কবি নজরুলের বিদ্রোহী সত্তার স্বরূপ

মোহীত উল আলম

শুক্রবার , ৩০ আগস্ট, ২০১৯ at ৮:২১ পূর্বাহ্ণ
77

বড় লেখকদের মৃত্যুর পর কালের আবর্তে তাঁদের অনেক কথা ক্রমশ দ্ব্যর্থবোধক হয়ে পড়ে। কবি নজরুলের ক্ষেত্রে সেরকম একটি বাক্য হলো “বিদ্রোহী” কবিতার সে বিখ্যাত পংক্তিটি: “আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ।” আমাদের বর্তমান লেখাটির উদ্দেশ্য হলো এই পংক্তিটির ভিত্তিতে নজরুলের বিদ্রোহী সত্তার স্বরূপ উদ্ঘাটন করা।
নজরুল যুদ্ধ থেকে ফেরত আসেন ১৯২০ সালের মার্চ মাসে। এর প্রায় পৌনে দুই বছর পর, ১৯২১এর ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে তিনি মুজাফফর আহমদের তালতলা লেইনের বাসাতে এক রাত্রিতে এক বসায় ১৩৯ পংক্তির “বিদ্রোহী” কবিতাটি রচনা করেন। সেটি প্রথমে বিজলী পত্রিকায় ছাপা হয় ৬ জানুয়ারি ১৯২২, এবং পরে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে ছাপা হয় মোসলেম ভারত মাসিক পত্রিকায়। তারপর সহসা প্রবাসী ও অন্যান্য সাময়িকীতেও ছাপা হয়। অক্ষরবৃত্ত, স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত মিশিয়ে মুক্তচ্ছন্দে নজরুল যে ক্লাসিক কবিতাটি লিখলেন সেটির মেজাজ যদিও মূলত বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আধিপত্যের বিরুদ্ধে ছিল, কিন্তু সামাজিক অর্থে নজরুল সমস্ত প্রচলিত রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে রণদামামা বাজিয়েছিলেন। তারপরও উদ্ধৃত পংক্তিটি “আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ” আমাকে ভাবায়।
কবিতাটির শেষ স্তবকে তিনি বলছেন যে ঋষি ভৃগু হলো তাঁর আরাধ্য ব্যক্তিত্ব, কারণ তিনি ভগবান বিষ্ণুকে তাঁর কর্মে অবহেলার জন্য বুকে লাথি মেরেছিলেন: “আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান-বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন! / আমি খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!” তারপর অধ্যাপক প্রীতি কুমার মিত্র যেটিকে ‘উল্লম্ব ব্যক্তিত্ববাদ’ বলে অভিহিত করেছেন সেটির চরম প্রকাশ হচ্ছে কবিতাটির শেষ পংক্তিদ্বয়ে: “আমি চির-বিদ্রোহী বীর– / বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!”
এই যে কথাটি, “বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!” এই কথাটিকে মানবসমাজে জায়গা দেওয়া হবে কীভাবে! এ প্রশ্নে ব্যাকুল হয়ে উত্তর খুঁজতে গেলে নজরুলের দু’টো প্রবন্ধের ওপর আমরা চোখ দিতে পারি, যেগুলিতে এই উল্লম্ব ব্যক্তিত্ববাদের খানিকটা ব্যাখ্যা মেলে। এ দু’টো প্রবন্ধ, যথাক্রমে “আমার পথ” এবং “‘ধূমকেতু’র পথ” শীর্ষক, নজরুলের ব্যাখ্যাটি তুলে ধরছে। প্রথম প্রবন্ধটিতে নজরুল অকাতরে জোর দিচ্ছেন ব্যক্তি-মানুষের বিবেকের ওপর। যার মনে সত্য আছে, তার আর মিথ্যাকে ভয় পাওয়ার দরকার হয় না। “নিজেকে চিনলে, নিজের সত্যকেই নিজের কর্ণধার মনে জানলে নিজের শক্তির ওপর অটুট বিশ্বাস আসে। . . . আত্মাকে চিনলেই আত্মনির্ভরতা আসে। এই আত্মনির্ভরতা যেদিন সত্যি সত্যিই আমাদের আসবে, সেই দিনই আমরা স্বাধীন হব, তার আগে কিছুতেই নয়।” অথচ ইংরেজ মনীষী ফ্রান্সিস বেকন তাঁর “অব টু্রথ” (১৫৯৭) শীর্ষক প্রবন্ধটি শুরু করছেন এই বিখ্যাত উক্তিটি দিয়ে, “হোয়াট ইজ টু্রথ?” সত্য কী?
