‘কৃষ্ণ আইলা রাধার কুঞ্জে-ফুলে পাইলা ভ্রমরা’ খ্যাত সুফি কবি আরকুম শাহ

সৈয়দা আঁখি হক

শুক্রবার , ১ জুন, ২০১৮ at ৫:৪২ পূর্বাহ্ণ
205

আজ থেকে ৭৭ বছর পূর্বে যে মানুষটি পরপারের ডাকে সাড়া দিলেন, কেমন ছিল তাঁর জীবন ভাবনা? চট্টগ্রাম থেকে সিলেট গিয়ে একটি মেয়ের পক্ষে এসব তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করা ছিল খুব কঠিন। তবু সকল কষ্টবাধাবিপত্তি অতিক্রম করে দুষ্প্রাপ্য একটি ছবিসহ সর্বপ্রথম আরকুম শাহের কর্মময় জীবনের নানা তথ্য ও সাধনতত্ত্ব সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছি ২০১৭ সালে প্রকাশিত ‘আরকুম শাহ: জীবনদর্শন ও গীতিবিশ্ব’ নামের গ্রন্থটিতে। ‘কৃষ্ণ আইলা রাধার কুঞ্জে’সহ তাঁর জনপ্রিয় পাঁচটি গান জাপানি ভাষায় অনুবাদ করে কৃতজ্ঞতায় আবদ্ধ করলেন আমার মামা ড. আরশাদ উল্লাহ। এ ধরনের ব্যক্তিত্বের জীবন ও কর্ম নিয়ে গ্রন্থ প্রকাশের জন্য প্রয়োজন মেধা, জ্ঞান, যোগ্যতা ও পাণ্ডিত্য।

পার্থিব জীবনের অপরিহার্য একটি বিষয় হলো আধ্যাত্মিক জ্ঞান। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ প্রাণী হিসেবে প্রতিটি মানুষেরই জন্মের পেছনে রয়েছে কোনও একটি মহৎ উদ্দেশ্য। তাই পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে বিবেকবুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে যুগে যুগে বহু জ্ঞানীগুণীপণ্ডিতসাধক অমর হয়ে রয়েছেন নিজ কর্মে। যেমন সুফি কবি আরকুম শাহ বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে যুক্ত করেছেন তাঁর অমূল্য সম্পদ। সৃষ্টি ও সাধনার মাঝে বেঁচে আছেন অগণিত ভক্তঅনুরাগীর হৃদয়ে।

ছোটবেলায় দেখতাম চট্টগ্রামের প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে ‘কৃষ্ণ আইলা রাধার কুঞ্জে, ফুলে পাইলা ভ্রমরা’ এই গানটি গাওয়া হতো। কণ্ঠশিল্পী হাবীব ওয়াহিদের কণ্ঠে জনপ্রিয় হওয়ার পর অনেকের ধারণা ছিল গানটি রাধারমণের। কেউ কেউ বলেছেন শাহ আবদুল করিমের। কিন্তু হাছন রাজা, রাধারমণ ও শাহ আবদুল করিমকে জানতে গিয়ে ২০০৯ সালে জানতে পারি বহুল প্রচলিত এই গানটির রচয়িতা সিলেটের আরকুম শাহ। কৈশোরে ঘাটুগান গাইলেও অন্তরে পোষণ করতেন ধর্মীয় অনুভূতি। যৌবনে শুরু হয় কর্ম এবং ধর্মের পথে জীবন পরিচালনা। কামেল গুরুর সংস্পর্শে সাধনার পর্বতারোহণ করে হয়ে উঠলেন একজন তত্ত্বজ্ঞানী সুফি সাধক। নিরন্তর ধর্মীয় চিন্তায় মগ্ন থেকে অধ্যাত্ম সাধনা করেছেন তিনি। ব্যক্তি জীবনে ও জীবনযাত্রায় ছিলেন ধার্মিক, সহজসরল, অতিশয় সৎ মানুষ এবং অন্যায়অবিচারের বিপক্ষে প্রতিবাদী একজন সুফি তাপস। নিজেকে সত্যের সন্ধানে উৎসর্গ করেছিলেন। সমাজে ধর্মের নামে অধর্ম আর অন্যায়ের শোষণে যারা লিপ্ত ছিল তাদের কর্মকে ঘৃণা করতেন এই অধ্যাত্মবাদী সাধক। এদের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করেছেন গানের মাধ্যমে। কখনো অন্যায়, অধর্মের সাথে আপস তো করেননি, বরং একজন সত্যিকারের মোমিন হিসেবে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ধর্মব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দ্বিধাহীনভাবে কথা বলেছেন। হীন প্রকৃতির লোকদের উদ্দেশে কল্যাণের কথা বলেছেন, সুপথে ডাক দিয়েছেন পথভোলাদের। এ জন্য তাঁকে অনেক লাঞ্ছনাগঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছিল।

