কাঁদো গ্রাম কাঁদো

আহমেদ মনসুর

শুক্রবার , ৮ মার্চ, ২০১৯ at ৬:২৯ পূর্বাহ্ণ
31

দোতলার বেলকনিতে বসে যেখানটাই হিজল গাছটা ছিলো, পাখিদের কলরবে মুখরিত থাকতো সূর্য পশ্চিমে অস্ত যাওয়া অবধি, এখন চাচাতো ভাইদের চারতলা দালান, মাঝে সুউচ্চ প্রাচীর, আনমনে সেদিকটাই তাকিয়ে কি এক গভীর ভাবনায় নিমজ্জিত সৈয়দ মাহমুদুজ্জামান চৌধুরী। শৈশবের দূরন্ত সময়গুলো কেটেছে এখানে। গাছের মগডালে বসে ছালিবিছালি করতে থাকা হলদে পাখিটা দেখে ছুটে গিয়ে মাকে ডেকে এনে বলতেন- ‘ওমা, আজিয়া গরবা আইবো।’ কচিৎ মিলে গেলে আহা কী আনন্দ!
চেইঞ্জারে ফিতার ক্যাসেটে সেলিম নিজামীর গান বেজে উঠে- ‘নাইওরী নাইওর হলো শেষ/ এইবার চলো নিজের দেশ।’ পাখিটা ফুড়ুৎ করে শূন্যে হাওয়া হয়ে যায়। হিজল গাছটাকে নিজের ভেবেছিলো কী হলদে পাখিটা? কি জানি! পাখির ভাষা কী আর ছোট্ট সৈয়দ বোঝে? মানুষ পারে না এমন কি আছে ভবে? তবে এ নয় কেন? প্রশ্ন জাগে ওর ছোট্ট মনে। ভাবে বড় হয়ে পাখি ভাষা শিক্ষালয় খুলবেন।
স্ত্রীর বছরি ফাতেহা হবে। চিকিৎসক কন্যা, ব্যবসায়ী জামাই, নাতি-নাতনিসমেত ভোরের আলো ফুটতেই তাই শহর থেকে রওয়ানা দেন জামাইয়ের মার্সিডিস পাজোরেতে। উদ্দেশ্য শরতের ভোর দেখা। রথ দেখা, কলা বেচার মতো। ডিমের কুসুমের মতো সূর্যটা চোখ মেলছে, গাড়ি শহর ছেড়ে গ্রামের পথ ধরে।
সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলা সড়কটি এখন চার লেইন হয়েছে, দুধারের বিস্তীর্ণ ধানী-জমি ভরাট হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। এখানে-ওখানে দালান ওঠে আড়াল করে দিচ্ছে অনেক দূরের গ্রামগুলো। নাতি সাইম মাহমুদুুজ্জামানকে আদুরে গলায় প্রশ্ন করে- ‘গ্রামগুলো মেইন রোড থেকে অনেক দূরে হয় কেন নানু?’ নানুর কপালের বলিরেখায় ভাজ পড়ে। মুহূর্ত বিলম্ব না করে মেয়ের জামাই ছড়া কাটেন- ‘ওরা রাস্তার পাশে করে চাষ/ অনেক দূরে করে বাস/ ওদের মাথায় বড় গন্ডগোল/ ওদের হলো সর্বনাশ।’
-‘বাবা, তুমি অনেক সুন্দর কবিতা বলেছ।’ সাইম খুশি হয়ে বলে। সৈয়দ সাহেবের কপাল আরো খানিকটা কুঁচকে যায়।
বসার ঘর থেকে সাইম দৌঁড়ে এসে নানার পিটে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলে- ‘একা বসে কি ভাবছো নানু?’ হঠাৎ সম্বিৎ ফেরে তাঁর। আদরের নাতিকে দু’হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নিয়ে জবাব দেন- ‘ভাবছি এ কমরডেঙা গ্রাম নিয়ে। গ্রাম সে তো নামে মাত্র। আর ভাবছি তোমাদের কথা। কত দুর্ভাগ্য, গ্রামে এসেও শহর দেখতে হয় তোমাদের। ছবির মতো এক গ্রাম ছিলো জানো; চারদিকে সবুজের সমারোহ, পাখিদের কলতানে মুখরিত সারাবেলা, বর্ষায় বিলে অথৈ পানি। এখন এসব গল্প মনে হতে পারে।’
এমন সময় হাঁফাতে হাঁফাতে ছুটে আসে তানিসা। কম্পিত গলায় সে বলে- ‘নানু, একটা পাগল এসে ডাকছে তোমায়। ঘরে ঢুকতে দিইনি।’
-‘পাগল আসবে আবার কোথা হতে? পাগলের সাথে কী কাজ?’ বলেই তিনি হাঁটুতে ভর দিয়ে দাঁড়ান। দীর্ঘক্ষণ বসে থেকে ঝিম মেরে থাকা পা স্বাভাবিক হতে সময় নেয়। ‘কী নানু, দাঁড়িয়ে রইলে যে, যাবা না নিচে?’ তানিসা ফের তাড়া দেয়। ‘নানুরে, বয়সকালে বুঝবি।’
ধীর পায়ে নিচে নেমে এলেন তিনি, সাথে তানিসা ও সাইম। ওরা দু’জন ধরে আছে নানুর দু’হাত। ওদের অপার আনন্দের দিন আজ। পাগল দর্শনের খুশিতে ওরা আত্মহারা। মাহমুদুজ্জামান বুঝতে পারেন না, পাগল আবার দেখার কী! তবু ওদের নিরাশ করেন না। ছোটবেলায় দাদুর মুখে প্রায় তিনি শুনতেন- ‘মনর নাম মুমেনা/মনে যেন্‌ হয় এন্‌ এনা।’ পাগল ওরা আগে দেখলেও সাহস করে কাছে যাওয়া কিংবা কথা বলা হয়নি কখনও। আজ দেখা হবে, কথাও শোনা হবে। আহা, কী মজা!
