কাল আজ কাল

কামরুল হাসান বাদল

বৃহস্পতিবার , ১৮ জুলাই, ২০১৯ at ৪:০৬ পূর্বাহ্ণ
28

“যত গর্জে তত বর্ষে না” একটি প্রাচীন প্রবাদ। দু:খজনক হলেও চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা দেখে সেই প্রবাদটিই বলতে হচ্ছে এখন। এই মেগা প্রকল্পটি নিয়ে যত কথা হয়েছে, যত আশার বাণী শুনতে হয়েছে গত কয়েকদিনের পরিস্থিতি দেখে এমন হতাশা প্রকাশ না করে উপায় নেই। যিনি এই মেঘা প্রকল্প গ্রহণ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী থেকে বরাদ্দ নিয়ে এসেছিলেন তিনি আমাদের অথৈ জলে নিক্ষেপ করে এখন দায়িত্বহীন ও নির্ভার জীবন কাটাচ্ছেন। কয়েকদিনের টানা বর্ষণে নগরীর যে হাল হয়েছে তা আর বর্ণনা করার অবকাশ রাখে না। অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এবারের অবস্থা আরও খারাপ। এবারের বর্ষায় যে এই পরিস্থিতি হবে তা অনেকে আশংকা করেছিলেন। এমনকি এই অধম কলামলেখকও তার বেশ কিছু লেখায় তেমন আশংকা প্রকাশ করে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টাও করেছেন।
গত বছরের জুনের ১৮ তারিখে এই কলামেই লিখেছিলাম “জলাবদ্ধতা; একটি ম্যাথ”। অর্থাৎ জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি সোজা অংকের কথা তুলেছিলাম। তাতে লিখেছিলাম মেগা প্রকল্পের কাজ কবে কীভাবে শুরু হবে জানি না। বর্ষার আগে আপাতত নালা ও খালগুলো আবর্জনামুক্ত করে তার ধারণক্ষমতা ফিরিয়ে আনুন আর রাস্তার পানি নালায়, নালার পানি খালে, খালে পানি নদীতে এবং নদীর পানি সাগরে যাওয়ার পথটুকু পরিস্কার করে দিন। এর মাঝখানের প্রতিবন্ধকতা যতদূর সম্ভব দূর করুন। আপাতত এটুকু করে দেখুন, জল কোথাও জমবে না। এরপরে খালে দু’পাশ দখলমুক্ত করে রাস্তা করবেন নাকি বাগান করবেন নাকি তাতে ভূস্বর্গ নির্মাণ করবেন তা পরে ভাবুন। নতুন খাল কাটবেন না কি আরেকটি কর্ণফুলী বানাবেন তা পরে চিন্তা করুন। আপাতত এই সহজ অংকটা সমাধা করুন, গণিত অলিম্পিয়াডের ভাবনা পরে ভাবা যাবে।
এখন কী হলো? সারা শহর জলে ভাসলো। এখন বলা হচ্ছে, ৩৬ খাল নয় পুরো নগর নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। পরিকল্পনা আর পরিকল্পনায় আমাদের জীবন পার হয়ে গেল তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন বোধ হয় দেখে যেতে পারব না।
পাঠকদের সবার জানা আছে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে প্রকল্পটি একনেকে পাশ করে তার জন্য প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। চট্টগ্রামের মানুষ ভেবে নিয়েছিল এবার তাদের দুঃখ-কষ্টের দিন শেষ হবে। তাদের আর পানিতে ডুবতে হবে না। আসুন সে প্রকল্পের বর্তমান কী অবস্থা তা একটু জেনে নিই।
৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্পটি ২০১৭ সালের আগস্টে একনেকে অনুমোদনের পর গত দুই বছরে বাস্তবিক অর্থে প্রকল্পের তেমন অগ্রগতি হয়নি বলে স্থানীয় একটি দৈনিকের প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করেছেন প্রকল্পটির পরিচালক ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মাঈনুদ্দিন। তিনি আগের মতোই আশ্বাস বাণী শুনিয়ে বলেন, এই বর্ষার পর আমরা পুরোদমে কাজ শুরু করব এবং আগামী বছরের বর্ষার আগে অবশ্যই নগরবাসী এর সুফল পাবে। এই প্রসঙ্গে পাঠকদের মনে করিয়ে দিই, এই প্রকল্পের মেয়াদ কিন্তু আগামী বছরের জুনেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। তিন বছর মেয়াদের প্রকল্পের কোনো কাজই হয়নি গত দুবছরে। তাহলে এই বর্ষার পর এবং জুনের আগে সম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করা কি সম্ভব?
