কার্ল মার্কস : দুনিয়া পাল্টে দেয়া দার্শনিক

দ্বিশততম জন্মবার্ষিকীর শ্রদ্ধা

কানাই দাশ

শুক্রবার , ১ জুন, ২০১৮ at ৫:৫০ পূর্বাহ্ণ
81

মানব সভ্যতার বিকাশ ও পরিবর্তনের প্রবাহ নিয়ে, বস্তু বিশ্বের ভবিতব্য নিয়ে যে মনীষী দার্শনিক বিজ্ঞানসম্মত ভাবে ভেবেছেন, প্রকৃতি বিজ্ঞানের মত সমাজ বিজ্ঞানের তথা সমাজের গতির সূত্র আবিষ্কার করেছেন, বস্তু থেকেই যে চেতনার জন্ম হয় এ প্রতিপাদ্য প্রতিষ্ঠা করে সমাজ বিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটিয়েছেন তিনি হলেন মহামতি কার্ল মার্কস। পৃথিবীর ইতিহাসে এ পর্যন্ত অন্য কোন দার্শনিক সমাজ ও রাষ্ট্র জীবনে, মানুষের চিন্তা ও বৌদ্ধিক জগতে এত গভীর প্রভাব বিস্তার করতে পারেন নি। অন্যান্য দার্শনিকের মত তিনি শুধু দুনিয়াকে ব্যাখ্যা করেননি, যথার্থ অর্থে দুনিয়াকে ভাব ও বস্তুগত দিক থেকে পাল্টে দিয়েছেন তাঁর অসাধারণ মেধা, গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও বৈজ্ঞানিক প্রজ্ঞার বিরল সমন্বয়ে। তাঁর ভাবাদর্শকে ভিত্তি করে তাঁর মৃত্যুর মাত্র ৩৫ বছরের মাথায় ১৯১৭ সালে সংঘটিত রুশ বিপ্লব ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে উদ্ভুত বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মত মানুষের উপর মানুষের শোষণ অবসানের প্রত্যয়ে নতুন সমাজ বিনির্মাণের উদ্যোগ নেয়। শুধু রাষ্ট্র ক্ষমতা, রাজনীতি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে নয় মানবিকী বিদ্যার বৌদ্ধিক জগতকেও মার্কসবাদ গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ইতিহাস, দর্শন ও সমাজ বিজ্ঞান সহ প্রতিটি একাডেমিক চিন্তাজগতে মার্কসের চিন্তাভাবনার প্রভাব সে সব বিষয়ের পন্ডিতদের চিরায়ত ভাবনার উপযোগিতা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে বিকল্প ভাবনার জন্ম দিয়েছে। মার্কসীয় নন্দনতত্ত্বে প্রভাবিত হয়েছে বিশ্বজোড়া অসংখ্য শিল্পী সাহিত্যিক। বিশ্বনন্দিত ফরাসি শিল্পী পিকাসো, নোবেল জয়ী পাবলো নেরুদা, রবীন্দ্রনাথ, আইনস্টাইন, রোঁমারোলা সহ বিশ্ব মনীষার এক বিরাট অংশ বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশক থেকে হয় মার্কসবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েন অথবা চিন্তা ভাবনায় রেডিক্যাল হয়ে পড়েন। আজকে এই একবিংশ শতাব্দীতে সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পরেও গ্লোবাল ক্যাপিটেলিজম তার চূড়ান্ত সংকট ও অবক্ষয়ের মুখেও মার্কসীয় ভাবাদর্শও সমাজতন্ত্রের পুনরাবির্ভাব ঠেকাতে দুনিয়া জুড়ে চালাচ্ছে নির্বিচার আগ্রাসন, ছড়িয়ে দিয়েছে নানা অঞ্চলে উগ্র ধর্মান্ধতা, উস্কে দিচ্ছে আঞ্চলিক যুদ্ধ ও সংঘাত। এত কিছুর পরেও মার্কসীয় বীক্ষা বুকে ধারণ করে অসংখ্য সংগঠন ও ব্যক্তি দুনিয়ার দেশে দেশে লড়ে চলেছে মানব মুক্তির সংগ্রামে। সমাজ, অর্থনীতি, দর্শন ও ইতিহাসের বস্তুনিষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তথা মানব মুক্তির