কমছে না মজুরি বৈষম্য : খেত খামারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করা নারী মজুররা এখনো বেতন পাচ্ছে পুরুষ মজুরের অর্ধেক

চৌধুরী শহীদ : চন্দনাইশ

সোমবার , ৪ মার্চ, ২০১৯ at ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ
38

দেশের সংবিধানে নারী পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হলেও বিভিন্ন স্থানে সেই সমান অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশের অধিকাংশ নারী সমাজ। খেত খামারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমানতালে কাজ করলেও সবত্রই বিরাজ করছে নারী পুরুষের বেতন বা মজুরি বৈষম্য। সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রচার প্রচারণা চালিয়েও কমানো যাচ্ছে না ঘামের দামের এ বৈষম্য। ফলে জীবন জীবিকার প্রয়োজনে পুরুষ মজুরের চেয়েও অর্ধেক বেতনে সর্বক্ষেত্রে শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে নারী মজুররা।
চন্দনাইশ ও সাতকানিয়া উপজেলা সীমান্ত দিয়ে প্রবাহিত শঙ্খনদের উপকূল ঘেরা দুই উপজেলার হাজার হাজার নারী মজুর শঙ্খের চরের খেত খামারগুলো ছাড়াও নানাস্থানে পুরুষদের সাথে সমানতালে কাজ করেও পুরুষের অর্ধেক মজুরি পাচ্ছে। মজুরি বৈষম্যের এ ধারা চলতে থাকলেও কেউ কখনো এর প্রতিবাদ করছে না। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে পরদিন থেকে আর কাজে ডাকে না মালিকপক্ষ। তাই কাজ হারানোর ভয়ে কেউ কখনো কোন প্রতিবাদ না করে অর্ধেক বেতন মেনে নিয়েই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে পুরুষের পাশাপাশি সারাদিন কঠোর পরিশ্রমের পরও এসব নারী মজুরদের বাড়ি ফিরতে হচ্ছে অর্ধেক বেতন নিয়ে। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে বসতি গড়ে তোলা রোহিঙ্গা মহিলারা কম মজুরিতে কাজ করতে রাজি হয়ে যাওয়ায় এ বৈষম্যের সৃষ্টি বলে মনে করছেন সচেতন মহল। ফলে দেশীয় নারী মজুররা চরম বৈষম্যকে মেনে নিয়ে শুধুমাত্র অভাবের সংসারের চাকা সচল রাখতে অর্ধেক বেতনে কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে নারী পুরুষের এ মজুর বৈষম্য দেখা বা তদারকি করার জন্য কেউ মাঠে না আসার কারণেই দিনদিন এ বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।
দক্ষিণ চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি নারী মজুর কাজ করে দক্ষিণ চট্টগ্রামেরই সবজিভাণ্ডার হিসাবে খ্যাতি পাওয়া চন্দনাইশ ও সাতকানিয়া উপজেলার শংখনদ উপকূলবর্তী চরের সবজি খেতগুলোতে। শংখনদের দু’পাড়ে জেগে উঠা চরের কয়েক লক্ষাধিক একর জমিতে পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দিনমজুরি করছে শত শত নারী মজুর। সরেজমিন দোহাজারী লালুটিয়া চরে গিয়ে দেখা যায় একই খেতে পুরুষের সাথে নারীরাও সমানে কাজ করে যাচ্ছে। খেতে চারা রোপণ, পরিচর্যা, ফসলের গোড়ায় মাটি তুলে দেয়া এবং খেত থেকে ফসল তোলাসহ সব ধরনের কাজ এসব নারীরা পুরুষের সাথে সমানেই করে যাচ্ছে।
