কাল আজকাল

কামরুল হাসান বাদল

বৃহস্পতিবার , ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৫:৪৪ পূর্বাহ্ণ
20

দহনকাল-মানুষই যখন মানুষের প্রতিপক্ষ
১. কোনো প্রাণি যখন নিজেরা নিজেদের মধ্যে মারামারিতে লিপ্ত হয় তখন সে প্রাণি লয়প্রাপ্ত হয়, বা বিলুপ্ত হয়। যেমন ডাইনোসর। প্রাণির মধ্যে সবচেয়ে বৃহদাকার প্রাণি ডাইনোসর, এক সময় এই গ্রহে দাপিয়ে বেড়াত যে সে প্রাণিও বিলুপ্ত হয়েছে নিজেদের মধ্যে সংঘাত করে।
বিশ্ব পরিস্থিতি অবলোকন করে আমার কেবলই মনে হয়, আজ মানুষে মানুষে যেভাবে সংঘাতে জড়িয়েছে তাতে মানবজাতিরও বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অবশ্য এটি নতুন কিছু নয়। যুদ্ধবাজ দেশগুলোতে যে পরিমাণ পারমাণবিক সমরাস্ত্র মজুত আছে তাতে করে এই পৃথিবীকে অনেক অনেকবার ধ্বংস করা যাবে। মানুষ মারার জন্যে, মানুষকে ধ্বংস করার জন্যে যে পরিমাণ অর্থ প্রতিদিন যুদ্ধ-বিগ্রহ বোমাবাজি করে অপচয় করা হচ্ছে তার কিয়দংশ মানুষকে বাঁচানোর জন্য, বিশ্ব থেকে রোগ ব্যাধি-দারিদ্র্য ক্ষুধা দূর করার জন্য ব্যয় করা হলে দেশে দেশে কোটি কোটি মানুষ নিরন্ন, আশ্রয়হীন থাকতো না, কষ্ট পেতো না। মানুষ বড় কষ্টে আছে। প্রকৃত মানুষদের প্রতিদিনের ক্রন্দনের আওয়াজ, শোকের বিলাপ শুনছে না একদল মানুষরূপী দানব। ধর্মের নামে, জাতির নামে, নীতি ও দলের নামে, ক্ষমতা ও সাম্রাজ্য বিস্তারের নামে, হিংসা-ক্রোধ ও অহংয়ের নামে প্রতিদিন-প্রতিনিয়ত ওরা মানুষ হত্যা করছে। মানুষকে সর্বস্বান্ত করছে, মানুষকে অসহায় করছে, মানুষকে গৃহহীন, দেশহীন, রাষ্ট্রহীন করে তুলছে।
২. দু’বছর আগে ২০১৭ সালের অগাস্টের শেষ সপ্তাহে মিয়ানমার সরকার আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা শুরু করে। ব্যাপক সে সহিংসতায় মাতৃভূমি ছেড়ে, আরাকানে জন্মভিটা ছেড়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। উপায়ন্তর না দেখে বাংলাদেশ মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছিল। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে গিয়ে বাংলাদেশ সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক সংকট এবং পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। অধিক জনসংখ্যার বাংলাদেশে এই বাড়তি মানুষগুলো গোদের ওপর বিষফোঁড়া হিসেবে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ এদেরকে স্থায়ীভাবে থাকতে দিতে পারবে না শুধু নয়, আর বেশি সময় এই চাপ বহনও করতে পারবে না। ইতিমধ্যে মিয়ানমারের আচরণ স্পষ্ট করছে যে, তারাও সহজে এই রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে ফেরত নেবে না। কখনও যদি নেয়ও তারা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেবে না। পূর্ণ নিরাপত্তার দায়িত্বও নেবে না। এমনকি রোহিঙ্গারা যে মানুষ সম্ভবত সে স্বীকৃতিও তারা দেবে না। এখন রাষ্ট্রবিহীন এই মানুষগুলো সমুদ্রে ভেসে থাকা খড়কুটোর মতো একবার এদিকে আসবে ঢেউয়ে আরেকবার ওদিকে। মাঝখানে কিছু যুদ্ধবাজ মানুষের, আসলে মানুষের নয় দানবের হাতের পুতুল হয়ে নাচবে। হয়ত এই ভিটেমাটি ছাড়া মানুষগুলো দিয়েই অন্য কোনো একদল মানুষকে হত্যা-নির্যাতন এবং ভিটেমাটি ছাড়া করা হবে।