প্রশ্নে মার্কসবাদের বিকল্প কোন দার্শনিক ব্যাখ্যা এখনও পৃথিবীতে উদ্ভূত হয়নি। যদি হোত, প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মার্কসবাদ তাকে নিশ্চয়ই সৃজনশীলভাবে আত্মস্ত করে নিত কেননা মার্কসবাদ কোন ডগমা নয় এমনকি স্বয়ংসম্পূর্ণ কোন মতবাদও নয়, তা দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় নিয়ত বিকাশমান একটি সামাজিক, আর্থিক ও রাষ্ট্রনৈতিক ধারণা। জার্মান দর্শন, ব্রিটিশ রাজনৈতিক অর্থনীতি ও ফরাসী সমাজতন্ত্রের ধারণাএ তিনটি উৎস থেকে সৃজনশীল সংশ্লেষনের মাধ্যমে মার্কসবাদ বিকশিত হয়। মার্কসের বৈপ্লবিক জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনার সময় মার্কসের দর্শন ও চিন্তার সাথে সাযুজ্য ও তাঁর বিশ্ববীক্ষার যথার্থতা প্রমাণে অন্য এক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কথা উল্লেখ করতে হয় তা হল ১৮৫৭ সালে জীববিজ্ঞানী ডারউইনের প্রাণিজগতের বিবর্তনবাদের তত্ত্ব। মার্কসের সামাজিক বিবর্তন তত্ত্ব তথা ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ও ডারউইনের প্রাণিজগতের বিবর্তন তত্ত্ব, উনবিংশ শতাব্দীর দুই গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধিক অর্জন আজ পর্যন্ত মানুষের চিন্তাজগতকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে চলেছে। এ দু’ বিজ্ঞানীর কাছে মানবজাতির ঋন সত্যিই অপরিশোধ্য। মার্কসের জীবন ও মূল কিছু লেখার প্রতি একটু দৃষ্টিপাত করলেই আমরা তাঁর সৃষ্টির ও চিন্তার যথার্থতা কিছুটা উপলদ্ধি করতে পারব।

১৯১৮ সালের ৫ মে জার্মানীর রাইন প্রদেশের ট্রিয়ের শহরে এক মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কার্ল মার্কস। ১৭ বছর বয়সে ১৮৩৫ সালে মার্কস বন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য ও দর্শনে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য যান কিন্তু পিতার ইচ্ছাতে তিনি পরবর্তীতে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে ভর্তি হন। এর মধ্যেই তিনি দর্শন শাস্ত্রে আগ্রহী হয়ে উঠেন এই ভেবে যে দর্শন ছাড়া জগতে কিছুই বুঝা যায় না। তিনি এর কিছুদিন পূর্বে প্রয়াত জার্মান দার্শনিক হেগেলের দর্শন চিন্তায় অনুপ্রাণিত হন। তিনি ১৮৩৭ সালের দিকে বিপ্লবী চিন্তাধারায় যুক্ত “ইয়াং হেগেলিয়ান” নামে একদল যুবকের সান্নিধ্যে আসেন। এঁদের সাথে বস্তুবাদী দার্শনিক ফয়েরবাখ এবং ব্রুনো প্রমুখ জড়িত ছিলেন। এ সময়ে তিনি তাঁর ডক্টরেল থিসিস “ডেমোক্র্যাটিয়ান ও এপিকিউরিয়ান দর্শনের পার্থক্য” শীর্ষক কাজটি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ঐ থিসিসে মার্কস দেখাতে চেয়েছেন যে সহ্রাব্দ প্রাচীন ধর্মশাস্ত্রকে অবশ্যই সমসাময়িক ও উন্নত দর্শন ভাবনা বিবেচনায় নিতে হবে। ১৮৪২ সালের দিকে তিনি দু’টি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ রচনা করেন। একটি হল ‘উমর্ভরধঠর্লধমভর্ মর্ দণ উরর্ধধ্যলণ মত ঔণথণফ’্র দেধফম্রমযদহ মত ৗধথর্দ” এবং অন্যটি হল ’ৃভর্ দণ াণষধ্রদ লৈর্ণ্রধমভ’। এই প্রবন্ধেই তিনি প্রথমবারের মত প্রলেতারিয়েত বা সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণিকে বিপ্লবী শ্রেণি হিসাবে চিহ্নিত করেন। ১৮৪৪ সালে মার্কস পুঁজিবাদী অর্থনীতির উপর পাঠ ও গবেষণা শুরু করেন এবং ঐ বছরের জুলাইআগষ্টে লেখেন গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ”কদণ ঋডমভমবধড টভঢ দেধফম্রমযদধড ুটভল্রডরধর্য” বা “অর্থনৈতিক ও দার্শনিক পান্ডুলিপি”। এ বছরই তাঁর সাথে এঙ্গেলসের পরিচয় হয় ও আমৃত্যু তাঁদের সম্পর্ক বজায় থাকে কর্মেসৃজনে ও প্রতিজ্ঞায়। এ পান্ডুলিপিতে তিনি ডায়ালেকটিক বস্তুবাদভিত্তিক নিজস্ব দর্শন চিন্তা ও পুঁজিবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতি বিষয়ে তাঁর প্রাথমিক ধারণা ব্যক্ত করেন। উল্লেখ্য যে, ১৯৩২ সালের আগে এ পান্ডুুলিপি প্রকাশিত হয়নি। দর্শনকে ভাববাদী শৃঙ্খল তথা হেগেলীয় পরম সত্ত্বার ধারণা ধারণা থেকে বের করে এনে তাঁরই ডায়ালেকটিক পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে মার্কস দর্শনের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা প্রদান করেন। হেগেল মনে করতেন, মন বা চেতনা হল পরম সত্য ও বাস্তব, বস্তুবিশ্ব মনের প্রকাশ মাত্র এবং মার্কস ঠিক বিপরীতভাবে মনে করতেন বস্তুর এক ধরনের জটিল প্রকাশ হল চেতনা। বস্তুর আভ্যন্তরীণ দুই বিপরীত শক্তির দ্বন্দ্ব ও ঐক্যের মাধ্যমে সংঘটিত পরিমাণগত পরিবর্তন থেকে ক্রমে গুণগত পরিবর্তনের ধারায় ঐ বস্তুর নেতিকরণ বা বিলুপ্তি হয় এবং তা থেকে আরো উন্নত ও জটিল রূপে বিকাশ ঘটে ঐ বস্তুর। বস্তুর এ দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে বিকাশের নাম হল ‘দ্বন্দ্বতত্ত্ব’ বা ডায়ালেকটিক বস্তুবাদ। সমাজ বিকাশের ধারায় বা ইতিহাসে এর প্রয়োগ হলো ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। এটাকে আমরা বলি মার্কসীয় বীক্ষা। ১৮৪৪ এর পরে মার্কসের সমস্ত লেখা কিন্তু এই পান্ডুুলিপির সম্প্রসারিত, মার্জিত ও উন্নত রূপ। পান্ডুুলিপি প্রকাশের পরে ১৮৪৫ সালে লেখেন, “থিসিস অন ফয়েরবাখ”। এ বইতে তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি পাওয়া যায়ণ্ড “দার্শনিকরা এ পর্যন্ত নানাভাবে পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করেছেন, এখন কাজ হলো তাকে পাল্টে দেয়া।” । এ বছরই এঙ্গেলস সহ মিলে লেখেন “দি জার্মান আইডিওলজি” যেখানে ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা বিস্তৃতভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়। এতে পাওয়া যায় মার্কসবাদের সেই বিখ্যাত বয়ান “চেতনা বস্তুকে নিয়ন্ত্রণ করে না বরং বস্তুজগতই চেতনার জন্ম দেয়।” এই লেখার মাধ্যমে তিনি ফয়েরবাখ ও ব্রুনো প্রমুখ ‘ইয়াং হেগেলিয়ানদের’ তাত্ত্বিক চিন্তা থেকে সরে আসেন এবং ডায়ালেকটিক বস্তুবাদের উপর মনোযোগ নিবদ্ধ করেন। এ লেখাটিও ১৯৩২ সালের আগে প্রকাশিত হয় নি। ১৮৪৭ সালে