কবি নজরুলের বিকাশে সওগাত পত্রিকার ঐতিহাসিক ভূমিকা

নুজহাত নূর সাদিয়া

শুক্রবার , ৩০ আগস্ট, ২০১৯ at ৮:২০ পূর্বাহ্ণ
43

‘মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’
চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারা ছাড়ি’
ভুলোক দ্যুলোক গোলোক ভেদিয়া
খোদার আসন ‘ আরশ’ ছেদিয়া,
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতুর’
বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটির জনক জাতীয় কবি কাজী নজরুলের কাব্য প্রতিভা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। কিন্তু, স্বভাব বিদ্রোহী এ কবির বিকশিত হওয়ার কালে যে পত্রিকাগুলো এবং তাঁর গুণমুগ্ধ শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তার খবর সাধারণের অজানা। তাই নজরুল প্রেমি আর সাধারণ পাঠকদের সুবিধার্থে তুলে ধরার চেষ্টা করছি বাংলা সাহিত্যের এ অবহেলিত ধুমকেতুর আত্মপ্রকাশের চমকপ্রদ বর্ণনা।
বিশ শতকের বাংলায় ‘ সওগাত’ পত্রিকা একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল। মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন সম্পাদিত এই পত্রিকাটি ১৯১৮ সালে কলকাতা হতে প্রথম প্রকাশিত হয়। বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে বিশেষ করে মুসলমান সমাজের ভেতর আধুনিকতার প্রসারে এই পত্রিকাটি যুগান্তকারি ভূমিকা পালন করে। সওগাত পত্রিকাটির সাথে কাজী নজরুল ইসলামের সম্পর্ক পত্রিকাটি প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন হতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
লেখক হিসেবে আত্নপ্রকাশ তখন ও এ স্বভাব কবির হয়নি, তবে পত্রিকাটির জন্য গ্রাহক সংগ্রহ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি বেশ তৎপর ছিলেন। ১৩২৬ বৈশাখ সংখ্যায় সওগাত পত্রিকার জন্য যারা গ্রাহক সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন তাদের নামের একটি তালিকা প্রকাশিত হয়, যাতে উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিল তাঁর।
নজরুলের নাম মুদ্রিত আকারে সেই প্রথম সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। লেখকটির তখনকার পরিচয় রণাঙ্গনের একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে। সৈনিক হিসেবে তখন তাঁর অবস্থান ছিল ৪৯ নম্বর বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদর দফতর করাচিতে। সেখান থেকেই উদীয়মান তরুণটির সাহিত্য সম্ভারের ঝাঁপিটি ক্রমশ বিকশিত হতে থাকে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তিনি নিয়মিত নানা রচনা, গল্প, কবিতা পাঠাতে থাকেন।
সওগাত-এর প্রথম বর্ষ, সপ্তম সংখ্যা ১৩২৬ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ মাসে কবির প্রথম রচনা ‘বাউন্ডুলের আত্নকাহিনী’ প্রকাশিত হয়েছিল। এ প্রকাশিত রচনা সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করে সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন বলেন, সওগাত প্রকাশিত হবার প্রায় পর পরই নজরুল করাচি হতে লেখা পাঠাতে শুরু করেন। প্রচুর লেখা, সঙ্গে থাকত লেখকের আন্তরিক চিঠি। প্রথমদিকে নজরুল সওগাতে যেসব লেখা পাঠাতেন, সেগুলোর বেশির ভাগই ছিল উচ্ছ্বাসপূর্ণ। সেগুলোতে গ্রন্থ নৈপুণ্যের পরিচয় যেমন ছিল না, তেমনই শিল্প নৈপুণ্যের অভাব দেখা যেত। (সওগাতের সঙ্গে নজরুলের প্রথম সম্পর্ক: মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন, সওগাত-বিশেষ সংখ্যা, ঢাকা বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৮১)।