সিলেট মহানগরের উপকণ্ঠ সুরমা নদীর কীনব্রিজের ওপর দিয়ে দক্ষিণ পাড় ধরে রিকশায় বিশ মিনিটের পথ গেলেই খিত্তা পরগনায় ধরাধরপুর গ্রাম। সবুজের সমারোহে এই ধরাধরপুরের নৈসর্গিক পরিবেশ অত্যন্ত সুন্দর ও মনোহর। গ্রামের একটি বড় অংশ নিয়ে পাঞ্জেগানা মসজিদ সংলগ্ন শাহ আরকুম আলী (.)-এর মাজার শরিফ। আরকুম আলী তথা আরকুম উল্লাহ নামে তাঁর পরিচিতি থাকলেও আরকুম শাহ নামেই তিনি অধিক পরিচিত। তথ্যউপাত্তের ভিত্তিতে জানা যায় আনুমানিক ১৮৫১ সালে এ গ্রামেই জন্মগ্রহণ করেন সুফি কবি আরকুম শাহ।

সুফিরা প্রেমশক্তিতে বলীয়ান হয়ে প্রিয়তমের সঙ্গে মিলিত হওয়ার আশায় ছুটে চলেন সম্মুখে। তবে তাঁদের যাত্রাপথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়, এ পথ যেমন কণ্টকাকীর্ণ ও দুর্গম, তেমনই দীর্ঘ। দীর্ঘ এ যাত্রায় তাঁরা কখনো ক্লান্ত হন না। পরমের সঙ্গে মিলনাকাঙক্ষায় সর্বদাই উন্মাদ, যেন জীবনজিজ্ঞাসার ভেদ রহস্যই তাঁদের সাধনার বিষয়বস্তু। সেই অর্থে তাঁরা নিজেদের দিওয়ানা, পাগল, কাঙাল, ফকির হিসেবে অভিহিত করেন। দেহের ভেতরে দেহ কারিগরের সন্ধান করেন; আর সাধনায় নিরন্তরভাবে আত্মনিমগ্ন থাকেন যেন ‘আপনাতে আপনি বিভোর।’ এ পথেরই একজন নিরন্তর সাধক আরকুম শাহ একাধারে তিন বছর ইমামতি করেছেন। জীবনপ্রবাহে মরমি ভাবধারা লক্ষ্য করা গেলেও তাঁর সংগীত রচনার উপজীব্য বিষয় হলো সুফিবাদ। মরমিবাদ ও সুফিবাদের ওপর গুরুত্বারোপ করে গান রচনা করলেও বৈষ্ণব চেতনায় তিনি অসাম্প্রদায়িক চিন্তার ফসল হিসেবে আমাদের জন্য তৈরি করেছেন হিন্দুমুসলমানের সামাজিক মেলবন্ধনের এক বিশাল দৃষ্টান্ত। যে মেলায় হিন্দুমুসলমান, বৌদ্ধখ্রিস্টান একসঙ্গে, একই সুরে গেয়ে ওঠে, ‘আজি দরশনও মিলনও হইল এখন/ রাধাকানাই প্রেমলীলা বৃন্দাবন।’