রচনা করেন “মজুরী, শ্রম ও পুঁজি ” এবং নৈরাজ্যবাদী ফরাসী সমাজতাত্ত্বিক প্রশুঁধোর “দারিদ্রের দর্শন” নামে এক লেখার উত্তরে লেখেন “দর্শনের দারিদ্র্য” নামে অন্য একটি বিখ্যাত গ্রন্থ। ১৮৪৭ সালের ডিসেম্বরে সদ্য গঠিত কমিউনিস্ট লীগের ঘোষণাপত্র ও কর্মসূচি রচনার দায়িত্ব দেয়া হয় মার্কস ও এঙ্গেলসকে, লীগের লন্ডন সম্মেলনে। ১৮৪৮ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি তাঁরা দু’জনে প্রকাশ করেন বিশ্বখ্যাত “কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো” যা এখনও পর্যন্ত সারা বিশ্বের প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী কমিউনিষ্ট ও সমাজ বিজ্ঞানীদের কাছে অবশ্য পাঠ্য একটি পুস্তিকা। এতেই তাঁরা ঘোষণা করেন দুনিয়া কাঁপানো সেই অমর বাণী “মানব সভ্যতার ইতিহাস হল শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস ।” শ্রম ও পুঁজির দ্বন্দ্ব যে এক নতুন বৈষম্যহীন সমাজের জন্ম দেবে তার রূপরেখা তাঁরা এ ইশতেহারে তুলে ধরেন। বস্তুত ১৮৪০ এর পুরো দশক ছিল মার্কসের জীবনের ঘটনাবহুল ও সবচেয়ে সৃজনশীল সময়। মহাগ্রন্থ “পুঁজি” প্রণয়নের প্রাথমিক ভাবনা ও প্রস্তুতি তিনি এ দশকে শেষ করে ফেলেন। ১৮৫৯ সালে রচিত হয় অর্থনীতি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ” এ কনট্রাইবিউশন টু দি ক্রিটিক অব পলিটিক্যাল ইকনমি”। এটাকে “পুঁজি” গ্রন্থ রচনার প্রাথমিক প্রস্তুতিমূলক কাজ হিসাবেও বিবেচনা করা হয়। ১৮৬২সালে প্রকাশিত হয় দুই খণ্ডে “উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব” নামে “পুঁজি”র একটি বর্ধিত অংশ। অবশেষে ১৮৬৭ সালে প্রকাশিত হয় মহাগ্রন্থ “পুঁজি” যা পুঁজিবাদী অর্থনীতির উৎপাদন প্রক্রিয়া, মূল্যের শ্রম তত্ত্ব ও মুনাফার রহস্য নিয়ে বিস্তৃত ব্যাখ্যা তুলে ধরে এবং পুঁজিবাদের নিয়মেই কিভাবে পুঁজিবাদ ধ্বংস হবে তা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে। “পুঁজি’র” বাকী অংশের উপর মার্কস তাঁর গবেষণা অব্যাহত রাখেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর ১৮৮৫ ও ১৮৯৪ সালের এঙ্গেলস যথাক্রমে এর দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড প্রকাশ করেন। ১৮৭১ সালের ফ্রান্সের “প্যারী কমিউন” তথা প্রথম সর্বহারা বিপ্লবের ব্যর্থতার কারণ বিশ্লেষণ করে লিখেন “ফ্রান্সের গৃহযুদ্ধ” নামে আরেকটি শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবের জন্য শিক্ষামূলক গুরুত্বপূর্ণ রচনা। তাঁর শেষ উল্লেখযোগ্য রচনা হল ১৮৭৫ সালে জার্মানির ‘গোথা’ শহরে অনুষ্ঠিত সোশ্যালিস্ট পার্টিগুলোর সম্মেলনে গৃহীত সংস্কার কর্মসূচির সমালোচনা করে লেখা “গোথা কর্মসূচির সমালোচনা” নামক বিশাল প্রবন্ধ। এতে তিনি কমিউনিস্ট সমাজ নির্মাণের কৌশল ও এতে সম্পদ বণ্টনের সম্ভাব্য রূপরেখা তুলে ধরেন। একটি উচ্চনৈতিকতা সম্পন্নও প্রাচুর্যে ভরা কমিউনিস্ট সমাজে প্রত্যেকে “প্রত্যেকের সামর্থ্য অনুযায়ী দেবে ও প্রয়োজন অনুযায়ী নেবে”।

