমধ্যেই বন্দীশালার মানুষজনের খেয়াল রাখছি। ১১০ জন নিরপরাধ মহিলারা আমাদের সাথে শান্তিসদনে (শান্তিনীড়)। এবং তাড়াতাড়িই বন্দীশালা থেকে ২২ জন ছেলে আমাদের কাছে আসবেন। ভায়েরা তাদের দেখাশোনা করবেন। (পশ্চিমবঙ্গ) সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে নিরপরাধ ব্যক্তিদের এসব জায়গায় রাখা উচিত নয় এবং আমাদের তাদের যত্ন নিতে বলেছেন। তাদের ভালবাসার পরিবেশে থাকা উচিত। তাদের ভালবাসা পাওয়া দরকার।

গর্ভপাত নিয়ে আপনার অবস্থান কী?

আমি ইতোমধ্যেই বলেছি- আপনাদের যদি তাদের থেকে ভয়ের কারণ থাকে ( ভাবী সন্তান), তাদের আমার কাছে দিয়ে দাও। দয়া করে তাদের হত্যা করবেন না। আমরা গর্ভপাতের বিরুদ্ধে লড়ছি দত্তক নেয়ার মাধ্যমে। শুধুমাত্র কোলকাতাতেই, আমরা ১০০০ এর উপরে বাচ্চা দত্তক এ দিয়েছি। বছরে আমরা কয়টা বাচ্চা পাই হিসাব করে বলতে পারব না। কিন্তু আমরা কাউকে প্রত্যাখান করি না। সবাইকে স্বাগত জানাই।

গির্জার সক্রিয় কর্মীরা বলে যে, আপনি আপনার সেবামূলক কাজের মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচনের চেষ্টা না করে দারিদ্র কে ব্যবহার করে অসৎ কর্ম করছেন। এই শোষনপূর্ণ ব্যবস্থা সংস্কারে মুক্ত ভাবধারা কেমন হবে বলে মনে হয়?

আমি কীভাবে নৈর্ব্যক্তিকভাবে কাজ করতে পারি? যখন কোনো মানুষ খাদ্যাভাবে মারা যায়, আমি কীভাবে তাকে এড়িয়ে যেতে পারি? আমি যখন ক্ষুধার্ত অথবা নগ্ন মানুষকে রাস্তায় পাই আমি তার পাশ দিয়ে চলে যেতে পারি না। আমার মনে হয় কোন মানুষই তা করতে পারে না। অন্য লোকেরা আছে যারা এই মুক্ত ভূমিকা নিয়েছে। আমার এর পেছনে খরচের মতো সময় নেই। আমি আমার কাজ নিয়ে ব্যস্ত। আমার রাস্তা পরিস্কার। আমি কাউকে মরতে দেখলে তুলে নিয়ে আসি। কাউকে ক্ষুধার্ত দেখলে খেতে দি। সে ভালবাসতে পারে ও পেতে পারে। আমি তার বর্ণ দেখি না, ধর্ম দেখিনা। আমি কিছুই দেখি না। প্রত্যেকে মানুষ। সে হিন্দু মুসলিম বা বৌদ্ধ হোক সে আমার ভাই, আমার বোন। আমার মনে হয় সবাই তাই করি।

x