কর্ণফুলীর তলদেশে খনন কাজ আবারও পেছাল

খনন যন্ত্রের অ্যাসেম্বলি শেষ হয়নি।। বাড়তে পারে টানেলের প্রকল্প ব্যয়

সোহেল মারমা

শনিবার , ২৭ অক্টোবর, ২০১৮ at ৭:৫৭ পূর্বাহ্ণ
460

বহুল প্রতীক্ষিত কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের খনন কাজ আবারও পিছিয়ে গেল। আগামী ৩১ অক্টোবর কাজটি শুরু করার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা হচ্ছে না। খননকারী যন্ত্র টানেল বোরিং মেশিন (টিবিএম) অ্যাসেম্বলির কাজ শেষ না হওয়ায় আগামী দুই মাসের মধ্যে কাজ শুরুর ব্যাপারে সন্দিহান প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে প্রকল্পটির ডিপিপি রিভাইজড হচ্ছে। এতে করে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যেতে পারে বলে ধারণা করছেন অনেকেই। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে তলদেশে খনন কাজ শুরু করার কথা ছিল। এ ব্যাপারে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বহু লেন সড়ক টানেল নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক হারুনুর রশীদ চৌধুরী গতকাল আজাদীকে বলেন, খনন কাজ শুরু করার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুতি এখনো সম্পন্ন করতে পারিনি। কিছু কাজ বাকি আছে। সেগুলো শেষ হলে খনন কাজ শুরু করা যাবে।
তিনি বলেন, এ ধরনের প্রকল্প বাংলাদেশে প্রথম হচ্ছে। এ জন্য প্রকল্পটিকে গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। এটাকে অন্যান্য প্রকল্পের মতো দেখলে হবে না। খুব সাবধানে কাজটি শুরু করতে হবে। তড়িগড়ি করে খনন শুরু করতে গিয়ে মাঝপথে আটকে গেলে প্রকল্প কাজে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটবে।
তিনি বলেন, এ ধরনের খনন কাজ শুরু করলে শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যেতে হবে। সুতরাং খুব ভেবে-চিন্তে ও সবকিছু ঠিকঠাক করেই খনন কাজটি শুরু করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না। কখন শুরু করা যাবে তা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না বলে জানান তিনি। প্রকল্প কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কর্ণফুলীর তলদেশে খনন কাজ শুরু করতে আরো দুই মাসের মতো সময় লাগতে পারে। পিবিএমের অ্যাসেম্বলির কাজ সমাপ্ত না হওয়ায় খনন কাজ শুরু হতে দেরি হচ্ছে। আর্থিক বা অন্য কোনো সমস্যা প্রকল্পটির সময়ক্ষেপণের জন্য দায়ী নয়।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একজন আজাদীকে বলেন, টিবিএমের অনেক কাজ বাকি রয়েছে। এছাড়া প্রকল্পটির ডিপিপি রিভাইজডের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে গত ৫ সেপ্টেম্বর পরিকল্পনা কমিশনে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ইতিমধ্যে সংশোধিত ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে প্রেরণ করা হয়েছে। এতে করে বর্তমানে প্রকল্প ব্যয় সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার চেয়ে বেড়ে যেতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে নদীর তলদেশ খননকারী যন্ত্র টিবিএম যে জায়গা (পতেঙ্গা অংশ) থেকে খনন শুরু করবে তার ওয়ার্কিং শাফটসহ আনুষঙ্গিক কাজের নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পটির পূর্ব প্রান্তের ওয়ার্কিং শাফট নির্মাণের কাজ এখনো শেষ হয়নি। তবে ওই অংশে গাইড ওয়াল ও ডায়াফ্রাম ওয়ালের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

