কালচক্রে সবুজ পাহাড়: জিঞ্জ ফুলেন

সালেহীন আরশাদী

মঙ্গলবার , ২০ আগস্ট, ২০১৯ at ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ
25

কালচক্রে সবুজ পাহাড় ধারাবাহিকে ‘নেচার অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব ও সাকা হাফং’ অধ্যায় থেকে আমরা জানতে পারি জিঞ্জ ফুলেন নামে এক ব্রিটিশ ভদ্রলোকের কথা, যিনি ২০০৬ সালের বান্দরবানের মদক রেঞ্জে অবস্থিত সর্বোচ্চ চূড়া চিহ্নিত করতে বাংলাদেশে আসেন। এশিয়ার দেশগুলোর সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণের প্রজেক্টের কারণেই জিঞ্জ ২০০৫ সালে প্রথমবারের মত বাংলাদেশে এসেছিলেন। সেবার তিনি গিনেজ বুক অফ রেকর্ডস স্বীকৃত বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া ‘কেওক্রাডং’ আরোহণের লক্ষ্য নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু অভিযানের সময় নানা কারণে তাঁর মনে একটা খটকা ঢুকে যায়। দেশে ফিরেও তিনি বাংলাদেশের পাহাড়ি জনপদকে ভুলতে পারেননি। এক বন্ধুর সাহায্যে পুরনো মানচিত্র, বইপত্র, রেফারেন্স, স্যাটেলাইট ইমেজারি ইত্যাদি ঘেটে নিশ্চিত হন কেওক্রাডং বা তাজিন ডং কোনটাই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিন্দু নয়।
তার এই অনুসন্ধানী অভিযানের পর থেকেই মূলত বাংলাদেশের ট্রেকিং ও পাহাড় নিয়ে আগ্রহীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। জিঞ্জ ফুলেনের সেই অনুসন্ধানী অভিযানের আদ্যোপান্ত (২পর্বে) জানার প্রাক্কালে ‘প্রাককথন’ লিখছেন অদ্রি সম্পাদনা পরিষদের একজন সালেহীন আরশাদী।
প্রাককথন
২০০৯ সালের শেষ দিকে অনেকটা ভাগ্যগুণে আমি প্রজেক্ট বাংলাট্রেকের সাথে জড়িয়ে পড়ি। বাংলাদেশের পাহাড় চূড়া, জলপ্রপাত, গুহাসহ ট্রেইলগুলোর বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে এক জায়গায় সমাবেশ ঘটানো ছিল এই প্রজেক্টের মূল কাজ। প্রজেক্টে কাজ করার সুবাদেই প্রথমবারের মত জানতে পারি জিঞ্জ ফুলেনের নাম। এই ব্রিটিশ ভদ্রলোকই নাকি খুঁজে বের করেছেন, ছোটবেলায় বইপত্রে পড়া কেওক্রাডং নাকি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া নয়। বান্দরবানের আরো দক্ষিণ-পূর্বে মায়ানমার সীমানার কাছে গহীন জঙ্গলের মাঝে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া। প্রথম দিকে এই নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাইনি। কিন্তু এই ধারণা পাল্টে যেতে খুব বেশি দিন সময় লাগেনি।
তখন আমার সামনে আমাদের সবুজ পাহাড়ের রহস্যাবৃত রূপটি মাত্রই উন্মোচিত হওয়া শুরু করেছে। প্রতিদিন নতুন কিছু সামনে আসছে। কত সুন্দর, কত রহস্যময় আমাদের এই সবুজ পাহাড়। নতুন নতুন অঞ্চলে পা রাখা ও প্রকৃতির সৌন্দর্যকে দুচোখ ভরে দেখা তখন একপ্রকার নেশার মত হয়ে দাড়িয়েছে। সেই সময়ই উপলব্ধি করলাম বান্দরবানের নতুন নতুন অঞ্চলে কোন লক্ষ্য স্থির করা ও সেখানে পৌঁছানো চাট্টিখানি কথা নয়। এর জন্য প্রচুর কাঠখড় পোঁড়াতে হয়। তথাকথিত আধুনিক সভ্যতা থেকে দূরে, যোগাযোগ ব্যবস্থাহীন, থাকা-খাওয়া এমনকি পথ সম্পর্কে কোন প্রকার তথ্য না থাকা একটি জায়গায় পৌঁছানো কতটা কষ্টসাধ্য ব্যাপার তা টের পেয়ে গেলাম। তখন থেকেই আমি বান্দরবানে অনুসন্ধানী অভিযানের জন্য পা রাখা আমার অগ্রজদের সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতে বাধ্য হলাম।
সংগ্রহ করুন
বলা যেতে পারে এই উপলব্ধির পর পরই অগ্রজদের পুরনো অভিযানগুলোর গল্প জানার জন্য অন্য রকম এক আগ্রহ তৈরি হল। বিশেষ করে সেই সময়ে বান্দরবানে একজন বিদেশি হয়ে জিঞ্জ ফুলেন প্রশাসনিক ও নানা প্রাকৃতিক বাধা পেরিয়ে কিভাবে খুঁজে বের করেন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিন্দু? তার সেই অনুসন্ধানী অভিযান সম্পর্কে খুঁটিনাটি জানার আগ্রহ ও কৌতূহল দিন দিন বাড়তেই থাকল।
