কূলদীপ নায়ার : নীতিনিষ্ঠ ও সেকুলার জার্নালিজমের পুরোধা পথিক

কানাই দাশ

শুক্রবার , ২ নভেম্বর, ২০১৮ at ৯:৪৪ পূর্বাহ্ণ
37

উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক, এক সময়ের উর্দু কবি ও লেখক, মানবাধিকার কর্মী, সেকুলার ও মধ্য বাম ভাবাদর্শে আমৃত্যু উজ্জীবিত কূলদীপ নায়ার গত ১৫ আগস্ট ৯৫ বছর বয়সে দিল্লীতে মৃত্যুবরণ করেছেন। একজন খ্যাতনামা সাংবাদিক ও লেখক হিসেবে তাঁর মৃত্যুতে এ দেশের সুধী সাংবাদিক ও লেখকদের মধ্যে তাঁকে নিয়ে খুব বেশি আলোচনা বা লেখালেখি হয়নি যদিও ঢাকার কয়েকটি প্রথম শ্রেণীর বাংলা ও ইংরেজী পত্রিকায় তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশ করা হতো। তার মৃত্যুতে উপমহাদেশের বিগত প্রায় ৭৫ বছরের ঘটনাবহুল বর্ণাঢ্য ইতিহাসের প্রত্যক্ষদর্শী ও এর নিষ্ঠাবান ভাষ্যকার, নিবেদিত প্রাণ সেকুলার ব্যক্তিত্ব, সত্যদ্রষ্টা সাংবাদিক ও নির্ভীক এক মানবাধিকার কর্মীকে আমরা হারালাম। ’৪৭ সালের দেশ ভাগের পূর্বাপর সময়ে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মুখে জন্মস্থান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের শিয়ালকোট থেকে সহায় সম্বলহীন অবস্থায় ২৪ বছর বয়সে ভারতে চলে আসতে বাধ্য হলেও সাম্প্রদায়িকতা কখনো তাঁকে কলুষিত করেনি বরং মানবিক সম্প্রীতির পক্ষে সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত উপমহাদেশ ছিল তাঁর জীবনের প্রধানতম অন্বিষ্ট। যখনই সুযোগ হয়েছে তখনই তিনি বারবার পাকিস্তান, বাংলাদেশ এমনকি আফগানিস্তানের পথে প্রান্তরে ঘুরেছেন, প্রথিতযশা সাংবাদিক হিসেবে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, কথা বলেছেন নেহেরু থেকে বঙ্গবন্ধু, জিন্নাহ থেকে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহ উপমহাদেশের সব রাষ্ট্রের প্রায় সব মতাদর্শের রাষ্ট্র প্রধান ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে। আদর্শগত দিক থেকে বিপরীত মেরুর হলেও আইয়ুব, ইয়াহিয়া, টিক্কা, জিয়া ও মোশাররফ সহ পাকিস্তানের পাঞ্জাবি সমর নায়করা পাঞ্জাব তথা শিয়ালকোটের লোক হিসেবে বরং তাঁর সাথে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। বিশ্বের আরো অনেক রাষ্ট্র নায়কের সান্নিধ্যে তিনি এসেছেন। বিশ্বব্যাপী শান্তি ও গণতন্ত্রের লড়াইয়ে এসব রাষ্ট্র নায়কদের প্রকৃত ভূমিকা তুলে ধরে তিনি জনমত গড়ে তুলতে চেয়েছেন। তাঁর আত্মজীবনী- ‘Beyond the lines এর পরিশিষ্টে তিনি তাঁর জীবন সাধনা সম্পর্কে বলছেন ‘My instincts from a very early age have been to recognize such people who suffered victimization and marginalization. I have worked with them in Kasmir as they searched for an identity, in Bihar where land grabbers have fraudulently seized people’s land…………….Indeed seeking a responsive chord wherever and whenever it was possible to find it has been a guiding principle for me which made religious and political boundaries becoming largely irrevalent’ দেশ কালের সীমানা ছাড়িয়ে, ধর্ম সংকীর্ণতার বেড়াজাল অতিক্রম করে উপমহাদেশে তথা বিশ্বব্যাপী এক মানবিক , প্রকৃত অর্থেই গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের কঠিন সংগ্রামের এক নিরলস কর্মী ছিলেন কূলদীপ নায়ার তাঁর- প্রতিজ্ঞায় ও প্রতীতিতে।
