কৃষকের বাতিঘর : পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র

নয়টি ফলের জাত উদ্ভাবন, দশ বছরে আট লক্ষ চারা বিতরণ

সমির মল্লিক : খাগড়াছড়ি

সোমবার , ২০ আগস্ট, ২০১৮ at ৭:২১ পূর্বাহ্ণ
38

পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র খাগড়াছড়িসহ তিন পার্বত্য জেলা হলো কৃষি ও কৃষকের প্রাণ। ইতিমধ্যে নয়টি ফলের জাত উদ্ভাবন করে কৃষক পর্যায়ে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেই কৃষকদের কৃষি প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও পরামর্শ প্রদান করে আসছে। দীর্ঘ সময়ের পথচলায় বিপুল কৃষক এই কেন্দ্র প্রশিক্ষণ নিয়ে কৃষিতে সাফল্য পেয়েছে।

দেশের প্রায় এক দশমাংশ জুড়ে পার্বত্য জেলা। দেশের সমতলের তুলনায় পাহাড়ি ভূমির রয়েছে ভিন্ন রূপ। পাহাড়ি ভূমির উপযোগী সুষ্ঠু চাষাবাদ ও ব্যবস্থাপনার প্রযুক্তির উদ্ভাবনের লক্ষ্যে পাহাড়ি কৃষি কেন্দ্র স্থাপিত হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি সময়ের পথচলায় পাহাড়ের কৃষিতে মৌলিক অবদান রেখে যাচ্ছে। প্রযুক্তি ও নতুন জাতের উদ্ভাবনের মাধ্যমে পাহাড়ে প্রতিষ্ঠানটি কৃষকের আস্থায় পরিণত হয়েছে। ইতিমধ্যে পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রযুক্তিজ্ঞান ও এ্‌খানকার উদ্ভাবিত কলম চারা’র মাধ্যমে চাষাবাদ করে অনেক কৃষক ও কৃষাণী স্বাবলম্বী হয়েছে। নীতিদীর্ঘ সময়ের পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি কৃষকের বাতিঘরে পরিণত হয়েছে। পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের সফলতার ইতিহাস রয়েছে। গত ১০ বছরের পাহাড়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রায় আট লক্ষ (,০০,০০০) চারা ও কলম বিতরণ করা হয়েছে।

তবে ৩৭ বছরের পথচলায় নানা চড়াইউৎরাই পার করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশেষত পার্বত্য চুক্তি পূর্ববর্তী সময়ে পাহাড়ের অশান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে নানা সংকটের মধ্যেই পাহাড়ের কৃষি ও কৃষকের জন্য কাজ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ইতিমধ্যে খাগড়াছড়ি পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র থেকে নয় () টি ফলের জাত উদ্ভাবিত। যা প্রতিষ্ঠানটির মৌলিক অবদান বলা যায়। এর মধ্যে বারি মাল্টা০১ দেশব্যাপী উৎপাদিত হচ্ছে। পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র থেকে ২০০০ সালে বারি০১ অবমুক্ত করা হয়। এই জাতটি পার্বত্য চট্টগ্রামে কৃষকদের মাঝে দারুন উৎসাহ তৈরি করেছে। মাল্টা চাষ করে ইতিমধ্যে পাহাড় ছাড়াও সমতল এলাকায় কৃষকদের মাঝে বেশ সাড়া ফেলেছে। এসব জাতের চাষাবাদের মাধ্যমে কৃষকের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পেয়েছে। বারি মাল্টা০১ খাগড়াছড়িসহ পার্বত্য এলাকায় অত্যন্ত জনপ্রিয় ফল। মাল্টার চাষাবাদ পাহাড়ে ফলদ কৃষিতে যুগান্তরকারী পরিবর্তন এনেছে। একই সাথে বেশকিছু জাত পাহাড়ে সমাবৃত।

মাল্টা ছাড়াও বারি প্যাশনফল০১,বারি নাশপাতি০১,বারি পেয়ারা০৩, বারি মিষ্টি তেতুল ০১, বারি লিচু০৫,বারি আম১০,বারি কমলা০২ এবং বারি ড্রাগন ফল ০১সহ মোট ৯টি জাত উদ্ভাবন করে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রশিক্ষণ ও চারা কলমের চাষাবাদ করে সফল বিপুল সংখ্যক কৃষক ও কৃষাণী। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে পাহাড়ের অনেকে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ করেছে। পাহাড়ি কৃষি গবেষণা থেকে কলম চারা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নেয়া সফল কৃষক ও কৃষানী জানান,‘ এক সময় অভাবে দিন কাটত । নিজের বসতবাড়ি ও পাহাড়ি ভূমি থাকলেও চাষাবাদ করতাম না। কৃষি গবেষনা থেকে চাষাবাদ ও কলম চারা নিয়ে নিজের জমিতে চাষাবাদ করেছি। চারপাঁচ বছর পর থেকেই ফলদ বাগানের ফলন আসা শুরু হয়েছে। চাষাবাদে কোন সমস্যা হলে সহযোগিতা নিতাম। বর্তমানে পরিবারের সম্পূর্ণ আয় বাগান থেকেই আসে। ফল ও কলম চারা বিক্রি করে প্রতি বছর লাখ লাখ টাকা আয় করছে।’