ধূমকেতু পত্রিকাটি নজরুল নিজেই সম্পাদনা ও কোন বন্ধুর কাছ থেকে অর্থসাহায্য নিয়ে প্রকাশ করতেন। এর প্রথম সংখ্যাটির প্রকাশ হয় শুক্রবার, ১১ আগস্ট ১৯২২। “বিদ্রোহী” কবিতাটি ধূমকেতুর প্রথম সংখ্যায় পুনর্মুদ্রিত হয়। ধূমকেতুর প্রকাশের প্রেক্ষাপট ছিল পুরোটাই বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনা। সাথে ছিল রক্ষণশীল হিন্দুসমাজ ও মৌলবাদী ইসলামী চিন্তা-চেতনার ওপর আক্রমণ। এমনকি গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনকেও ধূমকেতুর সম্পাদকীয়ের মাধ্যমে নজরুল আক্রমণ করেন। ধূমকেতু প্রতি সপ্তাহে দু’বার বের হতো, এবং রবীন্দ্রনাথের শুভেচ্ছাবাণী অনুযায়ী এটি সত্যি সত্যি “আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু”র মতো কাজ করে। বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের সমর্থনে ধূমকেতুর অবস্থান দাঁড়ায় বলশেভিক বিপ্লব, কামাল আতাতুর্কের অধীনে তুরস্কের নবোত্থান, ইসলামের মহিমান্বিত ঐতিহ্য এবং বাংলার বিপ্লবী চেতনাকে সমর্থন করার মধ্যে। এটির তৃতীয় সংখ্যায় মার্ক্সবাদী চেতনার আলোকে নজরুল “রুদ্রমঙ্গল” শীর্ষক একটি সম্পাদকীয়তে কৃষক-শ্রমিকদের দুঃখ দুর্দশার বর্ণনা করে তাদেরকে সশস্ত্র সংগ্রামের আহ্বান জানালেন। মুজাফফর আহমেদ “দ্বৈপায়ন” ছদ্মনামে মার্ঙবাদী-চেতনা ঋদ্ধ কলাম লিখতে লাগলেন। ধূমকেতুর সপ্তম সংখ্যা “মহররম” সংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হয়। কারবালা-যুদ্ধ কেন্দ্রিক আবেগপ্রবণ কিছু লেখার সঙ্গে হযরত ইমাম হোসেন (রা: )-র কবরের ছবি ছাপা হয়। মক্কার জমজম কুয়া ও মদীনা নগরীর ছবিও ছাপা হয়। বস্তুত “মুসলিম জাহান” নামক একটি আলাদা বিভাগ পত্রিকাটির প্রতি সংখ্যায় প্রকাশ পেত, যেখানে মোস্তফা কামাল আতাতুর্ককে বীর ঘোষণা করে তাঁর সম্পর্কে প্রতিটা সংবাদ প্রকাশিত হতো। নজরুল এক পর্যায়ে প্রমাদবশত: বলশেভিক নেতা জোসেফ স্টালিনকে মুসলমান মনে করে ‘মোহাম্মদ সালাটিন’ হিসেবে প্রচার করেন। এর ফলে বলশেভিক নেতৃত্বে মুসলমানের অবস্থানকে তিনি রামায়ণ-এর রাম এবং সুগ্রীবের মধ্যে বন্ধুত্বের সঙ্গে তুলনা করেন। তবে ধূমকেতুর অফিস অচিরেই বাংলার বিপ্লবীদের বিচরণ ক্ষেত্র হয়ে পড়ে। এর প্রথম সংখ্যায় বিপ্লবী