খেতে কর্মরত আমেনা খাতুন, সুফিয়া বেগম, সুখি দাশ, মিতা দাশ, আমিনা বেগমসহ আরো কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায় তারা দৈনিক আড়াইশ টাকা মজুরিতে কাজ করছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার ২০০ টাকা বেতনেও কাজে এসেছে। এ সময় তারা জানায় তাদের সাথে যেসব পুরুষ মজুর তাদের সাথে কাজ করছে দিনশেষে তারা মজুরি পাচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। তারা অভিযোগ করে জানায় মিয়ানমারের মহিলারা কম বেতনে কাজ করতে রাজি হয়ে যাওয়ার কারণেই দেশীয় নারী মজুরদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। একই খেতে নারী মজুরদের সাথে কর্মরত পুরুষ মজুর আবুল বশর, মোহাম্মদ আলী স্বীকার করেছে নারী মজুরদের দুইগুণ বা তারও বেশি মজুরি পাওয়ার বিষয়টি। তবে পুরুষ মজুররা নারীদের চেয়ে বেশি এবং কঠিন কাজগুলো করে থাকে বলেও জানালেন।
নারী পুরুষের বেতন বৈষম্যের ব্যাপারে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক খেত মালিক বৈষম্যের বিষয়টি স্বীকার করে জানায় মহিলা শ্রমিকদের দিয়ে পুরুষদের মতো ভারী কাজগুলো করানো হয় না। তারা শুধু খেতে আগাছা পরিষ্কার, খুঁটি ঠিক করে দেয়া, ফসল তোলার মতো হালকা কাজগুলোই করে থাকে। এরকম হালকা কাজের জন্য পুরুষদের সমান মজুরি দিলে কোনভাবেই পুষিয়ে উঠতে পারবে না বলেও জানায় এ খেত মালিক।
চন্দনাইশ উপজেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক নবাব আলী খেত খামারে কাজ করা নারী শ্রমিকরা পুরুষ শ্রমিকদের চেয়ে অর্ধেক মজুরি পাচ্ছে স্বীকার করে বলেন যেখানে নারী পুরুষের সমান অধিকারের বিষয়টি সংবিধানে স্বীকৃত সেখানে নারী শ্রমিকদের এই বেতন বৈষম্য মেনে নেয়া যায় না।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জাতীয় কৃষক পার্টির সদস্যসচিব এ কে এম বাদশা মিয়া জানায় বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা মহিলারা কম মজুরিতে কাজ করতে রাজী হয়ে যাওয়ায় খেত খামারীরা বাঙালি নারী শ্রমিকদের কোনভাবেই বেশি মজুরি দিতে রাজি না হওয়ায় এ বৈষম্যমূলক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এ বৈষম্যের অবসান হওয়া দরকার বলেও মনে করেন এ কৃষক নেতা।
চন্দনাইশ উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মিসেস গীতা চৌধুরীর সাথে তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি আজাদীকে বলেন সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত পর্যায়ে নারী পুরুষের কোন বেতন বৈষম্য নেই। তবে বেসরকারিভাবে প্রায় সব পর্যায়ে এ বৈষম্য বিরাজমান রয়েছে স্বীকার করে তিনি বলেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরুষের সাথে সমানতালে কাজ করেও নারী মজুর বা শ্রমিকরা কম বেতন পাচ্ছে। বেতন ছাড়াও নারী শ্রমিকরা অন্যান্য সহযোগিতাও পুরুষের চেয়ে কম পায় উল্লেখ করে তিনি বলেন বিশেষ করে ইটভাটা, ইটভাঙা, রাস্তা বা সড়ক মেরামত বা খেতে খামারে পুরুষের চেয়ে নারী শ্রমিকরা অনেক বেশি কাজ করে দিনশেষে তারা দিনশেষে বেতন পায় অর্ধেক বা তার চেয়েও কম। যেটি কোনভাবেই মেনে নেয়ার মতো নয়। আলাপকালে এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল আরো জোরালোভাবে এগিয়ে আসলে এ বৈষম্যের অবসান হতে পারে বলেও মনে করেছেন এ মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা।

x