কর্ণফুলী রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন

বুধবার , ৩০ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৮:০৭ পূর্বাহ্ণ
42

কর্ণফুলীকে মনে করা হয় দেশের অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ। সেই গুরুত্বপূর্ণ নদীটি এখন ভয়াবহ দূষণের শিকার। নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা অসংখ্য শিল্প-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে নদীর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়ছে। শিল্পবর্জ্যে পানি দূষণের কারণে নদীর পরিবেশ ও প্রতিবেশ বিপণ্‌ন হওয়ার পথে। ব্যাপক দূষণের ফলে নদীটির প্রায় ৩০ প্রজাতির অর্থকরী মাছ বিলুপ্তির পথে। গত ২৪ জানুয়ারি দৈনিক আজাদীতে ‘দূষণে বিপর্যস্ত কর্ণফুলী / প্রতিদিন শত শত টন শিল্পবর্জ্য মিশছে নদীতে’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম একটি অপরিকল্পিত শহর। এখানে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা বলতে কিছু নেই। আর এই পয়ঃবর্জ্য কর্ণফুলী-দূষণের অন্যতম কারণ। চট্টগ্রাম ওয়াসা প্রতিষ্ঠার দীর্ঘদিন গত হলেও কোনো পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার করতে পারেনি। শহরের আধা কোটিরও বেশি মানুষের পয়ঃবর্জ্য সরাসরি কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে মিশছে। একজন লোকের দৈনন্দিন পানি ব্যবহার যদি ৫০ লিটার ধরা হয়, তাহলে সেই হিসেবে দিনে সাড়ে তিন হাজার টন পয়োবর্জ্যসহ ২৫ কোটি লিটার পানি কোনো ধরনের পরিশোধন ছাড়াই কর্ণফুলীতে গিয়ে মিশছে। মানুষের বর্জ্যের সাথে শিল্প বর্জ্য মিলে কর্ণফুলীর অবস্থা দিনে দিনে শোচনীয় হয়ে উঠেছে। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা মাত্রাতিরিক্ত দূষণে কর্ণফুলী থেকে বহু মাছই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। মৎস্য বিশেষজ্ঞের মতে, এক সময় কর্ণফুলী নদীতে প্রায় ১৪০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এর মধ্যে মিঠা পানির ৬০, মিশ্র পানির ৫৯ এবং সামুদ্রিক ১৫ প্রজাতির মাছ ছিল। কিন্তু দূষণের কারণে ইতোমধ্যে মিঠা পানির মাছ বিলুপ্ত হতে চলেছে। অবশিষ্ট মাছের মধ্যে ১০ থেকে ২০ প্রজাতি ছাড়া অন্য প্রজাতির মাছ এখন পাওয়া যায় না বললেই চলে। মূলত: শিল্প-কারখানার বর্জ্যে মাছের প্রজনন এবং অবস্থান কঠিন হয়ে পড়ায় দিনে দিনে মাছ বিলুপ্ত হচ্ছে। নদীতে মাছ বিলুপ্ত হওয়ায় চট্টগ্রামের জেলে সমপ্রদায়ের অনেকেই মারাত্মক রকমের সংকটে পড়েছে। নদী দূষণে মাছের প্রজনন ব্যাহত হওয়ায় দেশের মৎস্যভাণ্ডার খ্যাত বঙ্গোপসাগরেও ক্রমে মৎস্য কমে যাচ্ছে বলেও বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন।
অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কর্ণফুলী নদী প্রকৃতির অপার দান। দেশের অর্থনীতিতে এই নদীর অবদান অপরিসীম। উদার হস্তে এই নদী দিয়ে যাচ্ছে দেশ ও জাতিকে। কিন্তু সময়ের ধারাবাহিকতায় এই নদী এখন ক্রমশ নিষ্প্রভ হয়ে পড়ছে। নদীটির প্রাণস্পন্দন এখন অনেকটা ম্রিয়মাণ। ক্রমাগত দখল, দূষণ আর ভরাটের কারণে কর্ণফুলী আজ তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। বিষিয়ে উঠেছে নদীর পানি। ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্যের দূষণে খাল-ছড়াগুলোও বলতে গেলে ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। নদীর আশপাশের বেশিরভাগ শিল্পকারখানায় ‘তরল বর্জ্য শোধনাগার’ বা ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) স্থাপন করা হয়নি। ফলে এসব কারখানার দূষিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে এসে পড়ছে। দিনের পর দিন দূষণ বাড়তে থাকায় নদীর পানিতে দ্রবীভূত অঙিজেন কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চেয়ে কমে গেছে। অব্যাহত দূষণের কারণে কর্ণফুলী নদীতে মাছের আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। দূষণের কারণে নদীর পরিবেশ-প্রতিবেশ ব্যবস্থা বিনষ্ট হচ্ছে। বাড়ছে লবণাক্ততার মাত্রা। দূষণ বাড়তে থাকায় নদী ও নদীর আশপাশের সার্বিক জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আবার দখল ও দূষণে জমছে পলি, ভরাট হয়ে যাচ্ছে নদী। নদীতে চর পড়ে নদীর গভীরতা যেমন কমে যাচ্ছে, তেমনি নদীর প্রশস্ততাও কমে নদীটি ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে। কর্ণফুলী নদী ও এর আশপাশের খালগুলোর নাব্য সংকট দূর করতে না পারলে বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রাম নগরীতে আবার ব্যাপক জলাবদ্ধতা দেখা দেবে।
এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো, কর্ণফুলী দখল ও দূষণে মানুষের চেয়ে নদী ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়ভার বেশি। বন্দর মোহনা থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত কর্ণফুলী নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব চট্টগ্রাম বন্দর কর্তপক্ষের। কিন্তু তারা কখনও সঠিক দায়িত্ব পালন করেনি। কর্ণফুলীতে নোঙ্গরকারী শত শত জাহাজের পোড়া তেল প্রতিনিয়ত কর্ণফুলীতে ফেলছে। বন্দর নীরব। চট্টগ্রাম মহানগরীর ৭০ লক্ষ মানুষ সৃষ্ট বর্জ্য সরাসরি কর্ণফুলী পড়ছে। এক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত ওয়াসা নীরব দর্শক। নদীর উভয় তীরের শতাধিক শিল্প কারখানা, বাজার, ঘাটের মাধ্যমে নদী দূষণ হচ্ছে। এভাবে চলতে দেয়া যায় না। তাই কর্ণফুলী রক্ষায় সামাজিক আন্দোলন আরো জোরদার করার বিকল্প নেই। খরস্রোত না হলে অনেক আগেই কর্ণফুলীতে বুড়িগঙ্গা হয়ে যেত। কর্ণফুলী জোয়ার ভাটা রাসায়নিক ও মনুষ্য সৃষ্ট বর্জ্য সাগরে নিয়ে যাচ্ছে। এতে সাগরের দূষণ দিন দিন বেড়ে চলেছে। এ জন্য কর্ণফুলী সঠিক শাসন করতে বন্দর কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

Advertisement