কন্যাসন্তানের জন্মপূর্ব ছোট্ট আখ্যান!

মাধব দীপ

শনিবার , ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ at ৪:৪৯ পূর্বাহ্ণ
86

ছোটোবেলায় পড়েছিলাম রামায়ণ। প্রাথমিক ও হাইস্কুলের ধর্ম বইয়ে। সংক্ষিপ্ত আকারে। প্রাচীন সংস্কৃত মহাকাব্য এটি। ঋষি বাল্মীকি এর রচয়িতা। ওখানে পড়েছিরাজা দশরথের তিন স্ত্রী। মূলত পুত্র সন্তানের আশায়ই রাজা দশরথ তিন স্ত্রী গ্রহণ করেন। কারণ, রাজত্ব রক্ষা করতে হলে পুত্র সন্তান দরকার। এবং শেষে রাজা দশরথ চার পুত্র সন্তানের জনক হলেন। অর্থাৎণ্ড টেক্সট বইয়ে পড়েছিলামরামএরা চার ভাই। রাম, লক্ষণ, ভরত ও শত্রুঘ্ন।

কিন্তু এই যে, চার পুত্রসন্তান। তাঁরা জন্মেছিলেন এক কন্যা সন্তানের বড় ত্যাগের বিনিময়ে। তাঁর নাম ছিলো শান্তা। শান্তা হলো রামেরও বড় বোন। তার মানেণ্ড রামএরা চার ভাই, এক বোন। কিন্তু সেই বোনের ইতিহাস আমরা পড়িনি ছোটোবেলায়। আমাদের বইয়ে ছিলো না। আমার মাকেও জিজ্ঞেস করেছিলামতিনি রামায়ণ পড়েছেন। তিনিও জানতেন নাণ্ড শান্তা নামে রামের এক বড় বোন ছিলো।

শান্তা ছিলো বড় মাপের যোদ্ধা। কিন্তু দশরথের মনে খুশি ছিলো না। কারণ এই যোদ্ধা কন্যাসন্তান দিয়ে তিনি কী করবেন? সে তো আর রাজত্ব কিংবা বংশ রক্ষা করবে না! বংশ রক্ষার জন্য চাই পুত্রসন্তান। তাই কন্যা সন্তানকে এক কঠিন কর্মসাধনে প্রেরণ করার বিনিময়ে লাভ করলেন তিনি চার পুত্রসন্তান।

এই ইতিহাস এখন জেনেছি। বড় হয়ে। পড়াশোনা করে।

যাই হোক, জানার এ গল্পটি আমি এজন্য বললাম যে, আমি প্রায়শই ভাবিণ্ড কেনো কালক্রমে শান্তার ইতিহাসটি বাদ পড়ে গেলো আমাদের পাঠ্যবই থেকে! জানি না। তবে এটা বুঝতে পারিনারীর অনেক ইতিহাসই লেখা হয়েছে পুরুষের হাতে। সে কারণেই গণ্ডগোল। নারীর অর্জন, নারীর স্বীকৃতিকে ছোটো করে দেখতে করা হয়েছে ইতিহাসের এইরকম বিকৃতি।

শান্তার ঘটনাটি হঠাৎ মনে পড়ে গেলো আবার। কারণ প্রায় দুই বছর হলো আমি বাবা হয়েছি। স্বাভাবিকভাবেই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আমার স্ত্রীকে বেশ কয়েকবার আল্ট্রাসনোগ্রাম (ইউএসজি) করতে হয়েছে। রিপোর্ট বেশ ভালোই ছিল সবসময়। কিন্তু পুত্র না কন্যা সন্তান হবেণ্ড তা জানা নিয়ে আমার ও আমার স্ত্রীর যতোটা না আগ্রহ তার চেয়ে বেশি আগ্রহ আমার আত্মীয়স্বজনসহ পরিচিত, অল্প পরিচিত, অতি পরিচিত অনেকেরই। তাদের জানার ঢের কৌতূহলের অনেক পরও নিয়মিত চেকআপে থাকা আমরা প্রায় আট মাস সংশ্লিষ্ট কোনো চিকিৎসককে জিজ্ঞেস করিনিআমাদের সন্তানের জেন্ডার কী হবে?

