‘কিন্তুর কাঁটা’ ও চুড়িহাট্টা টু ময়ূরপঙ্খি

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ৫ মার্চ, ২০১৯ at ৬:৫৯ পূর্বাহ্ণ
25

পুরান ঢাকার চকবাজার চুড়িহাট্টার ভয়াল অগ্নিকান্ড ধর্মগ্রন্থের দোযকের অগ্নিস্রোতকে বাস্তবে টেনে এনেছে। মহান ২১ ফেব্রুয়ারির আগের রাতের অগ্নি ঢেউয়ের তীব্রতা চকবাজারের গলিগুলোতে যারা দেখেছেন, তারা ভয়াল বিভীষিকা কোনোভাবেই স্মৃতি থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারবেন না। চুড়িহাট্টাসহ আশপাশের সবগুলো ঘিনজি গলিতেই গড়ে তোলা হয়েছে কেমিক্যালের ছোটবড় অসংখ্য গুদাম। পুরানো ঘিনজি ভবনের বিভিন্ন তলায়-আন্ডারগ্রাউন্ডে বিশাল-বিশাল গোপন মজুদ!
মস্ত এলাকা জুড়ে আরো আছে অসংখ্য সুগন্ধির কারখানা। বডি স্প্রে, লোশন, জেল, এয়ার ফ্রেশনার, পারফিউম আরও কতো বাহারি প্রসাধনীর বোতল, ক্যান ভর্তি শিল্প! মাত্র কয়েক শ’ বর্গফুট আয়তনের গুদামে মজুদ করা হয়েছে বিভিন্ন কারখানার দাহ্য কাঁচামাল কেমিক্যাল জার, ড্রাম। আরো আছে হোটেল-রেস্তোরাঁয় রান্নার কাজে ব্যবহ্রত গ্যাস সিলিন্ডারসহ প্রচুর বিস্ফোরক। প্রাথমিক তথ্যে যতটুকু জানা গেছে, চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানসনের দোতলায় প্রথম বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে রাত সাড়ে দশটার পর। বিস্ফোরণ এতই শক্তিশালী যে, ভবনটির বাইরের দেয়াল উড়ে গিয়ে ৫০ ফুট দূরে ইট, সুড়কি বোমার স্‌্িলন্টারের মতো ছিটকে পড়ে। এলাকাবাসী ঘটনা আড়াল করতে গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের দাবি করে। তাদের বক্তব্য, বিস্ফোরিত সিলিন্ডারের কিছু অংশ উড়ে গিয়ে কাছে থাকা বৈদ্যুতিক ট্রান্সফর্মারে বিস্ফোরণ ঘটায়! কিন্তু এর সত্যতা বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞের প্রথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি।
ঘটনা যাই ঘটুক, চকবাজারসহ পুরানো ঢাকার ৩০/৪০ লাখ মানুষ বিস্ফোরককে কোল বালিশ বানিয়ে জীবন পার করছেন, এই ভয়ঙ্কর সত্য এখন স্পষ্ট। এটা লুকানোর কোনো উপায় নেই। ৯ বছর আগে নিমতলি অগ্নি ট্রাজেডিতেও ১২৪ জন নীরিহ মানুষ পুড়ে রোষ্ট হয়ে মর্মান্তিকভাবে মারা যান। পুরো দেশ এই মর্মন্তুদ ঘটনায় দুঃখে-শোকে প্রায় বোবা হয়ে যায়। দেশ বিদেশে প্রচুর তোলপাড় ওঠে। মিডিয়া সপ্তাহ ভর নিমতলি ট্রাজেডি ফলোআপ নিয়ে রোমহর্ষক