কুমিরের পেটে পাতিহাঁস

পংকজ চৌধুরী রনি

মঙ্গলবার , ৯ অক্টোবর, ২০১৮ at ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ
43

মনান্তরের বন পেরিয়ে ফুলন্ত অঙ্কুরের ভাঁজ মেলে ছুঁয়ে থাকা ভূতলের হুঙ্কারে হাসে লাজুকলতার কচি ছানাপোনার উদাসীনতা। বাঁশ ঝাড়ের গোপনে বেড়ে উঠেছে খাল পাড়ের রক্ষাকবচ। হাওয়ার তাল সুর-ছন্দে মিশেছে গহীনের রস, মেলেছে প্রজাপতির পত্রপলক। জলজ প্রতিবিম্ব হয়ে ভাসে সবুজ হলুদ প্রতিচ্ছবি। গতজন্মের ফুল এ-জন্মের ভূত সেজেছে বাড়ির পরতে-পরতে। কৃষ্ণচূড়ার হাসিতে হাসছে আদুলি এ-পাড়ের ছাদতলার ওপরে পাতাদের নাচন রসে ছড়ানো আলোকরশ্মির ওপাড়ে মেঘেদের ভেলার উড়ে-উড়ে। বৃষ্টির হেয়ালিপনায় ভেসে যাচ্ছে রোদ্দুরে দুপুর। ঘুম চোখে চুম দিয়ে টুকটুকি। হালুম হালুম হালুম। আড়মোড়া ছানি চোখে কুমির ছুটেছে প্রাণপণে ইনিয়ে-বিনিয়ে পুকুরের পাড়ে উঠে মানুষ হবে বলে। মানুষের ছানাপোনাগুলো সব কুমিরের পেটে চলে গেছে। পাড়ে ওঠার ঘাটগুলো সরে গেছে আগের নিবাস থেকে। জলের সাথে জড়াজড়ি সহাবস্থানে বসবাসরত লতাপাতার দোলন ফুলকির আগায় ঝুলে ঝুলে ওঠার রাস্তাগুলোও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ছোটবেলায় উঠানকে পুকুর বানিয়ে পুকুর-কুমির খেলা। আমাদের উঠোনের গল্প। কখনো পুকুর কখনো খেলার মাঠ কখনো সিনেমার মঞ্চ হয়ে উঠতে দেখেছি চোখের সামনে এই উঠানকে। কালবৈশাখীর ঝড় শেষে উড়ে যাওয়া টিনের চালার ফাঁকে উঠানের মাঝে দাঁড়িয়ে মস্ত বড় আম গাছের ফুসফুস। সারা উঠান জুড়ে শয্যাশায়ী আধকাঁচা আম রাশি। বিচ্ছুর দল কুমির হয়ে ছুটছে ঝড়েরও আগের গতিতে বাড়ির পশ্চিম সীমানার ওপারে জমা জলে লম্পঝম্প। বাড়ির মধ্যখানে মাটির দেয়ালের আধমরা গতরের ঠাকুর পূজার ঘর। শুনেছি এক সময় খুব রাজকীয় আয়োজনে দুর্গাপূজা হতো এই বাড়িতে। এখনও সকাল সন্ধ্যা নিয়ম করে দু’বেলা শাখ বাজার সুর শুনতে পাওয়া যায় ব্রাহ্মণের ফুঁ জোড়ে। দালানের তলানিতে লুকিয়ে ছেলেবেলা, পুকুরের ভূত গুইসাপ। কুমিরের পেটের ভার বাড়তে বাড়তে লেজের গোড়ায় শিবের আহার মিটানোতে মগ্ন হয়ে বড্ড ক্লান্ত। তারপর সজ্ঞানে যার মাল তাকে বুঝিয়ে দিয়ে কুমির হয়ে গেল ভূত। ভূতলের জলজ জীবন প্রদীপ হয়ে জ্বলছে রসদের যোগান দিতে। স্তরে স্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিন্দু। বিন্দ-ুবিন্দু রেখার তরণী আঁকাবাঁকা। লেজের গোড়া সমৃদ্ধ অতি সমৃদ্ধ মগজ। নতুন পাতা নতুনের মতো, পুরাতনের নতুন। আজকের নতুন আগামীর বিন্দু। নতুন পাতা আজকের মাথা। লেজের গোড়ায় মগজ। ছোটবেলায় বাড়ির