কাঠিমেম

জায়েদ ফরিদ

মঙ্গলবার , ২৩ এপ্রিল, ২০১৯ at ১১:০০ পূর্বাহ্ণ
22

(আফ্রিকার দক্ষিণাংশে অবস্থিত বোট্‌সওয়ানার এক সতীর্থ কলমনবীশের মুখ থেকে শোনা খণ্ড খণ্ড কাহিনী অবলম্বনে রচিত)

নিরিবিলি খই পল্লী। উঠানের তৃণ-রোমশ বুকে জংলি ঘরের ছায়া ফেলেছে হেলে পড়া মরুর তাতাল। হরিণ শিকারের আয়োজনে হাড়ের তৈরি তীরের ফলায় গুবরে পোকার বিষ মাখছিলো মঙ্গো।
তৃণঝোপের জটাজালে আটকে প’ড়ে কয়েক নিঃশ্বাস জিরিয়ে নিলো বাথান-সাহেবের সাফারি-জিপ। ক্ষণিক-বিরতি পেয়ে ধুলট কাঁচ নামালো অস্থির এক শাদা মেম। নীল চোখে গেঁথে নিলো ছোট পল্লীটা।
বাথানে গিয়ে একটু খোঁজ-খবর নেয়া দরকার, ভাবে মঙ্গো, অনেকেরই আজকাল রাখালের চাকরি জুটে যাচ্ছে।
পশ্চিম কালাহারির এ অঞ্চলটাতে তৃণঝোপের দৌরাত্ম্য একটু বেশি। সঠিক সময়ে গবাদি পশুর বাথানে পৌঁছেও অবাক হলো সৌর-কেশী হেনরিয়েটা। ব্যস্ত স্বামীর দেখা নেই তখনো। অভ্যর্থনা জানাতে তাকে ঘিরে ধরেছে একঝাঁক তামাটে- হলুদ খই ছেলেমেয়ে।
জ্ঞাতি-সূত্র বিষয়ে গবেষণারত অক্সফোর্ডের ছাত্রী সে। থিসিসের প্রয়োজনীয় উপাদান সামনে এগিয়ে দিয়ে কেন পিছিয়ে গিয়েছে উইলিয়াম সঠিক বুঝে উঠতে পারে না হেনরিয়েটা। বিরক্তির বোঝা ঠেলে সরিয়ে দেয় পারিপার্শ্বিকতার প্রতি। জীবনে প্রথমবার সে যেন অনুভব করে এক স্বকীয় প্রভা, একরাশ চকচকে তামার পাপড়িতে রূপালি গর্ভকেশর হয়ে ফুটে উঠেছে সে।
মাথার ক্লিপ থেকে স্লিপারের ফুল পর্যন্ত খুঁটে খুঁটে দেখছে ছেলেমেয়েগুলো। ঢিলেঢালা কমলা ম্যাক্সির ফোঁকল গলে বেরিয়ে এসেছে খড়িমাটি-রঙা হাত-পা আঙুল। উৎসুক হয়ে কেউ কেউ ছুঁয়েও দেখছে তাকে। মোড়কে লুকোনো দেহের আকার-আকৃতি বেশ দুর্বোধ্য মনে হচ্ছে তাদের। দীঘল বল্লীদেহে স্বাভাবিক বক্রতার কোনো আভাস পায় না তারা, তাই সরলভাবেই তাকে চিহ্নিত করে কাঠিমেম নামে।
নতুন বাংলো-বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দ্যাখে কাঠিমেম। ইংল্যান্ডে এমন একটা বিশাল বাংলোর কথা ভাবাই যায় না। দোতলায় ঝুলন্ত বারান্দা সংলগ্ন অন্ধকার একটি বিশ্রাম কক্ষে ঢুকে পড়ে সে। শ্রান্ত হয়ে অপেক্ষা করে সোফায়, একটু পরেই ওপরে উঠে আসবে উইলিয়াম।
ধক্‌ ধক্‌ শব্দে বৈদ্যুতিক জেনারেটরের আওয়াজ কানে আসতেই ঝলমল করে উঠলো পালিশ করা কাঠের অভ্যন্তর। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলো কাঠিমেম- শো-কেসের মধ্যে সাজানো সারি সারি অনেকগুলো রাইফেল। এর কয়েকটিতে স্যুটিং ক্লাবের দূরপাল্লার রাইফেলের মতো দূরবীন লাগানো। এমন সুনসান পরিবেশে নিরাপত্তাবোধকে সে অস্বীকার করতে পারে না।
উইলিয়ামের দেরি দেখে বারান্দায় বেরিয়ে আসে কাঠিমেম। সন্ধ্যার আবছা আলোয় দেখতে পায় দূরে কাঁটাতার ঘেরা একটি জায়গা। ধোঁয়ামলিন অন্ধকারে তার পাশ দিয়ে বাংলোর দিকে হেঁটে আসছে দুজন বন্দুকধারী।

