কালাজ্বর নিরাময়ে হোমিওপ্যাথি

ডা. প্রধীর রঞ্জন নাথ

শনিবার , ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৮:০৪ পূর্বাহ্ণ
63

সারাদেশের মানুষ যখন ডেঙ্গু আতঙ্কে ভুগছে ঠিক তার পাশাপাশি দেখা দিয়েছে স্যান্ডফ্লাই বা বেলেমাছির মাধ্যমে ২৬ জেলায় কালাজ্বরের প্রকোপ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারেই ঢাকা সংলগ্ন টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, ময়মনসিংহ দেশের ২৬টি জেলার ১০০টির বেশি উপজেলায় কালাজ্বরের ঝুঁকি রয়েছে। ২০১৭ সালের পূর্ববর্তী পাঁচ বছর ধরে প্রতিবছরই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যার তুলনায় কালাজ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি ছিল। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় ২০১৬ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ছিল ৪০০ জন আর কালাজ্বরে আক্রান্ত ছিল একা হাজারের বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কালাজ্বর নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের ডিপিএম বলেন, বাহক বাহিত রোগ এখন বেড়ে যাচ্ছে। তাই অন্যগুলোর মত কালাজ্বরের দিকেও আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। এবার এ পর্যন্ত কালাজ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা ১১৮ জন আর দুজনের মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, কালাজ্বরের জীবাণুবাহী বেলেমাছি নিধন ঠিকমতো না হওয়ায় দেশের এ রোগের ঝুঁকি কমছে না। কালাজ্বরে বিশ্বের মোট রোগীর পাঁচ ভাগের চার ভাগই ভারত, বাংলাদেশ ও নেপালের বাসিন্দা।
কালাজ্বর কী : এটি অনিয়মিত জ্বর, ক্রমশঃ বর্ধনশীল প্লীহা ও যকৃত, রক্তের শ্বেতকণিকা সংখ্যার হ্রাস, অত্যধিক পেশীশীর্ণতা এবং কালো চর্ম ইত্যাদি লক্ষণ সমন্বিত দীর্ঘকালস্থায়ী পুরাতন ব্যাধি। এই রোগে মানুষের গাত্রবর্ণ কালো হয় বলেই একে কালাজ্বর বা লিশম্যানিয়াসিস বলা হয়।
কালাজ্বরের কারণ : ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে ডা. লিস্‌ম্যান এবং ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে ডা. ডনোভ্যান এক জাতীয় পরাঙ্গপুষ্ট জীবাণুই কালাজ্বরের কারণ বলে আবিষ্কার করেন। আবিষ্কর্তাদ্বয়ের নামানুসারে একে লিস্‌ম্যান ডনোভ্যান বডি (এল.ডি. বডিস) নামে অভিহিত করা হয়। এক প্রকার মশক বা বেলে মাছি (স্যান্ডফ্লাই) কালাজ্বরের জন্য দায়ী। কালাজ্বরের জীবাণুর নাম লিশম্যানিয়া ডনোভানি। বেলে মাছি (স্যান্ডফ্লাই) রোগীর দেহ থেকে রক্তের সাথে কালাজ্বরের জীবাণু গ্রহণ করে থাকে। যখন মাছিটি কোনো সুস্থ ব্যক্তিকে কামড় দেয় তখন এই জীবাণু মানবদেহে প্রবেশ এং কালাজ্বর রোগ সৃষ্টি হয়। কালাজ্বর ছাড়াও এই জীবাণু থেকে চর্মের উদ্ভেদ হতে দেখা যায়। তাকে ‘কিউটেনাস লিশম্যানিয়াসিস অরিয়েন্টাল সেরি’ বলা হয়। অনেক সময় কেবল চর্ম ও শ্লেষ্মা ঝিল্লি আক্রান্ত হয়। আমাদের দেশে ৪০/৫০ বছর পূর্বে কালাজ্বরের যে ব্যাপক হার ছিল বর্তমানে তা কমে গেছে। এটি এক ধরনের প্রোটোজোয়া শ্রেণীভুক্ত।
কালাজ্বরের লক্ষণ
১. কালাজ্বরের প্রধান লক্ষণ জ্বর। অল্প অল্প জ্বর দিয়ে শুরু হয়। রোগী হাঁটা চলা করে তবে হঠাৎ তীব্র জ্বর নিয়েও এই রোগ শুরু হতে পারে।
২. অনেক সময় ২৪ ঘন্টায় জ্বর ২ বার বৃদ্ধি পায়। এটা কালাজ্বরের বিশেষ লক্ষণ। তবে জ্বরের সাথে কাঁপুনি থাকে না।
৩. জ্বর চলতে থাকলে প্লীহা বৃদ্ধি পায় এবং অনেক সময় বিশালাকায় প্লীহা হাত দিয়ে অনুভব করা যায়। প্লীহা বড় হলেও নরম এবং বেদনাহীন হয়। লিভার বড় হয় তবে প্লীহার মতো ততটা নয়।
