কাজী নজরুল ইসলাম : শ্রেণী-সংগ্রামের প্রধানতম কবি

এ বি এম ফয়েজ উল্যাহ

শুক্রবার , ২৪ মে, ২০১৯ at ৫:৫৯ পূর্বাহ্ণ
185

বাংলা সাহিত্যে শ্রেণী সংগ্রামের প্রবক্তা কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনিই সর্বপ্রথম বাংলা সাহিত্যে এই শ্রেণি-বিপ্লবের প্রবর্তন করে নবযুগ সৃষ্টি করেছিলেন। সাহিত্যকে মনোরঞ্জনের রংমহলা থেকে টেনে এনে গরিবের ভাঙ্গা কুড়েঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন। কারণ নজরুল ইসলাম ছিলেন স্বাধিকার স্বাধীনতা আন্দোলন ও লাঞ্ছিত বঞ্চিত শোষিত গণ-মানুষের কবি। তাঁর হাতেই সাহিত্য সর্বজনীন রূপ পরিগ্রহ করেছিল।নজরুল ইসলামকে ‘বিদ্রোহী কবি’,‘ সর্বহারার কবি’, ‘প্রেমের কবি’,‘হিন্দু-মুসলমানের মিলনের কবি’, ‘ গানের কবি’ ইত্যাকার অভিধায় বিভূষিত করা হলেও তাঁর হাত ধরেই যে বাংলা সাহিত্যে সমাজতান্ত্রিক ধারার কাব্য রচনার সূচনা ও উৎকর্ষতা লাভ হয়েছে, পৃথকভাবে তার মূল্যায়ন হয়নি।
নজরুলের ‘সাম্যবাদী’ ও ‘‘সর্বহারা’ কাব্যের ভাবসত্য মার্কসীয় শ্রেণী সংগ্রামী-দৃষ্টিভঙ্গির বহু লক্ষণ বহন করছে।মনে রাখতে হবে ‘সর্বহারা’ নামটিও মার্কসীয় ঢ়ৎড়ষবঃধৎরধঃ বা ঐধাব হড়ঃং শব্দের বাংলা অনুবাদ। কাজেই ‘সাম্যের গান, ‘সর্বহারার গান’ কবিতা রচনার সময় নজরুলের মনে মার্কসীয় বা রুশীয় সাম্যবাদ যে গভীরপ্রভাব বিস্তার করেছিল, এ’কথা অস্বীকার করা যায়না।
মার্কস যেখানে বলেছেন,‘ উপনিবেশ ব্যবস্থা পৃথিবীতে পশুবলের ওপর প্রতিষ্ঠিত’ ; নজরুল সেখানে পূর্বজের পথ ধরে বলেছেন,‘ পরের মুলুক লুট করে খায়, ডাকাত ওরা ডাকাত’। ‘তখ্‌তে তখ্‌তে দুনিয়ায় আজ কম্‌বখ্‌তের মেলা’। মার্কসের তত্ত্ব ও গোর্কীর শ্রেণী সচেতনতায় কবি তখন আবিষ্ট। তাঁদের কাছ থেকেই তিনি পেয়েছেন ‘বিপ্লব’ ও ‘শ্রেণী-সংগ্রামের’ প্রেরণা। ঐ সময় নজরুল এক প্রবন্ধে লেখেন,‘ তারপর এলো এই মহাপ্লাবনের ওপর তুফানের মত ভয়াবহ সাইক্লোনের মত বেগে ম্যাক্সিম গোর্কি।.. ..দুর সিন্ধুতীরে বসে কার্ল মার্কস যে মারণমন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন, তা এতদিনে তক্ষকের বেশে এসে প্রাসাদে লুক্কায়িত শত্রুকে দংশন করল। জার গেল-জারের রাজ্য গেল-ধনতান্ত্রিকের প্রাসাদ শাবলের ঘায়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল”। এই প্রেরণা থেকেই কবি তীব্রভাবে অনুধাবন করেছেন, জনগণকে শ্রেণী সচেতন করে তুলতে না পারলে, তাদের অহংবোধকে জাগাতে না পারলে, তাদেরকে বিপ্লবী-মন্ত্রে উজ্জীবিত করতে না পারলে, স্বাধীনতার স্বপ্ন সুদূর পরাহতই থেকে যাবে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাত থেকে স্বাধীনতা লাভ সম্ভব