কবি অরুণ সেন : কিছু স্মৃতি, কিছু কথা

মনিরুল মনির

শুক্রবার , ৩ আগস্ট, ২০১৮ at ৩:২৯ পূর্বাহ্ণ
30

অজস্র স্মৃতি। খুব বেশি করে বলতে চাইছি না। স্মৃতি পুষে রাখলে উষ্ণতা অনুভব করি। মনের মধ্যে এক তরঙ্গ সবসময় খেলা করে যায়। সেই বেশ। আর বলবার জন্য স্মৃতি ক্রমশ পুরনোও হতে হয়। পুরনো স্মৃতিগুলো আরো বেশি পুরনো হওয়া জরুরি। বেঁচে থাকতে যাকে আমরা বুঝতে পারিনি, তাকে বুঝতে চাইবো কেন! আমাদের তো কাণ্ডজ্ঞানহীন দিক রয়েছে। এলোমেলো সাহস রয়েছে। রয়েছে ঝাঁঝালো স্পর্ধা। এই যে সহসা স্মৃতি হয়ে যাওয়া, এটি আজ আমার কাছে চরম বেদনার। যারা কবিতায় ভাবেন, তাদের কাছে বেশি অশান্ত। অস্থির সেই ঢেউ।

চট্টগ্রাম শহরের জাগতিক পাড়াটি সবসময় জাগ্রত থাকে। চেরাগি পাহাড়, মোমিন রোড, আন্দরকিল্লা, রহমতগঞ্জ, জেএমসেন হল, জামাল খান রোড, সিরাজদ্দৌলা রোড পাশাপাশি ডিসি পাহাড়। সব কোলাহলে উদ্দাম থাকবে। কোনো কিছুই থেমে থাকে না, থাকবেও না। এখনও চেরাগি পাহাড়ে চায়ের দোকানে কাপপিরিচের ঝনঝনানি শোনা যায়, পানের দোকানে দোকানি সক্রিয় আছে। নেই কেবল অরুণ সেন। ঐ পান দোকানি অবাক দৃষ্টিও কোনো না কোনো ভালোবাসার তীব্রতা দেয়। পত্রিকার হকাররা আর ফেরি করবে না অরুণ সেনের কবিতা। তার কবিতা ইতিহাসের সৌকর্য নিয়ে গর্ব করতে থাকে। তিনিই তো বাংলা কবিতার পোক্ত পঙক্তিটি আমাদের ধরিয়ে দিতে চেয়েছেন। আমরা তার কাছে কিছুই শিখিনি। তার হাসিকে বুঝতেই পারিনি। ‘যেঠিকানা স্থায়ী নয়, সে তুলেছে চুপিচুপি বুকের ভেতর এত ঢেউ/যেকথাটা কথা নয়, চোখ নিজে বয়ে নেয়, সেকথাটা বুঝেছে কি কেউ।’ বুঝতে পারিনি, পারিনি তার কথা।

তার খিস্তিখেউড় আর উচ্চ রবে কথা বলার ভঙ্গি নিয়ে আমাদের আড্ডা পেতো বিশেষ গুরুত্ব। এক অস্বচ্ছতার বিরুদ্ধে সেই বাক্যবান। আমরা সবাই চুপ, শুনছি। অন্যরাও শুনতে পারছে, পাশ থেকে লোকজন হেঁটে যায় কেউ কেউ চাইছে কি হচ্ছে এখানে। রাস্তায় ধারে ফুটপাতে কিংবা চায়ের দোকানে সেই অদ্ভুত সময়। ভাবনার চিৎকার কবির কণ্ঠে। চিন্তার উৎকর্ষতা। ভঙ্গুর সমাজের, অস্থির জীবনের শুধরে যাবার আড্ডা। কখনও কখনও কবিতা, কখনও হাসিঠাট্টা, তামাশা, এই এক জীবন পার করেছি আমরা। আমাদের জন্য এই রাস্তা, এই চায়ের দোকান সরগরম হয়ে পড়েছে। এখন আর ওভাবে আমরা বসতে পারবো না। ওভাবে আর আড্ডা হবেও না। একজন দুরন্ত মানুষ আজ আর নেই। তাকে স্মরণ করেই এই লেখা। জানি না কীভাবে যাব?