দরজাটা খোলা ছিলো হাট করে, পাগল হলেও লোকটা ভদ্র আছে, খোলা পেয়েও ঘরে ঢুকে যায়নি। ভেজানো কপাট খুলতেই মাহমুদুজ্জামান দেখতে পান ওকে, মাথাটা খানিক ঝুঁকিয়ে খুঁটিয়ে দেখেও চিনতে পারেন না।
-‘কি মাহমুদ, চিনিত নঅপারছ, ক্যান? আঁই তোর ল্যাংডা হালর বন্ধু সোহরাব। সোহরাব হোসাইন চৌধুরী।
-‘তুই সোহরাব? ওমা কি হস! তই তুর এই অবস্থা ক্যা?
অবিন্যস্ত ময়লাটে আর জটপাকানো সুদীর্ঘ চুল-দাড়ি, পরনে ফাটাছেঁড়া, তালিযুক্ত, মলিন জামা। আর দশটা পাগলের অবস্থা যা হয় আর কি!
-‘আঁর এ অবস্থারলাই তুরাই দায়ী বন্ধু। অধিক পয়সা হামাইবাল্লাই তুরা মিট্রিক পাশ গরিবার আগেই শঅরত ধাই গেলিগই, আর ইন্দি আঁই টেঁয়ার অভাবে স্কুলত্তুন ঝরি গেই, এর পরত্তুন শুরু গইরলাম জীবনরল্লয় যুদ্ধু, তই পারিলাম হই? বাপে যা কিছু রাহিগেইয়েল গ্রামর মাতব্বরে দহল গরিফেলাইয়ে। এক ঝাঁক পোয়া-মাইয়া রাহি বউও গেলগই মরি। বেয়াক হারাইয়েরে পঅল অইগেলামগই। এহন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরি, পাইলি হাই, নপাইলে চাই থাই।’
-‘আইচ্ছা ইয়িন পরে য়ুননযাইবু, আগে ঘরত আয়।’
-‘না, ঘরত ঢুইকতাম ন, বউদ্দিন পরে তুই গ্রামত আইলি য়ুনিয়েরে আইলামদে। দইন বিলত তোর যে একখান জাগা আছিল, ইয়েন দহল গরি ফেলাইয়ে ভূমিদস্যু ভানডাইয়ে, এহন তাজমহল বাধের পানলার। চাই আগই।’
-‘কি হস তুই?’
মাহমুদুজ্জামানের মাথায় রক্ত চড়ে যায়। সম্পত্তি বেদখলের খবর কাউকে স্থির থাকতে দেয় না। কাল বিলম্ব না করে তিনি ছুটে যান সেখানে। পাগল হলেও সোহরাব মিথ্যা বলেনি। পাগলের মাথাও মাঝেমাঝে কাজ করে। চাঁদের সাথে জোয়ার ভাটার যেমন একটা সম্পর্ক আছে, পাগলদের পাগলামীরও একটা যোগ আছে। অমাবস্যা পূর্ণিমাতে তা বেড়ে যায়। এখন হয়ত অমাবস্যা পূর্ণিমা নয়। শীতকালও নয়। সে হিসাব অবশ্য মাহমুদুজ্জামানের করার সময় এখন নয়।
চোখ লাল করে রাগত স্বরে মাহমুদুজ্জামান প্রশ্ন করেন- ‘এই থিয়ে, কিরর তোরা এন্ডে?’
