কৃষিতে নারীর স্বীকৃতি প্রসঙ্গে

নিপা দেব

শনিবার , ৯ মার্চ, ২০১৯ at ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ
40

সম্প্রতি ঘুরে এলাম রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি-সাজেক। পাহাড়ের পাহারা আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মন ডুবানোর পাশাপাশি আমাকে সেখানকার যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে সেটি হচ্ছে- ওইসব এলাকার কাঁচাবাজার এবং কুটির বা হস্তশিল্প প্রস্তুত ও এসবের অনেক বিপণীকেন্দ্র। আমি অনেক কাঁচাবাজার দেখেছি যেগুলো নারীদের তৈরি কাঁচাবাজার। যেখানে পুরুষ বিক্রেতার চেয়ে নারী বিক্রেতা বেশি। অনেক কুটির বা হস্তশিল্পও চোখে পড়েছে বিপণীকেন্দ্রে যেগুলোর বিক্রেতা হিসেবে পুরুষের পাশাপাশি নারীর উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।
সাজেক পাহাড়ের উপরে একটি ঘরে ঢুকে কৌশলে একটু কথা বলার চেষ্টা করলাম। যা পেলাম- তার সারমর্ম হচ্ছে- বাজার থেকে কাঁচামাল কিনে নিয়ে এসে তৈরিকৃত হস্তশিল্প বাজারে বিক্রি করা বা পর্যটকদের বিক্রি করার ক্ষেত্রেও নারীরা অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখে। উপরন্তু, ঘরকন্নার অধিকাংশ কাজ নারীদের সম্পন্ন করতে হলেও একাজে পুরুষও সমান পারদর্শী। ব্যাপারটি বেশ দৃশ্যমানও বটে। কিন্তু, আমার জানা হয়নি- আমাদের প্রচলিত সমাজব্যবস্থায়- কৃষিকাজে নারীর অংশগ্রহণ থাকলেও ফসলের মালিক যেমন পুরুষ হয়ে যায় ঠিক তেমনিভাবে এই কুটির শিল্প বা হস্তশিল্পগুলোর মালিক হিসেবে পুরুষই গণ্য হয় কিনা। মানে, এ খাত থেকে অবধারিতভাবেই সকল উপার্জন পুরুষের পকেটে চলে যায় কিনা।
সে যাই হোক, এই লেখাটি আমাদের মূলধারার কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণের সামাজিক স্বীকৃতি নিয়ে। কৃষিবিষয়ক একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়- আফ্রিকায় নারীরা কৃষিকাজের ৬০%-৮০%, পশুপালনের ৫০% এবং খাদ্য প্রক্রিয়ায় ১০০% কাজই করে থাকে। কৃষিনির্ভর উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রত্যেকটি দেশেই এই পরিসংখ্যান সামান্য এদিক-সেদিক করে খাটে। আমাদের দেশের মূলধারার গ্রামীণ সমাজের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় কৃষিতে নারী-পুরুষের শ্রমের হিসাব করলে দেখা যায়- জমিতে হালচাষ, ফসল বোনা ও কাটা ইত্যাদি কাজ সাধারণত পুরুষরা করে থাকে। তবে কিছু কিছু সমাজে দেখা যায় এসব কাজেও পুরুষের পাশাপাশি নারী অংশগ্রহণ করছে। যেমন- ফসলের ক্ষেতে নিড়ানি দেওয়া, ফসল মাড়ানো-শুকানো, বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ-সংরক্ষণ, ফসলের বিচালীকে জ্বালানী বা অন্যান্য কাজে ব্যবহার উপযোগী করে তোলা ইত্যাদি। উপরন্তু, বাড়ির উঠানে বা আশেপাশের পতিত জায়গায় নানা ধরনের শাক-সবজির আবাদ, বৃক্ষরোপণ ও তার পরিচর্যা, বাড়ির ফলজ বৃক্ষ হতে ফল সংগ্রহ, বিক্রির জন্য প্রক্রিয়াজাত করা ইত্যাদি নানা ধরনের কাজ সম্পূর্ণভাবে নারীকেই করতে হয়। হাঁস-মুরগী, গরু-ছাগল ইত্যাদি গবাদি পশুপাখি প্রতিপালনের সম্পূর্ণটাই করে নারী। অথচ- ফসল, গবাদি পশু-পাখি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের উপর তার ন্যূনতম কোন অধিকার বা মালিকানা নেই। কৃষিকাজে, পশুপালনে, খাদ্যপ্রক্রিয়ায় অধিকাংশ শ্রম দেওয়ার পরও নারীর প্রতি আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এই হল সার্বিক মূল্যায়ন।
