কি টু ফ্রিডম

অরুন্ধতী ঝিলি

মঙ্গলবার , ৩১ জুলাই, ২০১৮ at ৭:৩০ পূর্বাহ্ণ
46

সংস্কৃতি বা ঐতিহ্য ধরে রাখা নিয়ে যতই প্রাণপাত করা হোক, সেগুলো

সময় আর প্রয়োজনকে ধারণ করতে না পারলে আপনাতেই ঝরে পড়ে। স্বাভাবিকভাবে একুশ এখানে টিকে গেল তার নিজস্ব শক্তিবলে।

একেক দেশের সংস্কৃতিতে ভিন্ন ভিন্ন বয়সকে প্রাপ্তবয়স্ক বলে নির্ধারণ করা হয় সম্ভবত। খুব বেশিদিন তো গড়ায়নি আমাদের এই বাংলাতেই আট দশ বছরের বাচ্চার বিয়ে দেয়া হত। নিশ্চয় ভাবত এই বয়সেই তারা পূর্ণ নারী বা পুরুষ হয়ে ওঠে! কতশত বছর ধরে বাচ্চারা এই ভাবনার বলি হয়ে এসেছে। শুনেছি জুডাইজমে ছেলেদের ১৩ বছর হলেই বলা হয় তোমরা পুরুষ, তোমরা এখন আদেশনামা বহন আর পালন করার উপযুক্ত! কিন্তু সাউথ আফ্রিকায় ২১ বছর বয়সকেই সামাজিক ভাবে এডাল্টহুড বলে মানা হয়। তাই একুশতম জন্মদিন এখানে মোটামুটি বিয়ের কাছাকাছিই একটা উদযাপনযোগ্য অনুষ্ঠান। সেটা পালনও করা হয় একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে। এটা জীবনের অন্য সকল জন্মদিনের মতো নয়। এই দিনটির আলাদা একটা সাংস্কৃতিক মূল্য রয়েছে। যদিও সারা পৃথিবীর মত সাউথ আফ্রিকান আইন অনুসারেও প্রাপ্তবয়স্ক হিসাবে ১৮ বছরই স্বীকৃত । ১৮ হলেই সে ভোট দিতে পারে, এলকোহল আর সিগারেট কেনার অনুমতি পায়, ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে পারে। সবরকম আইনি সিদ্ধান্ত নেবার জন্য নির্ধারিত বয়স ১৮। কিন্তু আইন এখানে সংস্কৃতিকে গিলে খেতে পারেনি। শহুরে এলাকায় সময়ের সাথে অনেক সামাজিক চর্চা হারিয়ে যায় সব দেশেই। এটাও একুশের জায়গায় তের বা নয় হলে নিশ্চয় টিকে থাকত না আজ অব্ধি। সংস্কৃতি বা ঐতিহ্য ধরে রাখা নিয়ে যতই প্রাণপাত করা হোক, সেগুলো সময় আর প্রয়োজনকে ধারণ করতে না পারলে আপনাতেই ঝরে পড়ে। স্বাভাবিকভাবে একুশ এখানে টিকে গেল তার নিজস্ব শক্তিবলে।