হলেও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ দেশীয় বুর্জুয়া, মহাজন, জমিদার, জোতদার তথা সামন্তবাদী শক্তির যাঁতাকল থেকে মুক্তি লাভ করবেনা। সুসম সম্পদের বনন্টন ব্যবস্থা না থাকলে স্বাধীনতা প্রাপ্তিতে প্রান্তিক-শ্রেণীর, খেটে-খাওয়া মানুষের কোনোই লাভ হবেনা। স্বাধীনতার সোনালি ফসল উঠবে দেশীয় সামন্ত,বুর্জোয়া,জমিদার মহাজনদের ঘরে। তাই শোষিতের পক্ষের জনগণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমের উদ্দেশ্যে কবি তখন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন।
এই প্রসংগে ভারতীয় কম্যুনিস্ট পার্টির নেতা মুজফফর আহমদ তাঁর ‘কাজী নজরুল ইসলামঃস্মৃতিকথা’ বইতে লেখেন, ‘সে (নজরুল ) স্থির নিশ্চিত হয়েছিল যে, চরখা ও খদ্দরের মারফতে স্বাধীনতা কোন দিন আসবেনা। তাই তার মন জনগণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই বিষয় নিয়ে সে কয়েকজন বন্ধুর সংগে বিশেষ করে কুতুব উদ্দিন আহমদ,হেমন্ত কুমার সরকার ও সামসুদ্দিন হোসায়নের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে।স্থির হয় যে তাঁদের চারজন উদ্যোগতা হয়ে একটি দল গঠন করবেন।১৯২৫ সালের নভেম্বর এই দলটি কলকাতায় গঠিত হয়। নাম ‘লেবার স্বরাজ পার্টি’।’ পরে এই দলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘বঙ্গীয় কৃষক শ্রমিক দল’। নজরুলের প্রকাশিত পত্রিকা ‘লাঙল’ ছিল মার্কসীয় ভাবধারায় গঠিত এই ‘বঙ্গীয় কৃষক শ্রমিক দল’র মুখপত্র । সর্বোপরি ‘লাঙল’ ছিল অগ্নিযুগের তৎকালীন সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের বিপ্লবী নেতা-কর্মীদেরও একমাত্র প্রিয় পত্রিকা।
এই দলের প্রথম ইশতেহার,গঠন প্রণালী নজরুলের দস্তখতে ‘লাঙলে’ প্রকাশিত হয়েছিল। ‘সাম্যবাদী’ ছাড়াও ‘ লাঙলে’ প্রকাশিত কবির ‘শ্রমিকের গান’, ‘ধীবরের গান’, ‘ কৃষানের গান’, ‘ কুলি-মজুর’, ‘ রাজা-প্রজা’, ‘ চোর-ডাকাত’, ‘ ফরিয়াদ’ ইত্যাদি সহ বহু কবিতা, গান, প্রবন্ধ ; যা শ্রেণি-বিবেদপূর্ণ সমাজব্যবস্থার শোষণ-শাসন ও আর্থিক অসাম্যনীতির ওপর ভিত্তি করেই রচিত।
ময়মনসিংহের ‘কৃষক-শ্রমিক সম্মেলনে’ পাঠানো বক্তব্যে তার প্রকাশ,-“এই মাঠকে জিজ্ঞাসা কর,মাঠে ইহার প্রতিধ্বনি শুনিতে পাইবে, এই মাঠ চাষার,এই মাটি চাষার, এর ফুল ফল কৃষক বধুর। আমার শ্রমিক ভাইরা, যাহারা আপনাদের বিন্দু বিন্দু রক্ত দান করিয়া হুজুরদের অট্টালিকা লালে লাল করিয়া তুলিতেছে।… তাহারা আজ অবহেলিত,নিষ্পেষিত বুভুক্ষু। তাহাদের শিক্ষা নাই, দীক্ষা নাই,ক্ষুধায় পেট পুরিয়া আহার পায়না,পরনে বস্ত্র নাই”। মানুষে মানুষে বৈষম্য , কৃষক-শ্রমিক শ্রেণীর উপর ধনিক শ্রেণীর শোষণ,নিপীড়ন,নির্যাতন, লুণ্ঠন, কলকারখানা তৈরির নামে কৃষাণের জমিন দখল ইত্যাদি সামাজিক ও রাষ্ট্রিক অসাম্য কবি নজরুলের কাব্যে বিধৃত হয়েছে। পরাধীন ভারতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও দেশীয় ধনবাদী-শক্তির শাসন-শোষণ যন্ত্রের কবলে পড়ে তাদের স্বাধিকার,স্বাধীনতা,সচ্ছলতা সব শেষ হয়ে গেছে। “অন্ন-স্বাস্থ্য,প্রাণ,আশা,ভাষা হারায়ে সকল কিছু