অসংখ্য আইটেম করে। গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। এতে বিস্ফোরক কেমিক্যাল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে ফেলাসহ দেড় ডজন নিরাপত্তা সুপারিশ করা হয়। শুরুতে উদ্যোগও নেয়া হয়। কেরানীগঞ্জের নয়া কেমিক্যাল পল্লিতে স্থানান্তরের। কিন্তু বাধার দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় এলাকাবাসী। তারা বাড়ির ছোট ছোট খোপ কেমিক্যাল গুদাম হিসাবে প্রচুর টাকা রোজগার করে। ক্ষতি কাটানোর সহজ বিকল্প না থাকায় টাকা রোজগারের আত্মঘাতি পথ ছাড়েনি। সরকার বা প্রশাসনও চুপ মেরে যায়। সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। কিন্তু নিমতলি অগ্নি ট্রাজেডিতে যারা আপনজনের পোড়া লাশ বুকে নিয়েছেন, তারা কী এই বিভীষিকা ভুলেছেন? না কোনোদিন ভুলতে পারবেন? অসম্ভব! আজীবন তারা ট্রমায় ভুগবেন। কষ্টের ডেলা গলায় আটকে বাকি জীবন পার করবেন।
ভয়াল স্মৃতির ক্ষত আবার দগদগে করে দিল চুড়িহাট্টার ট্রাজেডি। ৭০ জনের বেশি তরতাজা মানুষ আগুনে পুড়ে বারবিকিউ হয়ে গেলেন! সম্পদ ক্ষতি না হয় বাদ! ভয়াল আগুনের ছোবলে কয়েকজন তো হাড়গোড়শুদ্ধ পুড়ে ছাই। হাড়ের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা ছাড়া লাশ সনাক্ত করাও যাচ্ছে না! ঘিন্‌জি অস্বাভাবিক ঘনবসতি। দমকল বাহিনীর গাড়ি ঢোকারও কোন সুযোগ নেই। তার উপর বিস্ফোরক গুদামের উপর লাখ লাখ মানুষের বাস! এটা তো পরমাণু অস্ত্র মজুদাগারের সাথে সহাবস্থান! সামান্য আঙুল পোড়া ক্ষতের কষ্ট যেখানে অসহ্য যন্ত্রণার, সেখানে আস্ত মানুষ পুড়ে রোষ্ট হয়ে যাওয়ার কষ্ট কল্পনা করাও যে অসম্ভব! কিন্তু ঘটছে তাই। আমরাই ঘটতে দিচ্ছি! বডি স্প্রে, লোশান বা এয়ার ফ্রেশনারের ক্যানগুলো কত ভয়াল বিস্ফোরক হতে পারে চুড়িহাট্টার ট্রাজেডি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। হায়রে জনপ্রিয় সুগন্ধি, বডি স্প্রে তোমরা কী এখন মানুষের পোড়া হড়গোড়ে সৌরভ মাখাবে! তাইতো করা উচিত!
অগ্নিদগ্ধ হয়ে যারা বেঁচে থাকবেন এবং যারা প্রিয়জনের পোড়া লাশ দাফন করছেন, তাদের সান্ব্তনা দেয়ার মতো কোনো ভাষা কী পৃথিবীতে আছে? নাই। কাজেই আর একদিনও সময়ক্ষেপ নয়, পুরানো ঢাকা তথা দেশকে ভয়াল বিস্ফোরক থেকে বাঁচাতে হবে যে কোনো মূল্যে। ভয়াল বিস্ফোরককে কোল বালিশ বানিয়ে কোনো মানবসতি সভ্য দেশে থাকতেই পারেনা!
