কারখানার বর্জ্যের বিষক্রিয়ায় জমিতে কোনো ফসল হয় না

পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও কৃষিতে বিপর্যয়ের আশংকা

লিটন কুমার চৌধুরী : সীতাকুণ্ড

সোমবার , ৩ জুন, ২০১৯ at ১১:১১ পূর্বাহ্ণ
46

কুমিরা এলাকার কৃষক জসিম উদ্দিন তাঁর ৫ একর জমিতে গত বোরো মৌসুমে দুইবার ধানের চারা রোপণ করেছেন। তারপরও জমির প্রায় অর্ধেক চারা মারা যায়। যে চারাগুলো বেঁচে ছিল সেগুলো থেকে ধান পাওয়া যায়নি। জসিম উদ্দিনের মতো একই অবস্থা রবিউল হোসেনের। তিনিও তার প্রায় ৩ একর জমিতে বোরো ধান চাষ করে কোন ধান পাননি। এবার তাঁরা ওই জমিতে এখনও পর্যন্ত আমন ধান রোপণ করেননি। বিভিন্ন শিল্প-কারখানার বর্জ্যে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে খালে ফেলার কারণে বিষক্রিয়ায় সীতাকুণ্ড উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের ফসল উৎপাদনে এ অবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভাটিয়ারী বি এম গেইট সংলগ্ন টোবাকোর বিষাক্ত বর্জ্য সুয়াখালী খালে, কনফিডেন্স সিমেন্ট কারখানার বর্জ্য মাদামবিবিরহাট খালে, আবুল খায়ের ষ্টীল মিলের এসিড পানি সালেহ কার্পেটের পশ্চিমের খালে, শীতলপুরের কয়েকটি রি-রোলিং কারখানার এসিড পানি বার আউলিয়া খালে, জোড়-আমতল কবির ষ্টীল মিল ও কর্নফুলী কে.আই সি.আর ইন্ডাষ্ট্রিজ এর এসিড পানি জোড় আমতল খালে, কুমিরা পিএইচপি, কর্ণফুলী ষ্টিল মিলের এসিড পানি ও সিপি বাংলাদেশ কারখানার মুরগীর খাদ্যর বিষাক্ত বর্জ্য কুমারী খাল দিয়ে সরাসরি সমুদ্রের পানির সাথে মিশে যায়। এছাড়া শিপ ইয়ার্ডগুলোর বিষাক্ত বর্জ্য পদার্থ খালের মধ্যে ফেলা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের শিল্প বর্জ্যে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ফেলা হচ্ছে পার্শ্ববর্তী খালে। ফলে বিষাক্ত বর্জ্যে এলাকার কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে।
সরেজমিনে ভাটিয়ারী, সোনাইছড়ি ও ফৌজদারহাট ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে শিল্পবর্জ্যের দুষণ বিষয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সাথে সাথে আতংকও লক্ষ্য করা গেছে। জাহানারাবাদ গ্রামের গোপাল জলদাস ও ধীমান জলদাস জানান, আগে যেসব খালের মাছের ওপর তাঁদের নির্ভরশীল ছিল, এখন ওই সব খালের মাছ দুর্গন্ধে খাওয়া যায়না। এর পরও কেউ খেয়ে ফেললে বিভিন্ন ধরনের অসুখ হয়।
এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, কারখানার বর্জ্য ফেলার কারণে খালের পানি বিষাক্ত ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়েছে। যার ফলে সীতাকুণ্ডের তিনটি ইউনিয়নের প্রায় দেড় লাখ মানুষের বসবাস কষ্টকর হয়ে উঠেছে। পানির দুর্গন্ধে শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগ দেখা দিচ্ছে। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে বার বার লিখিত আবেদন করেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছেনা বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করে।
এব্যাপারে শীতলপুর এলাকার চিকিৎসক ডা. অমরেন্দ্র ভট্টাচার্য দৈনিক আজাদীকে জানান, ওই তিন ইউনিয়নে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা বেশি। কারণ শিশু জন্মের পর বিষাক্ত বর্জ্যে পদার্থের দুর্গন্ধে শ্বাসকষ্টে ভোগে। পরবর্তীতে প্রতিবন্ধী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
খালের পাশে বসবাসরত কুমিরা কাজী পাড়া গ্রামের জহিরুল আলম বলেন, আমার তিন বিঘা জমি খালি পড়ে আছে। এখানকার জমিগুলোতে ফসল লাগালে বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে নষ্ট হয়ে যায়। আমার এলাকার অনেক কৃষকের জমি চাষের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এলাকায় বিভিন্ন গাছ-পালার রঙ হলদে আকার ধারণ করে।
দঃ ঘোরামারা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, কারখানার বিষাক্ত রঙের পানির কারণে আমাদের কষ্টের সীমা নেই। পুকুরে কোনো মাছ চাষ করলে মরে যায়। বড় হতে চাইনা। পুকুরের পানিও কালচে রঙ ধারণ করে। এছাড়া কারখানার বিষাক্ত পানি সমুদ্রে পড়ার কারণে এখানকার জেলেরা আগের মতে মাছ পাচ্ছেনা।
ভাটিয়ারী ইউনিয়নের আব্দুল মোমেনের বাড়ি খালের পাড়েই। তিনি বলেন, পানির পচা গন্ধে খাবার ঢুকতে চায় না। আমার সন্তানদের সার্বক্ষণিক শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, ঠিকমতো নিঃশ্বাস নিতে পারেনা।
সোনাইছড়ি ইউপি চেয়ারম্যান মনির আহমদ এবং কুমিরা ভাটিয়ারী ইউপি চেয়ারম্যান নাজীম উদ্দিন জানান, বিষাক্ত বর্জ্য খালে না ফেলতে অনেকবার শিল্প-কারখানার মালিকদের অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের কথা কেউ কর্ণপাত করছে না।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খান সাফকাত আহমেদ জানান, মিল-কারখানার বর্জ্যে জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন, অনেক কারখানায় শোধনযন্ত্র থাকলেও খরচ কমানোর জন্য তা বন্ধ করে রাখে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান কর্মকর্তা ডা. আব্দুল মজিদ জানান, ওই এলাকার খালগুলোর বিষাক্ত পানি ও দুর্গন্ধে এলাকার শিশু, বৃদ্ধ ও মহিলারা চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যাথা, বমি, চোখ জ্বালাপোড়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রসূতি মহিলাদের জন্য খুবই সমস্যা দেখা দিতে পারে।

x