দেউলিয়া হয়ে চলেছে মানব ধ্বংসের পিছু পিছু।” (-সাম্যবাদী ঃ চোর ডাকাত) এই সময়েই কবি ‘বঙ্গীয় কৃষক শ্রমিক দল’-এর পক্ষ থেকে ঘোষণা দেন,
‘ লাঙল যার জমি তার’।
‘লাঙল নবযুগের নব দেবতা।
জয় লাঙলের জয়।
জয় লাঙলের দেবতার জয়’।
প্রতারিত,নির্যাতিত,শোষিত শ্রেণির এ’ আত্ম উপলব্ধি, এ’ বিদ্রোহ ঘোষণা,বাংলা সাহিত্যে এ’ এক অনন্য নতুন সুর। এ’ সুর কথা কয়ে উঠেছে মার্কস, গোর্কী,লেলিনের পক্ষে সর্বহারার কবি নজরুলের কণ্ঠে :- (১) “জনগণে যারা জোঁক সম শোষে তারে মহাজন কয়, ‘ সন্তান সম পালে যারা জমি, তারা জমিদার নয়।“
“মাটিতে যাদের ঠেকেনা চরণ/ মাটির মালিক তারাই হন”।
(২) “আজ চার দিক হতে ধনিক বণিক শোষণকারীর জাত,
(ও ভাই) জোঁকের মতন শুষছে রক্ত কাড়ছে থালার ভাত”। (-সর্বহারা ঃ কৃষাণের গান)
(৩) “চোখ ফেটে এলো জল-
এমনি করিয়া জগত জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?”
সাথে সাথে জমিদার, জোতদার, মহাজনদের বিরুদ্ধে কৃষাণের কণ্ঠে দুর্বার বিদ্রোহের ঘোষণা দিয়েছেন কবি-
“মোদের জমির মাটি, ঘরের বেটি সমান রে ভাই
কে রাবণ করবে হরণ, দেখবো রে তাই”।
শোষিত মানুষের পক্ষের এই ঘোষণা সাহিত্যেও ইতিহাসে ‘মেঘনা কার্টা’। অতঃপর কৃষক,শ্রমিক, ধীবর,মুঠে, মেথর তথা শোষিত শ্রেণির মানুষদের জাগাতে,নিজ নিজ অধিকার আদায়ে সোচ্চার হতে, বাঁচা মরার লড়াইয়ে সামিল হতে আহ্বান জানিয়ে তিনি বিদ্রোহে-উদ্দীপ্ত বীজ-মন্ত্র ছড়িয়েছেন।
“উঠ্‌রে চাষী জগতবাসী ধর কষে লাঙল
দেখুক এবার সভ্য-জগত চাষার কত বল”।
(২)“যত শ্রমিক শু’ষে নিঙড়ে প্রজা
রাজা উজির মারছে মজা,
এবার জুজুর দল ঐ হুজুর দলে
দলবি রে আয় মজুর দল,
ওরে ধ্বংস-পথের যাত্রীদল
ধর হাতুড়ি তোল কাঁধে শাবল”।
(৩)“শোন অত্যাচারী! শোনরে সঞ্চয়ী,
ছিনু সর্বহারা,হব সর্বজয়ী।
ওরে সর্বশেষের এই সংগ্রাম মাঝ
নিজ নিজ অধিকার জুড়ে
দাঁড়া সবে আজ” ‘ (৪) “ঐ দিকে দিকে বেজেছে ডঙ্কা, শঙ্কা নাহিক আরমরিয়ার মুখে মারণের বাণী উঠিতেছে মার মার”।
উদ্ধৃত কবিতাংশ গুলিতে কবি তীব্র ভাষায় বৃটিশদের পদলেহি ধনিক-বণিকদের শোষণ পদ্ধতির স্বরূপ তুলে ধরেছেন।এতে শ্রেণি সংগ্রামের মূলভাব নজরুল-কাব্যে তীব্রভাবে ব্যক্ত হয়েছে।
