কিংবদন্তি শিল্পী খন্দকার ফারুক আহমদ

আহসান রফিক

বৃহস্পতিবার , ১১ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ
37

খন্দকার ফারুক আহমদ সোনালী দিনের আধুনিক গানের এক বিস্ময়কর প্রতিভা। স্পষ্ট ও নির্ভুল উচ্চারণ ও সাবলীল পরিবেশনায় তিনি আজো এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত। প্রতিভাবান এই গায়ক জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪০ সালে বগুড়ায়। পুলিশ অফিসার পিতার চাকরির সুবাদে ঘুরেছেন দেশের বিভিন্ন এলাকায়। পড়াশুনা করেছেন বগুড়া জিলা স্কুল, রাঙামাটি জিলা স্কুল ও ঢাকার জগন্নাথ কলেজে। ছাত্রজীবনে ছিলেন তুখোড় স্পোর্টসম্যান। জগন্নাথ কলেজের এথলেটিক্স এ চ্যাম্পিয়নও হয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই গানের পাগল ছিলেন। আকাশবাণী কলকাতায় কান পেতে শুনতেন হেমন্ত, মান্নাদে ও শ্যামল মিত্রের গান। প্রিয় গায়ক মান্না দের গান শুনতে শুনতেই মনে গায়ক হওয়ার স্বপ্ন উঁকি দেয়। বগুড়ার ওস্তাদ আলাউদ্দিন সরকারের কাছে সঙ্গীতের হাতেখড়ি। পরবর্তীতে প্রখ্যাত ওস্তাদ মিথুন দের কাছেও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দীক্ষা নিয়েছেন। ১৯৬১ সালের ২রা জানুয়ারি ঢাকা রেডিওতে অডিশন দিয়ে পাস করেন। কাকতালীয়ভাবে আরেক কিংবদন্তী সৈয়দ আবদুল হাদীও একই দিনে রেডিওর অডিশনে পাস করেন। খন্দকার ফারুক আহমেদ ১৯৬৪তে টিভির জন্মলগ্ন থেকেই গান করেছেন। ১৯৬৬ সালে মিতা পরিচালিত চাওয়া পাওয়া ছবিতে ডঃ মোঃ মনিরুজ্জামানের লেখা ও সত্য সাহার সুরে ‘রিক্ত হাতে যারে ফিরায়ে দিলে ওগো বন্ধু’ গানটির মাধ্যমে তাঁর প্লেব্যাকের সূচনা।
প্রথম প্লেব্যাকেই খন্দকার ফারুক আহমেদ সঙ্গীতবোদ্ধাদের চমকে দেন। কোন গায়কের প্রথম প্লেব্যাকে যে এতটা একাগ্রতা ও যত্নের ছোঁয়া থাকতে পারে তা কেউ কল্পনা করতে পারেন নি। গানটি বাংলাদেশী সিনেমার বিরহের গান হিসেবে আজো এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত খন্দকার ফারুক আহমদ বরাবরই বেছে বেছে গান করেছেন। সিনেমার গানে সত্য সাহা ছাড়া কদাচিত অন্য কোন সুরকারের গান করেছেন। চাওয়া পাওয়া, নীল আকাশের নিচে, আবির্ভাব, দীপ নেভে নাই, চোরাবালি, সন্তান, সমাধান, কোথায় যেন দেখেছি, যৌতু্‌ক, অমর প্রেম, আলোর মিছিল, মালকা বানুসহ প্রায় ১৫০টি ছবিতে গান গেয়েছেন তিনি। সিরিয়াস প্রেজেন্টেশনের জন্য খন্দকার ফারুক আহমদকে বাছাই করা হত। চোরাবালি ছবিতে’ আর কত দূরে উড়ে যাবি ওরে আমার বলাকা মন’, সমাধান ছবিতে’ তোমাদের সভায় আমার এ গান হয়তো বেমানান হবে’ গানগুলো সিরিয়াস প্রেজেন্টেশনে শিল্পীর দক্ষতার প্রমাণ দেয়। কোথায় যেন দেখেছি ছবিতে তাঁর গাওয়া” রিকশাওয়ালা বলে কারে তুমি আজ ঘৃণা কর” গানটি আন্দোলনরত শ্রমজীবী মানুষের মনে ব্যাপক জোয়ার এনেছিল। এ গানটির জন্য মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী শিল্পী খন্দকার ফারুক আহমদকে পল্টন ময়দানে লক্ষাধিক মানুষের জনসভায় সোনার মেডেল পরিয়ে সম্মানিত করেন। রোমান্টিক গানেও রেখেছেন দক্ষতার স্বাক্ষর। আবির্ভাব ছবিতে ‘আমি নিজের মনে নিজেই যেন গোপনে ধরা পড়েছি’, সন্তান ছবিতে’ তোমারই রূপের এত যে আলো’, দীপ নেভে নাই ছবিতে’ আমার এ গান তুমি শুনবে জানি শুনবে হয়তো বা আজ নয় আর কোনদিন’ গানগুলো কোনদিনও ভুলে যাবার নয়। সবচে বেশী রোমাণ্টিক ডুয়েট গেয়েছেন সাবিনা ইয়াসমীনের সাথে। এ জুটির গাওয়া আবির্ভাব ছবির ‘কাছে এস যদি বল তবে দূরে কেন থাক ‘ছদ্মবেশী ছবিতে’ এই নীল নীল নিঃসীম নিরজনে’, স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা ছবির’ নীল নীল আহা কত নীল ‘পিঞ্জর ছবির’ তোমার এ উপহার আমি চিরদিন রেখে দেব’ সহ বহু গান আজো শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। ফেরদৌসী রহমানের সাথে তাঁর গাওয়া অমর প্রেম ছবির ‘আমি কার জন্য পথ চেয়ে রব আমার কি দায় পড়েছে’ ও শাহনাজ রহমতুল্লাহর সাথে এতটুকু আশা ছবির ‘শুধু একবার বলে যাও আমি যে তোমার কত প্রিয়’ গান দুটি জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে কালের সমস্ত সীমা অতিক্রম করেছে। ফোক সুরের গানেও তিনি সাবলীল ছিলেন। মালকা বানু ছবিতে তাঁর গাওয়াকে তুমিগো পুকুর ঘাটে সখী আহা কি দেখি তুমি মোরে কইরলা দিওয়ানা’ গানটি শুনে মুগ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধু নিজ হাতে তাঁকে পুরস্কৃত করেন। ১৯৭৪ সালে আলোর মিছিল ছবিতে ‘দিন বদলের দিন এসেছে কান পেতে ঐ শোন’ গানটি গেয়ে ১ম গায়ক হিসেবে বাচসাস পুরস্কার জিতে নেন খন্দকার ফারুক আহমেদ। তখনো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার চালু হয়নি। নায়করাজ রাজ্জাকের লিপে তিনি এতই সাবলীল ছিলেন যে স্টেজে গান গাইলে দর্শকরা তাঁকে প্রশ্ন করত- আপনি রাজ্জাকের গান গাইছেন কেন আপনার গান করেন। রেডিওতে তাঁর গাওয়া অজস্র গান ব্যাপক শ্রোতাপ্রিয়তা পায়। ফজলে খোদার লেখা’ বাসন্তী রঙ শাড়ি পড়ে কোন বধূয়া চলে যায়’ ও কাজী লতিফা হকের লেখা’ সেদিন তুমি কি যেন কি ভাবছিলে’ গান দুটো তদানীন্তন পাকিস্তানের উভয় অংশে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করে। ১৯৬৮ সালে জহীর রায়হান সম্পাদিত দ্যা এক্সপ্রেস পত্রিকার পাঠকদের ভোটে শ্রেষ্ঠ টিভি গায়ক নির্বাচিত হন খন্দকার ফারুক আহমেদ। ১৯৮০ সালে তাঁর গাওয়া ‘আমি যে পথিক দেখেছি’ গানটির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংস্থা শিল্পীকে ‘হাণ্টিং সিঙ্গার’ খেতাবে ভূষিত করে। ১৯৯৫ সালে আমেরিকাভিত্তিক সাহায্য সংস্থা কমিটমেণ্ট তাঁর ও সৈয়দ আবদুল হাদীর সঙ্গীত জীবনের ৩৫ বছর পূর্তীতে বিশেষ সংবর্ধনা প্রদান করে। তাঁকে ঋষিজ পদক দিয়েও সম্মানিত করা হয়। তিনি অজিত রায়, আবদুল জব্বার, মাহমুদুন্নবী, নীলুফার ইয়াসমীন, শাহনাজ রহমতুল্লাহ ও সাবিনা ইয়াসমীনের সাথে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত ও একুশে সঙ্গীতের কোরাসে কণ্ঠ দেন । ১৯৯৭ সালে ব্রেণ ষ্ট্রোকে আক্রান্ত হন শিল্পী। এরপর ক্রমান্বয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। অসুস্থ অবস্থায় ১৯৯৯ সালের ৩ ডিসেম্বর ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে ওস্তাদ বারীণ মজুমদারের সাহায্যার্থে সাবিনা ইয়াসমীনের সাথে জীবনের শেষ ফাংশানে অংশগ্রহণ করেন। ২০০১ সালের ১১ই জুলাই বাংলা গানের এ প্রথিতযশা গায়ক মৃত্যুবরণ করেন। শিল্পীর ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা তাঁকে গভীরভাবে স্মরণ করি ও তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।

x