খোদাভীতি, খোদাপ্রীতি, আত্মোৎসর্গ ও আত্মত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল ছিলেন জ্ঞানপিপাসু এই সাধক। মনের সকল অভিব্যক্তির প্রকাশ, বিচিত্র ভাব, বিচিত্র চিন্তার প্রসার ঘটিয়েছেন গানে। অগাধ জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের পরিচয় দিয়েছেন শরিয়তের মুছলা ত্রিপদী ও চৌপদী গানসমূহে। যেন আধ্যাত্মিকতার ভাবরসে সিক্ত আরকুম শাহের মরমি সংগীত। বাউল পন্থার মিশ্রণ সংবলিত রূপকযুক্ত আহাজারি আর অপূর্ব রসমাধুর্যের লহরির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে তাঁর প্রতিটি গান। রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার নিগূঢ় আধ্যাত্মিক রসাস্বাদন করেছেন ধামাইল গীত রচনার মাধ্যমে। যদিও মরমি ও সুফি ভাবনার প্রভাবে হৃদয়ে ছিল মহান আল্লাহর অসীম দয়া কামনার আকুতি, ইসলামের সুমহান সাম্যবাণী প্রচার করার প্রয়াস, তবে বৈষ্ণব প্রভাববলয় থেকে তিনি বাইরে ছিলেন না, বললে অত্যুক্তি হবে না। তাঁর রাধাকৃষ্ণমূলক গানগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করলেই উপলব্ধি জাগ্রত হয় যে, এসব গানে প্রেম আর বিরহ সমানভাবে মিশে আধ্যাত্মভাবের ব্যঞ্জনায় চিত্তবীণায় ঝংকার তুলে যেন আত্মার গ্লানি মুছে দেয়।

প্রেমের গানগুলো একদিকে যেমন রোম্যান্টিক, চেতনায়কল্পনায় ভাস্বর, বাস্তবে তেমনি জাগতিক কামনাবাসনাতেও গানগুলো উদ্দীপ্ত হয়েছে অবলীলায়। জীবন ভাবনার প্রত্যক্ষ যে অনুভূতিগুলো তাঁর মনে কাজ করেছে তাই তুলে ধরেছেন রূপকের আবরণে। পরিবেশ ও জীবন থেকেই গানের সব উপকরণ সংগ্রহ করেছেন, আর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে ওঠে এসেছে তাঁর সমাজভাবনা। সমাজের বাস্তব দিকগুলো গানে তুলে ধরে যেন এক অসাধারণ চিত্রকল্প নির্মাণ করেছেন। আরো রয়েছে মানুষে মানুষে পারস্পরিক প্রেমবোধ, রয়েছে ধর্মের পারস্পরিক সহমর্মী কথা। তিনি প্রেমের প্রকৃত সংজ্ঞা খুঁজে পেতে প্রেমবন্দনায় ব্রতী হয়েছিলেন। অন্তর দিয়ে যাকে আহ্বান করেছেন তাকে পাওয়ার আনন্দ, আবার না পাওয়ার বেদনা ধ্বনিত হয়েছিল প্রাণে; সে যন্ত্রণায় অশ্রুসিক্ত ছিলেন। এককথায় বলা যায় যে, তাঁর প্রেমিকপ্রেমিকার জীবনরসসমৃদ্ধ গানগুলো যেমন তত্ত্বকথায় আবর্তিত, তেমনি সাহিত্যরসমণ্ডিত।