বারীন্দ্র কুমার ঘোষের ছবি ছাপানো হয় এই বলে “বাংলার প্রথম ধূমকেতু ফাঁসির বারীন্দ্র”। তৃতীয় সংখ্যায় মানিকতলার বোমা মামলার আসামী কানাইলাল ঘোষের ছবি ছাপা হয় “বাংলার সাগ্নিক তরুণ কানাইলাল” ক্যাপশন দিয়ে। পত্রিকাটির দ্বাদশ সংখ্যায় “শহীদ পৃষ্ঠা” নামক একটি পুরো পাতায় বাংলার বিপ্লবীদের ছবি ছাপা হয়: যথাক্রমে ক্ষুধিরাম, কানাই লাল, সত্যেন বসু, প্রফুল্ল চাকী ও বাঘা যতীনের। “আমরা লক্ষ্মীছাড়ার দল,” “আমি সৈনিক” ইত্যাদি সম্পাদকীয়তে নজরুল প্রচার করেন যে স্বাধীনতার দাবি সশস্ত্র সংগ্রামের পথ ছাড়া আদায় হবে না। যা হোক, বিপ্লবীদের ছবি সংবলিত এই দ্বাদশ সংখ্যাই (২৬ সেপ্টেম্বর ১৯২২) আসলে ধূমকেতুর অন্তিম সংখ্যা হয়ে পড়ে, কারণ এতে প্রকাশিত নজরুলের কবিতা “আনন্দময়ীর আগমনে”-র মধ্যে “ভূ-ভারত”কে “কসাইখানা” বলায় দেশদ্রোহিতার দায়ে বৃটিশ সরকার পত্রিকাটির প্রকাশ বন্ধ করল শুধু নয়, নজরুলকে পাঠালো জেলে।
“আনন্দময়ীর আগমনে” কবিতাটি সত্যি সত্যি একটি এটম বোমা। আমার ধারণা, এটি বন্ধ করার পেছনে বৃটিশ সরকার হিন্দু এবং মুসলমান সমাজের নেতৃগোষ্ঠীরও সমর্থন পেয়েছিলো। কারণ কবিতাটিতে আক্রমণের মিসাইল থেকে কাউকে বাদ দেয়া হয়নি। প্রথমেতো হিন্দুদের দেবী মা দুর্গাকে এক বিরাট খোঁচা দিয়ে সনাতন হিন্দু ধর্মকে আক্রমণ: “আর কতকাল থাকবি বেটি মাটির ঢেলার মূর্তি-আড়াল?” তারপর, নজরুলের চিরকালের শত্রু মোল্লাদের প্রচারিত ধর্মীয় উন্মাদনায় আঘাত: “দাড়ি নাড়ে, ফতোয়া ঝাড়ে, মসজিদে যায় নামাজ পড়ে, / নাইকো খেয়াল গোলামগুলোর হারাম এ-সব বন্দী গড়ে। / ‘লানত’ গলায় গোলাম ওরা সালাম করে জুলুমবাজে, / ধর্ম-ধ্বজা উড়ায় দাড়ি, ‘গলিজ’ মুঝে কোরান ভাঁজে।” (‘গলিজ মুঝের অর্থ নোংরা আত্মা।) এরপর গান্ধীর অহিংস আন্দোলনকে কটাক্ষ: “মাদীগুলোর আদি দোষ ঐ অহিংসা-বোল নাকি-নাকি, / খাঁড়ায় কেটে কর্‌ মা বিনাশ নপুংসকের প্রেমের ফাঁকি!” নজরুলের চোখে অহিংস আন্দোলন ছিল “মাদী” ও “নপুংসকের” আন্দোলনস্বরূপ। তারপর অভিযোগ এবং আশা: “হঠাৎ কখন উঠলো ক্ষেপে বিদ্রোহিনী ঝান্সি-রানী, / ক্ষ্যাপা মেয়ের অভিমানেও এলি নে তুই মা ভবানী। / এমনি করে ফাঁকি দিয়ে আর কতোকাল নিবি পূজা? / পাষাণ বাপের পাষাণ মেয়ে, আয় মা এবার দশভুজা!”
