ড. মইনুল ইসলামের কলাম

বৃহস্পতিবার , ১৪ জুন, ২০১৮ at ৫:১৫ পূর্বাহ্ণ
29

বাংলাদেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে অবহেলা করা কি ঠিক হচ্ছে?

সম্প্রতি দৈনিক প্রথম আলোতে খবর প্রকাশিত হয়েছে যে দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ঘাটতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ফলে, প্রায় ১২ শতাংশ ইচ্ছুক জনগোষ্ঠি এসব সামগ্রী ব্যবহার করতে পারছেন না। পত্রিকাটি এই সমস্যার ওপর একটি সম্পাদকীয়ও প্রকাশ করেছে। আমি এই খবর এবং সম্পাদকীয়ের সাথে একমত হয়ে বলতে চাই, বর্তমান সরকার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে যথাযথ অগ্রাধিকার দিচ্ছে না। বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশ। বৃহৎ জনসংখ্যার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ঘন বসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ,এক বর্গকিলোমিটারে প্রায় ১১২০ জন মানুষের বাস এদেশে। জনসংখ্যার এই মাত্রাতিরিক্তঘনত্বের জন্যেই বিংশ শতাব্দীর সত্তর ও আশির দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ওয়াকিবহাল মহলে দৃঢ়মূল উদ্বেগ পরিলক্ষিত হত। জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে ঘোষণা দিয়েছিলেন, জনসংখ্যাই বাংলাদেশের ‘এক নম্বর সমস্যা’। আমরা জিয়াউর রহমানের এহেন নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকে কখনোই সমর্থন করিনি, কারণ বাংলাদেশের প্রকৃত এক নম্বর সমস্যা দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠন।কিন্তু, এর মানে তো এটা হতে পারে না যে বাংলাদেশের ভৌগোলিক আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা যে ‘কাম্য সাইজ’ (মর্যধবলব ্রধড়ণ) থেকে বেশি তা স্বীকারই করা যাবে না।

আমার মতে, বিদেশে বাংলাদেশীদের অভিবাসন প্রবাহ জনসংখ্যার সঠিক চিত্র পেতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মনে রাখতে হবে, চারটি পরিমাপের যোগবিয়োগের মাধ্যমে জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধির হার হিসাব করা হয়:জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধির হার=(মোট জন্মহারমোট মৃত্যুহার)+(বিদেশ থেকে দেশে বছরে অভিবাসনদেশ থেকে বিদেশে বছরে অভিবাসন)।এই পরিমাপে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের সকল দেশে জনস্থানান্তর কিংবা অভিবাসনকে বিবেচনা করার নিয়ম থাকায় বাংলাদেশের সরকারগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে বিপুল জনসংখ্যার অভিবাসন ও দেশান্তরকে সঠিকভাবে গণনায় না আনার চালাকি করে চলেছে নানা কারণে। এক্ষেত্রে ব্যর্থতা কিংবা দক্ষতার ঘাটতি যেমন ভূমিকা রাখছে তার চাইতেও বেশি সরকারগুলোর রাজনৈতিক বিবেচনাও ভূমিকা পালন করছে। উদাহরণ: বাংলাদেশ থেকে ভারতে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠির বহির্গমন প্রবাহকে বাংলাদেশ সবসময় কম করে দেখাতে চায়। কারণ, বাংলাদেশের হিন্দুরা যে এদেশে নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশত্যাগ করছে এটা এদেশের কোন সরকারই স্বীকার করতে চায় না। অথচ,১৯৪৭ সালের পর গত ৭১ বছর ধরে এদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠির অনুপাত কমতে কমতে এখন জনসংখ্যার ২২ শতাংশ থেকে মাত্র ৯ শতাংশের কাছাকাছি এসে গেছে। আরেকটি বিষয় হলো, যদিও সরকারিভাবে বলা হয় যে প্রায় এক কোটি দশলাখ বাংলাদেশী প্রবাসে অবস্থান করছেন প্রকৃত সংখ্যাটা আসলে আরো প্রায় ৩০ লাখ বেশি হবে বলে এতদ্‌সম্পর্কীয় গবেষকদের মধ্যে একটা সাধারণ ধারণা গড়ে উঠেছে। উপরের দুটো অভিবাসন প্রবাহ বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধির হারকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিচ্ছে। আমার এসব কথা বলার মূল উদ্দেশ্য হলো, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে যথাযোগ্য অগ্রাধিকার না দেওয়া আমার মতে শেখ হাসিনা সরকারের সমীচীন হচ্ছে না।প্রচার মাধ্যমগুলো এই বিষয়টাকে এখন আর গুরুত্বই দিচ্ছে না এই কার্যক্রমের পেছনে ব্যয়িত অর্থায়ন প্রবাহটা শুকিয়ে যাওয়াতে। এমনকি, যেসব এনজিও পরিবার পরিকল্পনাকে উৎসাহিত করতো তাদেরকেও নাকি সরকারের পক্ষ থেকে আজকাল নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে, তাদের প্রণোদনা কর্মসূচিকে আগের মত গুরুত্ব না দিতে বলা হচ্ছে। কিন্তু, কেন? জনসংখ্যা নিয়ে এসব উল্টাপাল্টা নীতি গ্রহণের যৌক্তিকতা কী?আমি গণচীনের ‘এক সন্তান নীতি’র মত জবরদস্তিমূলক কোন জনসংখ্যা নীতিকে সমর্থন করি না, কিন্তু বাংলাদেশের মত ঘন বসতিপূর্ণ দেশে ‘ছেলে হোক বা মেয়ে হোক এক দম্পতির দুই সন্তানের বেশি নয়’ ধরনের প্রণোদনামূলক কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে না কেন তা আমি বুঝতে পারি না। শেখ হাসিনার দ্বিতীয় মেয়াদে ২০০৯ সাল থেকে যেভাবে জনসংখ্যা পরিকল্পনা কার্যক্রমকে অনেকখানি গুটিয়ে ফেলা হয়েছে তার কোন যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না আমি। জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকট এহেন নীতিরই ফসল।