নজরুল জনগণতান্ত্রিক চেতনা-সমৃদ্ধ, গণমানুষের কবি। কৃষক-শ্রমিক-মুটেমজদুর-ধীবর-মুচি-মেথর তথা সমাজের নিরন্ন-লাঞ্চিত-বঞ্ছিত মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী কবি। তাঁর কবিতায় গানে ‘লাঙল’ এবং ‘হাতুড়ি-শাবল’ যথাক্রমে কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণির প্রতীকরূপে ব্যবহৃত হয়ে শোষণহীন সমাজ চেতনার অর্থবহতাকে জোরদার করেছে।
কাজী নজরুল ইসলাম শ্রেণি-সংগ্রামের কবি। রুশো,ভলটেয়ার ,গোর্কি .আলবেয়ার কামু, ব্লাদিমির মায়াকভস্কি ও মার্কসের সমগোত্রীয়। সমাজ সচেতন ও দার্শনিক। বৈজ্ঞানিক সাম্যবাদ নজরূল শক্তভাবে আয়ত্ত করতে পেরেছিলেন। তাই ধনবাদী-শোষক-বুর্জোয়ার জুলুম অত্যাচার নিষ্পেষণে যে সমাজের শতকরা নব্বই ভাগ মানুষ ভূমিহীন, গৃহহীন,সম্পদহীন ; তাদের বিরুদ্ধে নিজ নিজ অধিকার আদায়ে একতাবদ্ধ প্রতিরোধ, সংগ্রামের যে বিকল্প নেই তা তীব্রভাবে প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর সাহিত্যে।
মার্কসের সাম্যবাদের আন্তর্জাতিকতা অন্তরে ধারণ করে নজরুল ঘোষণা দেন,“নির্যাতিতের জাতি নাই”। তিনি নিপীড়িত তথা সমগ্র মানবজাতিকে ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণিহীন সমাজ গড়ে তোলার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। নজরুলের পরিকল্পিত সাম্য-রাজ্যে সবমানুষ সমান।তাদের মধ্যে আর্থিক বৈষম্য নেই, ধর্মীয় ব্যবধান নেই, বর্ণেও বিভেদ নেই। ‘সাম্যবাদী’তে তার তীব্র প্রকাশ-
“গাহি সাম্যের গান-
বুকে বুকে হেথা তাজা সুখ ফুটে, মুখে মুখে তাজা প্রাণ।
বন্ধু, এখানে রাজা-প্রজা নাই, নাই দরিদ্র-ধনী
হেথা পায় নাক কেহ ক্ষুদ ঘাঁটা,কেহ দুধ-সর-ননী।.. ..
নাইকো এখানে ধর্মের ভেদ,শাস্ত্রের কোলাহল,
পাদরী-পুরুত-মোল্লা-ভিক্ষু এক গ্লাসে খায় জল।”
কবি নজরুলের এই পৃথিবী মার্কসীয় সাম্যবাদেরই পৃথিবী।
সঠিক শিল্পসত্তার আলোচনা করতে গিয়ে ‘রোমারোলা’র সুরে বলা যায়,“নজরুল ছিলেন সর্বহারা শ্রেণির মধ্যমণি”।
“তিরিশের পর থেকে বাংলা সাহিত্যে জনজীবনকে অবলম্বন করার যে স্পৃহা লক্ষ্য করা যায়,নজরুল তার উদ্‌গাতা।সর্বহারা মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, প্রীতি এবং তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাঁর অধিনায়কত্ব বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত। পরবর্তীকালে কৃষক-শ্রমিক আন্দোলন স্পষ্ট হয়েছে, বুদ্ধিজীবীরা তাতে হয়েছেন অংশীদার।.. ..নজরুলের অবদানের প্রধান দিক সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সর্বহারা মানুষের পক্ষে শিল্পীসাহিত্যিকের অংশ গ্রহণ। বাংলায় তিনিই এই কাজটি প্রথম শুরু করেছিলেন। বাংলা কবিতায় তখনই বিদ্রোহী সুরের জোয়ার এসেছিল। এ যেন কৃষাণ বিদ্রোহ।.. ..নজরুলের ‘কৃষাণের গান’, ‘শ্রমিকের গান’,‘ ছাদ পেটার গান’,‘কুলি-মজুর‘ কবিতার পরই সম্ভব হয়েছিল বিমল চন্দ্র ঘোষ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, গোলাম কুদ্দুস,দীনেশ দাস,সুকান্ত ভট্টাচার্যের আবির্ভাব।” (নজরুল কাব্য সমীক্ষা-আতাউর রহমান)
