কী দিয়ে গেলো কিশোর আন্দোলন

বিশেষ প্রতিনিধি

মঙ্গলবার , ৭ আগস্ট, ২০১৮ at ৫:৩২ পূর্বাহ্ণ
385

১৯৪৭ থেকে ২০১৮ যতবারই এই দেশ, দেশের মানুষ পথ হারিয়েছে, ততবারই পথ দেখাতে এগিয়ে এসেছে ছাত্র সমাজ। জাগতিক পিছুটান আর স্বার্থের টানাপড়েন কোটি মানুষের হাতে যে অক্ষমতার শিকল পরিয়ে দিয়েছিল, তা টান মেরে ছিঁড়ে দিয়েছে আমাদের কিশোর প্রজন্ম। নানা সমস্যা জর্জরিত সমাজে যখন আমরা আশাহত হয়ে জীর্ণ শীর্ণ অবস্থায় মুখ থুবড়ে পড়েছিলাম তখনি আমাদের আবার আলোর পথ দেখালো তরুণ প্রজন্ম। তারা আবার আশা জাগিয়েছে আমাদের বুকে। বাঁচার শ্বাসটুকু যেন তারা আবার ফিরিয়ে দিয়েছে আমাদের। তারা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, ইচ্ছে থাকলে সবকিছুই সম্ভব। জঙ্গিবাদ, মাদক ও দারিদ্র্যতাসহ নানা সমস্যা কাটিয়ে যতই আমরা উন্নত বিশ্বের কাতারে উঠার চেষ্টা করছি, যানজট সমস্যা যেন আমাদের ততই পেছনে টেনে ধরছিল। যানজটের এই ভয়াবহতা যেন দিনদিন ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। সংশ্লিষ্টরা বারবার চট্টগ্রামসহ দেশব্যাপী এই যানজট নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। রাস্তার লেন বাড়িয়েছে, ট্রাফিক সিস্টেম আধুনিকায়ন করেছে, কিছু কিছু রোডে রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণ করেছে। এতসব কিছুর পরেও কোথায় যেন কিছু একটার ঘাটতি ছিল। যানজট কোনোভাবেই যেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছিল না। পাশাপাশি কমানো যাচ্ছিল না সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যাও। সরকার যতবারই পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করেছে, ততবারই নানামুখী চাপের কারণে পেছাতে বাধ্য হয়েছে।

সম্প্রতি ঢাকার শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় ‘নিরাপদ সড়কের দাবিতে’ আন্দোলনে নামে বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে তারা সড়কে চালকদের লাইসেন্স চেক করতে থাকে। তাদের চেকিং থেকে মন্ত্রী, আমলা, বিচারপতি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সাংবাদিক কেউ বাদ পড়েনি। এর মধ্যে যারা লাইসেন্স দেখাতে পারেন নি বা যাদের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশকে মামলা দিতে বাধ্য

করেছে। উল্টো পথে যাওয়া ভিআইপিদের গাড়ি আটকে সোজা পথে যেতে বাধ্য করেছে। এমনকি ট্রাফিক সার্জেন্টের লাইসেন্স না থাকায় নিজেই নিজের বিরুদ্ধে মামলা দিতে বাধ্য হয়েছে। তারা দেখিয়ে দিয়েছে, আইন সবার জন্য সমান। এছাড়া শহরের মানুষ সুশৃঙ্খল গাড়ি চলাচলের যে স্বপ্ন দেখত তা বাস্তবে দেখিয়ে দিয়েছে এই কিশোর আন্দোলন। তারা আমাদের দেখিয়েছে, উন্নত বিশ্বে সড়কে ইমার্জেন্সি লেন নামে যে একটা লেন থাকে সেটি বাংলাদেশেও রাখা সম্ভব।

ওরা হাতেনাতে প্রমাণ করে দিয়েছে যে, এদেশের সরকারি সংস্থা, নিয়ম নীতির নির্ধারক ও প্রয়োগকারীরাই পথে পথে নিয়ম না মানায় অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে আছে। তাদের বৈধ কাগজবিহীন বাহন ও চালক আইন অমান্য করার পাশাপাশি সরকারকে বঞ্চিত করেছে প্রাপ্য রাজস্ব থেকে। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের ফলেই সর্বোতভাবে পুনরুন্মোচিত যে, গোটা গণপরিবহন খাত আজ মালিক সমিতি ও শ্রমিক সমিতির মাফিয়া চক্রের চাঁদাবাজি আর অরাজকতার কাছে জিম্মি। এই খাতে প্রতিদিন লেনদেন হয় কোটি কোটি টাকার চাঁদা আর বখরার ভাগ। যার সামান্যতম পরিমাণও জোটে না সরকারি কোষাগারের ভাগে। আর এই অপকর্ম সংঘটিত করার হাতিয়ার হতে গিয়ে এক শ্রেণির পরিবহন শ্রমিক পেয়ে গেছে হত্যাধর্ষণের মতো অপরাধ অবলীলায় ঘটাবার বিকারহীন মানসিকতা ও দুঃসাহস।

চার দশকের ঘুণে ধরা এক জাতীয় সমস্যার রোগ নিরূপণ পর্বটি শিশুরা করে দিয়েছে। এবার এর নিরাময় করতে যে কাঠখড় আর সময় পোড়ানো লাগবে, তা খুব সামান্য নয়। বিষয়টা সব বুঝদার মানুষই উপলব্ধি করেন। এর সবটা সময় শিক্ষার্থীদের পথে থাকাটা আবশ্যক নয়। প্রক্রিয়ায় কোথাও সংকট বা সমস্যা উদ্ভূত হলে, তার সমাধানে উত্তর প্রজন্মকে আবার যদি আসতে হয়, সে সুযোগ জাতি তাদের করে দেবে নিশ্চিত। সেই আস্থা ও ভালোবাসা এই পাঁচ দিনে ওরা অর্জন করেছে।

একটা বিষয় স্পষ্ট যে সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিল পথে পথে নির্বিচারে মানুষ খুন, এবং গণ ধর্ষণের মতো ঘটনা যখন পরিবহন শ্রমিকরা দিনের পর দিন অবলীলায় ঘটিয়ে যাচ্ছিল। অথচ তাদের জবাবদিহিতার কোনো বালাই ছিল না, পরিবহন খাতের মালিক ও শ্রমিক সমিতি দুটির আশকারার দৌরাত্ম্যে।

সমস্যা যখন চিহ্নিত এবং সমাধানের নানান উপায় নিয়ে খসড়া প্রস্তাবিত, তখন অপেক্ষা শুধু সময়ের। বিশেষজ্ঞ মত সম্পৃক্ত করে সমাধানের পথ ও পন্থা সুবিন্যস্ত ভাবে নির্দিষ্ট করা এবং তার বাস্তবায়নের জন্য সে সময়টুকু দিতেই হবে। অতএব আপাতত অমূল্য অর্জনের সাফল্য মালা গলায় নিয়ে শিক্ষার্থীরা এবার ঘরে ফিরুক, নিজ নিজ শিক্ষাঙ্গনে ফিরুক এটাই সচেতন জনসমষ্টি এখন চাইছে। তাদের মিশন পারফেক্টলি একম্পলিশড্‌। হ্যাঁ, তাদের পর্বের করণীয়টুকু তারা নির্ভুল ও নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করেছে। এবার পালা রাষ্ট্রযন্ত্রের।

তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত গতকাল মন্ত্রিসভায় সড়ক নিরাপত্তা আইনের চূড়ান্ত খসড়া অনুমোদন পেয়েছে। এবার তা পাশ করে বাস্তবায়নের পালা।

x