প্রেসিডেন্ট জিয়া কর্তৃক জনসংখ্যাকে বাংলাদেশের ‘এক নম্বর সমস্যা’ ঘোষণা একটি নেতিবাচক মানসিকতার প্রতিফলন, যার বিরুদ্ধে একজন গবেষক হিসাবে আমার অবস্থান বরাবরই উচ্চকিত। কিন্তু, বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে যথাসম্ভব দ্রুত ডেমোগ্রাফিক ট্রাঞ্জিশানের চতুর্থ পর্যায়ে, মানে ’স্থিতিশীল জনসংখ্যা’র স্তরে নিয়ে যাওয়ার গুরুত্বকে আমরা কেউ অস্বীকার করিনা। জবরদস্তির পথে না গিয়েও যে জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধিকে দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব সেটা বিশ্বের সামনে প্রমাণ করেছে শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম এবং ভারতের কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গ। মানুষকে সুশিক্ষিত ও সচেতন করতে পারলে, সাধারণ মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা হলে, শিশুমৃত্যুর হার এবং মাতৃমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারলে, বাল্যবিবাহ বন্ধ করা গেলে এবং জন্মনিরোধ পদ্ধতিগুলো মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করলে জনগণ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পরিবার পরিকল্পনায় উদ্বুদ্ধ হয়এই সত্যটা প্রমাণিত হয়েছে বিভিন্ন দেশে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ট্রাঞ্জিশান তত্ত্বের দ্বিতীয় পর্যায়ে (আরলি এক্সপান্ডিং ফেইজ) প্রবেশ করেছিল, যেটাকে সাধারণ জনগণের বোধগম্য ভাষায় ‘জনসংখ্যা বিস্ফোরণের পর্যায়’ বলে অভিহিত করা যায়। ঐ পর্যায়ে জনসংখ্যা প্রায় ২.৫ শতাংশ বা তার চেয়েও বেশি হারে বেড়েছে এদেশে। ফলে, ১৯৪৭ সাল থেকে ২৫ বছরের কম সময়েই সত্তর দশকে দেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশকে মার্কিন সেক্রেটারী অব স্টেট হেনরী কিসিঞ্জার ‘আন্তর্জাতিক তলাবিহীন ভিক্ষার ঝুলি’ আখ্যায়িত করার পেছনে প্রধান কারণ ছিল, ঐ সময়ের সাত কোটি মানুষকে আমরা খাদ্য জোগানোর সক্ষমতা অর্জন করতে না পারায় বিশ্বব্যাপী বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে ঐ জনসংখ্যা আবারো যখন পরবর্তী ২৫৩০ বছরের মধ্যে পনেরো কোটি ছাড়িয়ে যাবে তখন ভূমিদরিদ্র ঘনবসতির এদেশে জনগণকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিশ্বের জনগণের কাছে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ধর্ণা দেওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না। (ঐ সময় আমাদের খাদ্যশস্য প্রয়োজন হতো দেড় কোটি টন, আর আমাদের উৎপাদন হতো মাত্র এক কোটি দশ লাখ টন।) ওটা শুধু কিসিঞ্জারের ধারণা ছিল না, দুনিয়ার অনেক উন্নয়ন চিন্তাবিদের সুচিন্তিত গবেষণায়ও একইরকম বিপদের আশংকা ব্যক্ত করা হয়েছিল। একদল ম্যালথুসীয় ঘরানার তাত্ত্বিক তো বলেই বসলেন যে বাংলাদেশ একটা ‘পপুলেশন টাইম বোমার’ ওপর বসে রয়েছে। যখন বোমাটি ফাটবে তখন এদেশের দুর্ভিক্ষপীড়িত জনগণকে বাঁচাবার জন্য আগেভাগেই বিশ্বের ধনী দেশগুলোর পর্যাপ্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ওপর রচিত ফালান্ড ও পার্কিন্সনের বিশ্বখ্যাত বইয়ের মূল শিরোনামে বাংলাদেশকে ‘এ টেস্ট কেস অব ডেভেলাপমেন্ট’ আখ্যা দেওয়া হয়েছিল এত ঘনবসতিপূর্ণ একটা খাদ্যঘাটতির দেশে আদৌ অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হবে না আশংকা প্রকাশের জন্যেই। কারণ, ঐ পর্যায়ে জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২.৫ শতাংশ। মানে, ২০০০ সালে ঐ জনসংখ্যা আবারো দ্বিগুণ হওয়ার কথা ছিল। জনসংখ্যার গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে জ্ঞানের বিকাশ আরো এগিয়ে যাবার পর অবশ্য এই ধরনের আতংকবাদী ভবিষ্যদ্বাণী দেওয়ার হিড়িক সাম্প্রতিককালে অনেক কমেছে।

