কৃতী পুরুষ মোয়াজ্জেম খান এর আলোকিত পরিবার

মীর আসলাম : রাউজান

সোমবার , ২৯ অক্টোবর, ২০১৮ at ৫:৫৮ পূর্বাহ্ণ
43

হাজার কৃতির জন্মধন্য রাউজানের অন্যতম এক কৃতী পুরুষ আলহাজ্ব মোয়াজ্জেম হোসেন খান। আঠার শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে জন্ম গ্রহণকারী এই কৃতির জন্ম উপজেলার সুলতানপুর গ্রামে (বর্তমান পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ড)। তৎকালীন সময়ে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মোয়াজ্জেম খান ছিলেন কুসংস্কারাচ্ছন্ন ঘুনেধরা সমাজ বদলের দূত। তিনি ছিলেন শিক্ষানুরাগী, মানবতাবাদী ও ধার্মিক পুরুষ। ছোটকালে পিতা মাতা হারিয়ে তিনি কিশোর বয়সে চাকরির সন্ধানে চলে গিয়েছিল বার্মায়। সেখানে চাকরি নেন রেলওয়ের মেইল সার্ভিসে। প্রথম দিকে ছোট পদে চাকরি নিলেও তার কর্মদক্ষতা, সততা ন্যায় নিষ্ঠতার কারণে তাকে পদোন্নতি দিয়ে ব্রিটিশ রেলওয়ের মেইল সার্ভিসের পরিদর্শক করা হয়। এই পদে দায়িত্ব পালনকালে চাকরিদাতা কর্তৃপক্ষ তার বহুমুখি প্রতিভায় মুগ্ধ হয়। পদোন্নতি দিয়ে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার স্বীকৃতি প্রদান করেন। সর্বশেষ তাকে পদায়ন করা হয় রেঙ্গুন জেনারেল পোস্ট অফিসের সহকারি পোস্টমাস্টার জেনারেল পদে। রাউজানের এই কৃতি পুরুষ ১৯৩৮ সালে এই পদ থেকে অবসর নিলে তাকে তৎকালিন সরকারের পক্ষে বিরোচিত সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। ওই সংবাদ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ পায় কলিকাতার বাংলা ইংরেজি বিভিন্ন দৈনিকে। অবসরের পর তিনি বার্মা থেকে দেশে ফিরে আসেন। চলে যান পবিত্র হজব্রত পালন করতে। ওই সময় তাকে হজ্বব্রত পালনকারীদের টিম লিডার হিসাবে মনোনিত করা হয়। এই কৃতির জন্য তার সুলতানপুর বাড়িতে স্বল্প সময়ের জন্য আতিথেয়তায় এনেছিলেন উপমহাদেশের খ্যাতিমান আধ্যাত্ম্যিক পুরুষ হযরত আল্লামা ক্বারী সৈয়দ আহমদ ছিরিকোটি (রাঃ)কে। তিনি এই বাড়িতে আগত বহু নারী পুরুষকে বায়্যেত করিয়েছিলেন ।
প্রবীণদের বর্ণনায় কৃতি পুরুষ মোয়াজ্জেম হোসেন খান বার্মার চাকরি জীবনে নিজ গ্রামে সমাজ সংস্কারে বহুমুখি ভূমিকা রেখেছিলেন। কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ বদলে দিতে তিনি অবদান রেখেছিল আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারের জন্য। রাউজান আর আর এসি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বার্মা থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে পাঠাতেন। নিজের নামে জমি কিনে ওই জমি দান করেছিলেন রাউজান দারুল ইসলাম মাদরাসা প্রতিষ্ঠায়। এই দুটি প্রতিষ্ঠানের তিনি অন্যতম দাতা সদস্য। রাউজানের মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করতে অন্যদের সাথে বিশেষ ভূমিকা রাখেন সুলতানপুর আরবান কো-অপারেটিভ ব্যাংক প্রতিষ্ঠায়। তিনি ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সচিব। মানবিক ও আলোকিত সমাজ প্রতিষ্ঠায় এসবের বাইরে রাখেন তিনি আরো বহু দৃষ্টান্ত।