জানা যায়, ‘পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, খাগড়াছড়ি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এর একটি গবেষণা কেন্দ্র। ১৯৮৪ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এর আর্থিক সহায়তায় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প হিসেবে এর পথচলা শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে প্রকল্প মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এর আওতায় পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানের এর আয়তন ৮১.৭২ হেক্টর। এর মধ্যে পাহাড়ি ভূমির পরিমাণ ৫৯.৫ হেক্টর এবং সমতল জমির পরিমাণ ২২..২২ হেক্টর।

মূলত পাহাড়ে জুম চাষের পরিবর্তে স্থায়ী চাষাবাদ পদ্ধতি চালু করার মাধ্যমে পার্বত্য এলাকায় কৃষকদের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন করাই কেন্দ্রের অন্যতম লক্ষ্য । এরই প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটি পাহাড়ের আর্থ সামাজিক অবস্থার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ স্থায়ী চাষাবাদ পদ্ধতি উদ্ভাবন ও প্রসারের লক্ষ্যে কার্যকরী ভূমিকা রেখে আসছে। পাহাড়ের মাটি ক্ষয়রোধে ফসলের উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি উদঘাটন ছিল প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম চ্যালেঞ্জ। পাহাড়ের চাষাবাদযোগ্য ফসল নির্ণয়,ফসল বপন বা রোপণ সম্পর্কিত সঠিক সময় নির্ধারণ এবং নতুন জাতের উদ্ভাবন করে আসছে পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র। এছাড়া জার্মপ্লাজম সংগ্রহ,সংরক্ষণ ও পাহাড়ি এলাকায় উপযোগী জাত নির্বাচন করছে। ফসলের ক্ষতিকারক পোকামাকড় ও রোগ বালাই চিহ্নিত করণ ও দমনের ব্যবস্থা নির্ণয়ের কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি । এছাড়া কৃষক ও বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে উৎপাদিত কলম চারা বিতরণ করে। এছাড়া পার্বত্য এলাকায় উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতির উদ্ভাবনের মাধ্যমে জুম চাষ প্রতিস্থাপন।

পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে মিশ্র ফল বাগান তৈরিতে খাগড়াছড়ি মডেল হিসেবে চিহ্নিত। এছাড়া মিষ্টি কুমড়ার শাক উৎপাদন প্রযুক্তিসহ আইল সীম,বসত বাড়ির আঙিনায় সারা বছর সবজি ও ফল চাষ এবং আনারস ভিত্তিক বহুস্তরী ফল বাগান স্থাপন প্রযুক্তি প্রদান করে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র থেকে অবমুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে ভেরিগেটেড মাল্টা ও অমৌসুমী বাতাবী লেবু (নাবী)

পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার নেতৃত্বে বিশাল কর্মযজ্ঞে রয়েছে একদল বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বৈজ্ঞানিক সহকারী, নার্সারি পরিচর্যাকারী। গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুন্সী রাশিদ আহমেদ জানান,‘ প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই পাহাড়ের ভিন্ন ভূপ্রাকৃতিক গঠনকে বিবেচনায় নিয়ে কাজ করছে পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র। দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমায় প্রতিষ্ঠানটি পাহাড়ের কৃষকদের আস্থার জায়গায় পরিণত হয়েছে। নতুন জাত উদ্ভাবন ও কৃষকদের প্রতিনিয়ত প্রযুক্তি সহায়তা দেয়া হচ্ছে। পাহাড়ি ভূমিতে মসলা চাষের সম্ভাবনা নিয়েও ভবিষ্যতে কাজ করা হবে।’

তবে গবেষণা কেন্দ্রে জনবল সংকটের কারণে গবেষণা কার্যক্রম ব্যহত হচ্ছে। এছাড়া গবেষণা কেন্দ্রের একাধিক অংশ নিরাপত্তা বেষ্টনি না থাকায় কিছু অংশ এখনো অনিরাপদ।

x