জীবনের প্রথম রচনা প্রকাশ, আত্মহারা কবি সওগাত পত্রিকার সম্পাদক নাসিরুদ্দিন সাহেবকে অভিনন্দন জানিয়ে একটি দীর্ঘ চিঠি লিখেছিলেন। সে চিঠিতে দূরদর্শী লেখকটি তুলে ধরেছিলেন মুসলমান সমাজের দুরবস্থা এবং প্রগতিশীল সাহিত্য সম্পর্কে নিজ ইচ্ছে ও প্রগতিশীল সাহিত্যের প্রয়োজনীয়তা। তারপর এ বিদ্রোহীর শুধুই এগিয়ে চলা লেখালেখির কন্টকময় দুর্গম পথে।
নজরুলের দ্বিতীয় গল্প ‘স্বামীহারা’ প্রকাশিত হয় পত্রিকার প্রথম বর্ষ, একাদশ সংখ্যায় ১৩২৬ বঙ্গাব্দে। একে একে নজরুলের দ্বিতীয় কবিতা ‘সমাধি’, জীবনের প্রথম প্রবন্ধ ‘তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা’ সহ নানা রচনায় দৃঢ় করতে থাকেন সওগাতের সাথে তাঁর আত্নার বাঁধনটিকে। এখানে, উল্লেখ্য নজরুলের প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘মুক্তি’ কিন্তু প্রকাশিত হয়েছিল বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকাতে ১৩২৬ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ সংখ্যায়। সে কবিতাটি প্রকাশিত হবার পর সংশ্লিষ্ট পত্রিকার সম্পাদককে নজরুল একটি দীর্ঘ চিঠি লিখেছিলেন যাতে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে সওগাত পত্রিকার কথা উল্লেখ করেছিলেন। যাতে তাঁর নিখাদ স্বীকারোক্তি ছিল; এবারে পাঠালুম একটি লম্বা চওড়া গাঁথা । আরেকটি প্রায় দীর্ঘ গল্প, আপনাদের পরবর্তী সংখ্যা কাগজে ছাপানোর জন্য। যদি ও কার্তিক মাস এখন অনেক দূর। আর যদি এত বেশি লেখা ছাপাবার মত জায়গা না থাকে আপনার কাগজে তাহলে যে কোন একটি লেখা সওগাত সম্পাদককে হ্যান্ডওভার করলে আমি বেশ অনুগৃহীত হব। করাচিতে সামরিক ছাউনিতে থাকাকালীন সওগাতে নজরুলের চারটি রচনা প্রকাশিত হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষের পথে, ব্রিটিশ সরকার আগের ঘোষণা অনুসারে ১৯২০ সালের প্রথম দিকে সেনাবাহিনীর ৪৯ নম্বর রেজিমেন্ট ভেঙ্গে দেয়। বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙ্গে গেলে নজরুল কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৯২০ সালের মার্চ মাসে কার্যত বেকার অবস্থায় করাচি হতে ফিরে এসে বন্ধু শৈলজানন্দের বোর্ডিংয়ে অস্থায়ী আবাস গাড়েন। তিন-চারদিন পর তিনি আসেন ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রীটে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে।
কলকাতায় ফিরে এসেই কৃতজ্ঞ কবি সওগাত সম্পাদক নাসিরুদ্দিন সাহেবের সাথে সরাসরি দেখা করেন। তাঁর সাথে চাক্ষুষ দেখাকালের স্মৃতিচারণায় পরবর্তীকালে নাসিরুদ্দিন সাহেব লিখেছেন; আমি অফিসে বসে কাজ করছি। এমন সময় সৈনিকের পোশাক পরিহিত এক যুবক আমার সামনে এসে দাঁড়াল। আমি তাঁকে দেখে চমকে উঠলাম। ভাবলাম, সেনার লোক কেন আবার আমার অফিসে এসে ঢুকল। আমার উৎকন্ঠা অনুভব করে হেসে উঠে আগন্তুক বললেন, আমি কাজী নজরুল ইসলাম। বাঙালি পল্টন ভেঙ্গে দিয়েছে, তাই করাচি ছেড়ে চলে এলাম। আপনি সওগাতে আমার প্রথম লেখা ছেপেছেন, সে কথা ভুলিনি। সকলের আগে আপনার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে হল। এখন লিখব, অনেক লেখা দেব সওগাতে।