নতুন মরু-পরিবেশে কাঠিমেমের ঘুম পালিয়ে যায়, বাংলোর জানালা গ’লে দূরে, প্রত্যন্ত জনপদে। বাথানের প্রবেশপথে তামার পাপড়িগুলো খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হয়ে ফিরে আসে রাত্রির গভীরে। তৃণঝোপের চূড়ায় চূড়ায় মরু-তাতালের অঙ্গার-প্রভা জ্বলে ওঠে। বাথানে ঘুরতে বের হয় কাঠিমেম। সঙ্গে ভাঙা ইংরেজি-জানা বান্টু ড্রাইভার।
কাঁটাতার ঘেরা জায়গাটি চোখে পড়তেই জিপ থামাতে বললো কাঠিমেম।
বান্টু তাকে বোঝালো, ‘বছর দুই আগে এই এলাকাটি জংলি খইদের আস্তানা ছিলো, এখন এটা আমাদের দখলে। এই জলাশয়ে একদিন একটা খই মরে ভেসে ছিলো। সাহেব এরপর বেড়া দিয়েছে। তার কড়া হুকুম- একটা কুকুরও যেন এখান থেকে পানি পান করতে না পারে। আমাদের অঢেল পানি, যন্ত্র তুলে আনে পাতাল থেকে। জংলি খইরা একবার হৈ-চৈ করতে এসে সাহেবের গুলির আওয়াজে পালিয়েছে। অনেক দূরে সরে গেছে ওরা, এদিকে তেমন একটা আসে না। ইদানিং সাহেব দয়াপরবশ হয়ে রাখালের চাকরি দিয়েছে অনেককে।’
বাথানের সীমানা ঘেঁষে চৌচক্র-টানে এগিয়ে চলেছে জিপ, পথরোধকারী তৃণঝোপ অবজ্ঞা করে। সামনেই সারি বাঁধা পুতুলের ঘর-বাড়ি। এতক্ষণ প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে ডালপালাসহ এমনভাবে মিশে ছিলো যে চোখে পড়েনি। দূর থেকেই ঘরগুলোর নির্মাণ-কাঠামো আর উপাদান দেখে বুঝে নিলো নৃতত্ত্বের ছাত্রী– ওগুলো আফ্রিকার বিলীয়মান খইভাষীদের আস্তানা ছাড়া আর কিছু নয়।
জিপ থামাতেই পোষা পায়রার মতো ছুটে এলো একপাল ছেলেমেয়ে। কাঁধের ঝোলা থেকে মুঠি মুঠি ম্যাকিনতোশ চকলেট বিলিয়ে খই-সুরের মৌ-গুঞ্জন উপভোগ করছে কাঠিমেম। নাঙা পায়ে দুটি খই যুবতী দুধ ভরা বালতি হাতে দাঁড়িয়ে পড়লো ভিড়ে। চ্যাপ্টা মুখের উপর মঙ্গোলীয় চোখ আর নিগ্রোপ্রতীম নাক বসানো মেদহীন সুঠাম গড়ন। মেয়েদের নগ্ন নিসর্গ বুকে জমাট বেঁধে আছে পৌরাণিক তাম্র-কান্তি। সেদিকে হঠাৎ বিজাতীয় বান্টু ড্রাইভারের চোখ পড়তেই পাশ ফিরলো মেয়েরা। পার্শ্বদেশে স্পষ্ট হয়ে উঠলো অপ্রতুল পশুচর্মে ঢাকা কাগজী-বোলতার মতো সুডোল নিতম্ব। এমন অদ্ভুত নিতম্ব-ঢেউ সারা ইউরোপে কোথাও দ্যাখেনি কাঠিমেম। বিশ্বকোষের তাত্ত্বিক বর্ণনার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অনুপম ভাস্কর্য মূর্ত হয়ে বিস্ফারিত করে দিলো তার চোখ দুটো। একসময় এই শিকারি সংগ্রহকারী জাতি গোটা আফ্রিকাতেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো। কৃষ্ণাঙ্গ আর শ্বেতাঙ্গরা তাদের তাড়িয়ে এনে হাজির করেছে বিজন মরু কালাহারির কাঠগড়ায়। তাদের অপরাধ প্রকৃতির কোলে বাস করে ইট বানানোর জরুরী কাজটাকে তারা অবজ্ঞা করেছে।
মেয়েদুটোর সাথে কথা বলার প্রবল ইচ্ছেটা সংবরণ করে কাঠিমেম। খই ভাষার বিন্দুবিসর্গও বোঝে না সে। শুধু খেয়াল করে, তাদের দ্রুতলয়ের কথার সাথে সাথে অনুরণিত হচ্ছে পিয়ানোর নিচু সপ্তকের কিছু টুংটাং ঝট্‌কা সুর। পৃথিবীর অন্য কোনো জাতি এমন অদ্ভুত সুর মিশিয়ে কথা বলে, জানা নেই কাঠিমেমের। খইদের নিয়ে ভাবতে শুরু করে কাঠিমেম। যত দুর্বোধ্য আর কষ্টসাধ্যই হোক, খই ভাষাটা তার আয়ত্ত করা চাই। তাদের সুখ-দুঃখ বোঝার ইচ্ছেটা ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে তার।