দক্ষিণ-পূর্ব কোণায় ডোবার পাড়ের জংলায় কুমির দেখেছি। কুমির নয় গুইসাপ। দেখেছি মানুষ দেখলে পালিয়ে যেতে শত ব্যঞ্জনার শিকার হলেও হামাগুড়ির ব্যথা তোয়াক্কা না করে। মানুষগুলো ঢিল ছুঁড়ে। আচ্ছা মানুষ তাদের ঢিল ছুঁড়ে কেন! ভয় নাকি সংশয়। কুমির নিশ্চয়ই আরো বড় কিছু এই ভাবনার দ্বার খুলল চিড়িয়াখানায় কুমির দেখার পরে। সারা গায়ে কাটা কাটা বিশাল লম্বা লেজের অধিকারী। বাকি সব গুইসাপের আদল। সাইরেন বাজিয়ে গাড়ির বহরে কুমির পাচার হয়ে যেতে শুনেছি পুরানো ভূতের গল্পে। চোখের সামনে সূচের গুতায় গুইসাপ ধরে নিয়ে যেতে দেখেছি বাড়ির উত্তর পশ্চিম পাড়ের জংলা থেকে। উত্তর পাড়ের মধ্যখানে পুরানো জংলার আড়ালে কারুকাজ। বাবার মুখে শুনেছি জংলার আড়ালে ভাঙা ইট সুরকির স্থাপনাটি গায়েবি মন্দির। আমাদের বংশের একজনের ইচ্ছে ছিল মন্দির বানানোর। একদিন সন্ধ্যার লগ্নে দশ বারো বছরের হবে, এমন দুইটা অচেনা ছেলে ঘর দুয়ারে দাঁড়িয়ে জল খেতে চাইলো। জলপান শেষে মন্দির বানানোর জায়গাটা কোথায় জিজ্ঞেস করে দেখে চলে যায় শ্যামবর্ণের গামছা পড়া ছেলে দুইটা। চৌকাঠে সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বলে উঠলে জাগল শিহরণ। আমাদের মন্দির বানানোর বাসনা অন্য কেউ তো জানে না। তবে এই ছেলে দুটো কারা! অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও খুঁজে পাওয়া যায়নি ওই রাতে তাদের। ভোরের আলো আসার পর সবাই দেখতে পেলো ওখানে মানে যেখানে মন্দির বানানোর বাসনা ছিল, যেই জায়গাটা ছেলে দুটো দেখে গিয়েছিল সেখানে একটা মন্দির। এই গল্প অবশ্য বাবা তারও পূর্বদের কাছ থেকে শুনেছেন। একটা প্রশ্ন এসেছিল মাথায় তখন, জমিদারি যার রক্তবংশীয় বালামে; তার মন্দির বানানোর সামর্থ্য ছিল না নাকি এই গল্প আজগুবি। আসলে এই স্থাপনা যিনি তৈরি করেছেন তিনি ভূত হয়ে গেছেন যেমনটা একদিন আমি তুমিও হয়ে যাবো।

কুমিরের পেটে মানবের পাতিহাঁস। হাজার বছর আগে সেনবংশীয় কোনো এক রাজা যিনি শিব আরাধনার জন্য নিজে কিংবা তারই দেহ রাখার পর তার বংশধরেরা তার সমাধিস্থল হিসেবে এই মন্দির স্থাপন করেন। চারপাশে ভাঁজে ভাঁজে বসানো ইটের মোটা মোটা পিলারের বারান্দা। বাতাস যেখানে নিত্য সুবাসে সুরময় নৃত্যরত। সামনের দিকে বাইরের আবরণে ইটের ওপরের নকশাতে নকশাবন্দি করে নেয় চোখ। ফুল, লতাপাতা, বাঁশি বাজানো শ্যাম, রাধারাণী আরো আরো কতশত মোটিভ আর দুইটা লিপিফলক। ভিতরের মধ্যখানের উত্তর দিকের ওয়ালে একটা মঠ রাখার মত খোপ, দুইপাশে একটু ছোট খোপ যার মধ্যে হয়তো পূজার উপকরণ সজ্জিত করে রাখা হতো। মাথায় ইটের শরীরি নান্দনিক ভাজে গড়া ঘূর্ণায়মান চূড়া। পতপতিয়ে হুড়মুড় করে দৌড়ে গেলো একদল কলাবাদুরের ছানাপোনা। প্রচলিত ছিল মন্দিরের সামনের বাইরের আবরণে রূপ বহনকারী প্রাচীন লিপি কেউ পড়তে পারলে সে সাত পুরুষের গুপ্তধন সম্পদের খবর পাবে।
