কারা চালায় ড্রোন, হাসিয়া খেলিয়া মারে মানুষ!

রাফসান গালিব

মঙ্গলবার , ২৯ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৮:১৯ পূর্বাহ্ণ
95

ইয়েমেনে একটা জাহাজের কন্টেইনারের ভেতরে তথ্য প্রযুক্তি সমৃদ্ধ রুমের মধ্যে বসে আছেন কয়েকজন তরুণ-তরুণী। তাদের হাতে জয়স্টিক মানে ড্রোন নিয়ন্ত্রণকারী যন্ত্র। সামনে বিশাল স্ক্রিন। সেখানে দেখা যাচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং এই নির্জন রুম থেকে বসে থাকা তরুণদের হাতেই হচ্ছে তাদের মৃত্যু।
এতক্ষণ যাদের কথা বলছি, তারা হলেন ইয়েমেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিতর্কিত ড্রোন হামলা কর্মসূচিতে নিযুক্ত কিছু নারী-পুরুষ। তাদের হাত দিয়েই হচ্ছে ড্রোন হামলাগুলো এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা ছাড়াও তাদের ভুলের কারণেও নিহত হচ্ছে অনেক নিরীহ প্রাণ। রাশিয়ার প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম আরটি চ্যানেলের ওয়েবসাইটে আইরিশ ফ্রিল্যান্স লেখিকা ডানিয়েল রায়ানের লেখায় ওঠে এসেছে মার্কিন ড্রোন হামলায় অংশ নেয়া মানুষদের এমন কিছু বাস্তবিক চিত্র।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ সংস্থা এপির সমপ্রতি প্রকাশিত নতুন এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছরে ইয়েমেনে ড্রোন হামলায় নিহত এক তৃতীয়াংশ মানুষ কোন ধরনের জঙ্গিবাদী বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। এমনকী আল কায়েদা বা অন্যান্য সশস্ত্র সংগঠনের সাথেও তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।
শুধু ইয়েমেনেই না পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানে, ইরাক, সিরিয়ায় এমনকি সোমালিয়াও মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হচ্ছে নিরাপরাধ মানুষ। এই হামলার সাথে যুক্ত আছে সরকারগুলোও। স্বপ্রণোদিতভাবে বা বাস্তবতার কারণে চালানো এইসব ড্রোন হামলাকে তারা ‘নির্ভুল’ এবং ‘আকস্মিক সামরিক অভিযান’ হিসেবে উল্লেখ করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে বেসামরিক লোকই এর শিকার হচ্ছে।
সামপ্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন ড্রোন হামলা নিয়ে গোপন তথ্য ফাঁস হওয়ায় নির্মম ও নিষ্ঠুর এই হত্যাযজ্ঞের পিছনের কাহিনী বিশ্ববাসীর নজরে আসে। মার্কিন বাহিনীতে এক সময় কাজ করা ড্রোন প্রযুক্তিবিদ ও পরিচালনাকারী, ক্যামেরা অপারেটর এবং ইমেজ এনালায়সিস্টরাই এইসব তথ্য ফাঁস করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে। এতে দেখা যাচ্ছে ড্রোনচালনাকারীদের কী পরিমাণ মানসিক বিপর্যস্ততা ও চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সেইসাথে তাদের মুখোমুখি হতে হয় করুণ বাস্তবিক পরিস্থিতির।
এটা নিশ্চয়ই খুব হাস্যকর শোনাবে যে, নিরপরাধ মানুষ হত্যা করতে পশ্চিমারা যাদেরকে নিয়োগ দিয়েছে আবার তাদের মানসিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বিগ্ন তারা। এরপরে দেখা উচিত, কারা এসব মানুষ, কাদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে মানুষ মারার বাটন। কারা চালায় ড্রোন, হাসিয়া খেলিয়া মারে মানুষ!
