কাল আজ কাল

কামরুল হাসান বাদল

বৃহস্পতিবার , ১৬ মে, ২০১৯ at ৩:৩৯ পূর্বাহ্ণ
26

দলকে দুর্বল রেখে সরকার সবল হতে পারে না

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আছে সাড়ে দশ বছরের কাছাকাছি। এত দীর্ঘ সময় কোনো দলের সরকার ক্ষমতায় থাকেনি বাংলাদেশে। এতে আওয়ামী লীগের সাফল্যে আরও একটি পালক যুক্ত হয়েছে। টানা সাড়ে দশ বছরের শাসনামলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত সরকারের ক্ষমতা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে নিরঙ্কুশ হয়েছে, সুসংহত হয়েছে বলা যায়। কিন্তু এর পাশাপাশি দলের অবস্থা কীরূপ হয়েছে? দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকায় দল কি আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়েছে? সুসংহত হয়েছে? সুশৃঙ্খল হয়েছে? আওয়ামী লীগ তার অঙ্গ ও ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনের বর্তমান কার্যকলাপ দেখে তা বলা যাবে না। বরং দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকায় দলে এক প্রকার স্থবিরতা নেমে এসেছে। সুস্পষ্ট করে বললে বলতে হয় দল কার্যত দুর্বল হয়েছে। আমাকে এক আওয়ামী লীগ নেতা দুঃখ করে বলেছিলেন, “আমরা বিরোধী দলে থাকলে ভালো থাকি, সুশৃঙ্খল থাকি, সুসংগঠিত থাকি। পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগ ও আন্তরিকতা বেশি থাকে। ক্ষমতায় থাকলে গাছাড়া ভাব চলে আসে সবার মধ্যে।”
২০১২ সালের কোনো এক সময়। বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রে একটি অনুষ্ঠান রেকর্ডিং শেষে চট্টগ্রামের জেলা পর্যায়ের এক শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতার গাড়িতে ফিরছিলাম। পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি বেশ সমাদৃত। দলের জন্যেও তাঁর ত্যাগ কম নয়। ও সময় আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় আড়াই বছর অতিবাহিত হয়েছে। আড়াই বছরেও সুসমন্বিত উন্নয়নের পরিকল্পনা গৃহীত না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি দুঃখ করে বললেন, “শত চেষ্টা করেও গত আড়াই বছরে চট্টগ্রামের মন্ত্রী-এমপিদের সাথে দলের নেতাদের একত্রে চা খাওয়ার মতো একটা পরিবেশ বা ব্যবস্থা করা যায়নি। আমাদের নিজেদের মধ্যেই তো সমন্বয় নেই। ”
এই ক্ষোভ ও বাস্তবতাটিই এবার প্রকাশ্যে তুলে আনলেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেমউদ্দিন আহমদ। গত ১১ মে চট্টগ্রাম নগরের একটি কনভেনশন হলে আয়োজিত সাত জেলা আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “এমপিরা সংগঠনের কতটুকু দায়িত্ব পালন করছেন? তারা আদৌ সংগঠনকে মানছেন কিনা? তাদের কাছে তো সংগঠন ছোট। সংগঠনের নেতারা তো প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে পারেন না। কিন্তু এমপি-মন্ত্রীরা তো প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মিটিং করতে পারেন।” তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কথাটি বলেছেন, “উপজেলার সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এমপি সাহেরব হুকুমের ওপর নির্ভর করে। তাই যদি হয় তাহলে এমপিদের উপজেলার সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া উচিত।”
একই অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম নগর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দিনও ক্ষোভ প্রকাশ বলেছেন, অনেকে সংগঠনের পদে থেকেও দলে কোনো কর্মকাণ্ডে অংশ নেন না। অথচ তারা তাদের ব্যক্তিগত এবং ব্যবসায়িক কাজকর্ম ঠিকই করে থাকেন। দলে পদ ব্যবহার করে সকল সুযোগ-সুবিধা তারা নেন। কিন্তু দলের কর্মসূচিতে তাদের পাইনা।
মোছলেমউদ্দিন আহমদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, সরকার ও দলে মধ্যে একটি দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। মন্ত্রী এমপিরা সরকারের অংশ। তারা দলের সদস্য হলেও এমপি নির্বাচিত ও মন্ত্রী মনোনীত হওয়ায় এরা সরাসরি সরকারের অংশ হয়ে যান। এদের মধ্যে কেউ কেউ বহিরাগত আওয়ামী লীগার যাদের সঙ্গে তৃণমূলে নেতাকর্মীদের কোনো সংশ্রব নেই। কিন্তু না থাকলেও এমপি নির্বাচনের মনোনয়ন লাভ করার পরপরই দলের নির্দেশ থাকে তাদের পক্ষে নিঃশর্তভাবে কাজ করার। কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রতিবাদ হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেতাকর্মীরা দলে নির্দেশ মেনে নির্বাচনে কাজ করেন। নির্বাচনে বিজয়লাভের পর ওই এলাকায় সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হয়ে পড়েন এলাকার নির্বাচিত সংসদ সদস্য। দলে তিনি নবাগত। এবং সে সাথে গুরুত্বপূর্ণ কিছু না হলেও তার নির্বাচনী এলাকায় দলের রাজনীতি আবর্তিত হয় তাকে ঘিরেই।