এই গুজবে কতশত বার মন্দিরের ভিতর বাহির আশপাশ চোরদের দল খোঁড়াখুঁড়ি করে রেখে যাওয়ার চিহ্ন দেখেছি তার ইয়ত্তা নেই। একদল তান্ত্রিক কী জানি কী শক্তির খোঁজে বিশেষ করে অমাবস্যা রাতে বিভিন্ন রূপ ধারণ করে হানা দিত এই মন্দিরের আশেপাশে বিভিন্ন সময়। তারা আসলে ভূত ধরতে আসে। মানে পূর্ব পুরুষদের সাথে সাক্ষাৎ শুনে নিজেদের জ্ঞানের আহারে ভেঙে যাওয়া গাণিতিক সংখ্যা আঁকতে জড়ো হয়। শ্রী যদুনাথ সেন। এমনই এক সেনভূতের নাম ষোল সতের বছর আগে ওই লিপি থেকে উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও আজ অব্দি কোন গুপ্তধন টুপ্তধনের চেহারা দেখি নাই। অনেক বড় ছোট সাপের নিবাস এই গায়েবি মন্দিরে। গোলাভর্তি ধান না দেখলেও গোলা দেখেছে বাবা। আমি লতাপাতায় প্যাঁচানো চুনসুরকির ভাঙা বেশ কয়েকটির পিলার। যার গোড়ায় আড়ালে ছিল কাছিমের ছানাপোনা আর ডাহুকের রাজত্ব। ছোটবেলার কুলুক খেলায় লুকানোর অবস্থান যোগান দিত এই জংলা রাশি। কানের পাশে ফুঁ দিয়ে উড়ে যায় মাছি। কবুতরের পালকের ফুরফুর সুড়সুড়ির নাকের ফোকরে দিয়ে উল্লাসিত হাস্যরসে টুকটুকি।
পলাশপুকুর। জন্মের পর থেকেই বাড়ির সামনে পুকুরটাকে দেখেছি। নামটা অবশ্য আমার দেয়া কোনো এক বসন্তে। শুনেছি আমারও অনেক আগেই তার জন্ম। কয়েক পুরুষের অভিজ্ঞতা তার বুক-পিঠে। আজ পুকুরের সাথে কথা বলতে গিয়ে পুকুরের করা কিছু প্রশ্ন খুব ভাবনায় ফেলে দিয়েছে। পাড়ের পলাশ গাছগুলো হাসতে-হাসতে একাকার। নাম না জানা পাখিগুলো রস তুলে নিতে বেশ পটু। শিরা উপশিরা খুঁজে খুঁজে ঠোকর দিতেই একটা পলাশ মাটিতে এসে পড়ল। সেকি আনন্দ! পলাশ নাচতে নাচতে গড়িয়ে গেল ঘাস মাটি ছুঁয়ে জলে। দুপুরের প্রহর পলাশের আস্তর। সরিয়ে ডুব দিতে লেপ্টে চেপ্টে অবস্থান। পাশের বাড়ির বৌ ঠাকুরান/ হাঁসেদের খাবার তুলতে ডুব দিয়ে দুইখান শামুক তুলে আনল। এক দুই বারে গুণে দেখলাম সাত সাতটি হাঁস টহল দিচ্ছে বৌ রাণীর চারপাশে। ভিজে যাওয়া শাড়ির ভাঁজে এক গুচ্ছ কলমিলতা। দুষ্ট বাচ্চাদের দল একে একে সবাই গাছের ডগা থেকে ঝাঁপ দিতে শুরু করল। উফ্‌্‌ফ কি বিচ্ছু . . . কাদামাটি পানি এক করে ঘোলাটে। মাছেরা এহেন অত্যাচারের আপত্তি জানালো পুকুর রাজার রাজদরবারে। বিচ্ছুদের জ্বালায় নাকি প্রতিদিন ছোট মাছেদের