কিশোর অপরাধ: সামাজিক ব্যাধি

নাহিদা সুলতানা

শনিবার , ৩ আগস্ট, ২০১৯ at ৪:২৮ পূর্বাহ্ণ
28

চলমান সময়ে কিশোর অপরাধ আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ন্যূনতম পারিশ্রমিক কিংবা উচ্চাকাঙ্ক্ষার স্বপ্নে বিভোর কিশোরেরা প্রভাবশালী নেতা বা তথাকথিত বড় ভাই দ্বারা সহজেই অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদকদ্রব্য গ্রহণ ও বহন করা, এমনকি তারা হত্যাকাণ্ডের সাথেও সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে। খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে এটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি হিসেবে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশে সাধারণত ৭ থেকে ১৬ বছর বয়সীরা কিশোর-কিশোরী হিসেবে পরিগণিত হয়। এই কিশোরেরা যখন কোনো অপরাধমূলক কাজে সম্পৃক্ত হয় তখন তা কিশোর অপরাধ বলে বিবেচিত হয়। বিশেষত বয়ঃসন্ধির এই ক্ষণে কিশোরেরা অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয় সহজেই। কখনো কখনো এই অপরাধের মাত্রা এতটাই বেড়ে যায় যে তারা সমাজ বা দেশবিরোধী কাজে লিপ্ত হয় এবং ফলশ্রুতিতে আইনের অধীনে তাদের বিচার হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, “তের চৌদ্দ বছরের মতো এমন বালাই আর নেই।” এই বয়সে থাকে অদম্য আশা আর জীবন ও জগত সম্পর্কে জানার অতিকৌতূহল। আবার অনেক সময় প্রতিকূল পরিবেশের কারণে আশা ভঙ্গের বেদনায় হতাশার হাত ধরে নৈরাশ্যের আঁধারে হারিয়ে যায় তাদের বর্ণিল জীবন। ধীরে ধীরে কিশোরেরা অপরাধমূলক কার্মে সম্পৃক্ত হতে থাকে। এছাড়া বর্তমান অসংগঠিত সমাজ ব্যবস্থায় দ্রুত শিল্পায়ন ও নগরায়ণের নেতিবাচক ফলও কিশোর অপরাধ। পরিবার কাঠামোর দ্রুত পরিবর্তন, শহর ও বস্তির ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ, সমাজজীবনের বিদ্যমান নৈরাজ্য, অস্থিতিশীল পরিবেশ, অপসংস্কৃতির প্রভাব এসব কিশোর অপরাধের অন্যতম কারণ। কিশোর অপরাধ দ্রুত প্রতিরোধ করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে আমরা বিরাট বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবো। তাই এখুনি কিশোর অপরাধের কারণগুলো চিহ্নিত করে এই সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করতে হবে।
কিশোর অপরাধের লক্ষণ: সাধারণত বাহ্যিক আচরণের কিছু অসামঞ্জস্যতা দেখে অনেকাংশেই কিশোরদের অপরাধ প্রবণতা নির্ণয় করা যেতে পারে।১। সমাজবিরোধী চিন্তা ও ধ্বংসাত্মক কাজে জড়িয়ে পড়া। ২। আক্রমণাত্মক ও উচ্ছৃঙ্খল আচরণ। ৩। দুঃসাহসিক মনোভাব। ৪। পরিবার ও বিদ্যালয়ে অনমনীয় মনোভাব। ৫। বিষণ্নতা বা আবেগের অস্বাভাবিক প্রকাশ।
কিশোর অপরাধের কারণ: অপরাধ বিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীগণ কিশোর অপরাধের কিছু প্রধান কারণ নির্ণয় করেছেন।
১। জৈবিক কারণ: মনোবিজ্ঞানীদের মতে মানুষের দৈহিক গঠন ও বৈশিষ্ট্য অপরাধ প্রবণতার জন্য অনেকাংশে দায়ী। স্নায়ুতন্ত্রের অস্বাভাবিক গঠন হীনম্মন্যতাবোধ বা অস্বাভাবিক আচরণের সৃষ্টি করে। ফলে সে পরিবেশের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পারে না এবং অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে।
