কাল আজকাল

কামরুল হাসান বাদল

বৃহস্পতিবার , ১৮ এপ্রিল, ২০১৯ at ৬:৩৩ পূর্বাহ্ণ
48

নিদারুণ এক দহন কাল
১। কথাটি সম্ভবত হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন, ‘আপনি যখন একটি ভুল করেন তার মানে আপনি মানুষ, আর ভুল করার পর যদি অনুতপ্ত হন তখন আপনি ভালো মানুষ।’ হুবহু না হলেও তার কথার মমার্থটি এমনই।
মানুষ মাত্রই ভুল করবে, খুবই স্বাভাবিক। অপরাধও করবে এটাও স্বাভাবিক। যতক্ষণ পর্যন্ত একটি সমাজ বা রাষ্ট্রে একটি মানুষ ভুল করে, অপরাধ করে পরে লজ্জিত হয়, অনুতপ্ত হয় ততক্ষণ সে সমাজ বা রাষ্ট্রকে সভ্য বলা যাবে, মানুষের বাসযোগ্য বলা যাবে। আর যদি তার উল্টোটি ঘটে অর্থাৎ ভুল করে, অপরাধ করে লজ্জিত বা অনুতপ্ত হওয়ার পরিবর্তে সে ভুল ও অপরাধকে ‘জায়েজ’ করার চেষ্টা করে এবং এই জায়েজের কাজটি করার জন্য সমাজের অনেকে এগিয়ে আসে তখন ভাবতে হবে সে সমাজ বা রাষ্ট্র অসভ্য। সেটি মানুষের বাসযোগ্য নয়।
বিষয়টি আরও ভয়ানক, অমানবিক ও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে যখন সে ভুল, অপরাধ ও অপকর্মকে ঢাকা দিতে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রবণতাগুলো অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে। মানুষের সাধারণ বিবেকবোধও যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। প্রতিদিন এমন সংবাদ দেখতে দেখতে, পড়তে পড়তে, শুনতে শুনতে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এর থেকে পরিত্রাণের পথ কী তাও আমরা খুঁজে বের করতে পারছি না।
দিনদিন সমাজে অমানবিক আচরণের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নারী ও শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এই ধরনের নিষ্ঠুরতায়। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও ধর্ষণ, অনাচার,বলাৎকার ও নিষ্ঠুরতার ঘটনা ঘটছে। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুরা নিরাপদ নয়, শিক্ষার্থীরা নিরাপদ নয়। মাদ্রাসা, যেখানে দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া হয় সেখানেও শিক্ষার্থীরা নিরাপদ নয় এমনকি মসজিদ সেখানেও ঘটছে অপরাধ।
আমাদের আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়ে বিষোদগার করে এসেছে এক ধরনের মানুষ। তাদের ভাষায় সেখানে নির্লজ্জতা, বেহায়াপনার শিক্ষা দেওয়া হয়। সেখানে শিক্ষালাভ করে শিক্ষার্থীরা উচ্ছন্নে যাচ্ছে। কিন্তু এখন প্রকাশ হচ্ছে যারা দেশের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে দিনের পর দিন বিষোদগার করে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার্থীরা নিরাপদ নয় বরং তাদের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী নিগৃহীত হওয়ার ঘটনাই বেশি।
নৈতিক শিক্ষা যারা দেন বলে দাবি করেন, ধর্মীয় শিক্ষা দেন বলে যারা দাবি করেন তারাই যখন অনৈতিক কাজ করেন, অধর্মের কাজ করেন তখন ভাবতে হবে সমাজ ঠিক পথে নেই। রাষ্ট্র ঠিক পথে নেই। সে সমাজ ও রাষ্ট্রের মানুষ ঠিক নেই। নুসরাত প্রতিবাদ করেছিল বলে এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিবাদে অনড় ছিল বলেই ঘটনা এতদূর পর্যন্ত গড়িয়েছে। তাকে আগুনে পুড়ে এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করে প্রমাণ করতে হয়েছে যে তার ওপর অন্যায় হয়েছিল। নুসরাতের এই ঘটনায় মনে করার কোনো কারণ নেই যে, এমন পরিস্থিতির শিকার শুধু নুসরাতই হয়েছিল। এমন ঘটনা হাজার হাজার নুসরাতের জীবনে ঘটছে। তারা ভয়ে মুখ খোলে না, সংকোচে তা প্রকাশ করে না এবং এমন মৃত্যুঝুঁকি আছে বলে তা প্রকাশ করে না এবং ভবিষ্যতেও করবে না। এরমধ্যে দুয়েকজন নুসরাত জন্ম নেবে প্রতিবাদ করবে এবং সবশেষে জীবন দিয়ে বলে যাবে বাংলাদেশে কোথাও, ঘরে বাইরে মাদ্রাসা-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নুসরাতরা নিরাপদ নয়। আমাদের ঝলমলে জীবনকে, উন্নয়নকে, মাথাপিছু আয়কে, নারীর ক্ষমতায়নকে বিদ্রুপ করে যাবে।
দেশের মাদ্রাসাগুলোতে শিশুদের বলাৎকার হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। যারা এইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত, যারা পড়াশোনা করেছেন এবং যারা সামাজিকভাবে যুক্ত তারা সবাই স্বীকার করবেন এই ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। বছরে কতবার এই ধরনের বিষয় নিয়ে সালিশ-দরবার করতে হয়। কত মাওলানাকে চাকরি থেকে বিদায় করা হয়। এমন ঘটনা বছরের পর বছর চলে এসেছে। তবে আজকাল বেশি বেশি প্রচারের কারণ হচ্ছে সোশাল মিডিয়ায় তা প্রচার হয়ে যাওয়া। আগে ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হতো। ঘটনা প্রকাশ না হওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হতো এবং সাধারণ মানুষও ‘হুজুর’ বলে ঘটনাকে চাপা দিয়ে রাখতো।