নজরুলকে আমরা জাতীয় কবি করেছি। কিন্তু আমার ধারণা, নজরুলকে আমরা যে কারণে নজরুল সে কারণে তাঁকে জাতীয় কবি বানাইনি, বরঞ্চ তাঁকে তাঁর বিদ্রোহী সত্তার ছিঁটেফোটাকেও ধারণ না করে, তাঁকে পুচ্ছবিহীন খাঁচার পাখি বানিয়ে লালন করছি। তাঁকে আমরা ডিনেসিটাইজড করে ব্যবহার করছি। অর্থাৎ তাঁকে আমরা পোষ্য বানানোর চেষ্টায় আছি, এবং সে প্রক্রিয়া থেকে সংজ্ঞায়িত করছি জাতীয় কবির ধারণাকে। তা না হলে, আমার ধারণা নজরুল আজকে বেঁচে থাকলে এই বাংলাদেশেই আমরা তাঁর প্রতিটি বিপ্লবী কবিতার জন্য তাঁকে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’, ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’, ‘সামাজিক অস্থিরতা তৈরি’, ‘যুবসমাজকে উস্কানি দেয়া’ ইত্যাদি অভিযোগে জেলে পাঠানোর ব্যবস্থা করতাম।
নজরুলের ধূমকেতু পত্রিকাটি এক অর্থে “বিদ্রোহী” কবিতারই সম্প্রসারিত সাংবাদিকতার রূপ। দু’টোর চরিত্রই এক: বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা সহ সকল ধর্মীয় ও অথনৈতিক অনাচার আর শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।
দ্বিতীয় প্রবন্ধটি, “‘ধূমকেতুর’ পথ।” এটি তিনি লিখেছিলেন ধূমকেতুর উদ্দেশ্য নিয়ে। বললেন, “সর্বপ্রথম, ‘ধূমকেতু’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, কেননা, ও-কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম ক’রে থাকেন।” তারপর বলছেন, “পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে সকলের আগে আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে, সকল-কিছু নিয়ম-কানুন বাঁধন শৃঙ্খলা মানা নিষেধের বিরুদ্ধে। আর এই বিদ্রোহ করতে হ’লে–সকলের আগে আপনাকে চিনতে হবে। বুক ফুলিয়ে বলতে হবে–আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ!” আরো পরে বলছেন, “বিদ্রোহ মানে কাউকে না-মানা নয়, বিদ্রোহ মানে যেটা বুঝি না, সেটাকে মাথা উঁচু ক’রে ‘বুঝি না’ বলা। যে-লোক তার নিজের কাজের জন্য নিজের কাছে লজ্জিত নয়, সে ক্রমেই উচ্চ হ’তে উচ্চতর স্তরে স্বর্গের পথে উঠে চলবেই চলবে। আর যাকে পদে পদে ফাঁকি আর মিথ্যার জন্য কুণ্ঠিত হয়ে চলতে হয়, সে ক্রমেই নীচের দিকে নামতে থাকে, এইটাই নরক-যন্ত্রণা। আমার বিশ্বাস আত্মার তৃপ্তিই স্বর্গসুখ, আর আত্মপ্রবঞ্চনার পীড়াই নরক-যন্ত্রণা। ‘ধূমকেতু’র মত্‌ হচ্ছে এই যে তোমার মন যা চায়, তাই করো। ধর্ম, সমাজ, রাজা, দেবতা কাউকে মেনো না। নিজের মনের শাসন মেনে চলো।”