২। বংশগত কারণ: বংশের কেউ যদি অপরাধমূলক কাজ করে থাকে তবে জেনেটিকভাবে সেই প্রবণতা থাকতে পারে। তবে এক্ষেত্রে শুধু সম্ভাবনার কথা বলা যেতে পারে।
৩। মনোবৈজ্ঞানিক কারণ: অপরাধ মনোবিজ্ঞানী গডার্ড এ ধরনের অপরাধের জন্য মানসিক ত্রুটিকে দায়ী করেছেন। মানসিক কারণগুলো হলো-
ক) প্রত্যাখ্যাত শিশু বা কিশোর, খ) অতিরিক্ত আদর স্নেহ, গ) অতিশাসন, ঘ) পারিবারিক কলহ, ঙ) অভিভাবকের উচ্চাশা, চ) নিরাপত্তাহীনতা।
৪। পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক কারণ: অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশগত বা অর্থনৈতিক কারণে কিশোরেরা অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কারণগুলো হলো-
ক) দারিদ্র, খ) অস্বাস্থ্যকর গৃহ বা বিদ্যালয় পরিবেশ, গ) পারিপার্শ্বিক পরিবেশ।
৫। সামাজিক কারণ: সামাজিক অজ্ঞতা বা কুসংস্কার শিশু কিশোরের মনে অপরাধপ্রবণতার সৃষ্টি করে।
ক) পারিবারিক ভাঙন বা বিচ্ছেদ, খ) দাম্পত্য কলহ, গ) সামাজিকীকরণের অভাব, ঘ) চিত্তবিনোদনের অভাব, ঙ) বিদেশী সংস্কৃতির প্রভাব, চ) ত্রুটিপূর্ণ সামাজিক পরিবেশ।
অপরাধপ্রবণতা প্রতিহত করার উপায়: কিশোর অপরাধ মূলত বয়সজনিত সমস্যা। তবুও কোনো অপরাধ কখনো সুনজরে দেখা যায় না। এই অপরাধপ্রবণতা দু’টি উপায়ে প্রতিহত করা যেতে পারে। ক) প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, খ) প্রতিকার বা সংশোধনমূলক ব্যবস্থা।
কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ বা প্রতিকার করতে হলে –
ক) পিতা-মাতা বা অভিভাবককে সচেতন হতে হবে
খ) অসৎ সঙ্গ বা অসামাজিক আচরণ থেকে দূরে রাখা
গ) গৃহ ও বিদ্যালয়ের পরিবেশের মান ঠিক রাখা
ঘ) মৌলিক চাহিদা সুনিশ্চিত করা
ঙ) নৈতিক আদর্শের বিকাশ ঘটাতে হবে
চ) সহপাঠ্যক্রমিক কার্যের ব্যবস্থা করা
ছ) সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দূর করা
জ) আইনশৃঙ্খলা সম্পর্কে ধারণা দেয়া
ঝ) চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করা
ঞ) ধর্মীয় বিধিবিধান ও অনুশাসন প্রয়োগ করা
ট) সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোরদের সুশিক্ষার ব্যবস্থা করা।
যে সকল শিশু-কিশোর ইতিমধ্যে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে গেছে তাদেরকে সংশোধনের মাধ্যমে নিরাপদ জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে। তাদেরকে আইনের মাধ্যমে লঘু মানসিক বা শারীরিক শাস্তি প্রয়োগ করতে হবে যেন তারা পুনরায় অপরাধমূলক কাজে ফিরে না যায়। প্রয়োজনে তাদেরকে মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার মাধ্যমে সংশোধন করতে হবে। এছাড়া পারিবারিক বন্ধনকে অটুট রাখতে হবে। সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। অসৎ সঙ্গ থেকে নিরাপদে রাখতে হবে। অল্প বয়সে মাত্রাতিরিক্ত প্রযুক্তির ব্যবহার থেকে বিরত রাখতে হবে। বিচার বিবেচনা ছাড়া সকল আবদার পূরণ না করা। সুষ্ঠু আবেগীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে যত্নবান হতে হবে।

x