কৃষ্ণগহ্বর ও কেটি

রেজাউল করিম

বুধবার , ১৭ এপ্রিল, ২০১৯ at ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ
14

এই মহাকাশের কতো কিছু এখনও অনাবিষ্কৃত। বিজ্ঞানীরা নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। সীমাহীন জগতটি। মঙ্গলে অস্তিত্বের সন্ধানে ব্যতিব্যস্ত। কয়দিন ধরে ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর সারা দুনিয়ায় তোলপাড় চলছে।
কৃষ্ণগহ্বরের রয়েছে প্রচণ্ড মাধ্যাকর্ষণ শক্তি। এর আকর্ষণকে মহাকাশের কোনো বস্তুই অগ্রাহ্য করতে পারে না। এমন কি আলো পর্যন্ত পালিয়ে যেতে পারে না। ফলে মহাকাশে একে একটি কালো গর্তের মতো মনে হয়। এই কারণের এর নামকরণ করা হয়েছে কৃষ্ণগহ্বর। ১৯৬৯ সালে জন হুইলার নামক একজন মার্কিন বিজ্ঞানী প্রথম ব্ল্যক হোল শব্দটি সৃষ্টি করেন। তিনি এই শব্দটি মহাকাশের একটি চিত্রময় নকশা তৈরির জন্য ব্যবহার করেছিলেন। সে সময়ে আলো সম্পর্কে দুটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত ছিল। এর একটি ছিল নিউটনীয় তত্ত্ব। এই তত্ত্বে বলা হয়েছে- আলো একটি তরঙ্গমাত্র। আলো সম্পর্কে দ্বিতীয় তত্ত্বটি হলো- কোয়ান্টাম বলবিদ্যার কণা তত্ত্ব। এই তত্ত্বে বলা হয়, আলো অতিক্ষুদ্র কণা দিয়ে গঠিত। প্রথম তত্ত্ব অনুসারে আলোর গতি অসীম বলে ধরা হয়। এই ধারণা অনেকদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত ছিল। বিজ্ঞানী রোমার আলোর গতিবেগ নির্ধারণ করেন প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩,০০,০০০ কিলোমিটার। ১৮৮৩ সালে জন মাইকেল তাঁর একটি গবেষণা পত্রে জানান যে, বেশি ভর ও ঘনত্ব আছে এমন নক্ষত্র থেকে কোনো আলো নির্গত হতে পারে না। যেহেতু ওই জাতীয় নক্ষত্র থেকে আলো বেরিয়ে আসতে পারবে না, তাই ওই নক্ষত্রগুলো দেখা যাবে না। ফলে নক্ষত্রটিকে একটি কালো গহ্বর মনে হবে। অতি ভরবিশিষ্ট তারকার অস্তিত্ব নিয়ে একটি সংশয় দীর্ঘদিন ছিল। ১৯৩০ সালে চন্দ্রশেখর সুব্রহ্মণ্যন তাঁর শ্বেত বামন তারা বিষয়ক একটি তত্ত্ব তৈরি করেন। এই তত্ত্ব অনুসারে, কোনো তারার ভর সূর্যের চাইতে দেড় গুণ বেশি ভর সম্পন্ন হলে, তা নিউট্রন তারা বা কৃষ্ণবিবরে পরিণত হবে। আর এর চাইতে কম ভরবিশিষ্ট তারা শ্বেত বামন তারায় পরিণত হবে। বর্তমানে এই ১.৪৪ সৌরভরকে আদর্শ হিসাবে ধরা হয়। যে সকল নক্ষত্রের ভর নিউট্রন তারার চেয়ে বেশি, তারই কৃষ্ণগহ্বরের পরিণত হবে।