কূলদীপ নায়ার ১৯২৩ সালের ১৪ আগষ্ট পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের শিয়ালকোট শহরে এক সচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন শিয়ালকোট শহরের এক লব্ধপ্রতিষ্ঠ চিকিৎসক। ফলে শহরের সব মহলে তাঁদের পরিবারের পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা ছিল। একান্নবর্তী বিশাল পরিবার, বাড়ি-ঘর, দোকান-পাট সব মিলিয়ে শিয়ালকোট শহরে তাঁদের সামাজিক ও আর্থিক অবস্থান ছিল ঈর্ষনীয়। ফলে দেশ ভাগের পরেও তাঁরা পাকিস্তান বা মাতৃভূমি ছেড়ে যাবার কথা ভাবেননি। তাঁরা মনে করেছিলেন যে, সাময়িক উত্তেজনার পর সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে । কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাঞ্জাব রক্তাক্ত পথেই সাম্প্রদায়িক সমস্যা সমাধান করেছে যা দেশভাগ পরবর্তী উপমহাদেশের কোথাও হয়নি। একদিকে রণোম্মাদ মুসলিমরা পিন্ডি, লাহোর, শিয়ালকোট তথা পাকিস্তানভূক্ত পশ্চিম পাঞ্জাবের পথে প্রান্তরে শিখ ও হিন্দুদের খুঁজে বেড়াচ্ছে অন্যদিকে পূর্ব পাঞ্জাবের অমৃতসর , জলন্ধর, পাতিওয়ালা, আম্বালা ও চণ্ডীগড়ের রাস্তায় রাস্তায় উগ্র শিখ ও হিন্দুরা মুক্ত কৃপার্ণ হাতে মুসলিমদের নৃশংসভাবে হত্যা করছে। এক নৃশংসতম নরমেধযজ্ঞের মধ্য দিয়ে দুই পাঞ্জাবের ভৌগোলিক বিভক্তির সাথে সাথে ধর্ম ভিত্তিক জনবন্টনও সম্পন্ন হয়। নায়ার আত্মজীবনীতে এক জায়গায় উল্লেখ করেছেন দেশ ভাগ হওয়ার কয়েকদিন পরই জিন্নাহ পাকিস্তানের তৎকালীন পুনর্বাসন মন্ত্রী জনাব ইফতেখার উদ্দিন ও দৈনিক ‘পাকিস্তান টাইমস’-এর সম্পাদক মাজহার আলী খান সহ একটি ডাকোটা বিমানে চড়ে উপদ্রুত পাঞ্জাব সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করতে গিয়ে যখন দেখলেন সীমান্তের দুই দিক থেকে লক্ষ লক্ষ অসহায় মানুষের স্রোত অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ভারত ও পাকিস্তানে প্রবেশ করছে তখন তিনি নিজের অজান্তেই কপালে হাত দিয়ে বলছিলেন, ‘what have I done’ এ তথ্য দীর্ঘদিন গোপন রেখেছিলেন জিন্নার সে দুই সহযাত্রী। যেখানে জিন্নাহ এই দেশভাগ জনিত সহিংসতার দায়ভার নিজেই নিচ্ছেন সেখানে বাংলাদেশ ও ভারতে কিছু ঐতিহাসিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক জিন্নাকে এই মানবিক বিপর্যয়ের জন্য দায়ী না করে তাঁদের অপছন্দের রাজনৈতিক দল ও নেতা কংগ্রেস ও নেহেরুকে দায়ী করেন। যদিও নেহেরুর কিছু অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য ও অধৈর্য্য দ্বিজাতি তত্ত্বের উদগাতা জিন্নার লক্ষ্য ও প্রতীতিকে দৃঢ় করে ও তা বাস্তবায়নের সুযোগ করে দেয়। কিন্তু ব্যক্তির নৈতিক ও মানবিক অবস্থান বিবেচনায় বলা যায় যে, শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও প্রতিশোধ স্পৃহা থেকে একটি দেশকে বিভক্তির পিচ্ছিল পথে ঠেলে দেয়ার জিন্নার এই জেদ কিছুতেই সমর্থন করা যায় না। