কাল আজকাল

কামরুল হাসান বাদল

বৃহস্পতিবার , ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৬:৩২ পূর্বাহ্ণ
1997

একটি আত্মহত্যা এবং সাংবাদিকদের ভূমিকা
একজন সাংবাদিকের সামনে কেউ মারা গেলেও তিনি সরাসরি লিখতে পারেন না ব্যক্তিটি মারা গেছেন। তাঁকে কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি যেমন চিকিৎসক বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কারো উদ্ধৃতি দিয়ে বলতে হয় মারা গেছেন। একজন সাংবাদিক যখন একটি ‘নিউজ’ করেন তখন তিনি নির্মোহভাবে যা ঘটেছে তাই লিখবেন। সেখানে তিনি তার নিজের মতামত তুলে ধরতে পারেন না। একজন সাংবাদিক যখন একটি ‘রিপোর্ট’ করেন তখন তিনি পুরো ঘটনা তুলে ধরেন এবং সে সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি , বিশেষজ্ঞ ইত্যাদি ব্যক্তিদের মতামত তুলে ধরে একটি সারাংশ দাঁড় করান। কোনো বিষয়ে নিজের কথা বলতে হলে, বা নিজের মতামত তুলে ধরতে হলে সেক্ষেত্রে তাকে পত্রিকায় কলাম লিখেই তা প্রকাশ করা উচিত।
ডা. আকাশের আত্মহত্যার সংবাদটি প্রচার করতে গিয়ে দেশের কিছু পত্রিকা ও টিভি অনেকটা সে ধরনের কাজ করেছে। কোনো কোনো পত্রিকা সংবাদটি প্রচার করতে গিয়ে ডা. আকাশের ফেসবুক স্ট্যাটাসটিই হুবহু তুলে দিয়েছে। এটি ‘নিউজের’ সংজ্ঞায় পড়ে না। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কিছু কিছু ব্যক্তি এত অশ্লীল, অশোভন ও হিংসাত্মক প্রক্রিয়ায় বিষয়টি প্রচার করল তাতে ডা. মিতু নামের একজন মানুষের জীবন হয়ে পড়ে ভীষণ বিপদসংকুল। পুরো ঘটনা না জেনে অনেকে মিতু নামের নারীটিকে বেশ্যা, পতিতা, দুশ্চরিত্রা বানিয়ে দিল। মিতুর বিরুদ্ধে এতই ঘৃণা ছড়িয়ে দেওয়া হলো যে, তার জীবনই পড়ে গেল হুমকির মুখে। পরিস্থিতি এমন করে তোলা হলো যে, এই নারীকে কোথাও পেলে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো লোকের অভাব নেই বলে মনে হলো। কিন্তু তখন পর্যন্ত প্রমাণিত হয়নি যে, ডা. আকাশের আত্মহত্যার পেছনে আছেন বা আকাশের আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিয়েছেন তার স্ত্রী ডা. মিতু। আমরা গণমাধ্যমে শুধু আকাশের পোস্ট দেখলাম এবং তার পরিবারের বক্তব্যই শুনলাম। মিতু বা তার পরিবারের কিছু জানার সুযোগ পাইনি। আত্মহত্যার আগে ডা. আকাশ ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি তার আত্মহত্যার জন্য স্ত্রী ডা. মিতুর উচ্ছৃঙ্খল জীবন, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক ইত্যাদির কথা বলেন, তার এই অভিযোগের পক্ষে কিছু ছবি আপলোড করেন এবং সে সাথে একটি ভিডিও আপলোড করেন তিনি যেখানে ডা. মিতু কনফেস করছেন। তবে ভিডিওতে মিতুকে অত্যন্ত ভয়ার্ত দেখাচ্ছিল এবং দেখে মনে হচ্ছিল কেউ তাকে ভয় দেখিয়ে তার স্বীকারোক্তি আদায় করছে।
ডা. আকাশের আত্মহত্যার ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এমন একজন সম্ভাবনাময় যুবকের মৃত্যু মেনে নেওয়া অত্যন্ত কষ্টকর। আকাশ ও মিতুর এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আমাদের সমাজের অনেক চিত্র ভেসে উঠেছে। অনেক প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
আমরা যে যাই বলি, যে পরিস্থিতিতেই পড়ি তা থেকে উত্তরণের পথ কখনো আত্মহত্যা হতে পারে না। আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়।