গানের বাণীতে আরকুম শাহকে খুঁজতে গিয়ে আমি পেলাম একাধারে গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী, যন্ত্রশিল্পী ও একজন সুফি তাপসের সন্ধান। অনেকেই তাঁকে বাউল ভেবে ভুল করেন। বাউলরা যেমন গুরুর পদতলে নিজেকে সমর্পণ করে গুরুকে সর্বোচ্চে স্থান দিয়েছেন, তেমনি তিনিও মুর্শিদের চরণে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন। বাউলের মতো গুরুবাদের ওপর গান লিখেছেন, গুরুর গুণগান গেয়েছেন। এ কথা সত্য হলেও তিনি বাউল কিংবা বেশরা ফকির ছিলেন না। ছিলেন একজন সুফি সাধক, গান ছিল যাঁর অধ্যাত্ম সাধনার অঙ্গ। প্রেমে পূর্ণ তাঁর এ দীর্ঘ জীবনে বাউলা অন্তরে পরমকে পাওয়ার ব্যাকুলতায় পরিভ্রমণ করেছেন বহুস্থানে। স্র্রষ্টার প্রেম প্রত্যাশী আরকুম শাহকে উন্মাদ, দিওয়ানা, পাগল, ফকির যাই বলি কিন্তু বেশিরভাগ গানে নিজের নামের আগে ‘পাগল’ বিশেষণ সংযোজন করেই হয়তো পরিতৃপ্তি লাভ করতেন তিনি।

পাগল আরকুম শাহরই গান, শোনো ভক্ত আশিকান

হিন্দুমুসলিম যতই দেখো, মরলে পরে এক সমান ॥

নিজেকে ‘ফকির’ বা ‘পাগল’ বলে উল্লেখ করেও মর্মস্পর্শী আবেদন, ঐশী ভাবকল্পনা, পারলৌকিক চিন্তার প্রসার ঘটিয়েছেন তাঁর রচনায়। কথার সাথে সুরের অপূর্ব মিলন প্রতিটি গানকে করেছে মহিমান্বিত। ভাষার ব্যবহার ও অলংকারে বিচিত্র চিন্তাভাবনার প্রতিভাকে বিকশিত করেছেন তিনি। ছন্দের মিলন, ছন্দের প্রবহমানতা, শব্দচয়ন, ধ্বনিসৌন্দর্য, ব্যক্তিগত ভাব ও অনুভূতি তাঁর গানকে করেছে সমৃদ্ধ ও তেজোদীপ্ত। মনের সকল অভিব্যক্তির প্রকাশ, বিচিত্র ভাব, বিচিত্র চিন্তার প্রসারসহ, ইসলামি বিষয়, মনঃশিক্ষা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, সুফিবাদ, দেহতত্ত্ব, নবিতত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব, পিরতত্ত্ব, পরমতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব, অভেদতত্ত্ব, রাধাকৃষ্ণ, বিচ্ছেদ ও বাউল পন্থার মিশ্রণ ঘটিয়েছেন বিভিন্ন শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে। মনের উপচে পড়া রং ঢেলে প্রার্থনা, কামনাবাসনা, কষ্ট, আক্ষেপ ও বিভিন্ন রূপকে সজ্জিত করেছেন প্রতিটি গান। তাঁর চিন্তায় রয়েছে স্রষ্টা প্রেমের তীব্রতার প্রকাশ। এ ছাড়া স্রষ্টা প্রেমও আধ্যাত্মিকতার সাথে মরমি ভাবনায় রয়েছে অকৃত্রিম আনুগত্য।

তাঁর সুরসমুদ্রে অবগাহন করলে বিস্ময় জাগে; নিঃসন্দেহে এসব মাধুর্যমণ্ডিত গান শ্রোতার মর্মমূলে রসসঞ্চার করে যোগান দেয় পূর্ণ পরিতৃপ্তি। শ্রোতা হারিয়ে যায় ভাবের উন্মাদনায়, সুরের মূর্ছনায়। একসময় জন্মমৃত্যুমুক্তি এই তিনের রহস্যানুসন্ধানের সাধনায় বিভোর হয়ে অদৃশ্য সত্তার পরিচয় উদ্ঘাটনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। অবশেষে নিজের মাঝেই সেই সত্তার সন্ধান পান আরকুম শাহ। তাইতো গেয়ে উঠেন:

বন্ধে করে বন্ধের খেলা, আমি নাই সে জানি

হৃদের মাঝে থাইকা আমার, বন্ধের নামটি শুনি রে॥

আরকুম শাহ অনাদিঅনন্ত সত্তার অন্বেষণ করে গেছেন। দেখতে চেয়েছেন সেই প্রেমময়ের রূপ।

রূপ হইতে বাহির হইয়া, রূপ ধরিতে চায়

গোকুল নগরে ঐ রূপ ধুরিয়া না পায়॥

মানুষের হৃদয় বন্দরে নোঙর করা ভাটিয়ালি, আড়ি বা সারি, পল্লী, মুর্শিদি ও ধামাইল গানের সুর যেমন জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের নিকট শাশ্বত কালের; তেমনি বাংলা সাহিত্যকে করেছে সমৃদ্ধ। আরকুম শাহর গানে রয়েছে মনের মানুষের সন্ধানে শাশ্বত প্রেমের প্রকাশ ও মরমি ভাবধারায় ব্যাকুল প্রেমের আকুতি। তিনি ছিলেন আল্লাহ প্রেমিক। সর্বদা আল্লাহ তথা সৃষ্টিকর্তার প্রেমে বিভোর। কেননা মহান আল্লাহতায়ালাসর্বময়, অন্তর্যামী, সর্বজ্ঞানী ও সূক্ষ্মদর্শী। প্র্রেমিক, প্রেম ও প্রেমাস্পদকে নিয়ে নানা বর্ণনায় ও নানা ঢঙে গান রচনা করেন। অসংখ্য গানে মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রবল আকাঙক্ষা বিধৃত হয়েছে। অন্তরের সকল কথাব্যথা আর যথাযথ বিষয় উপস্থাপনকল্পে বাংলা, সংস্কৃত, আরবি, হিন্দি, উর্দু, ফারসি, ইংরেজি, তুর্কি, তাত্ত্বিক, আঞ্চলিক ও কথ্য শব্দের মজবুত গাঁথুনিতে সজ্জিত করেছেন তাঁর তত্ত্বপ্রধান গানগুলো। বলা হয় ‘লোকচক্ষুর অন্তরালে আরকুম শাহ।’ এরপরও ‘কৃষ্ণ আইলা রাধার কুঞ্জে,’ ‘পানসি দৌড়াইয়া যাইতাম,’ ‘সোনারও পিঞ্জিরা আমার করিয়া গেলায় খালি রে,’ ‘চাইর চিজে পিঞ্জিরা বানাই, মোরে কইলায় বন্ধ রে বন্ধু’, ‘আজি দরশন মিলন হইল এখন,’ এমন কিছু কালজয়ী জনপ্রিয় গানের মাঝেই তিনি কিংবদন্তি হয়ে আছেন। মাঝে মাঝে বেতারে ও টেলিভিশনে প্রচার হওয়া এসব গান শুনে হতাশার ঘোর কেটে যেন সান্ত্বনার বৃষ্টিতে স্নাত হই। গানের অপূর্ব ছন্দ, শব্দচয়ন আর সুরমাধুর্যে দোলায়িত করে যে কোনও মানুষের হৃদয়, মনকে করে প্লাবিত।

আরকুম শাহের জীবনী গ্রন্থটি প্রকাশের মাস তিনেক পরে ইউটিউবে তাঁর অগ্রন্থিত আরো একটি গান পেয়ে আনন্দে মন নেচে ওঠে। পিতা অমূল্য রায় চৌধুরী ও মাতা তরুবালা রায় চৌধুরীর যোগ্য সন্তান লোকসংগীত শিল্পী রণেন রায় চৌধুরীর মধুভরা কণ্ঠে ১৯৬৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে খালেদ চৌধুরী এই গানটি রেকর্ড করেন। এতেই প্রমাণ হয় যে, ১৯৪১ সালে ইন্তেকালের পরেও আরকুম শাহের গান বাংলাদেশের সীমা ছাড়িয়ে পশ্চিম বাংলায় সমসাময়িক সময়কে জয় করতে কতটা সক্ষম হয়েছে। কৃতজ্ঞতাসহ বিনম্র শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করছি চৌধুরীর চরণকমলে। সবটুকু দরদ ঢেলে ভাবাবেগে তাঁর গাওয়া গানটি ছিল এবমন