“নিজের মনের শাসন মেনে চলো”। অর্থাৎ “আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ।” নজরুলের ধূমকেতুর ধর্মীয়-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত আজকের বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিত থেকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোগতভাবে শুধু ভিন্নতর নয় চরিত্রেও আংশিক আলাদা। নজরুল ছিলেন পরাধীন যুগের সৈনিক-কবি। তাই স্বাধীনতার জন্য তিনি সবারই সাগ্রহ যুদ্ধ আশা করেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ এবং নজরুল আমাদের জাতীয় কবি। নজরুলের সমাজের সঙ্গে আমাদের সমাজের চারিত্রের আংশিক মিল হলো গরিবের শোষণ এখনও চলছে, এবং ধর্মের উন্মাদনা বেড়েছে বই কমেনি। কিন্তু যে অংশটা নজরুলের বিপ্লবী চরিত্রের সঙ্গে আমাদের মিলছে না সেটি হলো, “আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ” কথাটি একটি রাষ্ট্রীয় গণতান্ত্রিক সমাজে ঠাঁই পায় না। কারণ আধুনিক রাষ্ট্রীয় সমাজ হচ্ছে নির্ভরতাপূর্ণ সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী। যতই তথ্যবিপ্লব ঘটছে ততই পুরোটা বিশ্ব এক ধরনের সহযোগিতামূলক বাতাবরণ তৈরি করছে।
তবে রাজনীতিতে না হলেও নজরুলের উল্লম্ব ব্যক্তিত্ববাদের প্রকৃত জায়গা হচ্ছে তাঁর কাব্যভূমি। ১৯২৬ সালে কৃষ্ণনগর থেকে বেগম শামসুন নাহার মাহমুদকে কবির সঙ্গে গানের পাখির তুলনা করে লিখছেন, “বিশেষ করে গানের পাখি যারা, তারা চিরকালে নিরুদ্দেশে দেশের পথিক। . . . নীড়-বাঁধা সামাজিক পাখিগুলো দিতে পারল না আনন্দ, আনতে পারল না স্বর্গের আভাস, সুরলোকের গান . . .।” নজরুলের প্রিয় ইংরেজ কবি শেলী যেমন তাঁর কাব্যসত্তার প্রতিভূ হিসেবে “স্কাইলার্ক” পাখিটাকে এঁকেছিলেন, নজরুলও বুলবুলি পাখির মধ্যে তাঁর কাব্যিক সত্তার রূপায়ন দেখেছিলেন।
১৯৪১ সালে ৫ ও ৬ এপ্রিল কলিকাতার মুসলিম ইনস্টি্‌িটউট হলে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতির রজত-জুবিলি উৎসবে নজরুল সভাপতি হিসেবে তাঁর জীবনের শেষ অভিভাষণটি পড়লেন, “যদি আর বাঁশি না বাজে” শিরোনামে। একদম শেষের দিকে গিয়ে বলছেন, “বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতির সাথে আমার যোগাযোগ বহু দিনের। কয়েকজন বন্ধুর আহ্বানে আমি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতির আড্‌ডায় আশ্রয় নিই, এখানে আমি বন্ধুরূপে পাই মি: মুজাফফ্‌র আহমদ, মি: আবুল কালাম শামসুদ্দীন প্রমুখ সাহিত্যিক বন্ধুগণকে। . . . যাক সেদিন যদি সাহিত্য-সমিতি আমাকে আশ্রয় না দিত তবে হয়ত কোথায় ভেসে যেতাম, তা আমি জানি না! এই ভালোবাসার বন্ধনেই আমি প্রথম নীড় বেঁধেছিলাম; এ আশ্রয় না পেলে আমার কবি হওয়া সম্ভব হত কিনা, আমার জানা নেই।”
তবে কথা একটা থাকছেই। নজরুলের এই অমিত কবিপ্রতিভা না থাকলে চুরুলিয়া থেকে উঠে আসা এক ছন্নছাড়া যুবককে কেই বা আশ্রয় দিত?

x