কূটনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমেই যত দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গাদের ফেরাতে হবে

সোমবার , ৮ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ
22

রোহিঙ্গা সমস্যাকে আর ফেলে না রেখে এর দ্রুত সমাধান করার বিষয়ে বাংলাদেশ ও চীনের নেতারা একমত হয়েছেন, যা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে খুবই ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এই ঐকমত্য হয়। বৈঠকের পর পররাষ্ট্র সচিব সাংবাদিকদের বলেন, দুই নেতা একমত হয়েছেন যে, এটার দ্রুত সমাধান করতে হবে। এটাকে আর ফেলে রাখা যাবে না। দুই বছর হয়ে গেছে (প্রত্যাবাসন) চুক্তি হয়েছে। ওই ব্যাপারে কোনও দ্বিমত নেই এবং সমাধান কীভাবে হবে সে ব্যাপারেও দ্বিমত নেই যে এদেরকে (রোহিঙ্গা) তাদের দেশে (মিয়ানমারে) ফিরে যেতে হবে।
নির্যাতনের মুখে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে প্রায় দুই বছর ধরে। তাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করলেও তার বাস্তবায়ন করেনি। এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার ভার বয়ে চলা বাংলাদেশের সরকার মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির জন্য কূটনৈতিক যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, গত বছরের শুরুতেই কয়েক দফা বৈঠকের পর রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মিয়ানমারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করেছিলো বাংলাদেশ। সে সময় ধাপে ধাপে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে রাজি হয়েছিলো মিয়ানমার।এমনকি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের দুটি সংস্থার সাথেও চুক্তি করেছিলো তারা। কিন্তু বাংলাদেশ একটি তালিকা দিলেও শেষ পর্যন্ত একজনকেও ফেরত নেয়নি মিয়ানমার।
রোহিঙ্গা সংকটের শুরু থেকেই চীন রোহিঙ্গা সমস্যার আন্তর্জাতিকীকরণের বিরোধিতা করে দ্বিপাক্ষিক সমাধানের কথা বলে আসছিল। জাতিসংঘেও নানা সময়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আনা নানা প্রস্তাবে বিরোধিতা করে চীন সমস্যা সমাধানের বিষয়টি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের হাতে দেওয়ার কথাই বলেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতাধারী চীন বরাবরই আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র মিয়ানমারকে সমর্থন দিয়ে এসেছে।
তবে এবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফরে যাওয়ার আগে ধারণা করা হচ্ছিলো যে রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনকে আরও বেশি নমনীয় করাতে সক্ষম হতে পারে বাংলাদেশ। মনে করা হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রীর এবারের চীন সফরে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ প্রাধান্য পাবে।
রোহিঙ্গাদের ফেরাতে মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ বিষয়ে চীনের সম্মতি আদায়কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাফল্য হিসেবে দেখছেন কূটনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। পত্রিকান্তরে তাঁরা বলেছেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ প্রশংসনীয়। প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে চীনের সর্বোচ্চ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে রাজি করাতে পেরেছেন। এটা আমাদের জন্য একটি স্বস্তির খবর। কেননা চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্ক ভালো। তারা ছাড়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে আর কেউ রাজি করাতে পারবে না।
এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞ কূটনৈতিকরা বলেন, বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর এই কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে অভিবাদন পাওয়ার যোগ্য। আশা রাখি চীন সরকার প্রধান এ বিষয়টিকে গুরত্ব সহকারে দেখবেন। এখন আমাদের করণীয় হচ্ছে আমাদের কূটনৈতিক কাঠামোকে আরো সচল করে যত দ্রুত সম্ভব এই সমস্যা সমাধান বের করা।
তাঁরা বলেন, বাংলাদেশ থেকে এরূপ পদক্ষেপ নেওয়া আগেই দরকার ছিল। প্রধানমন্ত্রী চীনের সর্বোচ্চ ব্যক্তির সঙ্গে মিয়ানমার ইস্যুটি নিয়ে কথা বলে রাজি করাতে পেরেছেন। চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্কই ভালো। আর চীন ছাড়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে আর কেউ রাজি করাতে পারবে না। এখন আমাদের করণীয় হচ্ছে কূটনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে যত দ্রুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা।
রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের জন্য বিরাট আপদ। তাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করা বাংলাদেশের জন্য এক প্রকার চ্যালেঞ্জ। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের চাপ থাকা জরুরি। আমরা মনে করি, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে বাংলাদেশ শুধু চীন নয়, সব মিত্র দেশের পক্ষে দৃঢ় সমর্থন প্রত্যাশা করে। এ ক্ষেত্রে ভারত, রাশিয়া ও জাপানের সমর্থনও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা দেখে আসছি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা দেশগুলো বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন দিয়ে আসছে। তাঁরা বরাবরই উচ্চকণ্ঠ হয়ে ভূমিকা পালন করে আসছে। চীনের মতো অন্যান্য দেশও যদি আগ্রহ প্রকাশ করে অথবা রোহিঙ্গা ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করতে সম্মতি প্রদান করে, তাহলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব।

x