কৃষি জমির আইলের ওপর ৩৬৫ মিটার দীর্ঘ উড়াল সেতু

চক্ক ভান্তের এক অনন্য উদ্যোগ

মীর আসলাম : রাউজান

সোমবার , ৮ এপ্রিল, ২০১৯ at ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ
5619

রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের খৈয়াখালী গ্রাম। গ্রামটির তিন দিক ঘিরে আছে খাল আর বড় বিল(কৃষি জমি)। একটি বিলের পশ্চিম প্রান্তে আছে উপজেলার পূর্বগুজরা ইউনিয়ন আর উত্তরপূর্ব প্রান্তে কদলপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম। এক গ্রামের মানুষ অন্য প্রান্তের গ্রামগুলোকে খুব কাছ থেকে দেখতে গেলেও, গ্রামীণ আঁকাবাকা রাস্তা ঘুরে পরস্পরের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতে সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। নিজেদের কাছের মানুষ গুলোর বিলম্বিত এমন যোগাযোগ মোটেই ভাল লাগতো না এই গ্রামের সন্তান ও পাড়ার ধম্মাবিজয়ারাম বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ উ পঞ্‌ঞা চক্ক মহাথের। তার ভাবনায় ছিল মানুষের পারস্পরিক দূরত্ব কমিয়ে আনার জন্য একটা কিছু করার।
গত কয়েক বছর থেকে এই ভাবনায় তিনি ছিলেন অস্থির। অনেক বার নিজের মনের এই ভাব প্রকাশ করেছেন এলাকার বন্ধুমহল আত্মীয়স্বজনের কাছে।
সর্বশেষ তিনি নিজের ভাবনার কথা তুলে ধরেন এক অভিজ্ঞ প্রকৌশলীর কাছে। দুজনের পরিকল্পনায় ভান্তের এই অস্থিরতা কেটে যায়। সিদ্ধান্ত হয় ধানি জমি ক্ষতি না করে বিলের মধ্য দিয়ে নির্মাণ করবেন একটি উড়াল সেতু। যেই চিন্তা,সেই কাজ। কাজে নামেন এই বছরের শুরুতে। ভান্তের পরিকল্পনার উপর গড়ে উঠা এই উড়াল সেতু এখন দৃশ্যমান। তার মেধা ও শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় ঘটিয়ে দূরের মানুষকে কাছে এখন কাছে পাওয়ার সেতুবন্ধন তৈরি হচ্ছে।
সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, ধানি জমির আইলের মধ্যখানে ১০ ইঞ্চি বাই ১০ ইঞ্চি আর সিসি পিলার স্থাপন করে প্রায় আড়াই মিটার প্রস্থ ও ৩৬৫ মিটার দীর্ঘ দৃষ্টিনন্দন উড়াল সেতুটির কাজ ইতিমধ্যে ৬০ শতাংশ শেষ হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়,
ভান্তের আত্মীয় স্বজন,বন্ধুমহল,এলাকার ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে নারী পুরুষরা এই উড়াল সেতুটি নির্মাণ কাজে অর্থ সহায়তা দিচ্ছেন। দূরদূরান্তের ভক্ত ও পাড়ার নারী পুরুষরা নির্মাণ কাজে স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছে। এ কাজে শ্রম দিতে আসা নারী পুরুষরা বলেছেন বিহারের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ উ পঞ্‌ঞা চক্ক মহাথের এর প্রতি এলাকার মানুষের বিশ্বাস ও ভালবাসার দান এই উড়াল সেতু। দূরের প্রতিবেশিদের কাছে টেনে ভালবাসার চাদরে জড়াতে মানবতাবাদি এই ভান্তে যেই কাজটি করছেন তাতেই তিন ইউনিয়নের মানুষ খুশি। জমির মালিকরাও এই কাজে সহযোগিতা করছেন। গত ১ এপ্রিল সোমবার উড়াল সেতু নির্মাণ কাজ দেখতে গিয়ে দেখা যায়, কৃষি জমির আইলের উপর পাঁচ ফিট গভীরে ১০ ইঞ্চি সাইজের আরসিসি পিলার বেইজে ঢালাই দেয়া হচ্ছে। অন্তত ছয় ফুট উচ্চতায় বসানো এই পিলারের উপড় স্থাপন করা হচ্ছে লোহা সিমেন্টের আড়াই মিটার প্রস্থ পাঠাতন। প্রতিটি পিলার বসানো হয়েছে ১০ ফুট ব্যবধানে। নির্মাণ কাজের নিয়োজিত কয়েকজন মিস্ত্রির সাথে সহযোগি হয়ে কাজ করছেন বিভিন্ন এলাকা থেকে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে আসা অর্ধশতাধিক নারী পুরুষ। তাদের সাথে ছিল বিভিন্ন বয়সী শিশুরাও। বিহার অধ্যক্ষ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কাজের প্রেরণা জোগাচ্ছেন।
অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে নির্মাণাধীন এই উড়াল সেতুটি এমন ভাবে স্থাপন করা হয়েছে যাতে এক ইঞ্চি আবাদি জমি নষ্ট না হয়। সেতুর নিচ দিয়ে যাতে অবাধে হালচাষের ট্রেক্টর চলাচল করতে পারে সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
জমির আইলের উপর দিয়ে উড়াল সেতু প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখা বিহারের ভান্তের জন্ম এই খৈয়াখালী গ্রামেই। তিনি গ্রামের প্রয়াত যতীন্দ্র লাল বড়ুয়া ও মা জ্যোস্নাময়ী বড়ুয়ার সন্তান। তার চার ভাইয়ের মধ্যে ভান্তে চক্ক মহাথের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্র বিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করার পর ধর্মসাধনায় নিজকে নিয়োজিত করেন। ১৯৯০ সালে ভিক্ষু সভায় যোগ দেয়ার জন্য দীক্ষা নিয়েছিলেন বান্দরবানের বৌদ্ধ গুরু (সাবেক জজ) উ পঞঞা জোত মহাথের প্রকাশ গুরু ভান্তের কাছে। এরপর থেকে তিনি বৌদ্ধ ধর্মচর্চার পাশাপাশি,শিক্ষা ও মানব কল্যাণ মূলক কাজ করে আসছেন। এই ভান্তে বিহার পরিচালনা ছাড়াও এলাকার একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ও সদস্য হিসাবে রয়েছেন। ভান্তে চক্ক মহাথের এর সাথে কথা বললে তিনি জানান, এই সেতুর ডিজাইন করেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রাক্তন প্রকৌশলী উৎপল বড়ুয়া। এই সেতু নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা। যার পুরোটাই মানুষের দানের টাকা।
গ্রামের মধ্যে উড়াল সেতু নিয়ে কথা বললে স্থানীয় চেয়ারম্যান রোকন উদ্দিন বলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে সেতুটি নির্মাণ করা হচ্ছে। ভান্তের এই উদ্যোগ এই যুগে অনুকরণীয় হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম হোসেন রেজা বলেন ওই সেতুটি উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের মানুষের সেতুবন্ধন। এই উদ্যোগ যিনি নিয়েছেন তার মেধা ও মানবিকতার জন্য ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।

x