পাশ্চাত্য সমাজ ব্যবস্থার সাথে আমাদের পার্থক্য হচ্ছে এই যে, তারা সবক্ষেত্রেই অনেক স্পষ্ট ও অকপট। আর অন্যদিকে আমরা প্রবঞ্চক, ঠক, মূল কথা হিপোক্রেট। আমরা মুখে বলি অনেক কিছু কিন্তু তা বিশ্বাস করি না। যা বিশ্বাস করি তা প্রকাশ করি না। পশ্চিমারা তাদের পছন্দ বা সম্পর্ক নিয়ে লুকোছাপা করে না, পরস্পরকে ঠকায় না বা প্রতারণা করে না। কিন্তু আমাদের দেশে তা সম্ভব হয় না। অনেকে তা সাহস করে বলে না। আকাশ যদি বিয়ের আগে মিতুর অন্য সম্পর্কের বিষয়ে জেনে গিয়ে থাকে তাহলে সেদিনই তার সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত ছিল। আকাশ লিখেছেন চট্টগ্রাম শহরে তাকে সবাই চেনেন ফলে তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেননি। বিয়ের পর, আকাশের ভাষায় মিতুর অনেক বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ছিল, সব জেনে শুনে আকাশ সে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করলেন কেন? তার হাতে তো স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার মতো অনেক প্রমাণ ছিল। যার ওপর ভিত্তি করে তিনি খুব সহজেই ডিভোর্সের মামলা করতে পারতেন। আত্মহত্যার চেয়ে ডিভোর্সটা অনেক ভালো হতো না দুপক্ষের জন্যই।
একটি নারীই একজন পুরুষের জীবনে শেষ সম্বল নয়। আকাশ ওই নারীর জন্য আত্মহত্যা করতে যাবে কেন? যে নারী, তার ভাষায়, তার প্রতি অনুরক্ত নয়, বিশ্বস্ত নয়! আত্মহত্যার সিদ্ধান্তের আগে সে একবারও কি ভাববে না-যে মা তাকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন যিনি স্বামীর অবর্তমানে অনেক পরিশ্রম করে ছেলেদের মানুষ করে তুলেছিলেন, শিক্ষিত করে তুলেছিলেন, সে মায়ের কী হবে? যে ভাইয়েরা আকাশের ওপর নির্ভর করতেন তাদের পরিণতি কী হবে?
মানুষের জীবনে অনেক সময় অনেক দুর্ভোগ আসে, বিপর্যয় আসে। হতাশায় ডোবে। সে সময় অনেকে আত্মহত্যার মতো নেতিবাচক চিন্তায়ও আচ্ছন্ন হয়। কিন্তু তারপরও তাদের সে সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হয়। জীবনের বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে জীবনযাপন করতে হয়। বেঁচে থাকতে হয়। জীবনযুদ্ধে বেঁচে থাকাটাই সার্থকতা, যা মৃত্যুতে নেই। মানুষ একটি সময়ে এসে শুধু নিজের জন্যই বাঁচে না। তাঁকে বাঁচতে হয় অন্যের জন্য। মায়ের জন্য, বাবার জন্য, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা এবং তার পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য। পাছে তার মৃত্যুটি একটি খারাপ ও নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে যাবে এই জন্যও মানুষ মৃত্যুকে উপেক্ষা করে বেঁচে থাকে। আত্মহত্যা করে জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়া পৌরুষের নয়, তা কাপুরুষের। জীবনের সত্যকে, নির্মমতাকে, নিষ্ঠুরতাকে মোকাবেলা করে বেঁচে থাকাটাই গৌরবের। তার কাছে হার মেনে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা অগৌরবের। গ্লানির।
সম্প্রতি আমাদের দেশে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী থেকে আকাশের মতো উচ্চ শিক্ষিত আধুনিক মানুষও আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। এটি সমাজের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। এক জীবনে মানুষ কতকিছুইতো করতে পারে। সে জীবন কেন অপচয় হবে সামান্য অভিমানে। জীবনতো অনেক বড়। মৃত্যুতো সমাপ্তি। এ বিশ্বের কত মানুষ কত দুঃখ নিয়ে, কত কষ্ট নিয়ে, কত অভাব নিয়ে, কত না পাওয়ার বেদনা নিয়ে, কত হতাশা নিয়ে, কত উপেক্ষা নিয়ে, কত অবহেলা নিয়ে দিব্যি বেঁচে আছে। আমরা নিজেকে নিঃশেষ করার আগে একবারও কি সে সব লোকদের কথা ভাববো না। জীবনের এত রূপ,রস, গল্প থেকে নিজেকে বঞ্চিত করার আগে একবারও কি ভাববো না জীবনতো একটাই, একবারের জন্যই। দ্বিতীয়বারতো জন্ম হবে না কখনো। দেখার, শোনার, বোঝার উপভোগ করার সুযোগতো হবে না কখনো।