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের বক্তৃতার পরও যেমন আমাদের দেশে ডানে বামে জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক বলার লোকের অভাব নেই তেমনি দ্বিজাতিতত্ত্বের স্পষ্ট প্রবক্তা জিন্নাকে ‘ধর্ম নিরপেক্ষ’ বলার ডান ও বাম পন্থী লেখক ও কলামিস্টের অভাব নেই। মুসলিমদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তান ছাড়া ‘ধর্ম নিরপেক্ষ’ জিন্না অন্য কিছুতে রাজি ছিলেন না। এটলী ও ওয়াভেলরা তো পর্দার অন্তরালে তাঁর পক্ষেই ছিলেন। কেননা ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে তিনি তাদের কখনও বিব্রত করেননি। তাঁর আন্দোলন ছিল সব সময় কংগ্রেস ও গান্ধী-নেহেরুর বিরুদ্ধে। একদিনও জেল না খেটে একটা আস্ত দেশ তিনি বানিয়ে ফেললেন। পৃথিবীর স্বাধীনতার ইতিহাসে এ এক বিরল ব্যাপার- তিনি যথার্থ ‘বুদ্ধিমান’ তো বটেই। এই প্রেক্ষিতে ১৯৪৭ এর পূর্বাপর সময়ে উপমহাদেশের সামগ্রিক ঘটনাবলির একজন অসহায় ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে কূলদীপ নায়ারের বক্তব্য এখানে প্রণিধানযোগ্য। তাঁর লেখা থেকে আমরা আরো জানতে পারি যে, প্রচণ্ড সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও হানাহানি পটভূমিতে ভারতের শেষ বড় লাট হিসেবে মাউন্ট ব্যাটনের দিল্লী আসার পর প্রথম সাক্ষাতেই সারা ভারতের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে গান্ধীজী জিন্নাহকে প্রধানমন্ত্রী করে মুসলিম লীগের কাছে ভারতের ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য অনুরোধ করেন যাতে সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্য বজায় থাকে ও দেশ ভাগ করতে না হয়- যদিও আবেগপ্রসূত ও অবাস্তব বিবেচনায় প্যাটেল ও নেহেরু গান্ধীর এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। নায়ার লিখছেন যে, গান্ধী মাউন্ট ব্যাটেনকে আরো বলেছিলেন যে, বৃটিশদের দেশ ত্যাগের পর হিন্দু ও মুসলিম যদি একে অপরের গলা কাটার স্বাধীনতা পায় তাহলে সেই স্বাধীনতার কোন প্রয়োজন নেই। ১৯৪৬-৪৭ সালে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঠেকাতে গান্ধী প্রশাসনের তোয়াক্কা না করে জীবন বাজি রেখে নিজেই ছুটেছেন দাঙ্গা পীড়িত কলকাতা, নোয়াখালী, বিহার ও দিল্লীতে। দেশ ভাগ হওয়ার পর প্যাটেলসহ দক্ষিণপন্থী কংগ্রেসিরা যখন পাকিস্তানের ন্যায্য পাওনা দিতে অস্বীকার করে তখন গান্ধী আমরণ অনশনের হুমকি দিয়ে তাঁদের পাকিস্তানকে কিছুটা হলেও ন্যায্য পাওনা দিতে বাধ্য করেন। এখানে স্মর্তব্য যে পাকিস্তান ৪৭ বছরেও আমাদের পাওনা এক টাকাও দেয়নি। এসব কারণে গান্ধীজী উগ্র হিন্দুদের রোষানলে পড়েন এবং ১৯৪৮ সালে জানুয়ারিতে নাথোরাম গডসে নামক এক উগ্র হিন্দুর হাতে নিহত হন। গান্ধীর মত একজন অহিংস নেতার মৃত্যুর পর সারা পৃথিবীর রাষ্ট্রনায়করা সেদিন শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে অথচ সে সময় অনুদার জিন্নাহ এই বলে বিবৃতি দেন যে, তিনি একজন ভাল ‘হিন্দু’ ছিলেন। পাকিস্তান গান্ধীর মহত্বকে কোনদিন স্বীকার করেনি। এমনকি সেই ১৯৪৭-৪৮ সালে মুসলিম লীগের চাপে ও সাম্প্রদায়িকতার তাপে চট্টগ্রামের একসময় বিখ্যাত গান্ধী ময়দানের নাম নিশানা পর্যন্ত মুছে দেয়া হয়। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম তাঁকে আর মনে রাখেনি। একথা গুলো বলার কারণ হল কূলদীপ নায়ার তাঁর লেখায় ইতিহাসের এ সত্য ঘটনাগুলো অবিকল ভাবে তুলে ধরেছেন সব রকম সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে, কাউকে বড় বা ছোট করে দেখানোর রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক অভিসন্ধি থেকে নয়। এখানে উল্লেখ করা বাহুল্য হবে না যে, কূলদীপ নায়ার এর মা ছিলেন হিন্দু এবং পিতা শিখ ধর্মে বিশ্বাস করতেন। তাঁদের ঘরে উভয় ধর্মের চর্চা হতো এবং তিনি তাঁর নাম থেকে শিং শব্দটি বাদ দেন। উদার অসাম্প্রদায়িক পরিবেশে লালিত কূলদীপ নায়ার আজীবন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সবকিছু বিবেচনা করেছেন, ধর্ম সংকীর্ণতা কোনদিন তাঁকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি।
কূলদীপ নায়ারের শিক্ষা জীবন শিয়ালকোট ও লাহোরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাটে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মুখে তিনি সবাইকে ফেলে এক কাপড়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তিনি দিল্লী পৌঁছেন। দিল্লীতেও তখন প্রচণ্ড উত্তেজনা চলছিল। লাহোরের বিখ্যাত ফরমান খ্রীশ্চীয়ান কলেজে পড়ার সময় কূলদীপ নায়ার বামপন্থী ছাত্র ফেডারেশনের সাথে যুক্ত ছিলেন। সে সূত্রে তিনি দিল্লীতে কমিউনিস্ট পার্টির কার্যালয়ে গিয়ে পূর্ব পরিচিত বিপ্লবী বন্ধু, পার্টির দিল্লী ইউনিটের তৎকালীন সম্পাদক কমরেড মোহাম্মদ ফারুকীর সাথে দেখা করেন এবং তিনি নায়ারকে সাংবাদিকতার কাজে উৎসাহিত করেন ও “আঞ্জাম” নামে এক উর্দু পত্রিকায় কাজ জুটিয়ে দেন। “আঞ্জাম” এর মালিক সম্পাদক ছিলেন পাকিস্তান ও মুসলিম লীগের সমর্থক কিন্তু তিনি ভারতে থেকে যান। কিছুদিন পর তিনি “ওয়াদাত” নামে একটি উর্দু দৈনিকে যোগদেন। সেখানে তিনি প্রখ্যাত উর্দু কবি ও বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী ও স্বাধীনতা সংগ্রামী মাওলানা হসরাত মোহানির সংস্পর্শে আসেন। মাওলানা ইতোমধ্যে গান্ধীর আহবানে বেশ কয়েকবার কারা বরণ করেন। মাওলানা মোহানি তাঁকে উর্দু সাংবাদিকতা ছেড়ে দিতে বলেন এই ভেবে যে, স্বাধীন ভারতে উর্দু সাংবাদিকতার ভবিষ্যত নেই এবং সাথে সাথে নায়ারকে উর্দু সাহিত্য চর্চা তথা উর্দু কবিতা লেখা বাদ দিতে বলেন। তিনি মাওলানা মোহানির দুটি উপদেশই মেনে নেন। পরে নায়ার যুক্তরাষ্ট্র সরকারের তথ্য সংস্থা USIS এ যোগ দেন। এই চাকরির সুবাদে তিনি বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের North Western University এ ভর্তি হন এবং সেখান থেকে জার্নালিজমে এম.এ ডিগ্রী নেন। পরবর্তীতে হুমায়ুন কবিরের প্রেরণায় তিনি ইংরেজি জার্নালিজম শুরু করেন ও এতেই আজীবন ব্যাপৃত থাকেন। বিখ্যাত Statesman পত্রিকার তিনি ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন এবং সংবাদ সংস্থা ইউ এন আই- এর নির্বাহী ছিলেন দীর্ঘদিন। তাঁর শেষ জীবনে ‘ইবঃবিবহ ঃযব ষরহবং্থ নামক তাঁর বিখ্যাত কলাম ১৪ টা ভাষায় দেশে বিদেশে প্রায় ৮০টি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হতো।