৩. আশ্রয় নেওয়া এবং পরে এখানে জন্ম নেওয়া সব মিলিয়ে বাংলাদেশ অবস্থানকারী রোহিঙ্গার সংখ্যা ২০ লাখের কম হবে না। যদিও এর প্রকৃত কোনো পরিসংখ্যান নেই। এই দুরবস্থার মধ্যে নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে আসামের নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদপড়া কয়েক লাখ মানুষ। সম্প্রতি ভারতের আসাম রাজ্যে চূড়ান্ত নাগরিকপঞ্জি প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে বাদ পড়েছে প্রায় ১৯ লাখ মানুষ। রাজ্যের অর্থমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা ভারতীয় গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আমরা বাংলাদেশকে বলব এনআরসি থেকে বাদপড়া ব্যক্তিদের সে দেশে ফিরিয়ে নিতে। তিনি বলেন, এনআরসি থেকে বাদপড়া ব্যক্তিদের ভারতে ভোট দিতে দেওয়া হবে না। এরই মধ্যে ক্ষমতাসীন বিজেপির প্রভাবশালী নেতা অমিত শাহ সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, শুধু আসাম নয় সারা ভারত থেকেই অবৈধ অভিবাসীদের তাড়িয়ে দেয়া হবে।
ভারতের কেন্দ্রে বর্তমানে সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি ক্ষমতায়। চরম হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলটি ক্ষমতায় আসার আগে ভারতকে রামরাজ্য বানানোর কথা বলে মূলত হিন্দু ভোটারদের মনোযোগ আকৃষ্ট করার কৌশল নেয়। তারা তাতে সফল হয়েছিল। রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে ভারতের সব রাজ্যে নাগরিকপঞ্জি তৈরির দাবি জানিয়েছিল তারাই। আসামের চূড়ান্ত নাগরিক তালিকা (এনআরসি) প্রকাশ হওয়ার পর এখন বেকায়দায় পড়েছে বিজেপি নিজেই। বিজেপি বলছে, এটি ভুলে ভরা নথি ছাড়া আর কিছু নয়। কারণ, হিন্দুস্থানে কোনো হিন্দু কখনো ‘বিদেশি’ হতে পারে না। বিজেপির এই মন্তব্য করার কারণ হলো, বাদ পড়া ১৯ লাখ নাগরিকের মধ্যে অধিকাংশই বাঙালি হিন্দু। উল্লেখ্য যে, নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ পড়াদের মধ্যে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির পরিবার এবং ভারতের হয়ে পাকিস্তানের বিপক্ষে যুদ্ধ করা সেনা কর্মকর্তাও আছেন। যদিও আদালতের সর্বোচ্চ ধাপে যাওয়ার মতো সুযোগ আছে সবার তারপরও আমরা শঙ্কিত এই ১৯ লাখ মানুষের জীবনে শেষ পর্যন্ত কী ঘটবে। তারা রাষ্ট্রবিহীন নাগরিকে পরিণত হবে কি না তা নিয়ে বিশ্বসংস্থা জাতিসংঘও উদ্বিগ্ন।
৪. মানুষ বাঁচতে চায়। একটু শান্তিতে থাকতে চায়। এ জন্য মানুষ অভিবাসন করে। এক দেশ হতে অন্যদেশে, এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে গমন করে। মানুষের অভিবাসনের ইতিহাস বেশ পুরনো। লক্ষ-লক্ষ বছর আগে থেকে মানুষ অভিবাসন করে আসছে। খরা, মহামারী, দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ বিগ্রহ-প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি থেকে বাঁচতে মানুষ অভিবাসন করতো। শুধু পায়ে হেঁটেই হাজার হাজার মাইল পথ পারি দিত। সে অভিবাসন এখনও থেমে থাকেনি। এখনো অনুন্নত দেশ থেকে ভালো থাকার আশায়, উন্নত ও নিরাপদ জীবনের আশায় মানুষ উন্নত কোনো দেশে অভিবাসিত হওয়ার চেষ্টা করে। উন্নত ও সমৃদ্ধ কোনো দেশের মানুষ অপেক্ষাকৃত কম উন্নত দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য কখনো আসে না। আসে তবে তা কোনো উদ্দেশে। এক সময় নিজেদের সাম্রাজ্যবিস্তার বা কলোনি সম্প্রসারণের জন্য বা কোনো মিশনের কাজে।
এখনো যুদ্ধ থেকে বাঁচতে যেমন সিরিয়া, লেবানন, ইরাক, ইয়েমেন, লিবিয়া থেকে প্রচুর মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যদেশে আশ্রয় নিয়েছে। নিজেদের ভিটেমাটি ত্যাগ করে শরণার্থীর জীবন বেছে নিয়েছে। তারপরও দেখা যায় মানুষ খুব সহজে বড় কোনো কারণ না ঘটলে নিজের ভিটেমাটি ত্যাগ করে অন্য দেশে সহজে যেতে চায় না। অল্প সংখ্যক যায় উন্নত জীবনের আশায় সইচ্ছায়, অধিকাংশকে বাধ্য করা হয় দেশ ছাড়তে, ভিটে ছাড়তে।
