কী ভাবছেন বিশিষ্টজনরা

রতন বড়ুয়া

বৃহস্পতিবার , ১০ অক্টোবর, ২০১৯ at ৫:০৪ পূর্বাহ্ণ
36

বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডে সরকার দলীয় ছাত্র-সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠার পর ছাত্র রাজনীতি নিয়ে সারাদেশ জুড়ে নতুন করে শোরগোল উঠেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের একটি অংশ। অনেকেই বলছেন- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে যে রাজনীতির চর্চা চলছে, তা কোনভাবেই সুস্থ রাজনীতির চর্চা নয়। দলীয় লেজুঁড়বৃত্তি, পেশি শক্তির প্রদর্শন, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও কথিত নেতার হাতিয়ার হিসেবে নিজেদের ব্যবহারের অপর নামই বর্তমানের ছাত্র রাজনীতি।
যা সমাজ ও দেশের জন্য কখনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। তাই ছাত্র রাজনীতির নামে চলা এই অপরাজনীতি যত দ্রুত সম্ভব বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। তবে ভিন্নমতও পোষণ করেছেন কেউ কেউ। ছাত্র রাজনীতি বন্ধ না করে তা নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন অনেকে। অবশ্য, ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের বিপক্ষে অবস্থানের কথা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পক্ষের-বিপক্ষের এমন আলোচনা ও শোরগোলের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রামের বেশকয়জন বিশিষ্টজনের মুখোমুখি হয় দৈনিক আজাদী।

আদর্শভিত্তিক ও সংযত ছাত্র রাজনীতিই চাই
প্রফেসর ইসমাইল খান উপাচার্য,
চমেক বিশ্ববিদ্যালয়

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। আমাদের ভাষা ও স্বাধীনতা প্রাপ্তির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল আমাদের আদর্শভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি। জয় হয়েছিলো আমাদের কাঙ্ক্ষিকত বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের। ছাত্রসমাজের যৌথ জীবনের সাম্য আর অংশীদারিত্বের সাবলীলতা, শিক্ষা ও মননের বিকাশ এবং সমাজের কলুষতা দূর করতে ছাত্ররাজনীতি মূখ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম। সংঘবদ্ধ ছাত্ররাই পারে কুসংস্কার ও কুপ্রথার বিরুদ্ধে বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক চিন্তাভাবনা তৈরি করতে। আমাদের চাওয়া আদর্শভিত্তিক শুদ্ধ, সভ্য ও সংযত ছাত্র রাজনীতি। যা কল্যাণ বয়ে আনবে ছাত্রসমাজসহ সমগ্র জাতির। আমাদের পথ দেখাবে ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে।

ছাত্র রাজনীতি বন্ধের পক্ষে নই, তবে…
ড. রফিকুল আলম
উপাচার্য, চুয়েট

দেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেরা মেধাবীরা ভর্তি হয়। এমন সেরা মেধাবীদের মাধ্যমেই এগিয়ে যায় দেশ। এমন একটি প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের হত্যা-নির্যাতন একেবারেই কাম্য নয়। এ ধরনের ঘটনার মাধ্যমে অপরাধীরা দেশসেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মান ক্ষুন্ন করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে।
বুয়েটের ঘটনায় অপরাধীদের গ্রেফতার, শাস্তি প্রদানের উদ্যোগসহ সরকারের সার্বিক পদক্ষেপ দেখে আমরা আশাবাদী। এমতাবস্থায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে সকলকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে যেতে হবে। ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি। তবে সে রাজনীতি হবে ছাত্রদের কল্যাণের নিমিত্তে। বিশেষ করে, ক্যাম্পাসভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি হবে ছাত্রদের বিভিন্ন গঠনমূলক বিষয়, দাবি-দাওয়া নিয়ে। আমি ছাত্র রাজনীতি বন্ধের পক্ষে নই। তবে ছাত্র রাজনীতির নামে অপরাজনীতি চলতে পারে না। সুষ্ঠুধারার ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে এগিয়ে যেতে পারলে ভালো ফল আসবে বলে মনে করি।

শুধু ছাত্র রাজনীতি নয় শিক্ষকদের রাজনীতিও বন্ধ হওয়া উচিত
ড. জাহাঙ্গীর আলম
উপাচার্য, ইউএসটিসি

দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়) ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে ছাত্র সংসদ চালুর বিষয়টি ভাবতে হবে। আর ছাত্র সংসদ হবে আগেকার সময়ের মতো। যেটি হবে শিক্ষার্থীদের একটি ক্লাবের মতো। ছাত্র সংসদের সাথে জাতীয় ও দলীয় রাজনীতির কোন প্রকার সম্পৃক্ততা থাকবে না। এই ছাত্র সংসদের মাধ্যমেই কো-কারিকুলাম ও এক্সট্রা কারিকুলামে সংযুক্ত থাকবে শিক্ষার্থীরা। তবে শুধু ছাত্র রাজনীতিই নয়, একই সাথে শিক্ষকদের রাজনীতিও বন্ধ করতে হবে।
কারণ, শিক্ষকরা রাজনীতির সাথে সম্পৃত্ত থাকলে নিজেদের প্রয়োজনে শিক্ষকরাই ছাত্রদের নিয়ে দল পাকাবেন। শিক্ষকদের শিক্ষক সমিতি থাকে। এই সমিতিকেও শতভাগ রাজনীতিমুক্ত হতে হবে। শিক্ষকদের এমপি-মন্ত্রী ও নেতাদের দুয়ারে-দুয়ারে দৌঁড়ানো বন্ধ করতে হবে। সেটি করতে পারলে সমাজে তথা দেশে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আমার বিশ্বাস।

x