এই গুণির জন্ম ও পারিবারিক ইতিহাস থেকে জানা যায়, মোয়াজ্জেম হোসেন খান চৌধুরীর পিতা মোস্তফা খান চৌধুরী ছিলেন রাউজানের গহিরা মোবারক খান খিল গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ছিলেন তিন পুত্র ও দুই কন্যা সন্তানের জনক। অষ্টাদশ শতাব্দির প্রথম দিকে মোস্তফা খান চৌধুরী ছিলেন দেওয়ানী আদালতের চাকরিজীবী। কর্মস্থলে সহজ যাতায়াতের সুবিধার্থে তিনি বসতি গড়ে তুলেছিলেন সুলতানপুর গ্রামে। তিনি পরলোকগমন করলে কিশোর বয়সে মোয়াজ্জেম হোসেন খান বার্মায় চলে যান।
পারিবারিক বর্ণনায় জানা যায় কৃতি পুরুষ মোয়াজ্জেম হোসেন খান ১৯ সন্তানের জনক। তার সংসারের মধ্যে ১১ পুত্র সন্তানের মধ্যে ইদ্রিস খান, মাসউদ খান, মছির উদ্দিন খান, এয়াহিয়া খান, জাকারিয়া খান, মহিউদ্দিন খান, কামাল উদ্দিন খান, মাহমুদ খান, ছোলাইমান খান, আজগর খান, খালেদ খান বহু গুণে গুণান্বিত ছিলেন। তাদের সন্তানরাও স্ব স্ব ক্ষেত্রে দেশ বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। তার কন্যা সন্তানরাও সুশিক্ষিত ও সমাজসেবি হিসাবে পরিচিত ছিলেন তাদের মধ্যে (১) রাবেয়া খানম দেশের খ্যাত আইনজীবী মরহুম নুরুল আলম চৌধুরীর স্ত্রী ও ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ এর মা। (২) জয়নাব খানম পাঠানঠুলীর ঐতিহ্যবাহী খান সাহেব বাড়ির আকরাম খানের স্ত্রী। তিনি কাউন্সিলর নিয়াজ উদ্দিন খানের মা। তার অপর দুই সন্তান পিএইচডি ডিগ্রিধারী। (৩) মাহবুবা খানম এর নয় সন্তান দেশে বিদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। (৪) মালেকা বেগমের সন্তানরাও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা বাণিজ্যে প্রতিষ্ঠিত। (৫) নুরুন্নাহার খানম এর সন্তানরা স্বনামধন্য প্রকৌশলী ও ব্যাংকার। (৬) খতিজা খানম বিসিআইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও রাউজানের দানশীল ব্যক্তি প্রয়াত ছোলাইমান মিয়ার স্ত্রী। তার সন্তানরা উচ্চ শিক্ষিত। তারা দেশে বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। (৭) হানিফা খানম ইস্পাহানি জুট মিলের তৎকালীন ব্যবস্থাপক বোরহান উদ্দিন খানের স্ত্রী। তার সন্তানরা উচ্চ শিক্ষিত। দেশি বিদেশি কোম্পানিতে তারা উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। (৮) সুফিয়া খানম রাউজানের এয়াছিননগর গ্রামে বেলাল চৌধুরীর স্ত্রী। তার সন্তানরাও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। রাউজানের এই কৃতি পুরুষের পরিবারের প্রতিজন উত্তরাধিকারগণ বংশপরমপরায় এগিয়ে যাচ্ছে দেশবিদেশে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে আলোকবর্তিকা হয়ে। কৃতির বংশধরগণ ধারাবাহিকতা বজায় রেখে যাচ্ছে স্ব স্ব ক্ষেত্রে কৃতিত্বের।

x