এর কারণ একটাই। সন্তানতো সন্তানই। মাবাবার কাছে তার আবার জেন্ডার কি? ছেলে হোক আর মেয়েই হোক আমাদেরতো সে মা ও বাবা বলেই ডাকবে। আর আমরাই কি তার প্রতি যত্নের কোনো তারতম্য করবো নাকি? কিন্তু বিপত্তিটা বেঁধেছিলো অন্যখানে। যেহেতু আমরা চিকিৎসকের কাছে এব্যাপারে কখনো পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে জানতে চাইনি আর আত্মীয়স্বজনদের এব্যাপারে যথেষ্ট কৌতূহল থাকার পরও তারা কোনো সদুত্তর পাচ্ছিল না; সেহেতু, সবাই মনে মনে ধরে নিলোণ্ড আমাদের মেয়ে সন্তানই হবে। অবাক কাণ্ড!

না জানলে, চিকিৎসককে জিজ্ঞেস না করলে কিংবা না বলতে চাইলেণ্ড সবাই কেনো ধরে নেবে মেয়ে সন্তানই হবে! অনেকেতো আবার কয়েক ডিগ্রি এগিয়ে এসে গ্যারান্টি দিয়েই বললোকন্যাসন্তান হবে। অতঃপর কী মনে করে সময় ঘনিয়ে আসলে স্ত্রীর ইউএসজি করানোর পর আমি নিজেই চিকিৎসককে জিজ্ঞেস করলামআমাদের সন্তানের জেন্ডার (সেক্স) কী? তিনিও অবাক করলেন আমাদের। উত্তর না দিয়ে ফ্যাকাশে মুখে বললেন– ‘এতোদিন পরে কেনো? এর আগে জানেননি আপনারা? এখন আর বলা যাবে না।’

চিকিৎসকের সাথে আর কথা বাড়ালাম না। কিন্তু, মনে মনে ভাবলামএরকমভাবে বলার মানে কী? ব্যাপারটি বাসায় এবং ঘনিষ্ঠজনদের সাথে শেয়ার করলাম। শুনে সবাই বললো– ‘তাহলে, মেয়েই হবে। এ জন্যই চিকিৎসক ওইভাবে উত্তর দিয়েছেন। ছেলেসন্তান হলে অনেক আগেই জানাতেন চিকিৎসক। অনেক আগেই সোৎসাহে সেই খবর দিয়ে দিতেন। কারণ, ছেলেসন্তান হওয়াটা সুখবর!’

বেশিরভাগ দম্পতিই নাকি এমনটা আশা করেন। আর শ্বশুরশাশুড়ি তো বটেই। ভাবতে অবাক লাগলোজন্মের আগেই কন্যাসন্তানের প্রতি এ কেমন বৈষম্য সমাজের? আমরাতো এই প্রচলিত সমাজে নিজেদের যথেষ্ট শিক্ষিত বলেই দাবি করতে পারি। প্রথম শ্রেণির চাকরিও করছি। আর, চিকিৎসকরাওতো প্রথম শ্রেণিরই পড়াশোনা জানাঅলা মানুষ। দুনিয়াতো অনেক এগিয়েছে। যদি শিক্ষা এই সমাজ থেকে এ ধরনের অন্ধকার দূর করতে না পারেণ্ড তবে মুক্তি কোথায়?

অতীতে পরিবারে কন্যা সন্তান প্রত্যাশিত ছিলো না। হত্যা করা হতো। কন্যা সন্তান জন্মের জন্য মাকে দায়ী করা হতো। সমাজে নারীর মর্যাদা ও অবস্থান ছিলো না। অমানুষ তথা ভোগ্যপণ্য ভাবা হতো তাদের। স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়াকে অশৌচ (বা অপবিত্র) হিসেবে গণ্য করা হতো। এখনো কি দিন বদলায়নি? কন্যারা কি তবে এখনও শুধুই স্ত্রী, জননী কিংবা অমুকের কন্যা, অমুকের স্ত্রী কিংবা অমুকের মা হয়ে থাকবে? স্বামীর প্রয়োজনে, সমাজের প্রয়োজনে নারী কি তবে মানুষ নয়, অমানুষও নয়, কেবলই মেয়ে মানুষ? কন্যার জন্মসংবাদ কি নিরানন্দসূচক এখনও? এই শহরেও?

কিন্তু এ মানসিকতার শেষ কোথায়? এ কেমন চৈতন্য! কন্যাসন্তানের জন্ম এখনও কেনো নিরানন্দময় হবে? রামএরা চারভাই, একবোন কখন সমস্বরে উচ্চারিত হবে? কবে পাবো আমরা এই দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি?

x