সংবাদ মাধ্যমেও তা আসতো না। কারণ সংবাদপত্রের স্থানীয় প্রতিনিধিরাও এমন সংবাদ পরিবেশন করতে চাইতেন না কিংবা তারা ‘ম্যানেজ’ হয়ে সংবাদ পাঠাতেন না। এখন প্রায় প্রতিটি মানুষের হাতে মোবাইল এবং ইন্টারনেট সংযোগ ফলে খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে দেরি হয় না।
নুসরাতের মৃত্যুর পরও যে সে সুষ্ঠু বিচার পেতো তা কিন্তু নয়। কারণ সোনাগাজী থানার ওসির ভূমিকা পর্যবেক্ষণ করে মনে হয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই হত্যাকান্ডের তদন্ত ও বিচার নিয়ে কঠোর না হলে নুসরাতের হত্যাকান্ডটিকে আত্মহত্যা বলে বা অন্য খাতে প্রবাহিত করা হতো।
নুসরাত অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে প্রথম যেদিন থানায় যায় সেদিনের একটি ভিডিও ফুটেজ ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। নুসরাতের বক্তব্য মোবাইলে ধারণ করে তা ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়েছেন সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন নিজেই। ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে নুসরাত দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদতে কাঁদতে তার অভিযোগ জানাচ্ছিল আর ওসি সাহেব বারবার মুখ থেকে হাত সরাতে বলে এক পর্যায়ে বললেন, “সেটা তেমন কোনো বিষয় নয়।” এই ভিডিও দেখে প্রশ্ন উঠেছে একজন অভিযোগকারী এবং তিনি যদি নারী হয়ে থাকেন তাকে দিয়ে এভাবে কথা বলানো এবং তা ভিডিও করে ভাইরাল করা কতটা শোভনীয় ও আইনসম্মত। অবশ্য একজন আইনজীবী এ নিয়ে ওসির বিরুদ্ধে আইসিটি অ্যাক্টে মামলা করেছেন।
এই ঘটনায় সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার (ওসি) যে পক্ষপাতমূলক আচরণ করেছেন এবং তিনি কর্তব্যপালনে ব্যর্থ হয়েছেন তা ইতিমধ্যে আলোচিত হয়েছে। ফলে তাকে প্রত্যাহার করে আর্মড পুলিশ ব্যাটেলিয়নে বদলি করা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত যে তার কোনরূপ বিচার হবে, শাস্তি হবে কিংবা কাজের জন্যে নিন্দনীয় হতে হবে তা মনে হচ্ছে না কারণ এরই মধ্যে জেলার পুলিশ সুপার ওসির দোষ পাশ কাটিয়ে নুসরাতের পরিবারকে দোষারোপ করে পুলিশ সদরদপ্তরে একটি চিঠি দিয়েছেন। আমরা জানি পুলিশের সহযোগিতা ছাড়া ন্যায় বিচার পাওয়া কখনো সম্ভব নয়। সময়ের সাথে সাথে নুসরাতের ঘটনাটি চাপা পড়ে যাবে। ঘটনাবহুল বাংলাদেশে আরেক নুসরাতের ঘটনা আমাদের সবার দৃষ্টি অন্যত্র ফিরিয়ে নেবে। মিডিয়া ছুটবে অন্য খবরের পেছনে। আর এই ফাঁকে মামলার চার্জশিট প্রদান করবে পুলিশ। সেখানে তারা মামলাটিকে কোন খাতে প্রবাহিত করবে তা দেখার, পর্যবেক্ষণ করার কেউ থাকবে না। যেমনটি বাংলাদেশের অধিকাংশ মামলার ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। কাজেই কোনো একদিন হয়ত শুনব, দেখব অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা তার দলবল নিয়ে বেকসুর খালাস পেয়ে গেছেন কোনো বা কোনো উসিলায়।
২। এই ঘটনা অনেক চিন্তার উদ্রেক করেছে। যেমন এমন একটি নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের পরও সেই অধ্যক্ষের পক্ষে স্থানীয়ভাবে মিছিল হয়েছে এবং সে মিছিলে অনেক নারী অংশ নিয়েছে। নুসরাতকে আগুনে পোড়াতে যে স্কোয়াড গঠন করা হয় সেখানেও ছিল নারী যারা নুসরাতকে ছাদে ডেকে নিতে, বোরকা সরবরাহ করতে, হাত বাঁধতে এবং কেরোসিন ঢালতে সহযোগিতা করেছে। যে মেয়েটি নুসরাতকে ছাদে ডেকে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে মারার অভিযানে অংশ নিয়েছে সে মেয়েটি