দল নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। গামছা কিংবা শার্ট মেলে জল পোকাদের যথেষ্ট দৌড়ের মধ্যে রেখেছে এই বাহিনী। দুই চার জন প্রতিদিন গায়েব। রাজা মহাশয় বিষয়টাকে বিচ্ছু বাহিনীর মন প্রাণের রঙ হিসেবে ধরে নিয়ে একখানা জাল কিনে দিল। এখন থেকে আর ছোট মাছ নয়; রুই, কাতলা, মৃগেল, বোয়ালের সাথে খেলা হবে বিচ্ছুদের। সেইদিন বিচ্ছুদের এক সদস্যকে পুকুরের নিরাপত্তা বাহিনী পাল্টা জবাবে গুঁতো দিয়ে চোখ ফুলিয়ে দিয়েছে। এতে পলাশ পুকুরে বিচ্ছুদের আনাগোনা কমে গেছে খানিকটা। সেই ফাঁকে রহিমের পাহাড়ি মদের লুকোচুরি খেলার জায়গা হয়ে উঠেছে পানির দিকে ঝুঁকে পড়া বড় পলাশ গাছটার গোড়ায়। উত্তর পাড়ের জটলার দিকটাই হাঁসেদের আড্ডাবাজি।
সেইখানটাতে সদ্যজাত ডিম। পাড়ের বন্ধু মুরগী বুঝতে না পেরে ঠোকর মেরে ফুটো করে দিয়েছে ডিমের বুক। কলমিলতার ফাঁকে ফাঁকে মলচি শাকের উজ্জীবিত প্রাণ সদাই ঊর্ধ্বমুখী, আকাশদর্শন। লাল শাপলার বীজ ঠিক করে কোথা হতে এসে সঙ্গী হয়েছে পুকুরের বুকজুড়ে জানা যায়নি। তবে আসার পর থেকেই সে নাকি বেশ হাস্যোজ্জ্বল থাকতেও রাখতে চেষ্টা করে বাকিদের। যদিও মাঝেমধ্যেই তার গোড়াতে ঝাপটাঝাপটি চলে হাঁসেদের। সেইদিন ভোরবেলা দেখলাম বকের দল লাল শাপলার মেলে থাকা নরম তুলতুলে পাতার জলপিঠকে খেলার ময়দান বানিয়ে এক পিঠ থেকে আরেক পিঠে আনাগোনা খেলায় মেতে উঠেছে। সাথে কয়েকটা পানকৌড়িও এসে জুটেছে। বিচ্ছুদের দলের এক সদস্য নাকি রহিমকে ফেসাদে ফেলে দিয়েছে। পলাশের রংয়ের গ্লাস খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মাছেরা উৎসবে মেতেছে মাতাল হয়ে। ফুরফুরিয়ে হাঁসেদের দল পাখনার উপর ভর করে উড়ে উড়ে শারীরিক কসরত দেখাচ্ছে পুকুর রাজার ষোড়শী কন্যাকে। তার দোলাতে দুলতে শুরু করেছে শাপলার ফাঁকে লুকিয়ে থাকা ডাহুকের বাচ্চাটা। প্রতিচ্ছবিতে অতি পরিষ্কার হয়ে উঠেছে পশ্চিমপাড়ের কলাবনে ঝুলে থাকা লাল রঙের কলার থোড়। বিচ্ছুদের দল নতুন উদ্যমে উজ্জীবিত। কলার থোড় নাকি বসন্ত। মুহূর্তেই কাদাজলে লুকিয়ে আড়িপাতা শোল মাছটি নড়েচড়ে উঠল। জিজ্ঞেস করলাম, তুমি সবসময় কাদামাটিতে থাকো কেন? হেসে উত্তর দিল তোমরা যেমন সবসময় পালিয়ে বেড়াও, জানতে চাও, তেমনি আমরাও পালিয়ে না বেড়ানোর জন্যই মাটিতে হারিয়ে যাই। এতে কখনো কখনো আমাদের চোখেমুখে রাক্ষসের গ্রাস পড়ে, তারপরেও আমাদের সমস্ত সুখ সাম্রাজ্য এখানেই। অবশ্য তোমরা অস্বীকার না করলে তোমাদের শুরু এবং শেষও এই মাটিতেই। উত্তর পাড়ের উপর দিয়ে লাল ইটের তৈরি আমাদের বাড়ি