ভিড়ের মধ্যে কাঠিমেমকে অভিবাদন করে দাঁড়ায় মঙ্গো। প্রথমে ঝটকা সুরে তার নামটা বলে। তারপর ইশারায়-ইঙ্গিতে প্রাণপণ বোঝাতে চেষ্টা করে– জলের অভাবে তাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত; বাথানে কোনো রাখালের চাকরি পেলে পরিবারসহ বেঁচে যাবে তারা। কিন্তু উইলিয়াম জানিয়েছে– বাথানে গবাদি পশুর চালান না এলে নতুন কোনো লোক নিয়োগ করা যাবে না। যুক্তি বিপক্ষে হলেও কাঠিমেম তাকে আশাহত করে না, খোঁজ নিতে বলে দু-তিন মাস পর।

একটি খই যুবতীর হাত থেকে দুধ ভরা বালতি নিয়ে ইঙ্গিতে আতিথ্য করে কাঠিমেম, ‘একটু দুধ পান করে যাও।’
মঙ্গো ইতস্তত বোধ করলে ঝটকা হাসিতে খই যুবতীদের কেউ তাকে উৎসাহিত করে, ‘যতোটুকু পারিস টেনে নে মঙ্গো। আর যদি রাতটা আমাদের সাথে থাকিস দুধ বৃষ্টিতে তোকে স্নান করিয়ে দেবো।’
বালতিতে মুখ ডুবিয়ে যুবতী-টানকে উপেক্ষা করে পিপাসার্ত মঙ্গো।

শীতের শুরুতে মরু-তাতাল কিছুটা নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। অসময়ে গোটা কয়েক স্প্রিংবক হরিণ মারা পড়েছে আজ। দু’দিন অর্ধ-উপবাসের পর ভুঁড়িভোজের আয়োজনে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে শীতোষ্ণ খই পল্লী। খোদাই করা কাঠের পাত্রে জমা করা হয়েছে ভেষজ আরক মেশানো কিছু রক্ত। মাঝখানে অঙ্গারের সাথে জঠরের আগুনে জ্বলছে ক্ষুৎপীড়িত নর-নারী। সর্দারের মেয়ে কোরার চোখে ক্ষুধা অতিক্রান্ত এক অতিরঞ্জিত লাল শিখা, কেঁপে কেঁপে খুঁজছে কোনো শীতল করা অনুভূতি। আগুন তার পেছনে ছড়িয়েছে অস্থির অনিশ্চিত ছায়া। সেই ছায়াপথে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসে কেউ।
তামা-ঠোঁটে মিষ্টি হাসে কোরা। তার অনবরত জোনাক জ্বলা দেহটা ধনুক-বেঁকে গভীরভাবে ছুঁয়ে দেয় মঙ্গোকে। অদৃশ্য একটা বিষমাখা তীর এসে বিঁধে যায় মঙ্গোর বুকে। হাত-পা তার অবশ হয়ে আসে শরাহত হরিণের মতো। আবার মিষ্টি হাসে কোরা, খই মুদ্রায় দু’হাত ঘুরিয়ে কিছু একটা আবদার করে সে। মঙ্গো যুবক-লজ্জায় ঝলসানো হরিণের দিকে দৃষ্টি ফেরায়– খই নিয়ম অনুসারে বিয়ের আগে সন্তান চাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।
এবার স্পষ্ট করে দুটি আঙুল দেখায় মেয়েটি। মঙ্গো থিতু গলায় ফিসফিসিয়ে বলে, ‘এ-সব কাজে অনেক সময় লাগে– বুকে তোর মরুলা ফল গজালেও মাথায় তেমন বুদ্ধি গজায়নি।’
কোরার বুক শিরশির করে। হাঁটু মুড়েও মরুলা ফলের কাঁপুনি বন্ধ করতে পারে না সে। অস্থিরতা লুকিয়ে বলে, ‘ঠিক আছে তোকে পাঁচ আঙুলের এই পাঁচটা দিন সময় দিলাম।’
পাঁচ দিনে দুটো বাচ্চা, পাগল নাকি মেয়েটা! শীঘ্রই বিভ্রান্তির ঘোর কেটে যায় মঙ্গোর। যমজ শিশু নয়, কোরা তাকে একজোড়া উটপাখির ডিমের কথা বলেছে। এবার সত্যি ঘাবড়ে যায় মঙ্গো। তার চেয়ে আরও দুহাত গলা-লম্বা পাখির ডানার তলা থেকে ডিম সরিয়ে নেয়া সহজ কাজ নয়।
