কার মৃত্যু হলো সিনেমায়?

দেবাশীষ মজুমদার

মঙ্গলবার , ২৭ নভেম্বর, ২০১৮ at ১১:০৫ পূর্বাহ্ণ
72

পর্দা জুড়ে সাদা কুয়াশা, একটা অদ্ভুত আবহসঙ্গীতের সাথে সাথে সিনেমার টাইটেল স্কোর ভেসে উঠছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও দর্শক ঢুকে যাচ্ছে ১৯৭৯ সালের একটা জগতে, যেখানে দেখা যাচ্ছে একটা বাঙালি পরিবার কলকাতা থেকে ম্যাকলক্সিগঞ্জে যাচ্ছে গাড়িতে চড়ে। একটা নতুন বছরের উল্লাস, প্রেম, উন্মত্ততা এবং মৃত্যুর বিষাদ এই সবকিছু নিয়েই সিনেমার গল্প – ‘আ ডেথ ইন দ্য গুঞ্জ’। কিছু সিনেমা এমন হয় যেগুলো দিনশেষে রাত আসবে এমন সাদামাটাভাবেই অবতীর্ণ হয়, অথচ দীর্ঘ রাত জাগিয়ে রেখে কানের পাশে গুণগুণ করে যাবে। এই সিনেমাটাও তেমন।
যখন সিনেমাটা শুরু হয় একটা তরুণ ছেলে যার নাম ছুটু তার হাস্যোজ্জ্বল মুখ ভেসে উঠে, এরপর ক্রমে সেই মুখে ভেসে উঠেছে বিরক্তি, ভয়, লজ্জা এবং হতাশার অভিব্যক্তি। এটা এতটাই সাবলীলভাবে হয় যে দর্শক ঠিক বুঝে উঠতে পারে না কতটা যুদ্ধ হচ্ছে ওই তরুণের ভেতর। সিনেমাটায় একটা মৃত্যু দেখানো হয়েছে, কিন্তু এই মৃত্যুটাকে নিয়েই একটা ধোঁয়াশা সৃষ্টি করা হয়েছে, যদিও একদম শুরুতেই একটা মৃত্যুর আভাস দিয়েই শুরু হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কে মারা গেল সেটা রহস্যই রয়ে গেছে।
প্রায় শেষদিকে একটা সিনে দেখা যাচ্ছে ছুটু বন্দুক তাক করে আছে বিক্রমের (মিমি’র প্রাক্তন প্রেমিক যে বর্তমানে বিবাহিত) দিকে, বিক্রমের খুব গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে মিমি, এই ঘনিষ্ঠ অবস্থা মেনে নিতে না পেরেই ছুটু রাগ ও ঘেন্নায় বিক্রমের দিকে বন্দুক তাক করে আছে। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেল বন্দুক নিজের দিকেই ঘুরিয়ে নিয়েছে। তারপর দেখা গেল একটা গাছ থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে রক্ত পড়ছে। তো এই মৃত্যুটাকেই মেনে নেয়া যাচ্ছে না। পুরো সিনেমাটাতে দেখানো হয়েছে ছুটু একটা একাকীত্বে ভুগতে থাকা তরুণ, যার বাবা মারা গেছে, বিধবা মা তাকে কোনভাবেই মানুষ করতে পারছে না, সে পরীক্ষায় খারাপ করছে এবং এটা সবার কাছে লুকিয়েছে। পুরো সিনেমা জুড়ে সবাই মিলে তাকে নিয়ে নানাভাবে তামাশা করেছে। শুধুমাত্র ছোট্ট মেয়ে তানি মনে করে ছুটু অনেক প্রতিভাবান, সে ছুটু’র আঁকা ছবি দেখেছে। মিমি তার প্রাক্তন প্রেমিক বিক্রমের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হবার পর ছুটু’র সাথে ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করে এবং যেটা ছিল সম্পূর্ণ শরীরী একটা ব্যাপার, আর এটাই ছুটুকে অস্থির করে তুলে।
পুরুষশাসিত এই সমাজে একটা টার্ম প্রচলিত আছে ‘আসল পুরুষ’। সমাজ পুরুষদেরই গড়ে দেয়া এই আসল পুরুষ আদতে কেমন হওয়া উচিৎ বা এই স্কেলটা কে সেট করেছে তা একটা রহস্য। মানে এই নিক্তিটা আসলেই যে কি সেটা নিয়েও কিন্তু একটা খটকা রয়েই যাচ্ছে। যাই হোক, এই সিনেমায় কঙ্কণার সার্থকতা হচ্ছে এটাই যে পুরো সিনেমাটাতে একটা পরিবারের অন্দরমহলে দর্শককে টেনে নিয়ে যাওয়া এবং কখনও কখনও এমন মনে করানো যে দর্শক নিজেই ছুটুর চোখ দিয়ে সমস্ত দৃশ্যগুলো দেখছে। ছোট্ট মেয়ে তানিকে এক সময় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সমস্ত রাগ এসে পড়লো ছুটুর উপর, যেন তারই দায়িত্ব ছিল তানিকে দেখে রাখবার। একদিকে তানিকে খোঁজা হচ্ছে, অন্যদিকে ছুটুর দায়িত্ব-জ্ঞানহীনতা, তার মানসিক বিকার ইত্যাদি নিয়ে যে আলাপ-সালাপ চলছে এসবও তার কানে আসছিল। তানিকে খুঁজতে গিয়েই সে একটা গর্তে পড়ে গেল এবং একটা ভয়ংকর নেকড়ের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সে ফিরবার আগেই তানিকে পাওয়া গিয়েছিল, সকালে সে ফিরে দেখলো সবাই তানিকে ফিরে পেয়ে খুশি এবং তার অনুপস্থিতি কারও কাছেই কোনো গুরুত্ব পায়নি। সে যখন ফিরে আসছিল মিমিও তার সাথে দেখা করতে চাইলো না, আর এ-সমস্ত অবহেলাতেই সে ভেতরে ভেতরে ফুরিয়ে যাচ্ছিল।
সিনেমাটা শুরু হয়েছিল ঠিক এইভাবে – নন্দু এবং ব্রায়ান তাদের গাড়িতে রাখা একটা মৃতদেহ নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। অথচ শেষে দেখা গেল সেই গাড়িতে সে সময় ছুটুও ছিল, আবার শেষের একটু আগেই দেখানো হল কবরস্থানে মৃতের উপর উৎসর্গীকৃত কেকটা সবাই নিলেও ছুটু ফিরিয়ে দিচ্ছে। মনে হয়েছে পুরো সিনেমায় ছুটু বলে কেউ ছিলই না। তাহলে মারা গেল কে? বিক্রম, হ্যাঁ তার বেপরোয়া জীবনে মৃত্যু আসতেই পারে। পুরো ব্যাপারটাতেই একটা প্যারাডক্স সৃষ্টি করা হয়েছে। আর এতেই পরিচালকের সার্থকতা। অপর্না সেন এর যোগ্য উত্তরসূরি কঙ্কণার এই সিনেমাটা তাকে আইফা এওয়ার্ডের সেরা উদীয়মান পরিচালকের পুরস্কার এনে দিয়েছে। ব্রাভো কঙ্কণা।

x