কাফকো-সিইউএফএল ও শিকলবাহা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস যাচ্ছে আলাদা লাইনে

সার-বিদ্যুৎ উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখার উদ্যোগ

হাসান আকবর

সোমবার , ২০ আগস্ট, ২০১৮ at ৬:৪২ পূর্বাহ্ণ
577

চট্টগ্রামের সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সিইউএফএল, কাফকো এবং শিকলবাহা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের গ্যাস সংযোগ আলাদা করে দেয়া হচ্ছে। গ্রিড থেকে নিয়ে শুধুমাত্র এলএনজি প্রবাহের সাথে যুক্ত করে দেয়া হচ্ছে উক্ত তিনটি বৃহৎ গ্রাহককে। এতে চট্টগ্রামে নিরবচ্ছিন্ন সার উৎপাদনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের। তারা বলছেন, চট্টগ্রামের গ্যাসের গ্রিড লাইন থেকে উক্ত তিনটি বৃহৎ গ্রাহককে আলাদা করে দেয়ায় চট্টগ্রামে গ্যাসের প্রবাহও বৃদ্ধি পাবে। আনোয়ারা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত পাইপ লাইনের সাগরের তলদেশের অংশে শেষমুহূর্তে সমস্যা ধরা পড়ায় এলএনজি সরবরাহ এবং গ্রিড ম্যানেজমেন্ট নিয়ে নতুন করে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

পেট্রোবাংলা এবং কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গতকাল দৈনিক আজাদীর সাথে আলাপকালে জানান, চট্টগ্রামে বেশ কয়েকবছর ধরে চলে আসা গ্যাস সংকট ঘুচাতে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। নানা প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে অবশেষে চট্টগ্রামে এলএনজি সরবরাহ শুরু হয়েছে। দৈনিক পাঁচশ’ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি চট্টগ্রাম হয়ে ন্যাশনাল গ্রিডে যাওয়ার কথা। দক্ষিণ দিকের পাইপ লাইন হয়ে চট্টগ্রামে এলএনজির প্রবাহ যত বাড়বে উত্তর দিক থেকে আসা প্রাকৃতিক গ্যাসের যোগান তত কমিয়ে দিয়ে একটি সমন্বয় করার কথা। চট্টগ্রাম থেকে সাশ্রয় হওয়া প্রাকৃতিক গ্যাস ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সরবরাহ দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। দৈনিক পাঁচশ’ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি গ্রিডে দেয়ার জন্য দু’টি সিজিএস (সিটিগেট স্টেশন) নির্ধারণ করা হয়। মহেশখালী থেকে আনোয়ারার সিজিএস পর্যন্ত ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের ৯১ কিলোমিটার পাইপ লাইন নির্মাণ করা হয়। আবার আনোয়ারার সিজিএস থেকে ফৌজদারহাটের সিজিএস পর্যন্ত ৪২ ইঞ্চি ব্যাসের ৩০ কিলোমিটার পাইপ লাইন স্থাপন করা হয়। এই ৩০ কিলোমিটার পাইপ লাইন স্থাপন পুরো প্রকল্পটিকে ঝুলিয়ে দিয়েছিল। দফায় দফায় তারিখ পরিবর্তন করতে হচ্ছিল এই পাইপ লাইনের কাজ শেষ না হওয়ায়। অবশেষে পাইপ লাইনটি ঠিকঠাক করে সব আয়োজন চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আবারো সমস্যা দেখা দেয় সাগরের তলদেশের বিশাল এই পাইপে। এতে করে আনোয়ারার সিজিএস থেকে ফৌজদারহাট সিজিএস পর্যন্ত পাইপ লাইনটি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে শুধুমাত্র আনোয়ারা সিজিএস দিয়ে কর্ণফুলী গ্যাসের রিং মেইন লাইনে গ্যাস দেয়া হচ্ছে।