তার ভীতু ভাব দেখে অভয় দেয় কোরা, ‘উটপাখি দেখতে যত বড়ই হোক আদতে সে কাপুরুষই। বিপদ দেখলে বালিতে মুখ গুঁজে থাকে ভয়ে।’ বৃষ্টির জল সম্পূর্ণ নিঃশেষ হবার আগেই ডিমের পিপে ভরে রাখতে চায় কোরা, তৃষ্ণাময় ভবিষ্যতের জন্যে। কষ্টের কথা ভেবে নিজেকে টানটান সাহসী করে তোলে মঙ্গো, কাল সকালেই উটপাখির সন্ধানে বের হবে সে।
খই পল্লীতে কাতর ঘুমে রাত্রি গড়িয়ে চলে পিপাসার্ত ভোরে। যে যেদিকে পারে ছিটকে বেরিয়ে পড়ে জলের সন্ধানে। ঘুম থেকে উঠে একটা বুনো বেল ভেঙে তৃণের জঙ্গলে পা বাড়ায় মঙ্গো। কোরা এসে পথ আগলে দাঁড়ায়, ‘একা কখনো উটপাখিকে ভোলানো যায় না, ওরা সহজ সরল খই মেয়ে নয়। চল্‌ আমিও যাবো তোর সাথে।’
কোরার আজ সকালের কথাগুলো মেলাতে পারে না মঙ্গো। কিছুটা বিভ্রান্ত হয়েই সঙ্গে নেয় তাকে।
ঝোপঝাড় ডিঙিয়ে যেতে যেতে একসময় থম্‌েক যায় দু’জন। কালো রঙের একটি পুরুষ উটপাখি পাখা বিস্তার করে সূর্য আড়াল করেছে। পাখিটা ডিমে তা’ দিচ্ছে না। শুধু উষ্ণতা থেকে ভ্রুণাক্ত ডিমকে রক্ষা করছে ছায়া দিয়ে।
একটি বাঁকা ডাল আর মাথার উপর ধূসর-রঙা ঘাস চাপিয়ে নকল উটপাখি সাজে মঙ্গো। ধীর পায়ে এগিয়ে যায় পাখিটার দিকে। উটপাখি ভাবে, দলের কোনো উট-বিহঙ্গী হয়তো ফিরে আসছে পালাবদলের কাজে। কৌতূহলে পা পা এগিয়ে যায় নকল পাখিটার কাছে। এক পর্যায়ে সন্দেহ গাঢ় হলে প্রচণ্ড গতিতে রুখে যায় তার দিকে। লু-হাওয়ার বেগে ছুটে আসা রুষ্ট পাখিটার সাথে দৌড়-প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে মঙ্গো। পড়িমরি করে বার দুয়েক ডিগবাজি খেয়েও প্রাণপণ দৌড়াতে থাকে সে। সামনে এক বাবলা গাছ পেয়ে তর তর করে উঠে পড়ে উঁচু ডালে।
বাবলা-পাতার চালুনি-ফুটোয় দৃষ্টি বিঁধিয়ে দেখতে পায় মঙ্গো– দুহাতে দুটো ডিম নিয়ে কৌশলে সরে পড়ছে কোরা।
চিল-চক্কর ঘোরা পথে শ্রান্ত হয়ে ফিরে আসে কোরা। শুকনো ঘাসের ডগার মতো শুকিয়ে বিবর্ণ হয়েছে কোরার ঠোঁট দুটো। তার ছোট ছোট হাতে বিঘত আকারের দুটো শাদা ডিম, যেন জলে ভরা। সাবধানে মঙ্গোর হাতে একটিকে গড়িয়ে দিয়ে বলে,’পাত্রের যোগাড় হলো, এবার পাতাল থেকে জল তুলবে কে? খইদের নিরাশ করে এ-বছর সাত তাড়াতাড়ি শুকিয়ে গেলো মরু-বৃষ্টির জল, দেড় মাসও টিকলো না। এদিকে বাথান-সাহেবের দখল করা জলাশয়ের পথও বন্ধ। দুই বান্টু দিনরাত পাহাড়া দিচ্ছে বন্দুক ঘাড়ে।’
মাটিতে বুক ঢেকে ক্লান্তিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে কোরা। এক-দমকা খই-হাওয়া কোমর ঢাকা হরিণ-চামড়ার পাট খুলে লজ্জায় বাবলা গাছের চারদিকে ঘুরপাক খায়। অবসন্ন মনে মুহূর্ত গোনে কোরা….। স্পর্শ করার লোভটা সংবরণ করে মঙ্গো। তৃষ্ণার্ত হাতদুটো অস্ট্রিচের ডিমে বিকল্প মসৃণতা খোঁজে। মনে পড়ে, বাথানের খই মেয়েদের কাছ থেকে শোনা কাঠিমেমের নিতম্বপ্রীতির কথা। খই-নিতম্বিনীর হাতে বাল্‌িত ভরা এক-দীঘি দুধ এমন একটা বাল্‌িত কি কোরার হাতেও থাকতে পারে না!