-‘কিরির মানি? তুঁই হন?’
-‘আঁরে নচিনর? আঁই এ জাগার মালিক- মাহমুদুজ্জামান।’
-‘তোঁয়ার মাথা হনঅ লরি গেইয়ে না? এ জাগার মালিক ত ভানডা সওদর। ঘর বাইনতু লাগাইয়ে, ইয়েনে আঁরার পার্টি অফিস অইবু।’
রাজমিস্ত্রি কাম ভানডার চেলা রহমতের মুখে এসব শুনে মাহমুদুজ্জামান নিজেকে আর স্থির রাখতে পারেন না। কাঁপুনি ধরে যায় সমস্ত শরীরে। রাগান্বিত সিংহের মতো হুঙ্কার ছেড়ে বলেন- ‘তুরার মার নেক ভানডাইয়া না ফান্ডাইয়া, ইতে হন্ডে এহন? ডাক ইতেরে, আজিয়া কেচা চাবাই হাই ফেলাইয়ুম। মাদারচোদ! মানুষ নঅচিনে আইজো। ইতে ন’জানে জাগা ইয়েন যে ইতের বাপর?’
রহমতও চুপ মেরে থাকার লোক নয়। জন্ম থেকে সে যত অশালীন গালি শিখেছে বাপ মায়ের কাছে, আশ-পাশের মানুষজনের কাছে, সমস্তই তীরের মতো বর্ষণ করতে থাকে মাহমুদুজ্জামানের উপর। তাদের এ তুমুল তর্কাতর্কির একপর্যায়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে ভানডা সওদাগর।
ভানডার বাপ ছিলো ঘরজা, মানে শন দিয়ে ঘর ছাউয়ার কাজ। দিনে এনে দিনে খাওয়ার অবস্থাও ছিলো না তখন। মাথাটা ওর পরিষ্কার ছিলো। নানা কৌশলে এম.পি সাহেব পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে সে। সে থেকে ওকে আর ছৌঁয় কে! লোকাল পান্ডাগোছের লোক পোষে ছিটেফোঁটা দিয়ে। আর সে কামায় কাড়ি কাড়ি। আয়ের প্রধান উৎসই জমি জবর দখল। সে এখন গ্রামের মাতব্বর। ওর উপর আঙুল তুলে সাহস কার! উনার যে এখন আঙুল ফুলে কলা গাছ!
ভানডাকে দেখামাত্র মাহমুদুজ্জামানের সমস্ত কান্ডজ্ঞান কর্পুরের মতো উবে যায়। মাটিতে পড়ে থাকা ৫ সুতার কাটা রডের একটা টুকরো তুলে নিয়ে চকিতে বসিয়ে দেন ওর মাথায়। ‘ও মারে’ বলে মুহূর্তেই সে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। ওর এক চেলা ফোন দিয়ে দেয় থানায়। প্রথমে উপস্থিত সকলে থতমত খেয়ে গেলেও, পরক্ষণে দলবেধে মাহমুদুজ্জামানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে দেরী করে না। ভানডার চেলাদের হাতে বেদম উত্তম-মধ্যম খেয়ে তিনি মুমুর্ষু প্রায়। ততক্ষণে খবর পেয়ে ছুটে আসেন তাঁর মেয়ের জামাই ইমতিয়াজ রহমান। ওদের হাত থেকে বহুকষ্টে ছাড়িয়ে নেন শ্বশুরকে। এখনই তাঁকে নিয়ে যাওয়া দরকার হাসপাতালে। তবে এর কোন উপায় দেখেন না তিনি। বাংলা সিনেমার শেষ দৃশ্যের মারামারি শেষে যেমন হাজির হয় পুলিশবাহিনী, এখানেও ঘটল তাই।
মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত ভানডাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হলেও মুমূর্ষু মাহমুদুজ্জামানের রক্তাক্ত হাতে হাতকড়া পরিয়ে তোলা হয় পুলিশ ভ্যানে। পুলিশের গাড়ি গ্রামের পাকা সড়ক বেয়ে খরগোশ গতিতে এগুতে থাকে থানার দিকে। সড়কের পাশে বটতলায় বসা সোহরাব পাগলা। তখনও আপনমনে বিড়বিড় করতে থাকে সে। খাড়া কানে খানিকটা মনোযোগ দিলে স্পষ্টই বুঝা যায়; সে বলছে- ‘গ্রামের গায়ে পোশাক দিলা শহরের- ভালা কথা, ভালা কথা/ ইঁদুর মরা গন্ধ গায়ে সেন্ট মারিলা- ভালা কথা, ভালা কথা।’

- Advertistment -