কিশোর অভ্যুত্থান এবং…

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ৭ আগস্ট, ২০১৮ at ৬:০৭ পূর্বাহ্ণ
5

যুদ্ধজয়ী জাতি আমরা। একাত্তরে অনেক কিশোর যোদ্ধা অস্ত্র কাঁধে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে মৃত্যুর সাথে হাসতে হাসতে খেলা করেছি। মৃত্যুভয় অথবা পাকি ঘাতকের ভয়াল মারণাস্ত্র দেশপ্রেমের তেজ থামাতে পারেনি।

অভাবনীয় এক অভ্যুত্থান ঘটেছে দেশে! তিন সিটি কর্পোরেশনে আলোচিত নির্বাচনের পর পরই নিরাপদ সড়কের দাবিতে এক নয়া মাত্রার আন্দোলনের সুইচ অন করে দেশের অগুনতি কিশোর শিক্ষার্থী। এরা প্রায় সবাই স্কুলকলেজের সাধারণ ছাত্রছাত্রী। কোনোদিন রাস্তায় নেমে যানবাহন ও সড়ক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার মতো কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব তারা কাঁধে তুলে নেবে, অভ্যুত্থানের দুদিন আগেও কেউ তা কল্পনা করতে পারেননি। যুদ্ধজয়ী জাতি আমরা। একাত্তরে অনেক কিশোর যোদ্ধা অস্ত্র কাঁধে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে মৃত্যুর সাথে হাসতে হাসতে খেলা করেছি। মৃত্যুভয় অথবা পাকি ঘাতকের ভয়াল মারণাস্ত্র দেশপ্রেমের তেজ থামাতে পারেনি। অসম সাহসে যুদ্ধ করে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়েছি। মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী স্লোগান ’জয় বাংলা’ হুংকার দিয়ে শত্রুর বুকে ভয়ের কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছি। লড়তেলড়তে বুলেটবিদ্ধ হয়ে হাসতে হাসতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছি। সোনার কালিতে লেখা জাতীয় বীরত্বের এই ইতিহাস সবার জানা। ব্যাতিক্রম, মুক্তিযুদ্ধে সুদৃঢ় নেতৃত্বের ছায়া ছিল। সবার অন্তরে গোঁজা ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ছবি ও তাঁর মরণজয়ী বজ্রকণ্ঠ। কিন্তু এবারের কিশোর অভ্যুত্থানের কোনো সাংগঠনিক কাঠামো ছিল না। কোনো নেতৃত্ব ছিল না। রাজধানীর কুর্মিটোলা এলাকার শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের সামনে জাবালে নুর পরিবহনের দুটো বাস পরস্পরের সাথে রেষারেষির প্রতিযোগিতায় নেমে অপেক্ষমাণ একদল ছাত্রছাত্রীর উপর এক চালক বাস তুলে দেয়। ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় নয়, ছিল বাসস্ট্যান্ডে। এসময় আকস্মিক ঘাতক যন্ত্র দানবের অভাবনীয় হামলায় দু’শিক্ষার্থী ঘটনাস্থলেই নিহত এবং আহত হয় আরো নজন। নিহত আবদুল করিম রাজিব ও দিয়া নিম্নবিত্তের সন্তান। ঘাতক বাসটির ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতার ভিডিও ক্লিপ যারা দেখেছেন, দুঃস্বপ্নের এই স্মৃতি বারবার আপনার সুখের ঘুম কেড়ে নেবেই।

এর কদিন আগে চট্টগ্রামঢাকা রুটে হানিফ পরিবহনের একটি বাস একজন ভার্সিটি ছাত্রকে গজারিয়া খালে ছুঁড়ে ফেলে খুন করে। একের পর এক প্রিয় সহপাঠী হারানোর বেদনায় অবোধ শিক্ষার্থীরা যখন বেদনার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে, তখনই ঘটনার দিন রোববার বিকালে দাপুটে নৌপরিবহন মন্ত্রী ও পরিবহন শ্রমিক নেতা শাহজাহান খান দাঁত কেলানো হাসি সহযোগে সাংবাদিকদের কাছে হত্যাকান্ডের প্রতিক্রিয়ায় ভারতের একটি দুর্ঘটনার উদাহরণ টানেন। এই অমানবিক কেলানো হাসি ও প্রতিক্রিয়া কিশোর শিক্ষার্থীর জমে থাকা ক্রোধের বারুদে আগুন দেয়। প্রথমে রাজধানী ঢাকার রাজপথ দখলে নেয়, স্কুল কলেজের ইউনিফর্ম পরা কিশোর শিক্ষার্থীরা। ঝাঁকেঝাঁকে শিক্ষার্থী শিক্ষায়তনের বদলে অসংখ্য ব্যনারফেস্টুন নিয়ে রাজপথে নামে। শান্তিপূর্ণ এই কিশোর জাগরণ দুদিনের মধ্যে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম দিন বাধা দেয়া ও মারধরের চেষ্টা হলে তারা বেশকিছু গাড়ি ভাঙচুর ও জ্বালিয়ে দেয়। শুরুতেই নিরাপদ সড়কের দাবি বাস্তবায়নে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব তুলে নেয় তারা। গাড়ির লেইন ঠিক করে দেয়া, উল্টো পথের গাড়ি আটকে দেয়া, গাড়ি ও চালকের কাগজপত্র পরীক্ষা থেকে শুরু করে সড়ক শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে কোমলমতি কিশোরকিশোরীরা কদিনে যা করেছে (শনিবার বিকাল পর্যন্ত), এক কথায় জাতির ঘুমন্ত বিবেকে তা প্রচন্ড ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে দিয়েছে। সড়ক সেক্টরের অস্বাভাবিক নৈরাজ্য এরা রাস্তায় না নামলে কোনদিন জাতির সামনে এভাবে হয়তো উম্মোচিতই হতো না! কে জানতো মন্ত্রী, বিচারপতি, দুদকএর দায়িত্বশীল কর্তা, এমপি, পুলিশের গাড়ি চালকের লাইসেন্স নেই? গণপরিবহনের ৬০/৭০ শতাংশ চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। অর্ধেক গণ পরিবহনের নেই ফিটনেস? ১২/ ১৩ বছর বয়সী শিশুরা লাইসেন্স ছাড়া ৯০% টেম্পো, লেগুনা, রাইডার চালায়?