তেষ্টায় গলা কাঠ হয়ে আসে মঙ্গোর। হঠাৎ মনে হয়, পিপাসার কথা বলেছিলো কোরা। হাতের ডিমটা ভেঙে ফেলতে ইচ্ছে হয়, পারে না সে, তন্দ্রালু কোরার হাতটা শেষ অবলম্বনের মতো আঁকড়ে ধরে আছে পিপে। জলসঙ্কটের বিভীষিকায় ভবিষ্যতের কল্পনাকে গাছতলায় রেখে গা-ঝাড়া দিয়ে দাঁড়ায় মঙ্গো। একপলক ঘুম-গোলাপি চোখের পাতা নাড়ে কোরা। মঙ্গো সাবধান করে, ‘ডিম দুটো সামলে রাখ্‌, বানর আসতে পারে।’
বাবলা গাছের ঝিরিপাতায় জমেছে কুয়াশার মতো কণা কণা মধু। তড়িঘড়ি করে পিঁপড়েরা চলেছে শীতের সঞ্চয়ে। পথভ্রষ্ট হয়ে দলের কেউ কেউ কোরার খোলা বুকে বিভ্রান্তিতে ভোগে। জঙ্গলে এমন খাদ্যগন্ধী ভূ-প্রকৃতির সাথে তারা আদৌ পরিচিত নয়। কনুইয়ে ভর করে কাঁধের ওপর আলগোছে মাথাটা এলিয়ে দেয় কোরা, যেভাবে মাটির উপর খইরা ঘুমিয়ে থাকে। শরীরটাকে কাত করে জঙ্ঘা দিয়ে ঢেকে রাখে কষ্টার্জিত জলের পিপে দুটো।
কাছেই শুকনো কাঁটাঝোপের পাশে আঙুল চারেক এক শুকনো ডগা পরীক্ষা করে মঙ্গো। হাত দেড়েক গর্ত করে একটি রসালো বুনো আলু তুলে নিয়ে ফিরে যায় কোরার কাছে। ফ্লিন্ট পাথরের ধারালো রেঁদা চালিয়ে আঁচড়ে নেয় একমুঠো ছালবাকলা। দুহাতে প্রাণপণ লেবুচিপা করে কোরার মুখে নিঙড়ে দেয় আঙুলের স্বেদসহ কয়েক ফোঁটা ভেষজ রস।

সারারাত উত্তর আকাশের রক্তিম আর্দ্রার দেহে মঙ্গোর উষ্ণতা খোঁজে কোরা। ঘুম ভাঙে বেশ দেরিতেই। ধীর পায়ে এগিয়ে যায় মঙ্গোর ঘরের দিকে। আর সব ঘরের মতোই সাধারণ একটি ঘর। এক সারি ধনুক-বাঁকা ডালের ওপর কয়েক চাঁই ঘাসের বহর। অস্থায়ী নিবাসে এর চেয়ে বেশি কিছু বাহুল্য মনে করে খইরা। তবু তার ঘরের খিলানে পাখির পালক, নিচে হরিণ চামড়ার ফরাশ তাকে জলাশয়ের মতো টানে। মঙ্গোর সাথে এই ফরাশে রাত্রি কাটাতে চায় সে। সন্তানসম্ভবা না হলে বিবাহের দলিলটা হাতে পাবে না সে। খই জাতির এই লজ্জাকর ভালোবাসার পরীক্ষাটা তার ভালো লাগে না।
খালি ঘরে ঢুকে ফরাশে এলিয়ে পড়ে কোরা। খিলানে পালকের কারুকাজ দেখে দেখে ঘুম-চোখে তৃষ্ণা ভোলে সে। দুটো ফাঁপা নল হাতে ফিরে আসে মঙ্গো। ক্লান্ত কোরাকে বিছানায় দেখে বলে, ‘তুই না হয় ঘুমো, আমি পিপের জন্যে জল খুঁজে আসি।’ কোরা তার পিপাসার্ত সত্তাকে দুভাগ করে একটিকে শুইয়ে রাখে হরিণ-ফরাশে, অন্যটিকে নিয়ে উঠে পড়ে অনিচ্ছাসত্ত্বেও।
চারদিকে ঝোপঝাড়ের শুষ্ক দৃশ্য দেখে শঙ্কিত হয়ে ওঠে সন্ধানীরা। তবে কি এবার পশ্চিমের বান্টু অঞ্চলে জল-ভিক্ষায় বেরুতে হবে! একদিনের হাঁটাপথের দূরত্বে পৌঁছে গেছে শাদা সাহেবরা। খইরা সাহেবদের চোখের বিষ। তারা ব্যঙ্গ করে, খইরা ভয়ানক জংলি, বুশম্যান। বান্টুরা বদলে গেছে কৃষকের জাতে। বাথানে রাখালের কাজগুলো তাই ওদেরই জোটে বেশি।