ফিরে এসে স্বাভাবিকভাবে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। এই ঘটনায় খুনীরা এতটা বেপরোয়া ও নিষ্ঠুর ছিল যে, পরীক্ষার সময়ে স্কুল ভবনেই একটি মানুষকে পুড়িয়ে মারতে দ্বিধাবোধ করেনি, শংকাবোধ করেনি। শুধুমাত্র সুবিচার প্রত্যাশার কারণে কারো ওপর এমন নৃশংস হামলা হতে পারে তা ভাবতেও শংকিত হয়ে পড়ি। এই হত্যাকাণ্ডে তিনজন পুরুষও অংশ নিয়েছে যারা বোরকা ও নেকাব পরিহিত ছিল। এমনকি তাদের হাতে দস্তানাও ছিল। ফলে নুসরাতের পক্ষে তাদের চেনা সম্ভব হয়নি।
এই জায়গাটিতে আমাদের ভাববার বিষয় আছে। বর্তমানে অনেকে বোরকা পরেন, হিজাব পরেন। এটি তারা ধর্মীয় মূল্যবোধের অংশ বলে মনে করেন। তাতে কোনো সমস্যা নেই। কে কী পোশাক পরবেন তা আমরা নির্দিষ্ট করে দিতে পারি না। এ বিষয়ে তার স্বাধীনতা আছে। তবে শুধু চোখ ছাড়া বাকি সব ঢেকে রাখা কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। ইসলামে পর্দাপ্রথার কথা বলা হয়েছে। তবে চোখ ছাড়া সব কিছু ঢেকে রাখতে হবে সে কথা কোথাও বলা হয়নি।
এটা অধুনা সালাফি মতবাদীরা চালু করেছে যারা প্রচন্ডভাবে জঙ্গিবাদে বিশ্বাসী। এমনকি সৌদি আরব সেখানেও চোখ ছাড়া বাকি মুখ ঢেকে রাখার নিয়ম নেই। নিরাপত্তার স্বার্থেও অনেক দেশ এটাকে অনুমোদন করে না।
৩। অন্য এক বিপদের মধ্যেও আছি। এসব অনিয়ম নিয়ে বলতে গেলে, লিখতে গেলে একশ্রেণির মানুষ তা ইসলাম বিরোধী মনোভাব বলে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে উসকে দিতে চেষ্টা করে। এরা আমাদের আশেপাশে থাকে। এরা বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশ নেয় অন্য নারীদের সঙ্গে ছবি তুলে তা ফেসবুকে পোস্টও করে কিন্তু অন্তরে এরা জঙ্গিবাদকেই লালন করে।
নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রায় মুখোশ পরিধান নিষিদ্ধ করে ঘোষণা দেয় পুলিশ প্রশাসন। এ নিয়ে একজন ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে প্রশ্ন তোলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে যদি মুখোশ নিষিদ্ধ হয় তাহলে সেখানে নাক-মুখ ঢেকে রেখে যারা আসবে তাদেরও নিষিদ্ধ করা দরকার। কারণ পাশের মানুষটি কে তাতো নিশ্চিত হতে পারছি না। যে কেউ এমন পোশাক পরে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করে যেতে পারে। এই পোস্টটি দেখে খেপলেন অনেক বছর ভারতের ডাক্তার ও হাসপাতালের স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে কাজ করা এক ব্যক্তি যিনি অধুনা হজব্যবসা করছেন। তিনি এটাকে ইসলামবিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করলেন। এবং বিরতিহীনভাবে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। একটি উদ্দেশ্য নিয়ে এ ব্যক্তিরা এমন কাজ করে থাকেন। তারা ধর্মের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আপনাকে বিব্রত করবে। উত্ত্যক্ত করবে আর এরূপ করতে করতে আপনি অসতর্কভাবে যদি কোনো বেফাঁস কথা বলে ফেলেন তখন তারা আপনাকে নাস্তিক, মুরতাদ বলে ফাঁসিয়ে দেবে, রটিয়ে দেবে। ব্যস এরপর এদেশে বাস করা আপনার পক্ষে কঠিন হয়ে উঠবে। যে লোক একই বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ ও লক্ষ্য থেকে ভারত, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশে লোক পাঠায় সে লোক একই বাণিজ্যিক লক্ষে হজ ও ওমরায় লোক পাঠানোর কাজ করে সে যদি নিজেকে আল্লামা মুফতি ভাবতে থাকেন তাহলে আমাদের আরও বিপদ আছে ভবিষ্যতে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
Wmail-qhbadal@gmail.com

x