দল যে সবসময় ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করে তেমনও নয়। বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নানা রকম অংক, কৌশল ও বাস্তবতার কারণে দলে পরীক্ষিত, ত্যাগী, যোগ্য নেতাদের না হলেও বিত্তশালী, প্রভাবশালী এবং প্রভাবশালী কোনো মহলের আশীর্বাদে কেউ কেউ মনোনয়ন লাভ করে থাকেন। রাজনীতিতে দিন দিন এই প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে দেখা যাচ্ছে জাতীয় সংসদের সদস্যদের মধ্যে এখন অরাজনৈতিক ব্যক্তিই বেশি। আওয়ামী লীগ চট্টগ্রামের জেলা পর্যায়ের এক গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রাক্তন এক ছাত্রলীগ নেতার চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে ডেকে বললেন, ‘ওর তো না কি টাকা-পয়সা নেই। ব্যবসা বাণিজ্যও কিছু নেই। ও দল চালাতে পারবে? উত্তরে আশরাফ সাহেব দলে সভাপতি শেখ হাসিনাকে বললেন,‘আপা, সাংসদ হিসেবে তো বিত্তশালী প্রভাবশালী আমলা ও অবসরপ্রাপ্তদের দিই, দলের নেতৃত্বটি এমন লোকের হাতেই থাক। নেত্রী শুনে বললেন, তোমার কথাই ঠিক। ওকেই দায়িত্ব দিয়ে দাও।”
গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বিজয়ী দল সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করলেও বাংলাদেশে তেমন সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। সরকার গঠনের পর দলের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব বাড়তে থাকে এবং তাতে দল দিন দিন দুর্বল হতে থাকে। সরকারি দলের কর্মসূচিতে স্থবিরতা নেমে আসে। স্থানীয়ভাবে দল তখন পরিচালিত হয় এমপি বা মন্ত্রীর আদেশ নির্দেশে। মন্ত্রী বা এমপির ওপর দলের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। দলে সকল কর্মকাণ্ডের স্থল হয়ে ওঠে মন্ত্রী এমপির বাড়ির বৈঠকখানা। আর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হন মন্ত্রী বা এমপির এপিএস। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার এমপি বিশেষ করে সরকার দলীয় এমপি হয়ে ওঠেন একজন একনায়ক। স্কুলের দারোয়ান থেকে থানার ওসির নিয়োগ-বদলি সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন তিনি। এলাকার সব ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব পড়ে তাঁর ওপর। ফলে অর্থনীতি থেকে রাজনীতি সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণের একক ক্ষমতার অধিকারী হন একজন সংসদ সদস্য বা এমপি। আর মন্ত্রী হলে তো তিনি এক কাঠি সরেশ। একজন এমপির দাপটের কাছে উপজেলা চেয়ারম্যানও নস্যি। কিছু কিছু আসনে ব্যতিক্রম হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে উপজেলা চেয়ারম্যানগণ সংসদ সদস্যের আজ্ঞাবহ হিসেবেই কাজ করতে বাধ্য হন। আওয়ামী লীগ থেকে শুরু করে তার অঙ্গ ও ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনগুলোও তার নির্দেশে এবং পছন্দের লোকদের দ্বারা পরিচালিত হয়। সুষ্ঠু স্বাভাবিক ও রাজনৈতিক ধারায় দল পরিচালিত হচ্ছে এমন নজির খুব বেশি নির্বাচনী এলাকায় নেই।
সংসদ সদস্যরা দলের শৃঙ্খলা মানেন না কেন? তারা দলকে কেন পাত্তা দেন না? তার কারণ হলো, অর্থবিত্ত এবং অবাধ ক্ষমতা তাদের এমন উদ্ধত হয়ে উঠতে প্ররোচনা দেয়। যার হাতে এত ক্ষমতা, যার হাতে থানা পুলিশ, যার হাত দিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয় তিনি কোন দুঃখে মলিন চেহারার দীনহীন নেতাদের মান্য গণ্য করবেন। ফলে অধিকাংশ নির্বাচনী এলাকায় দলের স্বতঃস্ফূর্ত ভাব এখন আর নেই।