২০১৫ সালে মার্কিন বিমান বাহিনীর আভ্যন্তরীণ এক তথ্য প্রকাশ পায় ডেইলি ভিস্টে। এতে দেখা যায় ড্রোন পাইলটরা এ-কর্মসূচির সাথে থাকতে চাইছেন না এবং দলে দলে বেরিয়ে যাচ্ছেন। শেষপর্যন্ত ছয় অংকের বেতন প্রস্তাব করেও তাদেরকে রাজি করাতে পারেনি বিমান বাহিনী।
সময় ও শ্রমসাধ্য, দুঃসহ এবং অতিরিক্ত চাপের কারণে এই কাজ থেকে তারা বেরিয়ে যাচ্ছ্‌েন বলে জানাচ্ছেন ‘উই কিল বিকজ উই ক্যান’ বইয়ের লেখিক লাউরি ক্যালহোন। বইটিতে মার্কিন ড্রোন হামলা ও অভিযান নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করেছেন এ নারী বিশ্লেষক।
তিনি বলেছেন, ড্রোন হামলা থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়া এসব কর্মকর্তাদের মধ্যে আসলে মোহমুক্তি ঘটেছে বলা চলে। সেইসাথে, নিরাপরাধ মানুষ হত্যায় তাদের মধ্যে অপরাধবোধ ও অনুশোচনাবোধের সৃষ্টি হয়েছে।
ড্রোন প্রযুক্তির এই সময়ে এসে যেখানে অপারেটরদের কোনো ধরনের হতাহত হবার আশংকা নেই সেখানে তাদের এই জায়গা ছেড়ে দেয়াটা মূলত মানসিক বিপর্যস্তা (পিটিএসডি) থেকেই। ‘নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি’ থেকেই মানসিকভাবে তারা এ নীরব হত্যাকাণ্ড এক পর্যায়ে মেনে নিতে পারেন না।
এটা খুব সহজে বলা যায় যে, ড্রোন পরিচালনাকারী এসব নারী-পুরুষ পারস্পরিকভাবে বিচ্ছিন্ন, সেইসঙ্গে অনেকটা উম্মাদগ্রস্ততো বটেই। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এরা সাধারণ মানুষই এবং অধিক বেতনের লোভ দেখিয়ে তাদেরকে এ কাজের সাথে যুক্ত করেছে মার্কিন সেনাবাহিনী। তাদেরকে এটাও নিশ্চিত করা হয় যে, তারা নৈতিক ও ন্যায়মূলক কাজের সঙ্গেই যুক্ত আছে।
ভার্জিনিয়ার ল্যাঙ্গলিতে কাউন্টার টেরোরিজম এয়ারবোর্ন অ্যানালাইসিস সেন্টারের ইমেজ এনালাইসিস্ট হিসেবে কাজ করতেন ক্রিস্টোফার অ্যারোন। যিনি ২০০৬ সালে আফগানিস্তানে গোয়েন্দাবৃত্তির কাজে নিয়োজিত হয়েছিলেন। তিনি বলছেন, সফলভাবে হত্যাকাণ্ড শেষে মার্কিন ঘাঁটিতে কীভাবে তা উচ্ছ্বাসের সঙ্গে উদযাপন করা হতো। নির্দিষ্ট ব্যক্তি ছাড়াও সাধারণ অনেক মানুষও মারা যেতেন এই সব হামলায়। পরের দিন আবার সামনের বড় পর্দাতেই ড্রোন চালকরা দেখতেন, নিহত সেইসব মানুষদেরকে কবর দেয়ার জন্য মানুষের মিছিল। মনে হতো, নিজের সামনে দিয়ে এই মিছিল চলে গেল যেন।
অ্যারোনের সহকর্মীরা শুরুর দিকে তাদের কাজ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে লাগলেন, তারা আসলে কী করছিলেন পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলেন না। কিন্তু উচ্চপদস্থদের কাছে নিজেদের এইসব চিন্তা-দুশ্চিন্তা প্রকাশ করতে পারতেন না বা কীভাবে প্রকাশ করবেন সেটা বুঝতেন না। অ্যারোন জানাচ্ছেন, ‘আমরা নিজেদের ভাবনা নিজেদের মধ্যেই রেখে দিতাম। সামরিক কর্তৃপক্ষ কখনো ভিন্নমত শুনতে চাইতো না। শুধুমাত্র গোয়েন্দাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকেই তারা শুনতেন, তাও নির্দিষ্ট অবস্থায়।’