ফৌজদারহাট সিজিএস কার্যকর করা সম্ভব না হওয়ায় নতুন একটি সংকট দেখা দিয়েছে। মহেশখালী থেকে দৈনিক পাঁচশ’ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস চট্টগ্রামের দিকে পাঠানোর কথা থাকলেও আনোয়ারা সিজিএস দিয়ে এই গ্যাসের পুরোটা গ্রহণ করা সম্ভব হবে না। আনোয়ারা সিজিএস দিয়ে দৈনিক তিনশ’ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস রিং মেইন লাইনে প্রবেশ করানো যাবে। আর এতে করে দুইশ’ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রতিদিন কম গ্রহণ করতে হবে কর্ণফুলীকে। দৈনিক তিনশ’ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজির সাথে গ্রিড থেকে এক থেকে দেড়শ’ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলে চট্টগ্রামে গ্যাসের আকাল পুরোপুরি ঘুচে যায়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ন্যাশনাল গ্রিডে গ্যাসের যোগান নিয়ে। আবার পাঁচশ’ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের অবকাঠামো গড়ে তুলে তিনশ’ মিলিয়ন নেয়াও অর্থনৈতিকভাবে ফিজিবল না।

এই অবস্থায় পেট্রোবাংলা পুরো বিষয়টি নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী এবং বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আনোয়ারা সিজিএস দিয়ে বর্তমানে যেই তিনশ’ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আসছে তার থেকে কাফকো, সিইউএফএল এবং শিকলবাহা বিদ্যুৎ কেন্দ্র একশ’ বিশ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস ব্যবহার করবে। ফলে চট্টগ্রামে মূলত গ্যাস আসবে ১৮০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। কিন্তু কাফকো, সিইউএফএল এবং শিকলবাহা বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে গ্রিড থেকে আলাদা করে দিয়ে যদি সরাসরি এলএনজি লাইনে যুক্ত করে দেয়া যায় তাহলে তাদের প্রয়োজনীয় গ্যাস আনোয়ারা সিজিএসএর আগেই উক্ত তিন গ্রাহকের কাছে পৌঁছে যাবে। আনোয়ারা সিজিএস দিয়ে তিনশ’ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের পুরোটাই চট্টগ্রামের রিং মেইন লাইনে প্রবেশ করবে। বিশেষজ্ঞদের এই পরামর্শের প্রেক্ষিতে সিইউএফএল, কাফকো এবং শিকলবাহা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের গ্যাস লাইন আলাদা করে দেয়া হচ্ছে।

রাষ্ট্রায়াত্ত্ব সার কারখানা সিইউএফএল এবং বহুজাতিক সার কারখানা কাফকো বহুদিন ধরে গ্যাসের সংকটে রয়েছে। এই দু’টি কারখানা গড়ে ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস ব্যবহার করে। কিন্তু গ্যাসের আকাল শুরুর পর থেকে এই দু’টি কারখানা কখনো একই সাথে উৎপাদনে যেতে পারেনি। একটি চালু করলে অপরটি বন্ধ করে রাখতে হয়। আবার কখনো কখনো বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে দু’টি সার কারখানাই একই সাথে বন্ধ করে রাখতে হয়। বিদ্যমান এই পরিস্থিতিতে মহেশখালী আনোয়ারা এলএনজি সরবরাহ লাইন থেকে এই দু’টি কারখানাকে গ্যাস দেয়া হলে এগুলো নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন চালাতে পারবে। শিকলবাহা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অবস্থাও একই। দৈনিক ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের। কিন্তু এটি কখনো গ্যাস পায়, কখনো পায় না। কখনো যৎসামান্য গ্যাস দেয়া হলেও বেশির ভাগ সময়ই বন্ধ থাকে। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিকেও সরাসরি এলএনজি লাইনে যুক্ত করে দেয়া হচ্ছে। এতে করে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিও নিয়মিত উৎপাদন চালাতে পারবে।

দু’টি বৃহৎ সার কারখানা এবং একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সরাসরি এলএনজি লাইন দেয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার খায়ের আহমদ মজুমদার। দৈনিক আজাদীর সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, আমরা উক্ত তিনটি প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহ নিয়মিত করতেই বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছি। এতে চট্টগ্রামের উত্তরাংশে থাকা অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো উপকৃত হবে। এই পরিকল্পনার ফলে চট্টগ্রামে গ্যাসের যোগান অন্তত একশ’ মিলিয়ন ঘনফুট বেশি আসবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের গ্যাস লাইন আলাদা করার কাজ শুরু হয়েছে বলেও তিনি জানান।

x