অতি ভরবিশিষ্ট নক্ষত্রের পাশ দিয়ে আলো যাওয়ার সময় গতিপথ পরিবর্তিত হয়। এই বিষয়ে ১৯৩৯ সালে জার্মান বিজ্ঞানী ওপেনহেইমার ব্যাখ্যা করেন। ওপেনহেইমারের তত্ত্বানুসারেও দেখা যায়, ভারি নক্ষত্রের বাইরের থেকে আগত আলো বাঁকা হয়ে নক্ষত্রের অভ্যন্তরে ঢুকে যাবে এবং তা নক্ষত্রের কেন্দ্রে হারিয়ে যাবে। একই কারণে ওই নক্ষত্র থেকে উৎপন্ন আলো নির্গত হওয়ার পর, তা বেঁকে গিয়ে ওই নক্ষত্রের কেন্দ্রে ফিরে যাবে। ১৯৬৭ সালে ওয়ার্নার ইজরায়েল জানান, কৃষ্ণগহ্বর ঘূর্ণায়মান নয়। এদের আয়তন নির্ভর করে এদের ভরের উপর। আর ভরের উপর নির্ভর করে এদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তির। এদের আকার হবে নিখুঁত গোলীয়। কারণ একমাত্র ঘূর্ণনের ফলেই নক্ষত্রের বিষুব অঞ্চল স্ফিত হয় এবং এর ফলে নক্ষত্র নিখুঁত গোল হয় না। কৃষ্ণগহ্বরের বাইরের দিকে রয়েছে একটি প্রান্তীয় দিগন্ত বলয়। একে বলা হয় দ্য ইভেন্ট হরাইজন। এই অঞ্চলের প্রান্তে রয়েছে ফোটন বলয়। যার ফলে ফোটনকণাগুলো কৃষ্ণগহ্বরে কেন্দ্রকে ঘিরে আবর্তিত হয়। কৃষ্ণগহ্বরের ভিতরে তৈরি হয় বস্তু ও প্রতিবস্তু। এদের ভেতরে ঘটতে থাকে সংঘর্ষ। এই প্রক্রিয়াটি হকিং বিকীর্ণ নামে অভিহিত করেন। স্টিফেন হকিং-এর মতে বস্তু ও প্রতিবস্তুর ঘটনাটি যখন ব্ল্যাকহোলের প্রান্তে ঘটে, তখন কণাগুলোর এক অংশ কৃষ্ণগহ্বর শোষণ করে নেয় এবং অপর অংশ সেখান হতে মুক্ত হয়ে বাস্তব কণায় পরিণত হয়। এভাবে কৃষ্ণগহ্বর ক্রমশ ভর হারাতে থাকে এবং এক পর্যায়ে মহাশূন্যে বিলীন হয়ে যায়।
ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির (ক্যালটেক) সহকারী অধ্যাপক ক্যাথরিন এল ব্যোম্যান এই প্রথম কোনও ব্ল্যাক হোলের মূল ছবি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। বয়স তাঁর মাত্র ২৯বছর। স্মার্ট ও সুন্দরী। ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণ গহ্ববরের প্রথম ছবি তৈরি করে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন এই কম্পিউটার বিজ্ঞানী। একটি কম্পিউটার প্রোগ্রামের ফলেই ছবিটি তৈরি সম্ভব হয়েছে আর সেই প্রোগ্রামিং প্রকল্পের নেতৃত্বে ছিলেন ড. কেটি ব্যোম্যান। ব্ল্যাক হোলের প্রথম ছবিতে একটি চক্র এবং গ্যাস দেখানো হয়েছে, যা পৃথিবী থেকে ৫০০ মিলিয়ন ট্রিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ছবি প্রকাশের আগে ধারণা করা হতো এটি অসম্ভব। ব্যোম্যান নিজেও অবশ্য আগে যে খুব একটা আত্মবিশ্বসী ছিলেন তেমন হয়তো নয়। ফলে, নিজের ল্যাপটপে ছবিটি লোড হওয়ার অবিশ্বাস্য ওই মুহুর্তের ছবিও তুলে রেখেছেন। তিনি বলেন, অবিশ্বাসের সঙ্গে দেখছি, আমার বানানো প্রথম ব্ল্যাক হোলের ছবি যেটি পুননির্মাণ প্রক্রিয়ায় রয়েছে। বছরখানেক আগে এই প্রকল্পের জন্য অ্যালগরিদম লেখা শুরু করেন ব্যোম্যান। সে সময় ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির (এমআইটি) স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি।