৪. চিকিৎসা না হলে রোগী রক্তশূন্য এবং কৃশকায় হয়ে পড়ে। তার সাথে গাত্রবর্ণ কালো হয়। বিশেষ করে মুখমণ্ডল।
৫. টাইফয়েড জ্বর থেকে পৃথক করতে কষ্ট হয় না কারণ জিহ্বায় আস্তরণ থাকে না, পেটের ্ল্লেগালমাল থাকে না এবং প্লীহা অত্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
৬. দেহের লিম্ফনোডগুলো বড় হয় এবং অনেক সময় এটাই একমাত্র লক্ষণ হয়।
৭. ক্রমশ দুর্বলতা, বুক ধড়ফড়ানি, ওজনহানি ঘটতে থাকে এবং পেট মোটা কঙ্কালসার চেহারা হয়।
৮. অনেক সময় বেশীদিন ভুগলে ফুসফুস আক্রান্ত হয়। সর্দি, কাশি প্রভৃতি দেখা দেয়।
৯. নাসিকা এবং দাঁতের মাড়ি থেকে প্রায় রক্তপাত হতে দেখা যায়। মাড়ি ক্ষয়ে যায়, দাঁত নড়ে, অনেক সময় মাড়ি খসে, পড়তে পারে।
১০. ফুসফুস আক্রমণেই মৃত্যু হয় বেশী। প্লীহার বৃদ্ধির জন্য স্নায়ুতে চাপ পড়ে। শেষ অবস্থায় ফুসফুসের বেইস-এ রক্ত বা জল জমে। ব্রঙ্কোনিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে অবস্থা গুরুতর হয়। যক্ষ্মা রোগ ধরা পড়ে।
১১. চামড়া খসখসে হয়, চুল পড়ে যায়। পরে চামড়ায় উদ্ভেদ ও ঘা দেখা যায়। প্রথম অবস্থায় জন্ডিস হয় না, পরে হলে রোগীর বাঁচার আশা থাকে না।
পরীক্ষানিরীক্ষা : ব্লাড ফর টিসি, ডিসি, ইএসআর, এইচ বি%, সিএফটি ফর কালাজ্বর (কমপ্লিমেন্ট ফিক্সেশন টেস্ট) বোনমেরো টেস্ট, প্লীহা ও লিভার টেস্ট করে রোগ নির্ণয় করা হয়।
পরবর্তী পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া : রক্তচাপ কমে যাওয়া, নাড়ির গতি কম, হৃদপিন্ডের ছন্দের গোলযোগ, ত্বকে র‌্যাশ, অস্থিসন্ধির প্রদাহ, মাথাধরা, পচনশীল মুখক্ষত, উদরাময়, রক্তামশায়, জন্ডিস, যকৃতের সিরোসিস, অন্ডলালাময় মূত্র, ব্রঙ্কাইটিস, ব্রঙ্কোনিউমোনিয়া, প্লুরিসী, যক্ষ্মা, চক্ষু, নাসিকা, মাড়ি হতে রক্তস্রাব, রক্তবমন, রক্তমল, প্লীহা মধ্যে রক্তস্রাব মুর্চ্ছা, রক্তহীনতা, উদরী, সর্বাঙ্গীন শোথ প্রভৃতি দেখা দেয়।
প্রতিরোধ ব্যবস্থা : বেলে মাছি (স্যান্ডফ্লাই) এর আবাসস্থল নোংরা, আবর্জনা, জঙ্গল পরিষ্কার করে রাখতে হবে।
১. যেসব জায়গায় কালাজ্বরের প্রকোপ বেশি সেখানে সংক্রমিত বা বেওয়ারিশ কুকুর ধ্বংস করতে হবে যাতে স্যান্ডফ্লাই তাদের দেহে থাকতে না পারে।
২. পোকামাকড় বিধ্বংসী ওষুধ ব্যবহার করতে হবে।
৩. মশারি ব্যবহার নিজেকে স্যান্ডফ্লাইয়ের হাত থেকে রক্ষা করবে।
পথ্যাদি : খুব ক্ষুধা পেলেও কখনো বেশি খেতে দিতে নেই। তাতে খারাপ হয়। এর ফলে উদরাময় দেখা দিতে পারে।
* জ্বর থাকলে বার্লি, হরলিকস, ফলের রস ইত্যাদি খেতে দিতে হবে। জ্বর না থাকলে সরুালের ভাত ও হালকা মাছের ঝোল সুপথ্য।
হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান
কালাজ্বর নিরাময়ে হোমিওপ্যাথিতে যুগান্তকারী ওষুধ আছে যা অন্যপ্যাথিতে নেই। লক্ষণ সাদৃশ্যে নির্দিষ্ট মাত্রায় এই রোগে নিম্নলিখিত ওষুধ ব্যবহারে এই রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করা যায়। যথা- ১. কালমেঘ ২. চিনিনাম-সালফ ৩. চিনিনাম-আর্স ৪. নেট্রাম মিউর ৫. আর্সেনিক ৬. চায়না ৭. ইপিকাক ৮. ফেরাম সিয়ানেটাস ৯. ইউপেটোরিয়াম-পার্ফোলিয়েটাম ১০. ক্রোটেলাস হোরাইডাস ১১. লাইকোপোডিয়াম ১২. কুরারী ১৩. ওপিয়াম ১৪. পাইরোজেন ১৫. সিকেলী ১৬. টিউবারকুলিনাম ১৭. ভিরেট্রাম ভিরিডি ১৮. থুজা ১৯. ট্যারাঙকাম ২০. মেনিয়েন্থিস ২১. স্যাম্বিকাস ২২. সিয়ানোথাস ২৩. কার্ডুয়াস মেরিনামসহ উল্লেখযোগ্য। তারপরও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা উচিত।

x