মুর্শিদ কই আইলাম ও, নির্ণয় না পাই

যারে ভজিতে আইলাম তার তো উদ্দেশ নাই

মুর্শিদ কই আইলাম ও॥

অরণ্য জঙ্গলার মাঝে বান্ধিয়াছি ঘর

ভাই ও নাই বান্ধব ও নাই কে লইব খবর॥

আরকুম শাহ ফকিরে কয় শোনো ও জাত ভাই

কামাই করলে খাওরা আছে, অভাবে সঙ্গে নেওরা নাই॥

জগতে কোনও কিছুই চিরস্থায়ী নয়, এই ভবের মায়া ছেড়ে একদিন যেতে হবে সবাইকে। আরকুম শাহর জীবনের সকল ভাবনা চিন্তার অবসান হলো জীবন সায়াহ্নে এসে। মৃত্যুভয় তাঁকে কখনো দুর্বল করতে না পারলেও মরণকে তিনি উপলব্ধি করেছেন মর্মে মর্মে। আরকুম শাহ জীবনের অপরাহ্নকালে এসেও নিজের অর্জিত জ্ঞান মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। পেয়েছেন মানুষের ভালোবাসা। ভালোবাসতেন মাতৃভূমিকে, মানুষকে, স্রষ্টার সৃষ্টি সকল প্রাণীকে। ২ রবিউল আউয়াল, ১৩৬০ হিজরি, ৫ চৈত্র ১৩৪৮ বাংলা, ১৯৪১ সালে ১৯ মার্চ বৃহস্পতিবার রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে সম্ভাব্য ৯০/৯৫ বছর বয়সে প্রিয় মুর্শিদের কোলে মাথা রেখে সুফি সাধক শাহ আরকুম আলী (.) পাড়ি দিলেন অনন্ত পরবাসে।

আজ থেকে ৭৭ বছর পূর্বে যে মানুষটি পরপারের ডাকে সাড়া দিলেন, কেমন ছিল তাঁর জীবন ভাবনা? চট্টগ্রাম থেকে সিলেট গিয়ে একটি মেয়ের পক্ষে এসব তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করা ছিল খুব কঠিন। তবু সকল কষ্টবাধাবিপত্তি অতিক্রম করে দুষ্প্রাপ্য একটি ছবিসহ সর্বপ্রথম আরকুম শাহের কর্মময় জীবনের নানা তথ্য ও সাধনতত্ত্ব সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছি ২০১৭ সালে প্রকাশিত ‘আরকুম শাহ: জীবনদর্শন ও গীতিবিশ্ব’ নামের গ্রন্থটিতে। ‘কৃষ্ণ আইলা রাধার কুঞ্জে’সহ তাঁর জনপ্রিয় পাঁচটি গান জাপানি ভাষায় অনুবাদ করে কৃতজ্ঞতায় আবদ্ধ করলেন আমার মামা ড. আরশাদ উল্লাহ। এ ধরনের ব্যক্তিত্বের জীবন ও কর্ম নিয়ে গ্রন্থ প্রকাশের জন্য প্রয়োজন মেধা, জ্ঞান, যোগ্যতা ও পাণ্ডিত্য। হয়তো এর কিছুই আমার মধ্যে নেই। তবু দীর্ঘ সাতটি বছর যে সব তথ্য পেয়েছি তা দিয়েই দুঃসাহস করেছি মনের ছোট্ট মাটির পিদিমখানি জ্বালাতে। এই পিদিমের আলোয় যদি গ্রন্থটি আরকুম অনুরাগীদের কাছে বিন্দুমাত্রও আদৃত বা গ্রহণযোগ্যতা পায় তবেই আমার সকল কষ্ট সার্থক হবে।

x