চকবাজার ট্রাজেডির পর পরই ঘটল আরেকটি অনাকাঙ্‌ক্িষত ঘটনা। ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে দুবাইগামী বাংলাদেশ বিমানের নতুন সংযোজন সুপরিসর বোয়িং ৭৩৭-৮০০ মডেলের ময়ুরপঙ্খি নামের বিমানটি ছিনতাই প্রচেষ্টার শিকার হয়। মাত্র একজন রহস্যজনক ছিনতাইকারি দেড় শ’র বেশি যাত্রী ও ক্রূসহ বিমানটি কব্জা করে। বিমান ক্রূকে জিম্মি করার পর যাত্রীদেরও বিস্ফোরণ ঘটানোর ভীতির ভাইরাস ছড়িয়ে নিস্ক্রিয় থাকতে বাধ্য করে। তার হাতে পিস্তল ও বোমা ছিল বলা হলেও সে পটকা ফাটিয়ে ভয় দেখায় বলে জানানো হয়। পাইলট কৌশলে বিমানটি চট্টগ্রাম বিমান বন্দরে জরুরি অবতরণ করান। তারপরের ঘটনা সবার জানা। পুরো দেশের মানুষ মিডিয়ার কল্যাণে বিকাল পৌনে ছ থেকে সাড়ে নটা পর্যন্ত তিন ঘন্টার বেশি স্নায়ুছেড়া উত্তেজনার মাঝে সময় পার করেন। পাইলট বিমান অবতরণের পর পরই সবগুলো ইমার্জেন্সি দরজা খুলে যাত্রী ও ক্রূদের নিরাপদে নামিয়ে দেন। মাত্র একজন ক্রূ ছিনতাইকারীর কব্জায় থাকে। পরে সেনা,নৌ কমান্ডোদের অভিযানে ছিনতাইকারী গুলিবিদ্ধ হয়। শেষ হয় ছিনতাই নাটক। বলা হচ্ছে, ছিনতাইকারী শুধু প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলার দাবি ছাড়া বড় কোনো আব্দার করেনি। বিযয়টা এখনো রহস্যের চাদরে মোড়া। কী করে আন্তর্জাতিক টার্মিনােেলর কয়েক স্তরের কঠিন নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে সে পিস্তল নিয়ে বিমানে উঠল? অথবা বিমানে উঠার আগে কে তাকে পিস্তল সরবরাহ করল তা এখনো তদন্তাধীন। আবার বলা হচ্ছে, তার হাতে খেলনা পিস্তল ছিল। যদি তাই হয়, কমান্ডোদের আট মিনিটের অপারেশনে গোলাগুলি হয় কী করে? শুধু প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলার জন্য বিমান ছিনতাইর মতো এতবড় ঘটনা কেন ! ছিনতাইকারী পরে বিমানেই মারা যায়। প্রথমে নিজের নাম মাহাদি বললেও পরে পরিচয় জানা যায়। তার নাম পলাশ আহমেদ বাবা পিয়ার আহমদ, বাড়ি সোনারগাঁও। পুরো বিষয়টাই অস্বচ্ছ এখনো। বিমানে খেলনা পিস্তল কেন, কোন এ্যন্টিঙ বা ভিন্টেজ ছুরি, কাঁচি এমনকী লাইটারও নেয়া যায় না। প্রায় ভবঘুরে, মায়ে খেদানো, বাপে তাড়ানো জনৈক ঢাকাই নায়িকার ব্যর্থ স্বামী পলাশ পারলো কীভাবে! রহস্যটা দ্রুত ফর্সা করা উচিত। কারণ দেশ ও জাতির শত্রুরা এরমাঝে ঘটনা নিয়ে নানা রঙের গুজবের বেলুন ভাসিয়ে দিয়েছে।
এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনে ভোটের রাজনীতির উপর নাগরিক মনোভাব খুবই খারাপ সংকেত দিয়েছে। নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগে নির্লিপ্ত ভূমিকা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এর দায় শুধু নির্বাচন কমিশন নয়, ক্ষমতাসীন দলকেও নিতে হয়। গত ক’বছরের কিছু নির্বাচন বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর একটি ‘কিন্তু’র কাঁটা ফুটিয়ে দিয়েছে কমিশন, সরকারি দল দু’ তরফেই। কাঁটাটি তুলে নেয়ার দায়ও উভয় পক্ষকে নিতে হবে। না হলে এটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিষাক্ত ক্ষত তৈরি করতে পারে। আগামীতে মানুষের নেতিবাচক মনোভাব দূর করাও কঠিন হবে। এরমাঝে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় রাজনীতির উপর দীর্ঘ কালোছায়া পড়েছে। তাই সরকারকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর গণআস্থার ভিত পুনঃতৈরির কঠিন কাজটি করতেই হবে। না হলে সরকার বিশেষ করে জননেত্রী শেখ হাসিনার সকল অর্জন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ উন্নয়ন ও গণতন্ত্র দুটোই মানুষের জন্য। একটিকে ছাড় দিয়ে মানুষ অন্যটা পেতে চায় না।
epbl1999@gmail.com

- Advertistment -