ডেমোগ্রাফিক ট্রাঞ্জিশন তত্ত্বে উল্লিখিত চারটি পর্যায় যে ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বের সকল দেশকেই পেরোতে হবে সেটা তথ্যউপাত্ত সহকারে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ার পর জনসংখ্যাতাত্ত্বিকদের মনোযোগ এখন নিবদ্ধ হয়েছে জনসংখ্যা বিস্ফোরণের দ্বিতীয় পর্যায় কিভাবে সংক্ষিপ্ত করে বিভিন্ন জনবহুল দেশ যথাসম্ভব দ্রুত তৃতীয় পর্যায়ের ‘লেইট এক্সপান্ডিং ফেইজ’এ প্রবেশ করতে পারে সে প্রয়াস জোরদার করায়। এই তৃতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন দেশে মোট জন্মহার এবং মোট মৃত্যুহার উভয়ই দ্রুত কমে যায়। এই দুটো হারের পার্থক্য কমানোর মাধ্যমে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দ্রুত কমিয়ে আনায় সাফল্য অর্জন করতে পারলে জনসংখ্যা নিয়ে আর আতংকগ্রস্ত হওয়ার কোন কারণ থাকবেনা। ডেমোগ্রাফিক ট্রাঞ্জিশানের চতুর্থ স্তরে প্রবেশ করার পর জনসংখ্যা বৃদ্ধি কোন দেশের জন্যে আর মারাত্মক সমস্যা থাকে না, বরং তখন সমস্যাটার রূপ বদলে যায়।

আশির দশকেই বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ট্রাঞ্জিশানের তৃতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। অবশ্য, বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এখন ১.৩ শতাংশে নেমে গেছে বলে সরকার দাবি করলেও জাতিসংঘের জনসংখ্যাসম্পর্কীত সংস্থা ইউএনএফপিএএর জরিপ মোতাবেক তা এখনো ১.৪২ শতাংশে রয়ে গেছে বলা হচ্ছে। এদেশের টোটাল ফার্টিলিটি রেইট বা মোট প্রজনন হার সত্তর দশকে ছিল ছয়, মানে একজন নারী তাঁর সারা জীবনে ক’জন সন্তানের জন্ম দেন তারই একটা পরিমাপ এটা। এই হার কমে এখন ২.এ দাঁড়িয়েছে, যা একটা সাফল্য হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে।এটাকে ২ এর অনেক নিচে নামাতেই হবে, যদি আমরা জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধির হারকে এক শতাংশের নিচে নামাতে চাই। এর অন্যথা হলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির যে মোমেন্টাম রয়েছে সেটা ২০৩০ সালের পরও এদেশের জনসংখ্যাকে আরো বহুদিন বাড়াতেই থাকবে। (পপুলেশন মোমেন্টাম বজায় থাকার মূল কারণ শিশুদের সম্ভাব্য পিতামাতারা ত্রিশচল্লিশপঞ্চাশ বছর আগেই জন্ম নিয়েছেন।অতএব, তাঁরা এখন দুজন করে শিশুর জন্ম দিলেও অনেক পিতামাতার সন্তান জন্মদান চলবে আরো বহু বছর ধরে।) এই হার না কমার জন্য যে কয়েকটি বিষয়কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয় সেগুলোর শীর্ষে রয়েছে বাল্য বিবাহ, যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের মধ্যে প্রায় সবার ওপরে। সম্প্রতি জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনিসেফ বাংলাদেশ সরকারের ১৮ বছরের কম বয়সের কিশোরীদের বিয়ে সংক্রান্ত আইনকে সরাসরি ক্ষতিকর বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে বক্তব্য প্রদান করেছে। এই আইনে নারীর বিয়ের ন্যূনতম বয়স আঠারো বছরে অপরিবর্তিত রাখার পাশাপাশি একটা অপ্রয়োজনীয় ধারা আইনে যুক্ত করা হয়েছে যে পিতামাতা সিদ্ধান্ত নিলে আদালতের অনুমতি নিয়ে কন্যাকে ষোল বছরেও বিয়ে দিতে পারবেন। সরকার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নারীর ন্যূনতম বিয়ের বয়স আঠারো থেকে কমিয়ে বিশেষ ক্ষেত্রে ষোল করার প্রবল তাগিদ কেন অনুভব করেছে বুঝতে পারছিনা।