কিশোর শিক্ষার্থীর দেশব্যাপী এই অভূতপূর্ব অভ্যুত্থান না ঘটালে পরিবহন সেক্টরের ভয়ংকর বিশৃংখলা কখনো জানা হতোনা। নিরাপদ সড়ক দাবিতে তাদের ৯ দফা কর্মসূচির আংশিক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পূরণ করেছেন। বাকি দাবিও পূরণের দায় নিয়েছেন। সড়ক নিরাপত্তা ও ঘাতক চালকদের সর্বোচ্চ শাস্তিসহ পরিবহন আইন যুগোপযোগী করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। রোববার থেকে দেশব্যাপী ট্রাফিক সপ্তাহ পালনের পাশাপাশি লাইসেন্স ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন বাতিলের ঘোষণাও দিয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। ভিআইপিসহ সবার জন্য এই নির্দেশ বাস্তবায়নের কঠোর নির্দেশও এসেছে। সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি ঘোষণা করে তাদের ঘরে ফেরার আহবান জানিয়েছেন। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের নেতা ইলিয়াস কাঞ্চনও কিশোর জাগরণে সংহতি প্রকাশ করে তাদের ঘরে ফেরার অনুরোধ করেছেন। এই তালিকায় আছেন আরো অনেক বিশিষ্টজন। এটা সত্য, শিক্ষার্থীরা অসাধারণ শৃংখলার সাথে তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসংখ্য অশ্লীল ব্যানার, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড ছড়িয়ে দিয়েছে ঘোলাজলে মাছ শিকারী একটি অশুভ শক্তি। ফটোশপে বক্তব্য পাল্টে দিয়ে এরা কিশোর জাগরণকে সরকারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি করে সহজে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের কৌশল কাজে লাগাতে চায়। কোথাও কোথাও কিছু আন্দোলনকারী সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত যানবাহনের কাগজপত্র দেখার নামে অশোভন ব্যবহার ও অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসেছে। কদিনে অত্যন্ত সুশৃংখল ও দায়িত্বশীল যেআচরণ কিশোর জাগরণ কর্মীদের মাঝে দেখেছি, অভিযোগগুলো এর সাথে যায় না ! তবুও কিছু পরজীবী আগাছা ঢুকে পড়া অস্বাভাবিক নয়। তাছাড়া কিছু স্থানে অভ্যুত্থানকারীদের উপর হামলা ও ধাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এর কোনোটাই কাম্য নয়। বলপ্রয়োগ করে স্বতঃস্ফূর্ত গণজোয়ার থামাতে গেলে বড় কোনো অঘটন ঘটে যেতে পারে। সর্বোচ্চ সহিষ্ণুতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা জরুরি। সবচেয়ে ভাল হতো, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি ঘোষণা। কোটা সংস্কার আন্দোলনে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া কিশোর শিক্ষার্থীরা কিছুটা দ্বিধায়। এই দ্বিধা তাদের ঘর ও স্কুলকলেজে ফিরতে কাঁটা হয়ে আছে। আন্দোলন দীর্ঘায়িত হলে প্রতিপক্ষ শক্তি এর সহজ সুযোগ কাজে লাগাবেই। শেয কথা হচ্ছে, নিরাপদ সড়ক ও স্বাভাবিক মৃত্যুর দায় সরকারকে নিতেই হবে। কিশোর ছাত্রদের অভূতপূর্ব জাগরণ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে পথ দেখিয়েছে। বুঝিয়ে দিয়েছে, এতদিন আমরা কুম্ভকর্ণের ঘুম দিয়ে সব অনিয়মকে যায়েজ করার চেষ্টা করেছি। টুপিখোলা অভিনন্দন, আমাদের সৃষ্টিশীল,স্বচ্ছ নতুন প্রজন্মকে।

x