এই জন্মদিনটি পালন করা হয় মহা ধুমধামে। যাদের সামর্থ্য থাকে তারা নতুন গাড়ির চাবি হস্তান্তর করে বা মোটা অংকের টাকা দেয় । কেউ কেউ প্রফেশনাল শিল্পী নিয়ে আসে । তাদের দিয়ে নিজ বংশের নামের তালিকা পাঠ করায়। এইদিনে ২১ লেখা একটি চাবি সন্তানের হাতে তুলে দেয় বাবামা। বন্ধুরা মজারমজার স্মৃতিচারণ করে বক্তব্য রাখে। আত্মীয়রা প্রশংসাসূচক শুভেচ্ছায় ভাসিয়ে নেয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বাবামা। তাদের দীর্ঘ বক্তব্যে অতীতের স্মৃতিচারণের পাশাপাশি যেচাবিটি হস্তান্তর করতে যাচ্ছে তার সম্পর্কে বিসদ বলে নেয়দেখ, আমরা তোমাকে নিয়ে গর্বিত। সেকারণেই চাবিটা আজ তুমি পেতে যাচ্ছ। আমি তোমাকে এটা হস্তান্তর করছি তোমার জীবনের অসংখ্য দরজা খুলে জীবনকে বিকশিত করার অনুমোদন হিসেবে। তোমার চতুর্পাশে বিভিন্নমুখী দরজা, কোনোটা বিদ্যার কোনোটা জ্ঞানের কোনোটা সেবার কোনোটা মাদকের, ধ্বংসের বা মৃত্যুর। আজ থেকে তুমি নিজে সিদ্ধান্ত নেবে তোমার জীবন সম্পর্কিত সকলকিছুর। এই চাবি দিয়ে তুমি আলোর দরজা খুলবে নাকি অন্ধকারের। আমরা আশা করব তোমার সামনে ছড়ানো বিভিন্ন পথের মধ্যে সঠিক পথটিতেই তুমি যাত্রা শুরু করবে। আজ থেকে তুমি নিজের মতো নিজের দায়িত্বে এগিয়ে যাও আর যাত্রাপথে যেসব সুযোগ আছে তা কুড়িয়ে নিয়ে সমৃদ্ধ হও। এই চাবি তোমার জীবনের স্বাধীনতার প্রতীক, এটা এখন তোমার হস্তগত। এটা আমরা তোমাকে দিচ্ছি না তুমি নিজে অর্জন করে নিয়েছ। কিন্তু ভুলো না এর সাথে রয়েছে বিশাল দায়িত্বশীলতাও। আজ তুমি পূর্ণ নারী বা পুরুষ হয়ে উঠেছ, আমরা উদযাপন করছি তা। আশা করছি তুমি এর সুব্যবহার করে সঠিক দরজাগুলোই খুলবে যাতে পরবর্তী উদযাপনগুলো আমরা একসাথে করতে পারি।

তবে এই পার্টির একটা টুইস্ট আছে। এটা সকলের জন্য নয় কিছুতেই। সাউথ আফ্রিকা নানারকম সামাজিক সমস্যায় ভারাক্রান্ত। কিশোরকালীন গর্ভাবস্থা, মাদক অপব্যবহার, স্কুল থেকে ঝরে পরা এসব নিয়ে প্রায় পরিবারকে ভুগতে হয়। বাবামা এই বড় আয়োজন তাদের জন্যই করে যারা মূল শিক্ষাটা শেষ করেছে। যাদের কোন গর্ভপাত হয়নি এখনো বা বাচ্চা নেই। মাদক যাদের স্বাভাবিক জীবনপ্রবাহ পর্যুদস্ত করেনি। এটা ছোটদের উৎসাহিত করার জন্যও অনেকটা। তাদের এই বার্তাটা দেওয়া যে তুমি যদি ওয়েল বিহেভড হও নিজেকে মাদক আর আর্লি প্রেগনেন্সি থেকে মুক্ত রাখতে পার। আর শিক্ষাটা চালিয়ে যাও তাহলে এই পার্টি এই সবকিছু তোমার সময়ে তুমিও পাবে। সাউথ আফ্রিকান টিনএজারদের কাছে এই পার্টি স্বপ্নের মত। তারা জানে এটা সহজলভ্য নয়, চতুর্পাশে এতএত সহজ আর নকল মণিমানিক্যের চোরাবালি যে পিছলে যাওয়া পলকের ব্যাপার। কাজেই ধৈর্য্য আর সংযম দিয়ে এটা তাদের আয় করে নিতে হবে।

ছবির চাবিটি আমি চ্যারিটি শপ থেকে কিনেছি। আমার মেয়ের একুশতম জন্মদিনে ঠিক এরকম একটা পার্টির আয়োজন করে চাবিটি তুলে দেব ওর হাতে। সাউথ আফ্রিকায় থাকতে পারি বা না পারি, কি টু ফ্রিডম আর তার গল্পটা সাথে করে নিয়ে যাব।

x