মঙ্গো ভাবে, কোরাকে সাথে নিয়ে একবার কাঠিমেমের সাথে দেখা করা দরকার। আর কোনো সুবিধা না হোক. মেমের কাছ থেকে অন্তত দু’বাটি দুধ পান করা যাবে।
দু’জোড়া পিপাসার্ত মরু-চোখে খানাতল্লাশি চলে চৌদিকে। জন্ডিস আক্রান্ত তৃণঝোপের মধ্যে চোখে পড়ে এক চিলতে টিয়ে-সবুজ রঙ। ঝোপের কাছাকাছি একটা সমতল জায়গা বেছে নিয়ে খই-শিয়ালের মতো মাটি খুঁড়তে থাকে ওরা। হাত দুয়েক গর্ত করার পর কাঠের শাবলটা ভিজে ওঠে। নরম বালির মধ্যে দুটো লম্বা নল পুঁতে দেয় মঙ্গো, পাশে রাখে দুটো শাদা পিপে। একটি নলকে পালাক্রমে চুষতে থাকে ওরা। হঠাৎ মুখ ভরে ওঠে কাদা-জলে। পিপে ভরার চেষ্টা ক্রমাগত ব্যর্থ হতে থাকে। অক্লান্ত খই-খাটুনিতে যতটুকু জল উঠে আসে ওপরে তার চেয়ে বেশি ঘাম ঝরে যায় তাদের গা থেকে। অগত্যা দুটো বুনো ওল সংগ্রহ করে পল্লীর পথে পা বাড়ায় সেদিনের মতো।
পরদিন গাছে দুটো বেবুন দেখে দাঁড়ালো দুজন। কাছেই কয়েকটি গেরুয়া উঁইয়ের ঢিবি, প্রায় বুক সমান উঁচু। কোরার ঝুলি থেকে কিছু বীজ নিয়ে চিবুতে থাকে মঙ্গো। মনোযোগী হয়ে ওঠে বেবুনরা। ঢিবির দেয়ালে মাপ-জোক করে একটি গর্ত খুঁড়লো সে। গর্তের মুখটা সরু হলেও ভেতরটা প্রশস্ত। বেবুনদের দেখিয়ে দেখিয়ে সেই গর্তের ভেতর দু’মুঠো বীজ রেখে সরে দাঁড়ালো তারা। অনুসন্ধিৎসু ছোকরা-বেবুনটা গর্তে হাত ঢুকিয়ে মুঠি ভরে নিলো বীজে। স্ফীত মুষ্ঠি আটকে গেলো গর্তের ছোট মুখে। প্রাণীটা মুঠি খুললো না, হাতটাও আটকে রইলো। কুমা করা রজ্জুতে সহজেই তাকে বন্দি করে ফেললো মঙ্গো, বেঁধে রাখলো গাছের সাথে। কোরা ঝুলি থেকে লতাপাতাভোজীদের প্রিয় কিছু লবণ-কেক বের করে ছড়িয়ে দিলো বেবুনের সামনে। কিছুক্ষণ নাড়াচাড়ার পর লবণের টুকরোগুলো খেয়ে পিপাসার্ত হয়ে পড়লো বেবুন। অল্পক্ষণের মধ্যেই পিপাসায় চিৎকার শুরু করলে কোরা তার বাঁধন খুলে দিলো।
বেবুন ছুটে চলেছে। মঙ্গো আর কোরা সন্তর্পণে দৌড়াচ্ছে তার পেছন পেছন। দীর্ঘ পথ লাফ-দৌড়ের পর বেবুনটি হঠাৎ ঢুকে পড়লো ভূগর্ভের এক চিকন ফাটলে। উঁকি মেরে দেখলো মঙ্গো– পিপাসার্ত বেবুন উবু হয়ে জলপান করে চলেছে। জলাধারের প্রবেশপথ বেশ সঙ্কীর্ণ। বড় আকারের বন্য জন্তুরা তৃষ্ণা মেটানোর সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে এখনো জমে আছে বেশ খানিকটা অব্যবহৃত জল।