ইংরেজি জার্নালিজমকে তিনি সাহিত্যের পর্যায়ে নিয়ে যান। প্রথম জীবনে উর্দু কবিতা ও সাহিত্য চর্চা করলেও পরবর্তীতে তিনি ইংরেজিতেই লেখালেখি করেছেন। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে পশ্চিম পাঞ্জাব প্রত্যাগত প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক খুশবন্ত সিং এর কথা, যিনি সাংবাদিক হিসেবে ১৯৪৭ পরবর্তী পাঞ্জাবের রক্তাক্ত ঘটনাবলী ও নানা বিষয় নিয়ে সাহিত্য রচনা করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁর ‘অ ঞৎধরহ ঃড় চধশরংঃধহ্থ একটি উল্লেখযোগ্য ও বহুল পঠিত গ্রন্থ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে এক পর্যায়ে নায়ার ভারত সরকারের প্রেস ইনফর্মেশন ব্যুরোতে চাকরি নেন। নেহেরু মন্ত্রী সভার গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর প্রেস সচিব নিযুক্ত হন ও শাস্ত্রীর সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠে। এ কারণে তিনি পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ভারতের ক্ষমতাসীন অন্দরমহলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে আসেন। নেহেরু, প্যাটেল, আজাদ, হুমায়ুন কবির, দেশাই, কামরাজ প্রমুখ শাসকদলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে মেলামেশা ও কথা বলে তিনি দেশভাগের কারণ, উপমহাদেশের জনজীবনে তাঁর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া, ভারত ও পাকিস্তানের পারস্পরিক সম্পর্কের নানা ঘটনার পটভূমি ও অজানা অনেক তথ্য তিনি নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরেন তাঁর আত্নজীবনীমুলক গ্রন্থ ‘Beyond the linesr’ এবং ১৯৭২ সালে প্রকাশিত ‘Distant Neighbour নামক দুটি বইয়ে। নেহেরুর মৃত্যুর পরে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হওয়ার পর নায়ার ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হন। সহজ সরল জীবনের অধিকারী শাস্ত্রী তাঁকে সব সময় আস্থায় রাখতেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সারা ভারতে জনমত তৈরির কাজে তিনি আত্মনিয়োগ করেন। শুধু ভারত নয় ইংল্যান্ড ও আমেরিকার বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তিনি লেখালেখি করেন বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার ও জনগণের পক্ষে। সেদিক থেকে তাঁকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কলম সৈনিক বলা যায়। আমৃত্যু তিনি গণতন্ত্র, সমাজ প্রগতি ও অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। সমাজ তন্ত্রের সুষম বন্টন নীতিতে তিনি বিশ্বাস করতেন কিন্তু সামষ্টিক কল্যাণের লক্ষ্যে ব্যষ্টির অবদমন কখনো মানেননি। ইন্দিরা গান্ধী সরকারকে তিনি নানা সংকটে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছেন কিন্তু জরুরি অবস্থা জারী করে যখন গণতন্ত্রকে আঘাত করা হয় তখন তিনি তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। এ সময় তিনি কারাবরণও করেন। আবার শিখ দেহরক্ষীদের হাতে ইন্দিরার মৃত্যু তিনি মেনে নিতে পারেন নি। ভারতের ঐক্য ও সংহতির প্রশ্নে শিখ বংশোদ্ভুত হয়েও যেমন খালিস্তান আন্দোলন বা উগ্রপন্থী শিখদের সমর্থন করেননি তেমনি ইন্দিরার মৃত্যুর উগ্র প্রতিক্রিয়ায় দিল্লীর শিখ নিধন যজ্ঞের তিনি তীব্র নিন্দা করেছেন। ১৯৮৯ সালে ভিপি সিং প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁকে লন্ডনের ভারতীয় দূতাবাসে মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রদূতের পদে নিয়োগ দেওয়া হয় ও পেশাদার কূটনীতিক না হয়েও রাষ্ট্রনৈতিক বিষয়ে দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতার কারণে দুদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক দৃঢ় করার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে একজন সফল কূটনীতিকের পরিচয় দেন। ভিপি সিং সরকারের পতনের সাথে সাথেই নৈতিক অবস্থান থেকে তিনি নিজ থেকে রাষ্ট্রদূতের পদ ত্যাগ করেন। বৃটেনের হাউস অব কমন্স তাঁর সম্মানে এ সময় এক বিশেষ শুভেচ্ছা প্রস্তাব গ্রহণ করে যা একটি বিরল ঘটনা। ভারতের রাজ্য সভা বা পার্লামেন্টের আপার হাউসে বুদ্ধিজীবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক সহ অন্যান্য বরেণ্য পেশাজীবিদের জন্য রাষ্ট্রপতির মনোনীত নির্ধারিত কোটা থেকে কূলদীপ নায়ারকে প্রবীণ ও সম্মানিত সাংবাদিক হিসেবে রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত করা হয় ১৯৯৭-২০০৩ মেয়াদে। সে বছর তাঁর সাথে চলচ্চিত্র দুনিয়া থেকে শাবানা আজমী, বিজ্ঞানী হিসেবে ড. রাজা রামান্না প্রমুখ রাষ্ট্রপতির মনোনীত সদস্য হিসেবে রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হন। রাজ্যসভার সম্মানিত সদস্য থাকাকালীন সময়ে তিনি তাঁর কাজে, প্রজ্ঞায় অনুকরণীয় উচ্চ নৈতিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। সামান্য কারণে পার্লামেন্ট বা রাজ্যসভার অধিবেশন না চললে তিনি ঐ দিন বা ঐ সময়ের জন্য কোনভাবে ভাতা গ্রহণ করতেন না। তিনি রাজ্যসভার সদস্যদের প্রত্যেক বছর স্থাবর, অস্থাবর সম্পদের তালিকা হাউসে জমা প্রদানের বিধি চালুর প্রস্তাব আনেন যা বোধগম্য কারণে গৃহীত হয়নি। ভারতীয় সংবিধান ও সেকুলার রাষ্ট্রদর্শের পক্ষে তিনি সাধ্যমত পার্লামেন্টে কথা বলে গেছেন এবং সে সময় ক্ষমতাসীন বিজেপি বা এনডিএ সরকারের হিন্দুত্ববাদকে তিনি তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে বক্তব্য রাখতেন।
সামাজিক ও পেশাগত জীবনে কূলদীপ নায়ার ব্যক্তি হিসেবে আমৃত্যু সৎ, নিষ্ঠাবান ও যেকোন ধরনের দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থাকতে চাইতেন আন্তরিকভাবে। সাংবাদিকতা জীবনে এই সততা ও স্পষ্টবাদিতার জন্য ক্ষমতাসীন মহল বিশেষ করে দীর্ঘদিনের শাসক দল কংগ্রেসের সর্ব ভারতীয় নেতৃত্ব তাঁকে কোনদিন ভাল চোখে দেখেননি। তিনি সব সরকারের আমলে প্রণীত ও প্রচলিত গণবিরোধী ও অসাংবিধানিক কালাকানুনের তীব্র সমালোচক ছিলেন। আবার সাংবাদিক হিসেবে পেশাগত সততার উপর সব সময় জোর দিতেন। ভারতের মিডিয়া জগতের বিশেষত সাংবাদিকতার পেশাগত অবক্ষয়ের করুণ চিত্র দেখে শেষ জীবনে হতাশা ব্যক্ত করতেন। তিনি শংকিত হয়ে এককথায় বলেছেন,”What appalls me most is that editorial primacy has been sacrificed at the altar of commercialism and vested interest. It hurts to see many journalists bending backwards to remain handmaidens of the Proprietors, on the one hand and of the establishment on the other.”