আবার যখন বড় পুঁজি বিনিয়োগ করে ফার্মের মাধ্যমে পশুপাখি প্রতিপালন ও বাজারজাত করা হয় তখন সেখানে নারীর কোন অংশগ্রহণ থাকে না। এই ধরনের ফার্মগুলোতে সকল কাজ সম্পন্ন হয় পুরুষ কর্মীদের দ্বারা। কর্তৃত্বে অংশভাগ হতে পারে এই ভয়ে বড় বড় হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলোতে রান্নার কাজ থেকে যেমন ঠিক তেমনিভাবে এখান থেকেও নারীকে ‘বহিস্কার’ করা হয়।
আচ্ছা, আমরা ভেবে দেখেছি কি- আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে ব্যাপকহারে পুরুষ শ্রমিকের অভিবাসনের কারণে গ্রামীণ-সমাজের ঘরে-বাইরে নারীর শ্রম দেওয়ার পরিমাণ ও সংসারের প্রতি তাঁর দায়িত্ব-কর্তব্য অনেকগুণ বেড়ে গেছে। পরিবারের উপার্জনক্ষম প্রধান পুরুষ সদস্যের অনুপুস্থিতির কারণে গার্হস্থ্য কাজের পাশাপাশি অন্যান্য সকল দায়িত্বও তাঁকে পালন করতে হয় বা হচ্ছে। যেমন- নিয়মিত বাজার করা, সন্তানের লেখা-পড়ার সমস্ত দায়-দায়িত্ব বহন করা, তাদের ও পরিবারের অন্যান্য সকল সদস্যের চিকিৎসার সুব্যাবস্থা করা ও পোশাক-আশাক কিনে দেয়া, টাকা-পয়সার লেন-দেন সংক্রান্ত নানা ধরনের ঝামেলাপূর্ণ কাজও তাঁকেই সামলাতে হয়। এধরনের কাজের মধ্য দিয়ে অবশ্য সে একধরনের মুক্তি ও স্বাধীনতার আস্বাদ লাভ করে। যদিও এসব কাজের জন্য সমাজের নানা জনের কাছ থেকে তাঁকে বিভিন্ন রকম বাজে মন্তব্য এবং সমালোচনাও সহ্য করতে হয়।
এবার আসি- অন্য একটি জরিপে। দেশে গত প্রায় এক দশকে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত প্রায় এক কোটি ত্রিশ লাখ বাড়তি শ্রমশক্তির পঞ্চাশ লাখই নারী শ্রমিক। বর্তমানে দেশের মোট নারী শ্রমিকের ৭৭ শতাংশই গ্রামীণ নারী। এ সময়ে দেশে কৃষি, বন ও মৎস্য খাত, পশুপালন, হাঁস-মুরগি পালন, মাছচাষ প্রভৃতি কৃষিকাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিকের সংখ্যা ৩৭ লাখ থেকে বেড়ে প্রায় ৮০ লাখ হয়েছে। এ বৃদ্ধির হার ১১৬ শতাংশ। যদিও এসব নারীশ্রমিকের ৭২ শতাংশই অবৈতনিক পারিবারিক নারীশ্রমিক। ক্ষুধার বিরুদ্ধে সংগ্রামরত এসব নারীর অবদানের স্বীকৃতি আলোচনার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। শ্রমিক হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে নারীর কোনো স্বীকৃতি নেই। অথচ এসময় এ খাতে পুরুষ শ্রমিকের সংখ্যা কমেছে ২.৩ শতাংশ। কৃষি খাতে পুরুষ শ্রমিকের অংশগ্রহণ কমেছে ১০.৪ শতাংশ। সার্বিকভাবে- কৃষিতে নারীর অবদান থাকলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে এর স্বীকৃতি দেয়া হয়নি এখনো। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য কৃষিতে নারী শ্রমিক বা কিষানীর অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছি। কিন্তু, সেই স্বীকৃতি আসবে কবে?

x