কিন্তু সংসদ সদস্যগণ এত ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার কথা তো নয়। তারা তো আইন সভার সভ্য। তাদের প্রধান কাজই হলো সংসদে আইন পাশ করা। কিন্তু বাংলাদেশসহ বিশ্বের বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারত ও পাকিস্তানেও সংসদ সদস্যগণ অসীম ক্ষমতা ভোগ করে থাকেন। সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে সরকারের যাবতীয় উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়িত করার কারণে সংসদ সদস্যদের প্রচুর আর্থিক সংশ্লিষ্টতা ঘটে। এবং এত বিপুল পরিমাণ উন্নয়ন কাজ করার সুবাদে অনেকের আর্থিক অনিয়ম করার সুযোগও ঘটে থাকে।
আমি বছর দুয়েক আগে ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা গিয়েছিলাম। মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের নেতৃত্বে সে সময় সিপিএম রাজ্য পরিচালনার দায়িত্বে। একদিন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তার কার্যালয়ে সাক্ষাৎ হয় আমাদের। সন্ধ্যায় পার্টি অফিসের সামনে দেখলাম মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি। পরে সিপিএম রাজ্য শাখায় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলাপকালে জানতে পারলাম এটি মুখ্যমন্ত্রীর নিয়মিত কাজের একটি অংশ। প্রতিদিন সন্ধ্যার পরে তিনি পার্টি অফিসে আসেন। সেবার দেখলাম ত্রিপুরায় রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড বেশ সক্রিয়। কংগ্রেসসহ অন্যান্য দলের বিশাল বিশাল অফিস এবং তাতে নেতাকর্মীদের ভিড় দেখে অনুমান করলাম ভারতে রাজনৈতিক দলগুলো এখনো সুশৃঙ্খল। তাদের পার্টি অফিসগুলো দেখে বোঝা গেল ব্যক্তি নয় দলই সেখানে বড় এবং সেক্ষেত্রে পার্টি অফিসের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।
জিয়াউর রহমান পার্টি গঠন করেছিলেন কিন্তু তিনি পার্টি অফিসে যেতেন না। তাঁর স্ত্রী বেগম জিয়া কদাচিৎ পল্টনের পার্টি অফিসে আসতেন। ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি ও গুলশানে পার্টি চেয়ারম্যানের কার্যালয় থেকে তিনি দল পরিচালনা করতেন, যেখানে সাধারণ কর্মীদের যাতায়াতের সুযোগ ছিল না। এরশাদও দল গঠন করেছিলেন। রাষ্ট্রপতি ভবনই ছিল তার দলের কার্যালয়। সাধারণ্যে তিনি মিশতেন না। এর মধ্যেও সামান্য ব্যতিক্রম আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর কার্যালয় সব সময় নেতাকর্মীতে ঠাসা থাকতো। ক্ষমতায় থাকাকালীন খুব কম গেলেও বিরোধী দলে থাকাবস্থায় শেখ হাসিনা পার্টি অফিসে যেতেন। তাছাড়া তিনিও সুধা সদনেই বেশির ভাগ সময় থাকতেন। ঢাকা ছাড়া অন্যান্য জেলায় সব রাজনৈতিক দলের অফিস নেই। থাকলেও সেখানে নেতারা যান না। প্রভাবশালী নেতাদের বাড়ির বৈঠকখানাই পার্টি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। চট্টগ্রামে জাতীয় পার্টির মূল অফিস কোথায় তা কেউ জানে না।
বিএনপির অফিসে খোদ নেতারাও যান না। দারুল ফজল মার্কেটে মহানগর আওয়ামী লীগের অফিসের তালা নিয়মিত খোলা হয় কি না জানি না। আগে মহিউদ্দিন চৌধুরীর চশমা হিলের বাড়িতে, বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাবউদ্দিনের বাড়িতেই অধিকাংশ সভা অনুষ্ঠিত হয়। কোনো নেতার স্মরণসভাকে কেন্দ্র করে দারুল ফজল মার্কেটের অফিসটি মাঝেমধ্যে ব্যবহৃত হয়। কোনো আলোচনা সভা ছাড়া উত্তর ও দক্ষিণ জেলার অফিসে গুরুত্বপূর্ণ নেতারা যান না।
এর ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক অনুশীলন, পারস্পরিক মতবিনিময়, নেতৃত্ব গুণ গড়ে তোলার মতো বিষয়গুলো ঘটছে না। শুধু কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক দল কার্যালয়কেন্দ্রিক রাজনীতিচর্চা করে না।
এই বাস্তবতাটি এখন অনেক আওয়ামী লীগ নেতা অনুধাবন করছেন। খোদ প্রধানমন্ত্রীও এ বিষয়ে দলের নেতাদের পরামর্শ দিয়েছেন, সতর্কও করেছেন। দীর্ঘ স্থবিরতা কাটিয়ে আওয়ামী লীগ যদি দলকে চাঙা করতে চায় তাহলে তাদের তৃণমূলমুখী হতে হবে।
মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের দূরত্ব কমিয়ে আনতে হবে। দলকেই প্রথমে গুরুত্ব দিতে হবে। দলের সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্ব মানতে সবাইকে অভ্যস্ত হতে হবে। দল এবং স্থানীয় নেতৃত্বকে উপেক্ষা করার অভ্যাস ছাড়তে হবে মন্ত্রী-এমপিদের। সরকারের কাজ তারা করবেন। দলের কাজ নেতাদের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। দলকে দুর্বল রেখে সরকারকে সবল করা যাবে না। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ নেতাদের এই বিষয়টি বেশি বেশি বোঝা দরকার।
Email: qhbadal@gmail.com

x