প্রত্যক্ষ সাক্ষাত কবির ভেতরকার সুপ্ত আগ্নেয়গিরিটি এবার ধিকি ধিকি করে জ্বলে উঠল। সৃষ্টি হল তাঁর প্রথম গান উদ্বোধন। পরবর্তী কালে ‘কলঙ্কিপ্রিয়’ নামক দ্বিতীয় গানটি ও একই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রথম জীবনের এই গান ও গল্পের মাধ্যমে নজরুল পাঠকমহলে বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। গল্পকার হিসেবে নজরুলের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই সময়কালে কবি হিসেবে তিনি আত্নপ্রকাশ করেন মোসলেম ভারত পত্রিকাতে কোরবানি, মোহররম ও সাত ইল আরব নামে কিছু উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রচনার মাধ্যমে।
এই কবিতাগুলোর ভাব এবং ভাষার আধুনিকতা তৎকালীন পাঠক সমাজকে বিশেষ ভাবে আকর্ষিত করে। বাংলা ভাষার সঙ্গে আরবি ভাষা, বাংলা শব্দের সঙ্গে আরবি শব্দের সম্মিলন ঘটিয়ে সাহিত্যচর্চায় সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারা সৃষ্টি করেছিলেন নজরুল, মোসলেম ভারত পত্রিকায়। ১৩২৭ বঙ্গাব্দের এই পর্বে লেখা থেকেই নজরুলের সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়েছিল। তাঁর এই বৈচিত্র্যধর্মী সাহিত্য-প্রতিভার স্ফুরণকালে জাতীয় আন্দোলনের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। খিলাফত আন্দোলন, হিজরত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলনের পাশাপাশি জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড-সেই সময়ের ভারতবর্ষের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে।
জাতীয় আন্দোলনের এই পরিমন্ডলের ভেতরেই কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ফেরত সেনাটি নিজের বেকার অবস্থাকে গুরুত্ব না দিয়ে একটি পত্রিকা প্রকাশে উদ্যোগী হন। তাঁর সেই উদ্যোগের ফসল হল ‘নবযুগ’ পত্রিকা। এই দৈনিক পত্রিকাটি প্রকাশে নজরুলকে প্রধান পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন রাজনীতিবিদ একে ফজলুল হক। এই কাজে মুজাফফর আহমেদ, মোহাম্মদ ওয়াজেত আলি, ফজলুল হক সেলবর্ষী প্রমুখ সেই সময়ের কয়েকজন বিশিষ্ট সমাজ সচেতন মানুষ সম্মিলিত ভাবে নজরুলের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এই নবযুগ প্রকাশকালে মইনুদ্দিন হুসাইনের ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীতে তিনি নূর লাইব্রেরি নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা খোলেন এবং নজরুলের বেশ কিছু বইপত্র প্রকাশের ব্যবস্থা করে দেন।
পত্রিকাটির সাংগঠনিক কাজকর্মে ওয়াজেত আলি জড়িত থাকলে ও ব্যক্তিগত অসুবিধার কারণে তিনি পরে সরে দাঁড়ান। ১৯২০ সালের ১২ই জুলাই স্বভাব কবির নামের পাশে আরেকটি বড় পরিচয় যুক্ত হল, সম্পাদক। মোজাফফর আহমেদের সাথে যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত হল নবযুগ। যার প্রথম পর্ব হতেই সমসাময়িক ভারতবর্ষের আর্থ-সামাজিক বিষয়গুলো সম্পর্কে পত্রিকায় নানা ধরণের লেখা প্রকাশিত হত। শুরু হল নজরুলের ব্রিটিশ রাজের স্রোতের বিরুদ্ধে চলার আরেকটি দু:সাহসী পদক্ষেপ।