আকাশদের আত্মহত্যার মতো ঘটনা সমাজে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করে। অনেকের চিন্তায় কিংবা মনোজগতে এর প্রভাব পড়তে পারে। এ ঘটনা অন্যদেরও প্ররোচিত করতে পারে, তাতে সংকট বাড়বে বৈ কমবে না। যেমন আকাশ যা করতে পারতো, আকাশ যদি মনে করতো মিতু বিশ্বস্ত নয়, কিংবা তার প্রতি মিতুর কোনো ভালোবাসা নেই, তাহলে সে বিচ্ছেদ করে ফেলতে পারতো। তাতেতো কোনো বাধা ছিল না। প্রতিটি মানুষের স্বাধীনতা আছে তার নিজের মতো চলার। যেটি আকাশেরও ছিল। মিতুরও ছিল।
দেশের অধিকাংশ পত্রিকা মিতু যে একজন চিকিৎসক তা লেখেনি। এটি অন্যায়। মিতু নিজেও একজন চিকিৎসক। তার পরিবারের সবাই থাকেন আমেরিকায়। মিতু সেখানে ডাক্তারি করার সনদ (ইউএসএমএলই) পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ওই পরীক্ষায় পাস না করলে আমেরিকায় চিকিৎসক হিসেবে স্বীকৃতি মেলে না। এবং মিতু আকাশকে আমেরিকায় নিয়ে যেতে সেখানে কাগজপত্রও জমা দিয়েছিল। সে প্রক্রিয়াও প্রায় চূড়ান্ত হয়ে এসেছিল। আকাশের খালাতো বোনের বিয়ে উপলক্ষে মিতু সপ্তাহখানেকের জন্য দেশে এসেছিল। মিতুর পরিবার থেকে অভিযোগ করা হয়েছে আকাশ যে রাতে আত্মহত্যা করে সেদিন সন্ধ্যায় মিতুকে মারধর করা হয়েছিল। এবং এক পর্যায়ে মধ্যরাতের পর মিতুর বাবাকে ডেকে এনে তার হাতে মিতুকে তুলে দেওয়া হয়। এই ঘটনা জানেন এমন অনেকের ধারণা মিতু চলে যাওয়ার পর আকাশ ভেবেছিল তার বিরুদ্ধে শিশু ও নারী নির্যাতন আদালতে মামলা করা হবে। তেমন আশংকায় আকাশ ভড়কে গিয়েছিল। ঘটনার সময়ে আকাশের ভাই সাগরের সাথে আমেরিকা প্রবাসী মিতুর ছোটবোনের ম্যাসেঞ্জার কনভারসেশনে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
আমাদের সমাজে একটি দুঃখজনক প্রবণতা হচ্ছে যে কোনোভাবে একটি নারীকে হেনস্থা করা। পরিস্থিতিটা এতটা ভয়াবহ যে, ধর্ষিত হলেও তার দায় চাপানোর চেষ্টা করা হয় ওই নারীটির ওপরই। ধর্ষণে প্ররোচিত করার জন্য নানাভাবে দায়ী করা হয় ধর্ষিত নারীটিকেই। এই ঘটনার পরেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তেমন অপপ্রচারই চলছে। একজন তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে মিতুর জিন্স পরা ছবির পাশাপাশি থানায় মাথায় ওড়না দেওয়া ছবি আপলোড করে লিখেছেন, মডেলদের মতো চলাফেরা করেন আবার থানায় ও আদালতে এলে মাথায় ওড়না দেন। একজন মানুষ তিনি কী কাপড় পরবেন তাও অন্য একজন ঠিক করে দেবেন? জিন্স পরলেই কি কেউ মডেল হয়ে যাবেন? আর মডেল হওয়াটা কি গর্হিত কোনো পেশা?
আসলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা পাল্টাতে হবে। পাল্টাতে পারলে এমন দুঃখজনক ঘটনার সংখ্যাও কমবে, আত্মহত্যার মতো দুঃখজনক ঘটনাও কমবে। আর ফেসবুক জুড়ে নারীর প্রতি অবিরাম ঘৃণার বহিঃপ্রকাশও কমবে।
সবকিছুর উর্ধ্বে আমাদের একটু মানবিক হয়ে উঠতে হবে। রায় দেবে আদালত। তা কোনো সাংবাদিক বা ফেসবুকারের কাজ নয়। একটি ঘটনা ঘটার পরে তার সবকিছু, সবদিক বিবেচনা করতে হবে। তদন্ত এবং বিচার প্রক্রিয়াকে বিভ্রান্ত করতে পারে এমন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকাই বিবেকবান মানুষের কাজ। উসকে দিয়ে ঘটনাকে জটিল করা উচিত নয়।
অধিকাংশ পুরুষ একজন নারীকে এখনও কেমন হীন দৃষ্টিতে দেখে তার একটি উজ্জ্বল প্রমাণ হয়ে রইল এই ঘটনাটি।
Email – qhbadal@gmail.com

x