একথা আমাদের দেশের মিডিয়া জগতের ক্ষেত্রেও সর্বাংশে প্রযোজ্য। তিনি কিন্তু নিছক নৈর্ব্যক্তিক ও প্লাতোনিক সততায় বিশ্বাস করতেন না। মানুষের কল্যাণ কামনা ছিল তাঁর সততা ও জীবনের প্রধানতম লক্ষ্য। তিনি বলতেন “Speaking the truth is dependent on your basic attitude towards people . If it is people friendly, if you genuinely like being with people, if you are sufficiently interested in listening to what they say they will freely confide in you” আমেরিকার দার্শনিক রজার্সের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলছেন, ‘There are no strangers, only friends I have not met” তাঁর মতে এটাই হওয়া উচিত মানুষের প্রতি একজন সাংবাদিকের প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি।
একজন সমাজ সচেতন ও প্রগতিশীল মধ্য বাম রাজনীতির মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন যুদ্ধ বিরোধী ও শান্তিবাদী মানুষ, বিশেষত ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে শান্তি ও সৌহার্দ্যের জন্য তিনি আজীবন ছিলেন আত্ম নিবেদিত। ১৯৯২ সাল থেকে তাঁরই উদ্যোগে পাক-ভারত সীমান্ত ফাঁিড় পাঞ্জাবের ওয়াঘায় ১৪-১৫ আগস্ট দুদিনব্যাপী প্রতি বছর নানা ধরনের বাধার মুখেও মোমবাতি প্রজ্জ্বলন ও শান্তি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দুই দেশের শান্তিকামী মানুষের সমর্থনে তা এখন লক্ষ লোকের সমাবেশে রূপ নিয়েছে। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করতেন ভারত-পাকিস্তানের শান্তি ও সদ্ভাব স্থায়ী রূপ নিত যদি পাকিস্তানে গণতন্ত্র শক্ত ভিতের উপর দাঁড়াতে পারত এবং সামরিক বাহিনী যদি রাষ্ট্র ও প্রশাসনের উপর চিরস্থায়ী প্রভাব বিস্তার করতে না পারত। পাকিস্তানের সব রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের সাথে বিভিন্ন সময়ে কথা বলে তাঁর এই বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে।
মানবিক সম্প্রীতিতে পরিপূর্ণ উপমহাদেশের এক ভবিষ্যতের ছবি বুকে লালন করে ফার্সি কবি ওমর খৈয়ামের একটি কবিতার তাঁর প্রিয় কয়টি চরণ উল্লেখ করে তিনি তাঁর জীবনের লালিত আকাঙ্খার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। বলা যায় এটি তাঁর জীবনের অনেকটা শেষ বাণীর মত যা প্রতিটি শান্তিকামী প্রগতিবাদী মানুষের অন্তরের আর্তি-
So it be written in the Book of Love
I do not care about the Book above
Erase my name or write it as you will
So I be written in the Book of Love.

x