জলাধার আবিষ্কারের আনন্দকে ভাগ করে উল্লসিত হয়ে ওঠে খই পল্লী। সর্দার মেয়েকে আদর করে, মঙ্গোকে সম্মান করে বুদ্ধিমান আখ্যা দিয়ে। কোরা মায়ের কাছে মঙ্গোর সাথে রাত্রিযাপনের ব্যাপারটা ইনিয়ে বিনিয়ে বলে ফ্যালে। মা তার অতীত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে মেয়ের হাতে নেশাকর দু’মুঠো শুকনো মরুলা ফল তুলে দেয়– এ ফলের নিশি-গুণে বিয়ে-পর্বটা দ্রুত এগিয়ে আসে।

খইরা নতুন করে পল্লী সরিয়ে এনেছে জলাধারের কাছে। মাস-দুয়েক পরে জল শুকিয়েছে সেখানেও। শিকারি পুরুষরা ক্রমাগত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে খই-নারীদের ভেষজ খাবার সংগ্রহে। শীতার্ত পল্লীতে আবার কাতর রাত্রি গড়িয়ে চলেছে তৃষ্ণার্ত ভোরে। যে যেদিকে পারে ছুটছে জলের সন্ধানে। মঙ্গোর ঘরের মেঝেতে উত্তরাধিকারে প্রাপ্ত অনেকগুলো জলের পিপে পুঁতে রেখেছে কোরা। বৃষ্টি নামা পর্যন্ত এগুলো কি টিকে থাকবে? অজানা শংকায় বুক তার তৃণডগার মতো শুকিয়ে ওঠে।
কোরাকে সঙ্গে নিয়ে মঙ্গো যখন বাথানে পৌঁছুলো তখন কাঠিমেম সেখানে নেই, রয়েছে সাহেব। বাথানের কোণে নতুন একটা স্কুলঘর। সুর করে ইংরেজী ছড়া পড়ছে কিছু খই-বান্টু ছেলেমেয়ে। গবাদি পশুর বড় এটা চালান এসেছে। ব্যস্ততার সাথে নতুন লোক কর্মে নিয়োগ চলছে।
বান্টুদের সাথে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ে ওরা। অধিকাংশ বান্টুই কাজ পেয়ে যায় রাখালের। সাহেব তাদের সাথে অনর্গল বান্টু ভাষায় কথা বলে। মঙ্গোর কথা বুঝতে না পেরে বিরক্ত হয় সাহেব। সহকারী বান্টু তাকে আভাসে-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেয়– মঙ্গোকে রাখালের কাজে রাখতে তাদের কোনো আপত্তি নেই কিন্তু সাথের মেয়েটি যেন পল্লীতে ফিরে যায়। মঙ্গোর অনুরোধ টেকে না, সাহেবের নিষেধাজ্ঞা কড়া কথায় শুনিয়ে দিয়ে বান্টু ব্যস্ত হয়ে পড়ে স্বগোত্রীয় লোকের ত্রাণ-কর্মে।
কোরা বুঝতে পারে মঙ্গোর কষ্ট তবু উদাসীন হেসে প্রস্তাব দেয়, ‘আমি ফিরে যাই পল্লীতে, মাঝে মাঝে না হয় তোর সাথে দেখা করে যাবো।’ মঙ্গো তাকে এগিয়ে দেয় অনেকটা পথ, রাস্তায় কোনো কথা হয় না। প্রথম ও শেষ কথা বলে কোরা, ‘আমার তৃষ্ণা মেটানোর দায়িত্বটা একান্তই আমার, ডিমের পিপেগুলো আমি ….’ আর বলতে পারে না কোরা, এক দৌড়ে অদৃশ্য হয়ে যায় কাঁটাঝোপের আড়ালে।
তৃষ্ণার সাথে ঘুমিয়ে পড়েছে রাত্রি। তারার আলোয় নিজ হাতে গড়া খই-ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে দুহাতে মুখ ঢাকে কোরা। তার কেবলই মনে হয়, মঙ্গো আর কখনো ফিরে আসবে না। কাঠিমেমের বাথানে প্রাণভরে দুধ পান করে হয়তো অন্য কোনো খই মেয়ের সাথে ঘুমুবে সে। উটপাখির ডিম তাকে আর কখনো সংগ্রহ করতে হবে না। নাভির নিচ থেকে একটা চিনচিনে ব্যথা উঠে বুকের বাম দিকটাতে ছড়িয়ে পড়ে তার। প্রতিটি প্রশ্বাসে সে অনুভব করে, খই পল্লীতে একটি পিপাসার্ত শিশু ক্রমশ অস্তিত্বময় হয়ে উঠছে।