পড়াশোনার সময় এই প্রকল্পে এমআইটি কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ল্যাবরেটরি, হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিঙ এবং এমআইটি হেইস্ট্যাক অবজারভেটরির এক দল গবেষককে নেতৃত্ব দিয়েছেন ব্যোম্যান।
ব্ল্যাক হোলের এই ছবিটি তোলা হয়েছে ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ দিয়ে, যা পরস্পর যুক্ত আটটি টেলিস্কোপের একটি নেটওয়ার্ক। ছবিটি রেন্ডার করা হয়েছে ব্যোম্যানের অ্যালগরিদমের সাহায্যে। ব্যোম্যান বলেন, আমরা যখন প্রথম এটি দেখেছি, আমরা কেউই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। অসাধারণ এক ঘটনা ছিলো এটি। আমাদের কপাল ভালো, আবহাওয়া অনুকূলে ছিল। অনেক দিক থেকেই ভাগ্যবান ছিলাম আমরা। সামাজিক মাধ্যমে ব্যোম্যানের এই কাজের প্রশংসা করেছে এমআইটি এবং স্মিথসোনিয়ান। শক্তিশালী টেলিস্কোপ টানা এক বছর ধরে ছবি তোলার পর কেটির হাতে এসেছিল ইঁদুরের কুচি কুচি করে খেয়ে ফেলা বিশাল একটা মানচিত্রের খুব সামান্য কিছু টুকরা। যে মানচিত্রের প্রায় ৯৯.৯ শতাংশই চলে গিয়েছে ইঁদুরের পেটে। শুধু তাই নয়, সেই বিশাল মানচিত্রটা কার ছিল, কোনও দেশের নাকি পৃথিবীর বা ব্রহ্মাণ্ডের, সেটাই কেটির জানা ছিল না। কেটি লিখেছেন, আমার উপর দায়িত্ব বর্তাল, ইঁদুর যেটুকু খায়নি, সেই কণামাত্র অংশগুলি দিয়েই গোটা মানচিত্রটাকে বানিয়ে ফেলতে হবে। যে মানচিত্রটাকে আমি কখনওই দেখিনি। বানিয়ে ফেলতে হবে মেসিয়ার-৮৭ গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা ‘এম-৮৭’ ব্ল্যাক হোলটিকে। সাধারণত, চাঁদে যদি ১২ লক্ষ কমলালেবুকে একেবারে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে সাজিয়ে রাখা যায়, তবেই পৃথিবীতে বসানো কোনও টেলিস্কোপের তা চোখে পড়তে পারে। না হলে চাঁদে থাকা কোনও কিছু দেখা সম্ভব নয়। আমার অ্যালগরিদমের লক্ষ্য ছিল, চাঁদে থাকা একটি কমলালেবুকেও যাতে পৃথিবীতে বসানো টেলিস্কোপ দিয়ে দেখা যায়। সেটাই হয়েছে।
এ ব্যাপারে অবশ্য গবেষকদের পরিত্রাতা হয়েছিল পৃথিবীই। পৃথিবী তার নিজের কক্ষপথে লাটিমের মতো ঘুরে বলে ২৪ ঘণ্টা পর পর টেলিস্কোপের দেখা সামান্য খণ্ড ছবিগুলি সামান্য বদলে যায়। অনেকটা যেমন হাওয়ায় কুঁকড়ে থাকা কাগজের ছোট্ট টুকরোটার ভাঁজ কিছুটা খুলে যায়। তখন সেটিকে আরও একটু বেশি জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে বলে মনে হয়। মহাকাশের রহস্যের শেষ নেই। মহাকাশের জট খুলতে থাকবে বিজ্ঞানের উৎকর্ষতায়।

x