নজরুল যেমন বাঙালিদের মধ্যে সর্বপ্রথম ‘ভারতের পূর্ণ স্বাথীনতা’র ঘোষক তেমনি নজরুলই বাংলা-সাহিত্যের মাধ্যমে ভারতে প্রথম ‘কৃষকরাজ-শ্রমিকরাজ’ তথা ‘সমাজতান্ত্রিক’ আন্দোলন প্রতিষ্ঠারও প্রথম বাঙালী কবি। নজরুল এই কৃতিত্বের একক দাবীদাব।বাংলা সাহিত্যে এই কালজয়ী বিপ্লবী-ধারার তিনিই নির্মাতা। তাঁর ‘লাঙল’, ‘গণবাণী’র যুগের সমস্ত রচনাই শ্রেণিবৈষম্য ও শ্রেণিসংগ্রামকে ভিত্তি করেই লেখা। ‘কৃষকের গান’, ‘শ্রমিকের গান’, ‘কুলি-মজুর’, ‘নারী’, ‘রাজা-প্রজা’, ‘ছাদ পেটার গান’ এবং ‘ফরিয়াদ’সহ আরো অনেক কবিতায় যে শ্রেণিচেতনা, সাম্যবাণী ফুটে উঠেছে-তাতে মার্কসীয় তত্ত্ব বা‘মার্কসবাদ’পরিপূর্ণভাবে বলবৎ হয়েছে। সুতরাং বলাবাহুল্য যে সুকান্ত,সুভাষদের মত প্রেমেন্দ্র মিত্র, সমর সেন, বিষ্ণুদে, বুদ্ধদেব বসুরাও নজরুল ইসলামের নির্মিত শ্রেণিসংগ্রামের এই পথ ধরেই সমাজতান্ত্রিক ধারার কাব্য রচনায় ব্রতি হয়েছেন। নজরুলের কাব্যিক পরীক্ষা নিরীক্ষায় তৈরি বীণাযন্ত্রে তাঁরা নতুন সুর সৃষ্টির প্রয়াস পেয়েছেন মাত্র। তবে ধর্মহীনতা, নৈরাজ্যবাদ, আবেগ শূন্যতা, দুর্বোদ্ধতা ও রূঢ় বাস্তবতায় লেখা তাঁদের কারো করো কাব্য কবিতা তৎকালে সুশীল সমাজে আদৃত হলেও গণমানুষের মাঝে ব্যাপকতা লাভে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, গ্রাম্য সমাজে পদচারণা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। ব্যতিক্রম শুধু সুকান্ত ভট্টাচার্য।
নজরুল ইসলাম একাধারে বিপ্লবী, বিদ্রোহী, কবি,প্রাবন্ধিক,রাজনীতিবিদ, সম্পাদক, সুবক্তা ও সুগায়ক হওয়ায় এবং বাংলার গ্রামে-গঞ্জে অহরহ যাতায়াত থাকায় তাঁর বিদ্রোহী, বিপ্লবী, সাম্যবাদী-কবিতার বাণী তৃণমূল-শ্রেণি পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছিল,যা অন্য কবিদের পক্ষে সম্ভব ছিলনা। তার এক একটি কবিতা ছিল সর্বহারার পক্ষে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের এক একটি ফরমান। শত্রু-বিনাশী হাতিয়ার। ফলে সর্বহারা মানূষ শ্রেণি -সচেতন হয়ে শ্রেণি -সংগ্রামে উদ্দীপ্ত হয়েছিল। এইখানেই নজরুলের সার্থকতা। এইখানেই নজরুল অনন্য। কথিত শ্রেণি -সংগ্রামের কবিরা তাঁর প্রদর্শিত পথে চলেও তাঁর মত সফল হতে পারেনি।তাই বলা যায় ত্রিশের আগে পরের কোন কবির পক্ষেই তাঁকে অতিক্রম করা সম্ভব হয়নি। আর শ্রেণি সংগ্রামমূলক কাব্য রচনায় তিনি শুধু অনতিক্রম্য নন-পিতৃস্থানীয়।

x