সিডিএ এই প্রকল্পের অনুমোদন পেলেও মাঠ পর্যায়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন বিগ্রেড। এই বিগ্রেডের মহাপরিচালক তাদের ভূমিকা স্পষ্ট করতে গিয়ে বলেন, গত বছরের জুনে আমাদের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন হলেও আমরা কাজ শুরু করেছি গত অক্টোবর থেকে। এতে সময় কম পাওয়া, কর্মপরিকল্পনা ও ডিজাইন আমাদের হাতে না আমরা আসায় সে অনুযায়ী কাজ করতে পারিনি। তাহলে কি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়বে? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এই প্রকল্পটি রিভিউ হবে নিশ্চিত। ইতিমধ্যে আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে তা জানিয়ে দিয়েছি। ফলে আগামী বছরে শেষ হচ্ছে না প্রকল্পের মেয়াদ। রিভিউতে কী থাকবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এবার আর শুধু ৩৬ খাল নয়। পুরো নগরীর জলাবদ্ধতা নিয়ে একসাথে ডিজাইন করে কার্যক্রম শুরু হবে।
তাহলে সিডিএ যে প্রকল্পটি গ্রহণ করেছিল এবং তার জন্য অর্থ বরাদ্দও হলো তাতে লাভ কী হলো? প্রকল্পটি গ্রহণের আগে কেন এতসব ভাবা হলো না। তাড়াহুড়া করে কেন এত বড় প্রকল্প গ্রহণ ও তা একনেকে পাশ করা হলো? কেন পরিকল্পনা গ্রহণের পূর্বে সববিষয় মাথায় রাখা হলো না। কেন দূরদর্শি সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো না।
জলাবদ্ধতা নিরসনের সমস্যার কথা বলতে গিয়ে চট্টগ্রামের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনও বলেন, পুরো নগরীকে নিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা করতে হবে। তিনিও স্বীকার করেন যে, রাস্তা থেকে ড্রেন এবং বড় কিংবা ছোট নালা হয়ে খালের মাধ্যমে তা নদী বা সাগরে পতিত হওয়ার পুরো চ্যানেল ঠিক করে দিতে হবে। তিনি বলেন, এই চ্যানেল যতদিন করা যাবে না ততদিন জলাবদ্ধতা দূর হবে না।
মেয়র মহোদয়ও বলেছেন পুরো শহর নিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা করতে হবে। প্রশ্ন হলো সমন্বিত করার উদ্যোগ কে নেবেন? এবং সে সমন্বিত পরিকল্পনায় কোন কোন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকে রাখা হবে? এবং মূল পরিকল্পনাটি কীভাবে প্রণীত হবে। আমরা দেখতে পেলাম সিডিএ একটি প্রকল্প গ্রহণ করছে তার পাশাপাশি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম ওয়াসা ইত্যাদি সংস্থাও তাদের মতো করে প্রকল্প গ্রহণ করছে এবং তা অনুমোদনের জন্য সরকারের কাছে পেশ করছে। তখনও এ প্রশ্নটি উঠেছিল একটি নগরের প্রায় একই সমস্যা নিরসনে আলাদা আলাদা প্রকল্প কেন? একটি নগরের উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা আছে সেসব প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে এক ও অভিন্ন একটি পরিকল্পনা এত বছরেও কেন নেওয়া সম্ভব হলো না?
অনেক ঢাক-ঢোল পিটিয়ে প্রকল্প গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের কাজ করা হয় কিন্তু পরে দেখা যায় সিদ্ধান্ত বা পরিকল্পনাটি ঠিক ছিল না। যেমন আগ্রাবাদের শেখ মুজিব সড়কের বক্স কালভার্টটি। নির্মাণের সময় অনেকে আপত্তি তুলেছিলেন। সেসব আপত্তি অগ্রাহ্য করে বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হলো। এখন দেখা যাচ্ছে নিচে পানি চলাচলের পথটি ভরাট হয়ে গেছে এবং নির্মাণত্রুটির কারণে তা পরিষ্কারও করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের নদী-খাল-নানাগুলো দিয়ে পানি মাটি বা কাদা প্রবাহিত হবে এবং তাতে তা ভরাট হবে এ বাস্তবতা কেন পরিকল্পনা গ্রহণের সময় ভাবা হলো না? কিছুদিন আগে আমি মেয়র মহোদয়ের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, বক্স কালভার্টের ওপর অ্যালিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে নির্মিত হলে নিচে পানি চলাচলের কী হবে? তিনি বললেন, সেজন্য আমি নব নিযুক্ত চেয়ারম্যানকে (সিডিএ) অনুরোধ করেছি অ্যালিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে বারিক বিল্ডিংয়ের মোড় থেকে শুরু করতে। যতদূর জানি তাঁর অনুরোধ উপেক্ষা করে টাইগারপাস মোড় থেকেই অ্যালিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে নির্মিত হচ্ছে। বক্স কালভার্টের ফলে সংস্কারের অভাবে নিচে তো খালের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে গেছে এখন তার ওপর যখন বড় বড় পিলার নির্মিত হবে তখন কী অবস্থা হবে জানি না।