কবির লেখক জীবনের প্রথম দিকে তাঁর রচিত রাক্ষসী, বেদনা হারা, আবাহন সহ মোট নয়টি রচনা সওগাতে প্রকাশিত হয়েছিল। বস্তুত, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আকস্মিক পরিসমাপ্তি! সৈনিক জীবনের ঝঞ্জাবিক্ষুব্ধ জীবনকে ছুটি জানিয়ে পুরোপুরি মন দিলেন ভাবের জগতে। একদিকে ব্রিটিশ বিরোধী নিত্য সংবাদ তৈরি আর অন্যদিকে সৃজনশীলতার বিস্তৃত পথটিকে ক্রমশ বড় করা নিয়ে তরুণ কবি মত্ত ছিলেন।
‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর ছোট গল্প ‘বাদল পাতের শরাব’ আর ‘খেয়া পারের তরণীর’ মাধ্যমে গল্পকার হিসেবে তাঁর পরিচিতি পাঠকমহলে ছঁড়িয়ে পড়ে।
সময় তার যুবাপুরুষটির কলমের সাথে এক অদ্ভুত সন্ধি পাতিয়েছিল। আর তাই, ইতিহাসের বাঁক ঘুরানো ঘটনাগুলো ও তাঁর পরিণত বয়সের সাথে তাল মিলিয়ে একের পর এক বইয়ের পাতাগুলো ভরে যেতে লাগল এক অনন্য সাহিত্যকর্মে।
জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে মোজাফফর আহমেদ এবং নজরুলের যৌথ উদ্যোগের ফসল ‘নবযুগ’ পত্রিকাটি, যেখানে তিনি এ দু:সহ হত্যাকান্ড নিয়ে একটি সময় সচেতন প্রবন্ধ লিখেন। তাছাড়া, খিলাফত, হিজরত, অসহযোগ আন্দোলনের সূদুরপ্রসারি প্রভাব, ধর্মঘট , মুহাজিরীন হত্যার জন্য দায়ী কে? সহ নানা বিশ্লেষণাত্নক প্রবন্ধে তিনি সমৃদ্ধ করেছিলেন নবযুগের সম্পাদকীয়।
১৯২১ সালের জুলাই মাসে তাঁর বিখ্যাত ‘ভাঙার গান’ কবিতাটি রচনা করেন। যেটির অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের পত্নী বাসন্তী দেবীর কাছ হতে। কবিতাটি, সাপ্তাহিক বাংলার কথা-য় ১৯২২ সালে জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত হয়। কিছুটা বিরতিতে পরপর প্রকাশিত হয় তাঁর চিরসবুজ ‘বিদ্রোহী কবিতাটি’ এবং ‘কামাল পাশা।’ প্রথমে সাপ্তাহিক বিজলীতে ১৩২৮ বঙ্গাব্দের পৌষ সংখ্যায়, পরবর্তীতে কার্তিক সংখ্যা মুসলিম ভারতে দু‘টি কবিতা একত্রে প্রকাশিত হয়েছিল।
‘বিজয়িনী’ তাঁর বিখ্যাত প্রেমের কবিতা এরপর ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’, সুসময় তার দু‘হাত বাড়িয়ে তাঁকে আলিঙ্গন করেছিল। মুসলিম ভারত ও প্রবাসী পত্রিকায় সে বছরের এপ্রিল মাসে কবিতা দু‘টি প্রকাশিত হয়। কলম চলছিল পুরোদমে, তবে ভাবের মানুষটি কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হচ্ছিলেন প্রতিনিয়ত। যথেষ্ট আর্থিক সংকটের মধ্যে ছিলেন তিনি, তাঁর এ আর্থিক সংকট দূর করতে ১৯২২ সালের মে মাসে মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলির অনুরোধে তিনি ‘দৈনিক সেবক’ পত্রিকায় ‘কাতুকুতু’ নামে এক ব্যঙ্গ রসাত্নক ধারাবাহিক লেখা শুরু করেন।
১৯২২ সালের ২৫ জুন ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত প্রয়াত হওয়ার পর তাঁর স্মরণে সেবক পত্রিকায় তিনি একটি অসামান্য সম্পাদকীয় রচনা করেন। কর্তৃপক্ষ সেটি কিছুটা অদল-বদল করাতে তিনি মারাত্নক ক্ষুব্ধ হয়ে সংসার কিভাবে চলবে তার তোয়াক্কা না করে এক কথাতেই সেবক পত্রিকা ত্যাগ করেন।