পদার্পণের রাস্তা। ইটের ফাঁক খুঁজে সবুজ ঘাসেদের দল বেশ শক্ত অবস্থান করে নিয়েছে। উত্তর পশ্চিম দিক থেকে পশ্চিমের পাড়ের বেশিরভাগ অংশই সস্থান থেকে সরে গিয়ে জলের সাথে জড়াজড়ি সহাবস্থানে রয়েছে গত তিন বছর আগের বর্ষার পর থেকে। ঝিঁ ঝিঁ শব্দে কান ভরপুর করে তুলেছে উত্তর পশ্চিম কোণ জুড়ে দাঁড়িয়ে বিশালাকার দানবরূপী তেঁতুল গাছের গায়ে লেপ্টে থাকা নখের কোণা সমান শরীর অবয়বের ঝিঁঝিঁ পোকা। শুনেছি এই তেঁতুল গাছটাতে ভূত থাকে। এখনো মনে আছে ছেলেবেলায় তেঁতুল গাছটার আশেপাশে সন্ধ্যার পর একা যেতাম না। আর যেদিন একা পড়ে গেছি ভুলবশত সেদিন হয় একদম পূর্ব পাড়ে দাঁড়িয়ে মাকে চিৎকার করে ডাকতাম নয়তো গান গাইতে গাইতে দৌড়ে ছুটতাম। লোহা থাকলে নাকি ভূত তাদের ক্ষমতা দেখাতে পারে না। তাই ভূতের জোর কমানোর জন্য অসংখ্য লোহার পেরেক টুকে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন সময় গাছটার বুকপিঠে। যদিও গাছটার তাতে কোনো ধরনের আপত্তি কিংবা মতবাদ কোনটাই কখনো শুনতে চাওয়ার কথা কারো কাছে জানা যায় নি। বাড়ির পূর্ব পুরুষদের বসবাসও এই গাছতলাতেই। ছোট ছোট ঘর সবুজ শ্যাওলা জমে একাকার। এই ঘরগুলোর অবস্থান দিনে দিনে বেড়ে ইতিহাসের শক্ত শরীরী সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা স্থানটি শ্মশানঘাট নামেই চিনে এসেছি। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি আমাদের বাড়িতে কেউ মারা গেলে তাকে এই গাছটার তলাতেই বাড়ির অন্য প্রান্ত থেকে কাটা আম কাঠের শ্মশান সাজিয়ে হরি কীর্তনের সাথে মৃতের উত্তরবংশের মানুষ জীবগুলো কান্নার সুর মিলিয়ে আগুনে পুড়িয়ে দিতে।
কয়েক জ্ঞানীর মারফত জেনেছি মানুষের মৃত্যু হয় না, যা হয় তা দেহত্যাগ। অর্থাৎ দেহ থেকে আত্মা আলাদা হলে দেহটাকে পুড়িয়ে ফেলা হয় আর পোড়া দেহ ছাই হয়ে মাটির সাথে মিশে যায়। হয়তো সেই আত্মাগুলোর কেউ কেউ ওখানে ঘুরে বেড়াতে গিয়ে তাদের পরিচিত স্বজনদের ডাকে অতি আবেগ আপ্লুত হয়ে তাদের সাথে কথা বলতে চাওয়াতে ভয়ে তারা তাদের নিজেদের পূর্ব পুরুষদেরই ভূত বানিয়ে এই গাছটাতে আটকে রেখেছে। মায়ের মুখে শুনেছি বেলগাছের আগায় শিবঠাকুর থাকেন। তাই বেল গাছ যেখানে থাকে সেখানে ভূতেরা আক্রমণ করে পুষিয়ে উঠতে পারে না। তেঁতুল গাছটার ঠিক দশহাত পূর্বদিকে উত্তর পাড়েই একটা বেলগাছ। এই বেল গাছ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ভূত আক্রমণ করে আমার জেঠাতো বোনকে পাগল বানিয়ে দিয়েছিলো বুঝে উঠতে পারি নি। পরে তো দিদি আমাদের বাড়ির পিছনের পুকুরে ডুব