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাহিত্যকর্মিদের কাছে অরুণ সেন ছিলেন প্রাণের মানুষ। সেই ঋতপত্র তাকে দিয়েছে গৌরবের সংগ্রামী করে। এই ছোট কাগজটি ক্রমশ সাহিত্য পত্রিকার ঋদ্ধতা নিয়ে আমাদের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বাংলা সাহিত্যের শীর্ষ সাহিত্যকর্মিদের লেখা দিয়ে ভরপুর থাকতো। থাকতো গবেষণাধর্মী লেখা। এতেই পুষ্ট নয়, বহু কবিতার কবিতা ঠাসা থাকতো। যে সমাজ থেকে লেখা আসছে তাকে নিয়ে জোরালো চিৎকার, ‘এখানে অনেক ঝাপসা ও অনিশ্চিত বিষয় যেমন আমাদের মনে অনুরাগ জন্মায় ঠিক তেমনি অনেক সত্যের মুখচ্ছবিও আমাদের ভয় দেখায়।’

আমাদের সংসার, আমাদের অসুস্থতা নিয়ে তার আপত্তি। আমাদের চলা, কলা নিয়ে আছে অনেক কথা। সমাজের অস্বচ্ছতা, অন্ধদিকভ্রান্তদের নিয়ে আক্ষেপ, ক্ষোধ। তিনি এভাবেই ঘৃণা জানাতেন, ‘অশুদ্ধ আহারে বাড়ে ক্ষুধার মত্ততা/আর ক্ষুধা অন্ধ হলে পরিণতি চোখেই পড়ে না/মানুষ মানুষ খেয়ে তাকে হজমের পরও কিন্তু/জীবিত রেখেই দিচ্ছে ভোজনের অন্য এক রূপ।’ সেভাবেই হয়তো বলতে পেরেছেন, ব্যঙ্গ করেছেন, বিশুদ্ধতা প্রকাশ করেছেন, ‘পাথরের কান্নাতেই হৃদয় পাথর।’

আমাদের ভালোবাসার কিংবা বেদনার দিনগুলো এখন কেবলই স্মৃতি। সেই স্মৃতিতে এলো এক চৈত্রমাস। হঠাৎ তার চিরদিনের প্রস্থান আমাদের অসহায় করে দেয়। ‘পূত হে গাঁ, ও পরম পুণ্যভূমি মায়ের আঁচল/ তোমার ছায়া পুড়ে পাপ হয় নিষ্পাপ সকাল/ নিশ্চুপ বৃক্ষরা দ্যাখো ঠিক তোমারই বোনের মতো/ প্রাণের ফুয়েল দিয়ে টেনে করে সবুজ আদর/ আকাশ ছড়িয়ে দেয় চেতনার সফল আবাদ/বাতাস বাড়ায় আরও আনন্দের পবিত্র মেয়াদ।’ সেই গাঁয়ের পবিত্র মাটিতে মিশে আছেন কবি অরুণ সেন।

তিনি শহরের কোলাহল ছেড়ে একলা হয়ে গেলেন। তার কাছে এখন আছে মুকুন্দরামের হাট, সেই হারগিজি খাল। তাইতো বলে গেছেন, ‘সময়ের ঠোঁট হারগিজি খালে ভিজে/হয়ে খুব পরিপাটি।’ আমরা এখন গোলক রহস্যে আছি। সেই রহস্যের কথাই বলি, ‘অনেক ভুলের প্রতিবেশী মাঝরাতে/গুমরানি শোনে কার/ভদ্র ফাঁকিটা ধরবার ভুল দায়ে/কেন সব ছারখার।’ আমরা পড়ে গেছি ‘ভদ্র ফাঁকির’ ফাঁদে। ভদ্রলোকের সভ্যতায় এই এক অস্বচ্ছতা। কবির মূল আঘাতের জায়গা এখানে। তার প্রতি আমাদের চিন্তার হাত প্রসারিত হোক। প্রণতি জানাই হে কবি।

x