এই সময়কালে নজরুলের প্রথম গল্প সংকলন ‘ব্যথার দান’ প্রকাশিত হয় । যাতে, নজরুলের জনপ্রিয় কিছু গল্প যেমন হেনা, ব্যথার দান,রাজবন্দীর চিঠি প্রভৃতি সংকলিত হয়েছিল। ভয়ংকর আর্থিক সংকটের মুখোমুখি কবি মাত্র ১০০ টাকায় সে বইয়ের স্বত্ব আযিযুল হকের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তবে, দমে যাওয়ার পাত্র নন তিনি। সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে ১৯২২ সালের ১২ আগস্ট ‘ধুমকেত’ু নামক অর্ধ সাপ্তাহিকটির যাত্রা শুরু করেন। পত্রিকাটির সম্পাদকীয় যাত্রা শুরু হয়ে ছিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশীর্বাদ বাণী দ্বারা। যাতে তিনি লেখেন-কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু, আয় চলে আয় রে ধুমকেতু, আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু, দুর্দিনের এই দুর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন। অলক্ষণের তিলক রেখা। রাতের ভালে হোক না লেখা, জাগিয়ে দেরে চমক মেরে আছে যারা অর্ধচেতন। কবিগুরু ধন্য নজরুল ধুমকেতু পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যার সম্পাদকীয়তে এই লেখাটি ছাঁপাতেন।
এই ধুমকেতু পত্রিকাতেই প্রথম তাঁর বিখ্যাত ‘ধুমকেত’ু পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় এবং তিনি প্রথম ভারতের জন্য পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি জানান ১৯২২ সালের ১৩ই অক্টোবর। তিনি নি:সঙ্কোচে লেখেন; স্বরাজ টরাজ বুঝি না, কেননা ও কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম ভাব করে থাকেন। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, সমস্ত শাসনভার সমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে। তাতে কোন বিদেশীর মোড়লী অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না। আমাদের এই প্রার্থনা করার, ভিক্ষা করার কুবুদ্ধিটুকু দূর করতে হবে। বন্ধু মোজাফফর আহমেদ ‘দ্বৈপায়ন’ ছদ্মনামে,বিশিষ্ট সাহিত্যিক নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় ‘ত্রিশূল’ ছদ্মনামে, প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ হুমায়ূন কবির, বলাই দেব শর্মা সহ অনেকের সময়োপোযোগি রচনার সহযোগিতায় কবি সার্থক হয়েছিলেন ধুমকেতু পত্রিকাটিকে জনপ্রিয়তার শীর্ষ বিন্দুতে পৌঁছে দিতে। অপরদিকে, হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বাঙালির মননে আলোড়ন তোলা কবির প্রবল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবিরোধী মনোভাব, ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি-রক্ষণশীল সমাজের কাছে এক ভয়ানক আপত্তির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ‘ইসলাম দর্শন’ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে কড়া সমালোচনা লেখা হল: ইসলাম দর্শনের গত আশ্বিন সংখ্যায় আমরা অমঙ্গলের অগ্রদূত ধুমকেতু ও উহার স্বেচ্ছাচারী সারথি সম্বন্ধে একটু সমালোচনা করিয়াছিলাম। কিন্তু, দুষ্ট ধুমকেতু উহার দুর্বিনীত সারথি এখন পবিত্র ইসলাম ধর্ম ও ইসলামি শরীয়তের উপর পর্যন্ত শয়তানি আক্রমণ আরম্ভ করিয়া দিয়াছে।