দিয়ে এই শ্মশানের তেঁতুলগাছ তলাতেই জায়গা করে নিয়েছিলো। বাবার মুখে শুনেছি তেঁতুল গাছটার দশ-পনের হাত সামনের দিকে খেজুর গাছটার গোড়ায় দাদুকে শ্মশানে তোলা হয়েছিলো। পলাশপুকুরের নিরাপত্তারক্ষীর নাকের ডগায় মাছরাঙাটি শিকার ধরে বসে আছে ভাসমান পুঁটি ধরার আশে ওৎ পেতে। বিচ্ছুর দল তাকেই তাক করে ছুঁড়েছে ঢিল। আগাম বিপদ আঁচ করতে পেরে ফুড়ৎ গতিতে উড়ে গিয়ে দক্ষিণ পাড়ের মাটির দোতলা ঘরের কবুতরদের নালিশ জানালো মাছরাঙাটা। বাবুতররাশি সান্ত্বনা দিয়ে বললো ও বড় বিচ্ছুর দল। ওদের সাথে লাগতে যেওনা। দেখছো না? ওরা খেলতে আসলেই আমরা মাঠ ছেড়ে দিই। ওরা আমাদের মতো নয়, তাই আমাদের ইচ্ছা অনিচ্ছা চাওয়া পাওয়া নাগরিকত্ব এর কোনোটাই বুঝতে চায় না এরা। হয়তো একদিন ঠিকই বুঝবে আমাদের ততদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এ পাড়ের কাঁটাবনের ফাঁকে ফাঁকে আবার আম ঝুলে থাকে গরমের দিন আসলেই। বিচ্ছু বাহিনী তাদের ওপর বেশ আগ্রাসনী ভূমিকায় থাকে সেই সময়। কাঁটাবনের বুক চিরে ফুল ফুটেছে, কার্তিক পূজার সময় মাকে দেখেছি এই কাঁটাবনের ডগা আর গোড়ার কাঁটার অংশ পূজার পাতিলের উপকরণ বানাতে। এই কাঁটাবনে অবশ্য ডাহুকদের রাজত্ব। অসংখ্য বাচ্চা ডাহুক মাঝেমধ্যে তাদের মা বাপেদের সাথে বের হয়ে সারা পাড়জুড়ে হেঁটে বেড়াত। গুইসাপেরা আবার এই সময়গুলোতে মা বাবা ডাহুকদের একটা চিন্তার কারণ ছিলো। যদিও গুইসাপ ঝাপটি মেরে ধরার সময় মা বাবা নাকি বাচ্চা এটা তোয়াক্কা করতো না, তারপরেও মা বাবার কাছে সন্তানদের নিয়ে আলাদা চিন্তাটা ওদের মধ্যেও বিরাজমান দেখেছি। স্কুল জীবনে সাইকেল চালানো শিখতে গিয়ে একবার কাকাতো ভাই মিন্টু এই পুকুরেই পড়ে যায় সাইকেল নিয়ে। পশ্চিম পাড়ের দক্ষিণ দিকটায় শান বাঁধানো পাকা ঘাট। বড়শির আগায় কেঁচো গুঁজে দিলে তেলাপিয়া, পুটি, শিং, কই ধরা দিতো এই ঘাটে। ঘাটের ডানপাশের বাটার মধ্যে পড়ে গিয়ে একবার হাত কোমরের তেরটা বাজিয়েছিলাম স্কুল জীবনেই। প্রায় দেড় মাস ঝুলেছিলাম। বেশ কিছু বছর আগে চোখের সামনেই হুট করে অতিবৃষ্টিজনিত বানের জল এসে পুকুরের সমস্ত চরিত্রগুলোকেই ওলটপালট করে দিয়ে গিয়েছিল। তারপর তো সেই চরিত্রগুলো আবার তাদের স্বাভাবিক চরিত্রে ফিরতে বেশ সময় লেগেছে। সন্ধ্যা হয়ে এল। তেঁতুল গাছটা সকাল থেকে এই অব্দি ছায়া, বাতাস, আলোর উঁকি সবই দিয়েছে। হয়তো ভূত হয়ে, হয়তো বন্ধু হয়ে। ভূতটার গোড়াতে বসে লিখছিলাম এতক্ষণ। যেহেতু ভূত আমাকে এতক্ষণ সঙ্গ দিয়েছে সেহেতু ভূতকে আমি আমার বন্ধু হিসেবেই স্বীকার করে নিচ্ছি।

x