করপোরেট কর হার ॥ শুধু কমালে হবে না উৎপাদন পরিবেশেরও উন্নতি ঘটাতে হবে

বৃহস্পতিবার , ১৬ মে, ২০১৯ at ৩:২৪ পূর্বাহ্ণ
27

বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে আগামী বাজেট থেকে সব ক্ষেত্রে করপোরেট কর হার পর্যায়ক্রমে ২ শতাংশ করে কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে পেশাদার হিসাববিদদের সংগঠন ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট অব বাংলাদেশ (আইসিএবি)। একই সঙ্গে করের পরিধি বাড়ানোর ও রাজস্ব খাতের সংস্কারে আইসিএবির সদস্যদের যুক্ত করার দাবি জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি রাজধানীর সিএ ভবনে ‘আগামী জাতীয় বাজেটের ওপর চার্টার্ড অ্যাকউন্ট্যান্টদের ভাবনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন আইসিএবির প্রেসিডেন্ট। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক সভাপতি এবং ট্যাক্সেশন ও করপোরেট ল’ কমিটির চেয়ারম্যান। সূচনা বক্তব্যে আইসিএবির প্রেসিডেন্ট বলেন, আইসিএবির প্রস্তাবনাগুলো মূলত রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, আইনের বৈপরীত্য পরিহার ও ফাঁকফোকর কমানো, আইনের প্রয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ বিনিয়োগ কার্যক্রমকে উৎসাহ প্রদান ও দেশ থেকে মূলধন পাচার নিরুৎসাহিতকরণের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব প্রস্তাবনার বাস্তবায়ন হলে করদাতাদের হয়রানি কমবে এবং দেশে বিনিয়োগ বাড়বে। আইসিএবির প্রস্তাবনা হলো, কর আহরণ পদ্ধতি সহজতর করে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সব ক্ষেত্রে করপোরেট কর হার পর্যায়ক্রমে ২ শতাংশ করে কমিয়ে আনা। পত্রিকান্তরে এ খবর সম্প্রতি প্রকাশিত হয়।
করপোরেট করের হার নিয়ে দেশে বিতর্ক চলছে অনেকদিন ধরে। ব্যবসায়ীরা বলছেন বাংলাদেশে করপোরেট করের হার অনেক বেশি। বেসরকারি খাতকে বিকাশের সুযোগ দেয়ার লক্ষ্যে এ হার কমানো উচিত। অন্যদিকে সরকারের নীতিনির্ধারকেরা এসব কথায় তেমন কর্ণপাত করছেন না। আসন্ন বাজেট সামনে রেখে আইসিএবি করপোরেট কর হার পর্যায়ক্রমে ২ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এটা ঠিক যে ব্যবসার উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। ঋণের ব্যয় ধীরে ধীরে কমে এলেও এখন পর্যন্ত তা অনেক বেশি। এ অবস্থায় নতুন উদ্যোক্তারা তাদের বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারে অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হচ্ছেন। আবার এ কথা সত্য করপোরেট কর কমালে বেশি বেশি বিনিয়োগ হবে, এমনটিও নিশ্চিত নয়। কারণ বিনিয়োগ করার জন্য ব্যবসায় সম্প্রসারণের সুযোগ থাকতে হবে, টেকনোলজি থাকতে হবে, দক্ষ জনবল থাকতে হবে, বাজার থাকতে হবে, সর্বোপরি উদ্যোগ থাকতে হবে। আবার করহার কমালেই কর আদায় বেশি হবে, এমন কোন নিশ্চিত তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া মার্কিন অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিজ বলেছেন, বৈদেশিক বিনিয়োগ কেবল কর হারের ওপর নির্ভর করে না এটা নির্ভর করে অনেক চালকের ওপর। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, অবকাঠামো, আইনি কাঠামো ও দুর্নীতি। দেশে অব কাঠামো সমস্যার সমাধান হচ্ছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, সড়ক, বন্দর ইত্যাদি সমস্যার মোটামুটি সমাধান হতে আরো কয়েক বছর লাগবে। আইনি কাঠামো যথেষ্ট ব্যবসাবান্ধব হলেও তার সুবিধা দুর্নীতির কারণে নিতে পারছেন না দেশি বিদেশি উদ্যোক্তারা। সঠিক পরিমাণ কর যে সব কোম্পানি দেয় তাদেরও পোহাতে হয় সীমাহীন আমলাতান্ত্রিক হয়রানি ও দুর্ভোগ। কর্পোরেট কর কমানোর পাশাপাশি বিনিয়োগ ও উৎপাদন পরিবেশেরও উন্নতি ঘটাতে হবে। সরকার যদি কর আদায়ের বিশেষ কৌশল বা পদ্ধতি আরো সুদৃঢ় করে এবং যারা কর ফাঁকি দেন তাদের ধরতে পারে, তাহলে করহার এমনিতেই কমে আসবে। সরকারে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে।
বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ করপোরেট কর কমিয়ে আনছে। এর মধ্যে ভারতসহ সার্কভুক্ত দেশগুলো করপোরেট কর কমিয়েছে। উন্নত দেশ বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত অধিকাংশ দেশ এ নীতি অনুসরণ করছে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার সব খাতের করপোরেট কর না কমিয়ে গেল বছর ব্যাংকিং খাতের কর হ্রাস করে। যা বিতর্ক সৃষ্টি করে। এবার যেন সেটি না ঘটে, তার দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। একই সঙ্গে কর হার না বাড়িয়ে করের আওতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বর্তমানে ব্যবসায়িদের জন্য ব্যবসা সহায়ক কর ব্যবস্থা প্রয়োজন। এতে তারা আরো ভরসা পাবেন নতুন নতুন বিনিয়োগে। এর মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও অর্জিত হবে। সরকারের উচিত করপ্রদানকারীদের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি না করে যারা কর ফাঁকি দেন তাদের করের আওতায় আনা। যৌক্তিক করপোরেট কর হার বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করে। আর উচ্চ কর হার বিনিয়োগকারীদের কর ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা বাড়ায়। সরকারের রাজস্ব আহরণও ব্যবসায়ীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির মধ্যে ভারসাম্য আনা গেলে দেশের অর্থনীতি উপকৃত হবে।

x