কাজী নজরুলের ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ প্রকাশিত হয় ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ৯ আশ্বিন সংখ্যা ধুমকেতু-তে। কবিতাটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই ব্রিটিশ সরকার পত্রিকাটি বাজেয়াপ্ত করে। ভয়াবহ রাজরোষের শিকার হন নজরুল, বিচারের নামে প্রহসনে এক বছরের কারাদন্ড হয় বিদ্রোহী সম্পাদকটির। বিচারের সময় তাঁর জবানবন্দী-‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ শিরোনামে ধুমকেতু পত্রিকার বিশেষ কাজী নজরুল ইসলাম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। তাঁর জেলবন্দী থাকাকালে পত্রিকাটি প্রকাশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন অমলেশ কাঞ্জিলাল। তাঁর বিখ্যাত প্রেমের কবিতা সংকলন ‘দোলনচাঁপা’ জেলবন্দী থাকাকালে রচিত হয় আর এই সংকট সময়টিতে কবিকে ‘বসন’্ত নাটকটি উৎসর্গ করেন রবীন্দ্রনাথ।
১৯২৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর কবির বন্দীদশার অবসান হয়। বাস্তবতা বুঝেই তিনি প্রমীলা সেনগুপ্তের সাথে ১৯২৪ সালের ২৪শে এপ্রিল আটপৌরে সংসারের বাঁধনে জড়ালেন। সংসারি কবির কাব্যচর্চা তাতে থেমে থাকেনি-মুক্তিকাম, ঝড়, চরকার গান একের পর এক কবিতা সর্বস্তরের পাঠকের কাছে সমাদৃত হচ্ছিল। ১৯২৫ সালের নভেম্বর মাস নাগাদ রাজনীতি সচেতন মানুষটি এবার প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লেন। লেবার স্বরাজ পার্টির সাথে তাঁর একটি ঘনিষ্ঠ সর্ম্পক গড়ে উঠে। ‘লাঙ্গল’ নামে দলটির একটি মুখপত্র প্রকাশের সিদ্ধান্ত হয় ১৯২৫ সালের ২৫শে ডিসেম্বর যেটির প্রধান পরিচালক হিসেবে তাঁর নাম এবং প্রথম সংখ্যাতে তাঁর জনপ্রিয় কবিতা ‘সাম্যবাদী’ প্রকাশিত হয়। এই সময়কালে, ১৯২৬ সালের প্রথম দিকে গোটা দেশে ভয়াবহ দাঙ্গা ঘটে। বাধ্য হয়ে কৃষ্ণনগর চলে গেলেন, সেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে জন্ম নিল কবির কালজয়ী রচনা ‘কান্ডারী হুঁশিয়ার।’ কৃষ্ণনগরে থাকাকালীন তিনি ভয়াবহ আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন আর অন্যদিকে ১৩৩৩ বঙ্গাব্দে পুনরায় ‘সওগাত’ পত্রিকা আবার নতুন করে প্রকাশিত হতে শুরু করে। দাঙ্গার প্রভাবে সমাজে স্বজাত্যবোধ এবং স্বতন্ত্র চেতনা অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠে। সেই বোধ হতে সম্পাদক নাসিরুদ্দিন তাঁকে আরবি-ফারসি শব্দের সংমিশ্রণে ইসলামি ঐতিহ্যমন্ডিত কাব্য রচনার অনুরোধ জানান। তাঁর আর্থিক সংকট দূর করতে সওগাত তাঁর সঙ্গে মাসিক ১৫০ টাকার বিনিময়ে নিয়মিত লেখার জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। যাতে, স্পষ্ট লেখা ছিল তিনি প্রতি সংখ্যা সওগাতে কবিতা, গান ও একটা ধারাবাহিক উপন্যাস লিখবেন। সন্ধ্যায় সওগাত অফিসের সাহিত্য মজলিশে অংশগ্রহণ করবেন এবং ‘চানাচুর’ বলে একটি বিভাগ ছিল সেটির দায়িত্ব ও তাঁর উপর পড়ে। সওগাত অফিসের নিচেই তাঁর নতুন সংসারের শুরু। তারপরও সময়ের এই বিরল প্রতিভাকে বাঁচাতে গিয়ে ১৯২৭ সালের মার্চ মাসে অ্যালবার্ট হলে সওগাতের উদ্যোগে নামকরা কবি সাহিত্যিকদের অংশগ্রহণে কবির সাহায্যার্থে একটি সার্থক অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছিল। তাঁর চল, চল উর্ধ্বগগনে বাজে মাদল এ কবিতাটির মাধ্যমে তিনি আবার সওগাতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে কলম চালাতে থাকেন। নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাসের অবিরত চর্চা, অপর পক্ষে মানবিকতা বজায় রেখে সত্য কথনে অসাধারণ ভারসাম্য বজায় রাখা -সওগাত আর কবি নজরুল জন্ম দিয়েছিল এক অনন্যসাধারণ উপাখ্যান যা কালের বিচারে আজও অমূল্য।
(সূত্র: দৈনিক স্টেটসম্যান)

x