এছাড়া চীনের জিয়াংসু প্রদেশে জেংজিয়ান শহরে টানেল সেগমেন্ট কাস্টিং প্ল্যান্টে এখনো সেগমেন্ট নির্মাণের কাজ শেষ হয়নি। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্ল্যান্টটি ৪ হাজার ২৫০টি সেগমেন্ট নির্মাণ করতে পেরেছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৬৮টি সেগমেন্ট চট্টগ্রামে সাইটে পৌঁছেছে। পাশাপাশি আনোয়ারা অংশে চলমান সাইট ক্যাম্প, আবাসন ও বেচিং প্ল্যান্ট ও ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টসহ অন্যান্য সুবিধাদি নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
পতেঙ্গা ও আনোয়ারা উভয় প্রান্তে ২ মেগাওয়াট এবং পতেঙ্গায় ১৫ মেগাওয়াট স্থায়ী বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে। আনোয়ারা প্রান্তে স্থায়ী বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণের কাজসহ প্রয়োজনীয় সাবস্টেশন নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। এর আগে প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, প্রকল্প কাজ শুরুর পর বোরিং মেশিন বা খননকারী যন্ত্র পৌঁছার ভিত্তিতে সেপ্টেম্বরে খনন কাজ শুরু করার কথা জানিয়েছেন প্রকল্প কর্মকর্তারা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তখন খনন কাজ উদ্বোধন করার কথা ছিল। কিন্তু বোরিং মেশিনটি দেশে পৌঁছা নিয়ে কয়েক দফা সময় পিছিয়ে যায়। পরবর্তীতে গত ২৭ জুলাই সমুদ্রপথে টিবিএম চট্টগ্রামে পৌঁছে।
এ ব্যাপারে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বোরিং মেশিন চীনে নির্মাণ থেকে শুরু করে প্যাকেজিং করে দেশে নিয়ে আসা-এগুলো দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে করতে হয়েছে। এখানে পৌঁছার পর বৃহদাকার মেশিনটির প্যাকেজিং খোলা, সেখান থেকে একেক করে বিভিন্ন পার্টস খুলে প্রকল্প এলাকায় নিয়ে যাওয়ার কাজ শুরু হয়। মূলত টিবিএমের অ্যাসেম্বলির কাজ তখন থেকেই শুরু হয়। প্রায় তিন মাস হতে চলেছে, কিন্তু এখনো টিবিএমের অ্যাসেম্বলির কাজ সমাপ্ত করা যায়নি।
এর আগে আগস্টে চট্টগ্রামে সফরে এসে কর্ণফুলী তলদেশে টানেল সড়ক নির্মাণ কাজ পরিদর্শন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। ওই সময় মন্ত্রী অক্টোবরের শেষ নাগাদ খনন কাজ শুরু করার প্রতিশ্রুতি দেন।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৪শ ৪৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। এ প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার ২৮শ কোটি টাকা অর্থায়ন করছে। বাকি অর্থ দিচ্ছে চীন। চার লেনের তিন দশমিক চার কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ টানেল হবে ডাবল লেনের। পূর্ব-পশ্চিম প্রান্তে হবে পাঁচ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক। চীনের সাংহাইয়ের মতো ওয়ান সিটি টু টাউন মডেলে নির্মাণ করা হচ্ছে টানেলটি। এ কাজে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আড়াইশ কনসালটেন্টসহ মোট ১ হাজার শ্রমিক কাজ করছেন।
চট্টগ্রামের সাথে কর্ণফুলী নদীর ওই পারের এলাকার দ্রুত যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে কর্ণফুলী টানেল প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ সেতু পরিবহন কর্তৃপক্ষ কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। এ জন্য শাহ আমানত বিমানবন্দর থেকে কর্ণফুলী নদীর ২ কিলোমিটার ভাটিতে টানেল নির্মাণ কাজের এলাইনমেন্ট করা আছে। টানেলটি দুই লেন বিশিষ্ট এবং লম্বায় হবে ৩ হাজার ৩১৫ মিটার। এর সাথে ফ্লাইওভার থাকবে ৬৩৭ মিটার এবং সংযোগ সড়ক থাকবে ৫৯৫০ মিটার। ২০১৫ সালের নভেম্বরে হাতে নেওয়া প্রকল্পটি আগামী ২০২০ সালে জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে প্রকল্পের ভৌত কাজ গত বছরের ডিসেম্বর থেকে শুরু করা হয়। এর আগে ওই বছর ৬ নভেম্বর প্রকল্পের ঋণচুক্তি হয়েছে। চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড এ টানেল নির্মাণ কাজ করছে। এছাড়া নির্মাণ কৌশলে শিল্ড ড্রাইভেন মেথড এবং ডিজাইন রিভিউ ও নির্মাণ তদারকি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে থাকছে এসএমইসি-সিওডব্লিউআই জেভি অ্যান্ড এসোসিয়েটস।

x