কিন্তু ইন্টারনেটে অনেক ঘাটাঘাটি করেও তার এই অভিযান সম্পর্কে তেমন কোন তথ্যই পাওয়া গেল না। অগ্রজ ট্রেকারদের কাছেও জিঞ্জের সম্পর্কে বা তার বান্দরবানে অভিযান সম্পর্কে তেমন কিছু জানা গেল না। ২০১৬ সালে অদ্রির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় জিঞ্জ ফুলেনের সাথে, বেশ কয়েকবার ইমেইল চালাচালি হয়। অভিযান সম্পর্কে যতটা পারা যায় খুঁটিয়ে প্রশ্ন করা হয়। সেই মেইলগুলো, গিনেজ রেকর্ডের জন্য পাঠানো প্রতিবেদন ও অভিযান চলাকালীন সময়ে সহযোগীদের সাথে আদান-প্রদান করা তার তথ্যগুলো মিলিয়ে একযুগ আগের সেই অভিযানের একটি চিত্র অদ্রিতে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
এক.
কোন একজন ব্রিটিশ ভদ্রলোকের বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিন্দু খুঁজে বের করে সেখানে অনুসন্ধানী অভিযান চালানো হুট করে ঘটে যাওয়া কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এর পিছনের ঘটনা বুঝতে হলে আমাদের জিঞ্জ ফুলেন মানুষটা সম্পর্কে আগে বিশদভাবে জানতে হবে।
১৯৬৮ সালের ২৫ শে ডিসেম্বর জন্ম নেওয়া জিঞ্জ ফুলেন একজন ব্রিটিশ অভিযাত্রী। পেশায় তিনি একজন ডিপ সী ডাইভার। সমুদ্রের তলদেশেই তার কাজ কারবার। জিঞ্জ ২০ বছর ধরে ব্রিটিশ নেভিতে একজন ক্লিয়ারেন্স ডাইভার হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়া সমুদ্রের তলদেশে কাজ করা ইঞ্জিনিয়ার দল, বিস্ফোরক অপসারণ দল ও গভীর সমুদ্রতলে নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করা ডাইভিং দলের সাথে তিনি কাজ করেছেন। পৃথিবীর বেশ কয়েকটি কঠিন কোর্সে তিনি অংশ নিয়েছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মর্যাদাপূর্ণ ‘গ্রিন ব্যারেট’ কমান্ডো কোর্স।
বোমাং সার্কেলের পঞ্চদশ রাজা অং শৈ প্রু চৌধুরীর সঙ্গে জিঞ্জ ফুলেন
জিঞ্জ ফুলেন একজন জাত লড়াকু। যেকোন ধরনের চ্যালেঞ্জ নেওয়ার জন্য তিনি সবসময় মুখিয়ে থাকেন। পৃথিবীতে যত উদ্ভট রকমের প্রতিযোগিতামূলক খেলা আছে সবগুলোতে অংশ নেওয়া তার অন্যতম একটি শখ। ওয়ার্ল্ড কাস্টার্ড পাই চ্যাম্পিয়নশিপ, ওয়ার্ল্ড পেষ্ট্রি চ্যাম্পিয়নশিপ, পুডিং কিংবা বার্গার খাওয়া প্রতিযোগিতা, রাবার ব্যান্ড আঙুলে টেনে কে কত দূর পর্যন্ত নিতে পারে তার প্রতিযোগিতা, নিজের হাতে বানানো কার্ট রেস, কয়েন টস করার প্রতিযোগিতাসহ দেশ-বিদেশ ঘুরে উদ্ভট থেকে উদ্ভট সব প্রতিযোগিতায় তিনি অংশ নেন। এইটুকু বললেই আসলে তার পরিচয় শেষ হয়ে যায় না। মহাসাগরের গভীর তলদেশে ডুব দেয়ার পাশাপাশি তিনি একজন পর্বতারোহীও বটে। ১৯৯০ দশকে সবচেয়ে কমসময়ে ইউরোপের সবকটি দেশের (৪৭টি) সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণের রেকর্ড করে তিনি সবার নজর কাড়েন।
পরবর্তীতে ২০০০-২০০৫ সালের মধ্যে আফ্রিকা মহাদেশের ৫৩ টি দেশের সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ করে আরেকটি গিনেজ রেকর্ড করেন। এরপরই মূলত পৃথিবীর সকল দেশের সর্বোচ্চ চূড়া বা বিন্দুতে পৌঁছানোর এক বিরাট পরিকল্পনা তিনি ফেঁদে বসেন। এই পরিকল্পনা থেকেই ১৯৯৬ সালে পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দু মাউন্ট এভারেস্ট আরোহণ করতে গিয়ে তার হার্ট অ্যাটাক হয়। ভাগ্যগুণে ও তার সঙ্গীদের তৎপড়তায় সেবার প্রাণে বেঁচে যান জিঞ্জ। এত বড় একটি দূর্ঘটনার পরেও তিনি তার অভিযাত্রা থেকে সরে আসেন নি। ৬০০০ মিটারের উপর যাওয়া প্রাণঘাতী হতে পারে তাই তার তালিকা থেকে ১২ টি দেশ বাদ দিয়ে ১৯৪ টি দেশের সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ করার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকেন জিঞ্জ। ২০০৫ সালে ১৫০ তম দেশের সর্বোচ্চ বিন্দু আরোহণের লক্ষ্যে তিনি পা রাখেন বাংলাদেশে।
(চলবে)

x