২০০৯ সালে আফগানিস্তানে অ্যারোনের চাকরির দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হয়। এসময় তিনি মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন, শারীরিকভাবে এবং মানসিকভাবে। এই পরিস্থিতি থেকে স্বাভাবিক হতে তার সময় লেগেছিল পরবর্তী পাঁচ বছর। এরপর তিনি প্রকাশ্যে তার আফগানিস্তান অভিজ্ঞতার কথা বলা শুরু করেন।
সীমিত নৈতিক জ্ঞান এবং পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতাবোধের মধ্য দিয়ে অফিসে বসে যারা পৃথিবীর অন্য জায়গায় মানুষকে হত্যা করছেন, তারা কিন্তু ঠিকই স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। মুদির দোকানে যায়, সদাইপাতি করে, জিমে যায়, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান। শুধুমাত্র নিজেদের এ কাজকে আড়াল করে রাখার জন্য।
ড্রোন-হত্যা চালিয়ে অ্যারোনের মত অনেকেই যেভাবে মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হচ্ছে সেটা আসলেই সত্য। ক্যালহোন এ ব্যাপারে বলছেন, ‘এই কাজের জন্য আসলে এমন লোককে সামরিক বাহিনীর নির্বাচন করা উচিত, সহকর্মীকেও হত্যা করার পর যে অনুশোচনাবোধ সেটি তাদের থাকবে না।’
সম্ভাব্য প্রার্থীরা হবে ভিডিও গেইমসে পারদর্শী, যেখানে পর্দাতেই তারা মানুষ মারবে কিন্তু সেখানে ড্রোন হামলায় হতাহত লোকদের ফুটেজ দেখানো হবে এবং সেটা তারা ধরতেও পারবে না। তবে এই ক্ষেত্রে যারা প্রশ্ন তুলে বা ভিন্নমত পোষণ করে তাদেরকে এখান থেকে বাদ দেয়া হবে। এমনকী তিনি এমনও প্রস্তাব করেন যে, যাদের ইতোমধ্যে অপরাধপ্রবণতা আছে এবং সেইসঙ্গে মৃত্যু ও কারাগারে যাওয়ার ঝুঁকির তোয়াক্কা না করে উচ্চ বেতনে এই কাজ করতে রাজি হবে এবং মানুষ হত্যা করবে তাদেরকেই নেয়া উচিত।
২০১৬ সালে মার্কিন ড্রোন কর্মসূচির প্রভাব নিয়ে ‘ন্যাশনাল বার্ড’ নামে ডকুমেন্টারি করতে গিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিক সোনিয়া কেনেবেক তিনজন ‘গোপন তথ্য ফাঁসকারী’র সাথে কথা বলে জানার চেষ্টা করেছেন ড্রোন কর্মসূচির গোপন অধ্যায়।
দানিয়েল নামে গৃহহীন এক কিশোরের সম্পর্কে জানা গেছে, যার পরিবারের অন্যান্য পুরুষ সদস্যরা লঘু অপরাধে কারাগারে ছিল। আরেকজন হচ্ছে হাইস্কুল পাস করা হিটার লাইনবো নামে এক তরুণী, যেভাবেই হোক একটা চাকরি নিয়ে পেনসিলভেনিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন তিনি। সেইসঙ্গে এমন সব কাজের প্রতি তার আগ্রহ ছিল যা মানুষের কল্পনারও বাইরে, অনেকটা ভিডিও গেমসের চরিত্রের মতো।
সোনিয়াকে হিটার বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীকে রক্ষা করে চলেছে। আমরা মার্কিনিরা হচ্ছি তাদের ‘বড়ভাই’ এবং সকল ধরনের বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে তাদেরকে আমরা সহযোগিতা করছি। এমন অনুভূতি আমাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হতো।’
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আরও কঠিন কিছু। লাইনবো বলেন, ‘এটা আসলে আদিম যুগের বর্বরতা, ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে হত্যা করা। এটাই আসলে বাস্তবতা। মজার কিছু নয়।’