আসলে শহরের উন্নয়নের নামে প্রকৃতপক্ষে কী হচ্ছে তা বোঝা যাচ্ছে না। বর্ষার সাথে সাথেই মূল শহরের সঙ্গে বিমানবন্দরের যোগাযোগের একমাত্র সড়কটি প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ওই এলাকায় নানা সংস্থার নানা প্রকার কাজ চলছে। কয়েকদিন আগে টানা বর্ষণে এই সড়ক দিয়ে বিমানবন্দর যাওয়া-আসা প্রায় বন্ধই হয়ে পড়েছিল। একটি সিমেন্ট ফ্যাক্টরির একটি দেয়ালের কিছু অংশের কারণে সৃষ্ট এই ভয়াবহ অবস্থা চিহ্নিত করতে এবং সে দেয়াল ভেঙে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতেই চারদিন লেগে গেছে। এখনও ওই সড়কের অবস্থা এতই ভয়াবহ যে, তীব্র যানজটের কারণে রফতানি পণ্যবাহী ট্রাক বন্দরে ঢুকতে পারছে না। ফলে তীব্র সংকটে পতিত হয়েছে রফতানিকারক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে প্রচুর ক্ষতির সম্মুখীন হবে এসব প্রতিষ্ঠান।
বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বন্দরমুখী সড়কের ওপর চাপ বেড়েছে। বে-টার্মিনাল নির্মিত হলে বিশাল এলাকা বন্দরের কর্তৃত্বে চলে যাবে। টানেল চালু হলে ওই এলাকায় যানবাহনের চাপও বৃদ্ধি পাবে। এর মধ্যে বিমান বন্দরে যাওয়া-আসার লক্ষ্যে নির্মিত হতে যাচ্ছে অ্যালিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমান বিমানবন্দরে অবস্থান নিয়েই। এই বিমানবন্দর প্রশস্ত করার খুব বেশি সুবিধা নেই। এই বিমানবন্দর এমন এক স্থানে গড়ে তোলা হয়েছে যেখানে যাওয়ার জন্য শহরের সবচেয়ে ব্যস্ত সড়কটি ব্যবহার না করে উপায় নেই। একটি শহর অতিক্রম করে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাওয়ার নজির কোথাও নেই। তাছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এই বিমানবন্দর থাকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। অন্যদিকে মীরসরাইয়ে গড়ে উঠছে দেশের অন্যতম বৃহৎ বিশেষ শিল্পাঞ্চল। যেখানে কর্মযজ্ঞ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। কয়েক বছরের মধ্যে উৎপাদনে যাবে অনেক শিল্প কারখানা। তাকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলের গুরুত্ব অনেক বেড়ে যাবে। যোগাযোগ ব্যবস্থার অনেক আধুনিকায়নের প্রয়োজন হবে। সবকিছু বিবেচনা করে মীরসরাই হাটহাজারীর মধ্যবর্তী কোনো স্থানেই একটি বড় বিমানবন্দর গড়ে তোলা দরকার। আজ হোক-কাল হোক বর্তমান বিমানবন্দরটি ব্যবহারে অযোগ্য হয়ে পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে আমাদের দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সামনে আরও বাড়বে। ফলে বিমানবন্দরের মতো একটি স্থাপনা ওই জায়গায় বেশিদিন টিকিয়ে রাখা যাবে না। এইসব ভুলগুলো আমাদের পরিকল্পনাকারীদের অদূরদর্শিতার কারণে ঘটেছে। এখনো অনেক পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে সামনের ৫০/১০০ বছর পর কী হতে পারে তা না ভেবেই। যে কারণে জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রকল্পটিও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তার রিভিউ করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
চট্টগ্রামের একটি প্রচলিত কৌতুক বলে লেখাটি শেষ করব। এই গল্পটির সাথে বর্তমানের পরিস্থিতির কোনো মিল নেই। মিলে গেলে তা দৈবাৎ বলে মনে করতে হবে।
গল্পটি হচ্ছে চাচা ও ভাতিজা মিলে বিলে গেছে মাছ ধরতে। মাছ ধরা শেষে দুজনে বসেছে এবার মাছ ভাগ করতে। চাচা যেহেতু মুরুব্বি সেহেতু ভাগের দায়িত্ব নিলেন তিনি। চাচা একসাথে দুটো মাছ তোলেন, বলেন একটা আমার একটা তোর। এভাবে করতে করতে এক সময় ভাগ শেষ হলো। চাচা মুখে বললেন তুই কোনটা নিবি। ভাতিজা এতক্ষণ চুপ করে লক্ষ্য করেছে বড় মাছটি চাচা প্রতিবারই চাচার নিজের দিকের ভাগে রেখেছে। তার দিকের ভাগে রেখেছে ছোট মাছটি। ভাতিজা তুই কোন ভাগটা নিবি মুখে বললেও চাচা ভেবে নিয়েছে সহজ-সরল ভাতিজা তার সামনের ভাগটিই নেবে। কিন্তু না, চাচাকে অবাক করে দিয়ে ভাতিজা চাচার সামনের ভালো ভাগটি দেখিয়ে বললো, ওই ভাগ নেব চাচা। নিজের সব চেষ্টা বিফলে যাচ্ছে দেখে বিস্মিত চাচা দুহাতে মাছগুলো আবার একত্র করতে করতে বলতে লাগলেন ভাগও ন’হয়, টাগও ন’হয়। আবার ফইল্লেত্তন।
(ভাগও হয়নি-টাগও হয়নি আবার প্রথম থেকে)
Email- qhbadal@gmail.com

x