৫. এসব কিছু সংঘটিত হয় কখনো ধর্মের নামে কখনো ভাষা বা সংস্কৃতির নামে। কখনো উগ্র জাতীয়তাবাদের নামে। এই উপমহাদেশে দেশভাগের নামে মূলত ধর্মের কারণে কয়েক কোটি মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছিল কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয়েছিল ১৯৪৭ সালে। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের কারণে সে সময় অনেক অবস্থাপন্ন মানুষও রাতারাতি ভিখারিতে পরিণত হয়েছিলেন। স্থায়ী সমৃদ্ধ নিবাস ছেড়ে সড়ক, ফুটপাতে, রেল স্টেশনে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছিলেন। সে ইতিহাস বড় করুণ, নির্মম এবং মানবতার জন্য চরম অবমাননাকর। ৪৭ এর দেশভাগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বাংলা ও পাঞ্জাব প্রদেশে। কারণ দেশভাগের কোপাকুপিতে এই দুটি প্রদেশও ভাগ হয়ে গিয়েছিল। যে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পাক-ভারত ভাগ হলো সে সাম্প্রদায়িকতার হাত থেকে, অভিশাপ থেকে, পরস্পরের প্রতি ঘৃণা-অবিশ্বাস থেকে আমরা এখনো মুক্ত হতে পারছি না।
এখনো আমরা সেখানেই রয়ে গেলাম। ভারতকে হিন্দুদের রাষ্ট্র, পাকিস্তান বাংলাদেশকে মুসলমানের রাষ্ট্র বানানোর পথ থেকে আমরা এখনো পিছু হটিনি। এ কারণে এদেশে এখনো একজন সংখ্যালঘু নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, নিরাপদ ও উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষায় দেশ ছাড়ে। ভারতেও সংখ্যালঘু মুসলিম হওয়ার কারণে নিগৃহীত হতে হয়। ঠিক একই কারণে, একই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা গণহত্যার শিকার হয়।
৬. কিন্তু এভাবে মানুষের মুক্তি তো আসবে না। মানুষের কল্যাণতো হবে না। এভাবে তো মানবসভ্যতা টিকে থাকবে না। হিন্দুদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র, মুসলমানের জন্য আলাদা রাষ্ট্র, বৌদ্ধদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র, খ্রিস্টানদের জন্য, ইহুদিদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র এভাবে তো হতে পারে না। রাষ্ট্র হবে মানুষের জন্য। যেখানে সব মানুষেরই সমান অধিকার থাকবে। ধর্ম, ভাষা, বর্ণ, লিঙ্গ, সংস্কৃতি ইত্যাদির ভিত্তিতে বিভাজন করা যাবে না। রাষ্ট্র অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা, উদ্বাস্তু করে তোলা, শরণার্থী হিসেবে ঠেলে দেওয়া যাবে না।
কিন্তু হায়! এই দহনকালে মানুষ আজ বড় অসহায়। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও যুদ্ধের কারণে, সন্ত্রাসবাদের কারণে, উগ্রবাদ ও বর্ণবাদের কারণে নিগৃহীত হচ্ছে মানুষ। নিহত হচ্ছে মানুষ। উদ্বাস্তু ও ঠিকানাবিহীন হয়ে পড়ছে মানুষ।
এই বিপন্ন মানুষদের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। মানুষকে রক্ষা করতে হবে। এই অমানবিকতা, এই অনাচারে বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। মানুষের পক্ষে মানবতার সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করতে হবে। মানুষের পাশে মানুষ না দাঁড়ালে, মানুষের মধ্যে ঘৃণার বদলে ভালোবাসা জাগ্রত করতে না পারলে মানুষে মানুষে হানাহানি বন্ধ করা যাবে না।
পরস্পরের মধ্যে হানাহানির কারণে একদিন ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়েছিল। একই কারণে মানুষও বিলুপ্ত হতে পারে। মানুষের বাসযোগী একমাত্র গ্রহ পৃথিবী থেকে।
লেখক : কবি, সাংবাদিক, কলাম লেখক

x