তিনি বলেন, ‘আপনি একজনকে হত্যা করছেন কারণ আপনাকে বলা হয়েছে যে তাকে হত্যা করা ন্যায়সঙ্গত। এ কাজ করতে গিয়ে সবসময় আমার ভেতরটা ঝাঁকুনি দিত। অনেক সময় আমি দৌড়ে বাথরুমে চলে যেতাম এবং টয়লেটে বসে কান্না করতাম।’
ড্রোন চালনায় কাজ করা আরেক তথ্য ফাঁসকারী ব্রানডন ব্রায়ান্ট বলেন, ‘তিনি যখন প্রথম লাস ভেগাসের বাইরে ক্রিক এয়ার ফোর্স ঘাঁটিতে গেলেন সেখানে দেখলেন তার মতো নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের জোরে জোরে মেটালিকার হেভি মেটাল গান শোনানো হচ্ছিল। এক অফিসার ঘোষণা দিচ্ছিলেন, জেন্টেলম্যান, ওয়েলকাম টু ক্রিক। সবার উদ্দেশ্যে তিনি বলছিলেন, তোমাদের কাজ হচ্ছে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা এবং মানুষ হত্যা করা। এরকম নানাভাবে নতুন আগতদেরকে প্রস্তুত করা হচ্ছিল কাজের জন্য।’
ড্রোন হামলার যৌক্তিকতা নিয়ে একটা প্রতিষ্ঠিত ধারণা হচ্ছে, ড্রোন অভিযানে বেসামরিক মানুষের হতাহতের সংখ্যা কম থাকে। কিন্তু শুরুর দিকেই ২০১৪ সালে পাকিস্তানে মার্কিন ড্রোন হামলার ভয়ংকর একটা তথ্য হচ্ছে, দেশটিতে ড্রোন হামলায় ১১৪৭ জন মানুষ মারা গেছে, যার মধ্যে মাত্র ৪১ জনেরই কোন ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ততা ছিল।
তথ্য সংগ্রহকারীদের থেকে তথ্য নিয়ে গোয়েন্দারা হামলার লক্ষ্যবস্তু ঠিক করে থাকে। তবে আঘাত হানার আগে উচিত সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর আচার-আচরণ ও গতিবিধি গভীরভাবে বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ করা।
কিন্তু ড্রোন অপারেটরদের এটা জানার কোনো উপায় থাকে না, তারা শুধু নির্দেশ পেয়ে মানুষ হত্যা করে। কোন হামলায় হতাহত কম-বেশি হচ্ছে সেটি জানার কোনো উপায় থাকে না তাদের।
এদিকে এক সময় ড্রোন কর্মসূচির সাথে যুক্ত থাকা ও এ-সংক্রান্ত গোপন তথ্য ফাঁসকারী ব্যক্তিরা সরকারি চাপের সম্মুখীন হচ্ছেন। কেনেবেকের ডকুমেন্টারিতে তথ্য দেয়া দানিয়েলের বাড়িতে ৫০ জনের মতো এফবিআই এজেন্ট অভিযান চালায়। তার বাড়ি থেকে নানা নথিপত্র ও ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস জব্দ করে। এমনকী আরেকজনের বাসায় গিয়ে দুই সামরিক কর্মকর্তা তার মাকে জানান যে, তিনি ইসলামিক স্টেটের (আইএস) হিটলিস্টে আছেন।
অ্যারোনের মতো এ-নিষ্ঠুর কর্মসূচির সাথে সম্পৃক্ত থাকা সবার মনে একটা ভাবনা উদ্রেক করে, তা হচ্ছে-এই হত্যাকাণ্ড সহিংসতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে, এতে চরমপন্থা ছড়িয়ে পড়ছে আরও।
সেইসঙ্গে মার্কিন ড্রোন হামলার কারণে ইসলামিক যোদ্ধারা এবং উগ্রবাদী প্রচারকরা আরও বেশি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছে এবং তাদেরকে নিজেদের দলে টানছে। আর এদিকে ড্রোন হামলায় নিহত সাধারণ মানুষরা পরিণত হচ্ছে নিছক সংখ্যায়।

- Advertistment -