জনমিতি বা ডেমোগ্রাফি আমার উচ্চতর শিক্ষার বিশেষায়নের বিষয় এবং গবেষণার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। বিষয়টির অভিঘাত দেশের জনগণের জন্যে ভবিষ্যতে যে মারাত্মক নেতিবাচক হবে সে ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ। বলতে গেলে, এই আইন একবারেই অবিমৃষ্যকারী। নারীর মতায়নের জন্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত শেখ হাসিনা নারীর ক্ষমতায়ন পরিপন্থী এরকম একটি ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য মরিয়া হয়ে উঠলেন কেন?আমি মনে করি, অত্যন্ত বড় ভুল হয়ে যাচ্ছে এব্যাপারটায়। আঠারো বছরেই থাকুক আইনগতভাবে নারীর বিয়ের ন্যূনতম বয়স। কোন বিশেষ ব্যবস্থার সুযোগ আইনে রাখবেন না, রাখলে সমাজের ধর্মান্ধ গোষ্ঠী এবং নিম্নবিত্ত কৃষকশ্রমিক পিতামাতার জন্যে ঐ বিশেষ ব্যবস্থাই ‘আইনী নিয়মে’ পর্যবসিত হবে।বাল্য বিবাহের প্রাদুর্ভাব বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন। নারী শিক্ষার দ্রুত প্রসার সত্ত্বেও এই একটি বিষয়ে বাংলাদেশে কোন অগ্রগতিই পরিলক্ষিত হয়নি গত তিন দশকে।বর্তমান বিশ্বে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, শ্রীলংকা এবং বাংলাদেশ জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে কমবেশি সফলতা অর্জনকারী উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। এর বিপরীতে নাইজেরিয়া এবং পাকিস্তান জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার তেমন একটা কমাতে সক্ষম না হওয়ায় এই দুটো দেশের জনসংখ্যাবেড়ে বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে ইতোমধ্যেই ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশকে হটিয়ে নাইজেরিয়া এখন বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ।

আমি দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধির হার ১.৩ শতাংশ কিংবা ১.৪২ শতাংশ যাই হোক্‌ সেটা নিয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভোগার অবকাশ নেই। দেশের জনসংখ্যার মোট প্রজনন হারকে আগামী দশ বছরের মধ্যেই ২ শতাংশের অনেক নিচে নিয়ে আসতে হলে (মানে জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হারকে ১ শতাংশের নিচে নামাতে হলে) ‘ছেলে হোক বা মেয়ে হোক এক দম্পতির দুই সন্তানের বেশি নয়’ নীতিকে আমাদের জনসংখ্যা নীতির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের জায়গাটিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতেই হবে। দুই সন্তানের বেশি যেসব দম্পতি গ্রহণ করতে ইচ্ছুক তাদেরকে সক্রিয়ভাবে নিরুৎসাহিত করার জন্যে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে আমরা যেন আর বিলম্ব না করি। অন্যদিকে, জন্মনিরোধক সামগ্রীর যোগান এবং সহজলভ্যতা যেন কোনভাবেই বিঘ্নিত না হয় সেদিকে সরকারের সার্বক্ষণিক নজরদারি অগ্রাধিকার যেন পায়। মিডিয়াতে প্রচারপ্রচারণা যেন ‘দুই সন্তান নীতিকে’ জনগণের মনোযোগের কেন্দ্রে ধরে রাখে তারও ব্যবস্থা চালু রাখা অপরিহার্য। ১২ জুন ২০১৮

লেখক : অর্থনীতিবিদ; ইউজিসি প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

x