এভাবেই আমৃত্যু মার্কস পুঁজিবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতি বিশ্লেষণ ও সম্ভাব্য একটি শোষণমুক্ত সমাজ নির্মাণের পথ ও পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করে গেছেন যা তাঁর মৃত্যুর মাত্র ৩৫ বছরের মাথায় ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের মাধ্যমে লেনিন পরীক্ষামূলক ভাবে বাস্তবে রূপ দিতে আরম্ভ করেন। প্রায়োগিক বা সাবজেকটিভ ভুল এবং শক্তিশালী বিশ্বপুঁজিবাদের অব্যাহত আক্রমণে সমাজতন্ত্রের একটি মডেল বিপর্যস্ত হলেও পৃথিবী জুড়ে আজও তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে চলেছে শ্রম ও পুঁজির দ্বন্দ্ব। পুঁজিবাদের সংকট, বৈষম্য, দারিদ্র্য ও নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়া যত বাড়ছে মার্কসবাদের প্রাসঙ্গিকতাও ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। মার্কসবাদের বিকল্প আরও উন্নত মার্কসবাদ, বিপর্যস্ত সমাজতন্ত্রের বিকল্প আরও উন্নত সমাজতন্ত্র কিন্তু কিছুতেই পুঁজিবাদে প্রত্যাবর্তন নয়।

মার্কসের সারা জীবনের অধ্যবসায় ও শ্রমে রচিত অভিজ্ঞতা প্রসূত সমাজ ও অর্থনীতি বিষয়ক এসব তাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত ও ভাবনার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে মার্কসের চিন্তাধারা বা মার্কসবাদ। এ চিন্তাধারা কোন স্থির বা অপরিবর্তনীয় সিদ্ধান্ত হিসাবে মেনে না নিতে মার্কস বার বার অনুরোধ করেছেন। এটি হলো সমাজ পরিবর্তনের একটি গাইড লাইন। কিন্তু ভাববাদী ও নৈরাজ্যবাদীদের মত কিছু মার্কসবাদীও এর ভুল ব্যাখ্যা, বিভ্রান্তি ও গোঁড়ামি বার বার সৃষ্টি করে এসেছেন। এজন্য শেষ জীবনে একবার বিরক্ত হয়ে মার্কস নাকি বলেছিলেন ”ইফফ অ পভমষ ধ্রর্ দর্ট অ টব ভর্ম ট ুটরসর্ধ্র” মানুষের সার্বিক মুক্তি ও সব ধরনের স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ় ছিল তাঁর অবস্থান। একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল সব চাইতে কি জিনিস তিনি ঘৃণা করেন, তিনি উত্তর দেন “দাসত্ব”। তাঁর প্রিয় লক্ষ্য জার্মান ভাষাতেই তিনি লিখে গেছেন ”ঊণ ৃবভধঠল্র ঊর্লর্ধটভঢলব” অর্থাৎ সবকিছুকেই সন্দেহ করতে হবে। এর অর্থ দাঁড়ায় নিরন্তর বিচার বিশ্লেষণ করে সবকিছু মানতে হবে। পিউরিটান কর্তৃত্ববাদ বা অন্ধ আনুগত্য বিদ্যমান সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের কারণ কি না তা আমাদের মার্কসবাদেই খুঁজতে হবে। সামষ্টিক মুক্তির নামে ব্যষ্টির স্বাধীনতা কতটুকু খর্ব করা যাবে তা ভেবে দেখতে হবে নতুন সমাজ গড়ার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়। মার্কসের দর্শন ভাবনা বিগত সোয়াশ বছর ধরে সত্যিকার অর্থেই পাল্টে দিয়েছে মানুষকে তার চিন্তায়, মননেসৃজনেকল্পনায়, পাল্টে দিয়েছে আর্থসামাজিক মূল্যবোধের প্রেক্ষিতে, জীবন ও জগতের বিকাশের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী প্রত্যয়ের উপর নির্মোহ নির্ভরতায়।

x