অন্ধকারে দুহাত দিয়ে কেউ তার কোমরটা জাপটে ধরে…। বিভ্রান্ত হবার আগেই এক নিঃশ্বাসে অনেকগুলো কথা বলে যায় মঙ্গো.. ‘তুই চলে আসার পর কাঠিমেমের সাথে আনেক গল্প হয়েছে আমার। মেম এখন ঝরঝরা খই ভাষা শিখেছে। আমাদের উটপাখি ভোলানোর গল্পটা তাকে বলেছি, সে দুটো উটপাখির ডিম চেয়েছে তোর কাছে, ঘরে সাজিয়ে রাখবে বলে। তোকে সে দুগ্ধ দোহনের কাজটি দিতে চেয়েছিলো। প্রস্তাব শুনে সাহেব রেগে আগুন হয়ে মেমকে একলা ফেলে গাড়ি নিয়ে চলে গেলো। আমাকেই পৌঁছে দিতে হলো বাংলো পর্যন্ত। রাস্তায় যেতে যেতে কাঁটাতার ঘেরা জলাশয়ের পাশে দাঁড়িয়ে বললো– ‘এ পানির মালিকানা তোমাদের, খইদের জড়ো করে তোমরা সাহেবের কাছে জোর দাবি তোলো। আমি সাহেবকে বুঝিয়েছি, কোনো ফল হয়নি। প্রতিজ্ঞা করেছি, তোমাদের হাতে এই জলাশয় তুলে না দিয়ে আমি ফিরবো না। তোমরা শুধু একজোট হও, চারদিকের খই পল্লীতে খবরটা ছড়িয়ে দাও। ঠিক সাতদিন পর ভরদুপুরে, যখন তোমাদের ছায়া খুব ছোট হয়ে আসবে তখনই এখানে হাজির হবে তোমরা। আমিও এখানেই থাকবো।’
নির্ধারিত দিনে ঠিক সময়ে কাঁটাতারের চারদিকে ঘিরে দাঁড়ালো খই-ভাষীরা। তাদের হাতে কাঠের বর্শা, শাবল, তীর-ধনুক। কাঠিমেমকে এগিয়ে আসতে দেখে হৈচৈ পড়ে গেলো তাদের মধ্যে। ভীড় ঠেলে মঙ্গো এগিয়ে এলো তার কাছে। কাঠিমেম খই ভাষায় তাদের অধিকার বুঝিয়ে দিয়ে বললো– ‘এবার তোমরা কাঁটা তারের খুঁটিগুলো উপড়ে ফ্যালো…।’
ঝুপঝাপ শাবলের কসরতে সাহেবের দখলিস্বত্ব্ব চাপা আক্রোশে গজরাতে লাগলো। জলাধারে টহলরত বন্দুকধারী পিছু হটে খবর পৌঁছে দিলো সাহেবের কাছে। বিষমাখা তীরের ভয়ে ভড়কে গেছে বান্টু রক্ষীরা– সাহেবের হুকুম নিঃশেষে গিলে খেয়ে বাংলোর দরজায় ছিটকিনি এঁটে দিয়েছে তারা।

তারকাটা যন্ত্র দিয়ে একটা একটা করে সবকটা তার কেটে দিলো কাঠিমেম। এক ঝাঁক পিপাসার্ত খই ছেলেমেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো জলাধারে। চিৎকার করে আমন্ত্রণ জানালো তাদের প্রিয় কাঠিমেমকে। ঈশ্বরের কাছে বিড় বিড় করে কি যেন প্রার্থনা করলো কাঠিমেম।
খইদের উল্লাসে ফাটল ধরিয়ে হঠাৎ ভেসে এলো একটি গুলির আওয়াজ।
কাঠিমেমের রুপালি শরীর জলাশয়ের পানিতে আছড়ে পড়লো তামার পাপড়িগুলোর মাঝখানে। পিয়ানোর নিচু সপ্তকের সবকটা তার একসঙ্গে বেজে উঠলো খই-রাজ্যে। কোরার হাত থেকে খসে পড়লো উটপাখির দুটো শাদা ডিম।
উদ্ভিদ গবেষক ও গল্পকার
zayedfarid@hotmail.com

x